Robbar

এক শহর, দুই নির্বাসন

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 12, 2026 8:06 pm
  • Updated:August 12, 2026 8:07 pm  

প্রাগ তখন আমার কাছে নিছক কোনও পর্যটনকেন্দ্র নয়। কাফকার ‘The Metamorphosis’ (‘রূপান্তর’), ‘The Trial’ (‘বিচার’) আর মিলান কুন্দেরার উপন্যাস পড়তে পড়তেই শহরটি আমার মনে গড়ে উঠেছিল– গথিক গির্জা, পাথরের গলি, ভলতাভা, চার্লস সেতু, কুয়াশা আর এক অদ্ভুত মধ্য-ইউরোপীয় বিষণ্ণতা। চেক চলচ্চিত্রের প্রতিও তখন দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। ডেরেক ম্যালকমের লেখা পড়ে আগ্রহ, পরে চলচ্চিত্র-আলোচনা কেন্দ্রের অন্ধকার ঘরে কয়েকটি চেক ছবি দেখা। পর্দার আলো-আঁধারির মধ্য দিয়েই যেন প্রাগকে বাস্তবে যাওয়ার আগেই চিনে ফেলেছিলাম।

রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

সেদিন সন্ধে ছ’টায় আমার লেখা নতুন নাটকের মহড়া ছিল। অদ্ভুতভাবে সেদিন মহড়া অন্যদিনের তুলনায় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেল। থিয়েটার থেকে বেরিয়ে দেখি, আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি, কিন্তু শহরের গায়ে ইতিমধ্যেই সন্ধের ধূসরতা নেমে এসেছে। হেলসিঙ্কির সেই সন্ধেটা আজও মনে আছে। আকাশের রং পুরনো কোনও সাদাকালো ছবির মতো। বরফে ঢাকা রাস্তার ওপর হলুদ আলো পড়ছিল। সব কিছু নিস্তব্ধ, একটু দূরের, একটু অন্যরকম। ঠিক করলাম, হাঁটতে হাঁটতেই বাড়ি ফিরব।

পাথর-বিছানো সরু রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ভিনসেন্ট ভ্যান গগের ‘তারাভরা’ রাতের কথা মনে পড়ল। ছবিটি হেলসিঙ্কিতে আঁকা নয়, তবু সেদিন নীল আকাশের মধ্যে আলো আর অন্ধকারের মিশ্রণে মনে হচ্ছিল, বাস্তবেরও কখনও কখনও ছবির মতো হয়ে ওঠার ক্ষমতা আছে।

কখন যে শহরের প্রাণকেন্দ্রে, স্টকম্যান বিপণিবিতানের সামনে এসে পড়েছি, খেয়ালই করিনি। ঠিক তখনই চোখে পড়ল চেক বিমানসংস্থার দপ্তর। জানলার কাচে বড় বড় অক্ষরে লেখা– ‘বিশেষ সুযোগ: প্রাগ’। ওদের উচ্চারণে– ‘প্রাহা’।

আমি দাঁড়িয়ে গেলাম।

ওল্ড টাউন স্কোয়ার, প্রাগ, পুরাতন চিত্র

প্রাগ তখন আমার কাছে নিছক কোনও পর্যটনকেন্দ্র নয়। কাফকার ‘The Metamorphosis’ (‘রূপান্তর’), ‘The Trial’ (‘বিচার’) আর মিলান কুন্দেরার উপন্যাস পড়তে পড়তেই শহরটি আমার মনে গড়ে উঠেছিল– গথিক গির্জা, পাথরের গলি, ভলতাভা, চার্লস সেতু, কুয়াশা আর এক অদ্ভুত মধ্য-ইউরোপীয় বিষণ্ণতা। চেক চলচ্চিত্রের প্রতিও তখন দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। ডেরেক ম্যালকমের লেখা পড়ে আগ্রহ, পরে চলচ্চিত্র-আলোচনা কেন্দ্রের অন্ধকার ঘরে কয়েকটি চেক ছবি দেখা। পর্দার আলো-আঁধারির মধ্য দিয়েই যেন প্রাগকে বাস্তবে যাওয়ার আগেই চিনে ফেলেছিলাম। সেদিন অবশ্য এত গভীর কিছু ভাবছিলাম না। সত্যিটা সহজ– নিজের জীবনটাই তখন কেমন অর্থহীন লাগছিল। হয়তো অবসাদ, হয়তো দীর্ঘদিনের উত্তরহীন প্রশ্ন, হয়তো ফিনল্যান্ডের ছাইরঙা আকাশ, দীর্ঘ শীত আর নৈঃশব্দ্য– হয়তো সব মিলিয়ে। শুধু মনে আছে, হঠাৎ একটা কথা মাথায় এসেছিল– ‘কিছুই যেন অর্থপূর্ণ নয়।’ আর সেই মুহূর্তেই মনে হল– তাহলে প্রাগে যাওয়া যাক।

কোনও পরিকল্পনা ছিল না। কাউকে ফোন নয়, ভ্রমণসূচিও নয়। শুধু রাস্তার ওপারের দপ্তরটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তারপর দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লাম। কয়েক মিনিট পর বেরিয়ে এলাম হাতে একটি টিকিট নিয়ে।

গন্তব্য– প্রাগ।

এখন ফিরে তাকালে ঘটনাটা অবিশ্বাস্য মনে হয়। একটি সন্ধ্যায় মহড়া আগে শেষ হল, হাঁটতে বেরলাম, জানলায় প্রাগের নাম দেখলাম– আর কিছুক্ষণ পর শহরটির টিকিট হাতে। তখনও জানতাম না, এই ছোট্ট সিদ্ধান্ত আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে। শুধু জানতাম, হেলসিঙ্কি থেকে কয়েক দিনের জন্য বেরিয়ে যাচ্ছি। আর হয়তো নিজের জীবন থেকেও একটু বেরিয়ে যেতে চাইছিলাম।

ফ্রানৎস কাফকা

প্রাগ তখনও আমার কাছে কাফকার, কুন্দেরার, চলচ্চিত্রের– একটি বইয়ের ভিতরে বসবাস করা শহর। কয়েকদিন পর সত্যিই সেখানে পৌঁছব। এতদিন যে শহরকে শব্দ আর কল্পনায় চিনেছি, বাস্তবের প্রাগ তার সঙ্গে কতটা মেলে– সেই পরীক্ষার মুখোমুখি হব।

চেক বিমান সংস্থার বিমানটি যখন প্রাগের মাটিতে নামছিল, জানলার বাইরে একের পর এক বিবর্ণ সোভিয়েত আমলের বাড়ি। হঠাৎ স্নাতক শ্রেণির কথা মনে পড়ল– ১৯৬৮, প্রাগ বসন্ত, সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ট্যাঙ্ক শহরের রাস্তায়। ইতিহাসের বইয়ের ছবি যেন জানলার ওপারে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।

বিমানবন্দরে নেমে একজন চেক ট্যাক্সিচালক আমাকে বেশ চড়া ভাড়া নিয়ে ঠকিয়েছিল। তার মুখ আজ আর মনে নেই। তখন হয়তো বিরক্ত হয়েছিলাম, কিন্তু সেই সময় চারপাশের অনেক কিছুই যেন একটু দূর থেকে দেখছিলাম।

ভলতাভার জলের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হল, জলের মধ্যে দু’টি ছায়া কাঁপছে– একটি কাফকার, অন্যটি কুন্দেরার। কেন এমন মনে হয়েছিল জানি না। শুধু মনে হচ্ছিল, একেবারে নতুন কোনও জায়গায় আসিনি; এমন কোথাও ফিরেছি, যাকে আগে কখনও দেখিনি অথচ বহুদিন ধরে চিনতাম।

সন্ধে নামছিল। গির্জার চূড়া, পাথরের রাস্তা, দূরে বেহালার সুর, কোনও জানালায় জ্বলে ওঠা আলো। শহরের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনটাকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল।

এই রাস্তায় কাফকা হেঁটেছেন। এই আকাশ দেখেছেন। এই নদীর পাশ দিয়ে গিয়েছেন। পরে কুন্দেরাও এই শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটেছেন। একই শহর, অথচ দুই ভিন্ন ইতিহাস।

তখন বুঝতে শুরু করেছিলাম, প্রাগকে শুধু সুন্দর শহর হিসেবে দেখলে তাকে দেখা হয় না। তার অতীত পুরোনো বাড়ির গায়ে, গির্জার দেয়ালে, নদীর জলে, ট্রামের শব্দে মিশে আছে। হয়তো সেই কারণেই মনে হয়েছিল– আমি প্রাগে আসিনি। আমি ঢুকে পড়েছি একটি উপন্যাসের ভিতরে। আর সেই উপন্যাসের শেষ পাতাটি এখনও লেখা হয়নি।

প্রাগে আমার প্রথম দীর্ঘ হাঁটাগুলোর একটি ছিল চার্লস সেতুর ওপর দিয়ে। ভলতাভার ধারে দাঁড়িয়ে মনে হল, আমি যেন হেলসিঙ্কি থেকে প্রাগে আসিনি– একটি বই থেকে আরেকটি বইয়ের মধ্যে এসে পড়েছি। একদিকে কাফকার অদৃশ্য আদালত, অন্যদিকে কুন্দেরার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি; মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে ভলতাভা।

চার্লস সেতুর বারোক ভাস্কর্যগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সবকিছু দেখছে– সাম্রাজ্য, যুদ্ধ, প্রেম, বিচ্ছেদ, নির্বাসন।

সেতুতে তখন পৃথিবীর নানা দেশের মানুষ। ছোট ক্যামেরা হাতে জাপানি পর্যটকদের দেখলে আমার নিজের ছেলেবেলার ইয়াশিকা ক্যামেরাটার কথা মনে পড়ত। কাছাকাছি মাংস ভাজার গন্ধ, কোনও কফিশালা থেকে ভেসে আসা পিয়ানোর সুর, মানুষের কথাবার্তা, নদীর জল, কুয়াশা আর পাথরের ওপর আলো– সব মিলিয়ে দৃশ্যটি পুরনো সিনেমার মতো লাগছিল।

চার্লস সেতুর নিচে জমা ভলতাভা নদী

নিজেকে প্রশ্ন করলাম– কী খুঁজছি?

উত্তর জানতাম না। হয়তো সেই কারণেই প্রাগ আমাকে এত টানছিল। চারপাশের কুয়াশায় মানুষ, বাড়ি, ট্রামলাইন আর আলো একই ছবির মধ্যে মিশে যাচ্ছিল।

ঠিক তখন মনে পড়ল হেলসিঙ্কির শান্ত শহরতলি পাকিলার সেই ভাস্করকে। তাঁর বাগানে কাঠ, পাথর আর ধাতুর অসংখ্য মুখ ও বিকৃত অবয়ব। মনে হচ্ছিল, তারা যেন পৃথিবীর নয়– অন্য কোনও নীরব গ্রহ থেকে এসে এই শহরে আশ্রয় নিয়েছে।

সেই বাড়ির মালিক, মধ্যবয়স্ক এক ভাস্কর, এগিয়ে এলেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর হঠাৎ বললেন– 

‘সমস্যাটা জানেন কী? এই কাজগুলো তৈরি করা আমার পক্ষে কঠিন নয়। কঠিন হল এগুলো বিক্রি করা। এখন আমাকে গ্যালারিতে যেতে হবে, প্রদর্শনীর জন্য অনুরোধ করতে হবে, নিজের কাজের কথা বলতে হবে, নিজেকেই নিজের প্রতিনিধি হতে হবে। অথচ আমি তো শুধু সৃষ্টি করতে পারি। নিজেকে নিয়ে আমার কিছুই বলার নেই। এই ভাস্কর্যগুলোই আমার হয়ে কথা বলে। কিন্তু সেই ভাষা কেউ বোঝে বলে তো মনে হয় না। ধীরে ধীরে আমিও কেমন বোবা হয়ে যাচ্ছি, জানেন?’

কথাগুলো বলার সময় তাঁর চোখে এক ধরনের ক্লান্তি ছিল। শিল্পীর ক্লান্তি নয়– নির্বাসিত মানুষের ক্লান্তি। যেন তিনি নিজের সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না। যেন পৃথিবী তাঁকে শিল্পী হতে দিয়েছে, কিন্তু শিল্পী হিসেবে বাঁচতে দেয়নি।

এই ক্লান্তিটা আমি চিনি। ভীষণ পরিচিত এই ক্লান্তি।

চার্লস সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে সেই মুহূর্তে মনে হল, তিনি শুধু নিজের কথা বলছিলেন না। তাঁর কথার ভিতর দিয়ে যেন আমার নিজেরও কোনও অনুচ্চারিত কথা বেরিয়ে আসছিল।

মিলান কুন্দেরা

কুন্দেরার কথাও মনে পড়ল। তিনি সাক্ষাৎকার দিতে অপছন্দ করতেন; বিশ্বাস করতেন, একজন ঔপন্যাসিকের নিজের উপন্যাসের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে থাকা উচিত। কথাটা আমার অচেনা লাগেনি। শিল্প সৃষ্টি করা এক জিনিস, আর সেই শিল্পের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হয়ে কথা বলা আরেক। সবাই দুটো একসঙ্গে পারে না।

সৃষ্টিকর্তা আর বাজারের কথা ভাবতে গিয়ে রাগ হচ্ছিল। কিন্তু কার ওপর? নিজের কথা একজন শিল্পীকে কেন বলতে হবে? তাঁর কাজ কি যথেষ্ট কথা বলে না?

চার্লস সেতুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে তখন নিজেকেও প্রশ্ন করছিলাম– আমি আসলে কে? একজন অতিথি, ছাত্র, নাট্যকার, নতুন চলচ্চিত্রকার, না কি এমন একজন মানুষ, যে নিজের জীবন থেকেই ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল?

নদীর দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, মানুষ চলে যায়, শহর বদলে যায়, ইতিহাসের ভাষা বদলে যায়– কিছু জিনিস তবু থেকে যায়। মানুষ কি সত্যিই কোনও শহরে থাকে? না কি কিছু স্মৃতির মধ্যে? বাড়ি কি শুধু একটি ঠিকানা? না কি এমন একটি জায়গা, যেখানে ফিরে গেলে নিজের কাছেই ফিরে আসা যায়?

পৃথিবীর সমস্ত মহান শহরের হৃদয়ে কি একটি নদী থাকে– ছায়াপথের বুকের অচেনা কৃষ্ণগহ্বরের মতো, যার চারপাশে শহর তার আলো, ইতিহাস আর স্মৃতিকে নিয়ে ঘুরে চলে? আর সমস্ত মহান সাহিত্যের গভীরে কি থাকে এমনই এক অনুপস্থিতি– যা নেই, অথচ তার না-থাকাটাই পুরো গল্পটাকে অর্থ দেয়?

নদীটির নাম– ভলতাভা

সেদিন উত্তর জানতাম না। আজও পুরোপুরি জানি না। শুধু জানি, প্রাগে এসে দু’টি জিনিস খুব স্পষ্টভাবে অনুভব করেছিলাম– একটি নদী আর একটি অনুপস্থিতি।

নদীটির নাম– ভলতাভা।

অনুপস্থিতিটির নাম– বাড়ি।

কোনও শহর কি কখনও আমাকে এতটা ভাবিয়েছে, যতটা প্রাগ ভাবিয়েছিল?

রাতের ট্রামে বসে মনে হচ্ছিল, আমি কোনও শহরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি না– এই ট্রামলাইন যেন একটি উপন্যাসের প্রান্তরেখা, যা ধরে আমি এগিয়ে চলেছি। জানলার বাইরে গির্জার চূড়া, বৃষ্টিতে ভেজা পাথরের রাস্তা, আর এমন কিছু মুখ, যাদের দেখে মনে হচ্ছিল, তারা হয়তো ১০০ বছর আগেও এই রাস্তায় হাঁটত।

পরদিন সকালে মিষ্টি রোদ উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, সেই আলো যেন কাফকার অন্ধকার পৃথিবীর বাইরে থেকে এসেছে। আমি যাচ্ছি এমন এক মানুষের জাদুঘরে, যিনি বেঁচে ছিলেন মাত্র ৪০ বছর। জীবদ্দশায় নোবেল পাননি; অথচ আলবেয়ার কামু, জ্যঁ-পল সার্ত্র, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, কাজুও ইশিগুরো এবং লাসজলো ক্রাসনাহোরকাই-সহ পরবর্তীকালের বেশ কিছু নোবেলজয়ী লেখকের সাহিত্যজগতে তাঁর প্রভাবের ছাপ রয়েছে। নোবেল তাঁকে পায়নি; সাহিত্যের ইতিহাস পেয়েছে। কাফকার বাড়িটি দেখে বিস্ময়কর কিছু মনে হয়নি। বরং অদ্ভুতভাবে সাধারণ। পৃথিবীর অধিকাংশ ট্র্যাজেডির মতোই– বাইরে থেকে সাধারণ, ভিতরে যার কোনও শেষ নেই।

সকালের প্রাগ সন্ধের প্রাগের চেয়ে অন্যরকম। কুয়াশা সরে গেছে, ভলতাভা রুপোলি আলোয় ঝলমল করছে, চার্লস সেতুতে এখনও ভিড় জমেনি। কাফকাকে বুঝতে হলে শুধু তাঁর বই নয়, তাঁর শহরটাকেও পড়তে হয়। তাঁর আসল বিষয় ছিল মানুষের অসহায়তা– যে মুহূর্তে আমরা বুঝি, পৃথিবী আমাদের কাছে কোনও ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য নয়। জাদুঘরে ঢোকার আগে ভাবছিলাম, ম্যাক্স ব্রড যদি বন্ধুর শেষ ইচ্ছে মেনে তাঁর পাণ্ডুলিপিগুলো পুড়িয়ে দিতেন? ‘The Trial’ (‘বিচার’), ‘The Castle’ (‘দুর্গ’), ‘The Metamorphosis’ (‘রূপান্তর’)– তাহলে কি আজ কাফকার সেই পৃথিবী আমাদের কাছে থাকত? হয়তো কাফকা ছিলেন সেইসব অসমাপ্ত বাক্যের লেখক, যাদের শেষ শব্দটি আজও লেখা হয়নি।

কিন্তু প্রাগের গল্প কাফকায় থেমে থাকে না। কয়েক দশক পরে এই শহরের রাস্তায় হাঁটবেন মিলান কুন্দেরা। ১৯৬৮। প্রাগ বসন্ত। সাম্যবাদকে মানবিক মুখ দেওয়ার স্বপ্ন। তারপর সোভিয়েত ট্যাঙ্ক। একটি রাজনৈতিক স্বপ্নের সঙ্গে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যতও যেন চূর্ণ হয়ে গেল।

পরে ‘The Unbearable Lightness of Being’ (‘অসহনীয় অস্তিত্বের লঘুতা’) উপন্যাসে কুন্দেরা প্রেম, শরীর, রাজনীতি ও নির্বাসনকে এক জটিল মানবিক বয়ানে মিলিয়ে দিলেন। তোমাশ, তেরেজা, সাবিনা– তিনটি জীবন, তিনটি আকাঙ্ক্ষা; পেছনে ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া।

কাফকার প্রাগে মানুষ অজানা দরজার সামনে দাঁড়ায়। কুন্দেরার প্রাগে দরজা খুলেছে, কিন্তু ওপারের পৃথিবী আর আগের মতো নেই।

ফ্রানৎস কাফকা ও মিলান কুন্দেরার দেখা হওয়া সম্ভব ছিল না। কাফকা মারা যান ১৯২৪-এ; কুন্দেরার জন্ম পাঁচ বছর পরে। তবু তাঁরা যেন একই দীর্ঘ কথোপকথনের দুই প্রান্ত। একজন লিখেছেন অদৃশ্য আদালতের কথা, অন্যজন দৃশ্যমান ইতিহাসের। একজনের ভয় ভবিষ্যৎ, অন্যজনের ছায়া অতীত।

হয়তো তাঁদের মিল নির্বাসনে। কাফকা নিজের শহরের মধ্যেই একা; কুন্দেরা শেষ পর্যন্ত নিজের শহরের বাইরে। প্রাগের সবচেয়ে বড় স্থাপত্য কোনও সেতু বা গির্জা নয়– তার সাহিত্য। এক প্রান্তে কাফকা, অন্য প্রান্তে কুন্দেরা; মাঝখানে একটি শহর, যে এখনও নিজের গল্প পড়ে চলেছে।

সেদিন বিকেলে পুরনো শহরের এক সরু গলিতে একটি লাল ডাকবাক্স চোখে পড়ল। মনে হল, সময় এখানে এখনও পুরোপুরি চলে যায়নি। এক মুহূর্তের জন্য কল্পনা করলাম, কাফকা এসে দাঁড়াবেন। কোটের পকেট থেকে বের করবেন একটি চিঠি– খামের ওপর লেখা, মিলেনা ইয়েসেনস্কা। হয়তো সেই ১৩০টি চিঠিরই আরেকটি, যা ভালোবাসার কাছে পৌঁছতে চেয়েও কাগজের ভাঁজেই থেকে গেছে। লাল ডাকবাক্সটির দিকে তাকিয়ে মনে হল, কাফকার প্রেমও তাঁর সাহিত্যের মতো– অধরা।

কাফকা সম্পর্কে যত পড়ছিলাম, ততই মনে হচ্ছিল, তিনি নিজের ভেতরেই দু’টি বিপরীত মানুষের সঙ্গে বাস করতেন– ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা এবং তার কাছাকাছি যাওয়ার ভয়। মিলেনাকে লেখা চিঠিতে এক মানুষকে দেখি, যিনি নিজেকে মেলে ধরতে চাইছেন। অথচ তাঁর জীবনের অন্য প্রান্তে আছে প্রাগের সেইসব রাত, যেগুলোর কিছু সময় তিনি পতিতালয়েও কাটিয়েছেন। সেই রাতগুলোর অর্থ আজ আর পুরো জানা যায় না। হয়তো সেখানে তিনি শরীরের চেয়ে সাময়িক সান্নিধ্যই খুঁজেছিলেন– এমন ঘনিষ্ঠতা, যেখানে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করতে হয় না।

শেষ পর্যন্ত কী খুঁজেছিলেন, হয়তো তিনিও জানতেন না। শুধু মনে হয়, এমন একটি স্থান, যেখানে মানুষ আর একা থাকে না। সেই স্থান তাঁর জীবনে আসেনি। তাই তাঁর সাহিত্যের গোলকধাঁধার শেষে আদালত বা দুর্গের চেয়ে বেশি করে দেখা যায় একজন মানুষকে– অন্ধকারে দাঁড়িয়ে, কারও আসার অপেক্ষায়।

একটা শহরে এসে এত প্রশ্ন আমার মাথায় আসেনি, যতটা প্রাগে এসে এল।

 

পরদিন সকালে পুরনো চত্বরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে হল, কাফকা আজ এই শহরে এলে হয়তো অস্বস্তি বোধ করতেন। ক্যামেরা, স্মারক বিক্রির দোকান, রাস্তার শিল্পী, পর্যটকের ভিড়– প্রাগ যেন ধীরে ধীরে নিজেকেই পণ্য করে তুলেছে।

হঠাৎ পাকিলার সেই ভাস্করের কথা মনে পড়ল– 

‘আমি শুধু সৃষ্টি করতে পারি। বিক্রি করতে পারি না।’

কথাটা নতুন অর্থ পেল। কাফকা তাঁর পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। কুন্দেরা নিজের আড়ালটুকু রক্ষা করেছিলেন। অথচ আজ তাঁদের মুখ কফির পেয়ালা, জামা আর ছবিওয়ালা ডাককার্ডে– সাহিত্য থেকে বাজারে, মানুষ থেকে পণ্যে। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হল– একজন শিল্পীর মৃত্যুর পরে কী বেঁচে থাকে? শিল্প, না কি তার নামকে ঘিরে তৈরি হওয়া বাজার?

আইনস্টাইনের কথাও মনে পড়ল– এই শহরেই তিনি প্রায় দু’বছর ছিলেন। তাঁর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব আগে বুঝিনি; আজও পুরো বুঝি না। তবে বাজারের সূত্রটি যেন সহজ– মহান শিল্পী চলে গেলে মানুষটিকে আর ছুঁতে পারি না; তাঁর নাম ফিরে আসে পণ্যের মোড়ক হয়ে। প্রাগ সেদিন একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল– আমরা কি মহান শিল্পীদের স্মরণ করি, না কি শেষ পর্যন্ত তাঁদেরও ব্যবহার করি?

আলবার্ট আইনস্টাইন

সেই সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরতে ফিরতে মনে হল, প্রাগে আমি পর্যটক নই– নিজেরই এক সাদাকালো ছবির ভিতর দিয়ে হাঁটছি। শহরটাই তার দৃশ্যপট, রাস্তাগুলো একেকটি দৃশ্য; আর আমি একইসঙ্গে অভিনেতা ও পরিচালক।

চার্লস সেতুর ভাস্কর্যগুলো অন্ধকারে নিশ্চুপ। ভলতাভার উপর কুয়াশা। দূরে ট্রামের ঘণ্টা।হঠাৎ কাফকা– কালো কোট, মাথা নত, লাল ফিতের জালে আটকে থাকা এক দপ্তরকর্মী, কোনও অদৃশ্য আদালতের দিকে এগিয়ে চলেছেন। কয়েক পা দূরে মিলেনা, হাতে একটি চিঠি। তারপর কুন্দেরা। হাতে বই নেই; যেন বহন করছেন হারিয়ে যাওয়া এক শহরের স্মৃতি। পাশে তোমাশ, তেরেজা ক্যামেরা হাতে; দূরে সাবিনা, আবার চলে যাওয়ার প্রস্তুতিতে।

কোথা থেকে যেন আইনস্টাইনও এসে পড়লেন। তাকে দেখে আমার মাধ্যমিকে পাওয়া সেই ৪৩ নম্বরের কথা মনে হল। এটুকু বুঝেছি– পৃথিবীর সব অঙ্ক মেলে না; জীবনের অঙ্ক তো আরও দুর্বোধ্য।

ঠিক তখন তেরেজা ক্যামেরা তুলে ধরল আমার দিকে। লেন্সে নিজের মুখ দেখে হেলসিঙ্কির সেই তুষারময় সন্ধ্যার মানুষটিকে চিনতে পারলাম। আমি কি দর্শক, না কি ছবিরই একটি চরিত্র?

পেছনের অন্ধকার থেকে পাকিলার সেই ভাস্কর এগিয়ে এলেন। পাথরের ধুলো-মাখা হাতে মৃদু হেসে যেন আমার নিজেরই এক পুরোনো কথাকে ফিরিয়ে দিলেন– 

‘আমরা শুধু সৃষ্টি করতে পারি। কিন্তু নিজেদের কোথায় রাখব, তা জানি না।’

অস্কার কোকোস্কার ছবিতে ভলতাভা ও চার্লস সেতু

আমি ছবির মাঝখানে দাঁড়িয়ে– হেলসিঙ্কি থেকে প্রাগে আসা এক বাঙালি অভিনেতা ও পরিচালক। প্রাগ আসলে শুধু একটি শহর নয়, যেন অত্যন্ত ধীরে লেখা একটি উপন্যাস।

কাফকা ও কুন্দেরার মধ্যে সরাসরি কোনও সম্পর্ক ছিল না। তবু তাঁদের লেখার গভীরে ছিল এক অদৃশ্য সাংস্কৃতিক সূত্র। একজনের শক্তি ছিল প্রশাসন, অন্যজনের– মতাদর্শ। তাঁরা দু’জনেই প্রাগকে ছেড়েছিলেন ভিন্নভাবে– একজন মৃত্যুর মাধ্যমে, অন্যজন নির্বাসনে। কিন্তু শহর তাঁদের ছাড়েনি।

হঠাৎ বুঝলাম, এই ছবির বিষয় কাফকা নয়, কুন্দেরা নয়, এমনকী প্রাগও নয়।

এ ছবির বিষয়: নির্বাসন।

কেউ ভাষা থেকে, কেউ দেশ থেকে, কেউ অতীত থেকে, কেউ নিজের স্বপ্ন থেকে।

আর আমি?

প্রাগে এসেছিলাম একটি শহর দেখতে। যে শহরটাকে খুঁজছিলাম, তার কোনও ঠিকানা নেই।

হয়তো সেই শহরটাই আমি।