concept of work life balance is changing in corporate | Robbar
Robbar
  • ১০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ২৮ আগস্ট ২০২৬

উইকএন্ডের হাওয়াবদল

৪৪টি দেশের আধুনিকতম প্রজন্মের প্রায় ২৩,৫০০ মানুষের মধ্যে বছরখানেক আগে সমীক্ষা চালিয়েছিল এক প্রখ্যাত ব্রিটিশ সংস্থা। উঠে এসেছে কিছু ম্যাজিক তথ্য। নয়া প্রজন্মের মাত্র ৬ শতাংশ জানিয়েছেন, সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে সংস্থার একেবারে শীর্ষপদে ওঠার কথা। কর্মজীবনে ভালোভাবে বাঁচার লক্ষ্য তাঁদের কাছে বদলায়নি। শুধু বদলে গিয়েছে সেই লক্ষ্যের সংজ্ঞা। সফল কেরিয়ারের ধারণার মধ্যে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ছে ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্সও।

শেষ আপডেট: আগস্ট ২৮, ২০২৬, ১৯:৫৫   
Facebook WhatsApp Messenger

সে প্রায় দেড় দশক আগের কথা। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর সম্ভাব্য নিয়োগকর্তার সঙ্গে ইন্টারভিউয়ের কথা মনে পড়ে। তখন আমার ২১। কলেজ। সেক্টর ফাইভ। ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ। টেকনিকাল অংশগুলো বাদ দিয়ে সেই সাক্ষাৎকারের কিছু নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা যেতে পারে। চুলে পাক ধরতে শুরু করেছে ক্রমশ। কিন্তু এই স্মৃতিগুলো রিসাইকেল-বিনে যায় না কিছুতেই। ফাইল হাতে নিয়ে টেবিলের এক দিকে আমি একা সৈন্য। টাই। কপাল জুড়ে ঘাম। টেনশন। অন্যদিকে ধোপদুরস্ত পাঁচজন। ডিওডোরেন্ট। বহুজাতিক সংস্থা।

zoom
মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’ ছবির একটি দৃশ্য

 –তুমি কি দশটা পাঁচটা অফিস ডিউটিতে বিশ্বাস করো?

–প্রশ্নই ওঠে না স্যর! বাবা-কাকাদের সে-সব দিন গিয়েছে। আজকের দিনে ঘড়ি ধরে কাজ করা যায় না কি?

–খুব খুশি হলাম। ইলাবোরেট করো।

–কোনও কাজ শেষ করার জন্য যতক্ষণ প্রয়োজন, ততক্ষণ অফিসে থাকতে হবে। এখানে ঘড়ির কাঁটার থেকে অনেক বেশি জরুরি কাজ শেষ করার জন্য ব্যক্তিগত আবেগ।

–বাহ্। অসাধারণ। অফিস তো সোম থেকে শুক্রবার। যদি ওই পাঁচদিনেও কাজ শেষ না করতে পারো?

–তা হলে শনিবার তো আছেই।

–কিন্তু সেদিন তো ছুটি তোমার। রবিবারও।

–কিছু বাকি থেকে গেলে ছুটির কথা মাথায় আসবে কেন? উইকএন্ড শুধুমাত্র ক্যালেন্ডারের একটা অধ্যায়। সেখানে কাজ করার তো কোনও বারণ নেই। সবার আগে কাজ।

–প্রয়োজন হলে শনি-রবি অফিসে আসতে পারবে? মানে টানা সাত দিন অফিস করতে পারবে? তোমার ব্যক্তিগত জীবন? পরিবারের জন্যও তো সময় দিতে হয়।

–কাজটা তো আসলে করব পরিবারকে ভালো রাখার জন্যই। কিছু বাকি থেকে কয়েকদিন ঘড়ি নাই বা দেখলাম। কোনও এক বিখ্যাত মনীষী বলেছিলেন, মন দিয়ে কাজ করা পুজো করার মতো পবিত্র। সে কাজ ছোট-বড় যাই হোক না কেন।

এটা শোনার পরে প্রশ্নকর্তা হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন হাত। হ্যান্ডশেক করলাম। বুঝে গিয়েছিলাম, অঞ্জন দত্তর গানের মতো, বেলাকে এবার বলে দিতে পারি। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছিলাম, এই ধরনের প্রশ্নগুলো সবার জন্যই কমন ছিল। আর সবাই আমার মতোই উত্তর দিয়েছিল। ১৫ বছর আগে, এ ধরনের কোনও প্রশ্নর উত্তরে আমরা ‘না’ বলতে শিখিনি। আমাদের কলেজ থেকে সেই বছর তুমুল নিয়োগ করেছিল ওই সংস্থা। চূড়ান্ত তালিকায় যাদের নাম ওঠেনি, তাদের লিখিত পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তবে ‘ওয়ার্কিং এক্সট্রা আওয়ার্স’ সম্পর্কিত যাবতীয় প্রশ্নে আমরা সবাই– ‘হুঁ, হুঁ, নিশ্চয়ই’ করে মাথা নাড়িয়েছিলাম, ওপর-নিচে।

zoom
‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবির ইন্টারভিউ-দৃশ্য

আমার মতো বহু বন্ধুই এর পরে সংস্থা বদল করেছে কালের নিয়মে, দৌড়ের আহ্বানে, অন্যদের থেকে পিছিয়ে না পড়ার মানসিকতায়। কিন্তু এমন প্রশ্নের উত্তরে আমরা আজও বলি, ‘কেন নয়? পরিবারের অনেক আগে কাজ।’ আমাদের বড় হয়ে ওঠার ব্যাকরণ বলে, এমন প্রশ্নের উত্তরে না বললে প্রশ্নকর্তা রাগ করেন!

সময় কি বদলে যাচ্ছে বড্ড দ্রুত? খবরের কাগজে, নিউজ পোর্টালে, জব সার্চের বাহারি অ্যাপের ফিডে প্রায়ই দেখি এ-যুগে এমন প্রশ্নের পাল্টে যাওয়া উত্তর। একটি সাম্প্রতিক ঘটনার কথা মনে পড়ছে। এই সংক্রান্ত বহু পোস্ট এবং খবর ভাইরাল হয়েছিল বলা চলে। দিল্লির এক উদ্যোগপতি তাঁর নেওয়া এক ইন্টারভিউয়ের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন। বলাই বাহুল্য, চাকরিপ্রার্থী ছিলেন এক জেন-জি। এটি জানা বাধ্যতামূলক আজকের দিনে। তাও যাঁরা জানেন না তাঁদের জন্য জানিয়ে রাখি, ১৯৯৭ থেকে ২০১২-র মধ্যে এই ধরাধামে আবির্ভূত হওয়া মানুষরাই জেন জির-র বন্ধনীতে পড়েন। এঁদের চলন-বলন-রকমসকম থেকে পরিচিত এক সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক বলেছিলেন, ‘মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে হোমো সেপিয়েন্সের পরের অধ্যায় ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে এই জেন জি-দের হাত ধরে। তোমরা জানতে পারোনি।’

মূল বিষয়টিকে লঘু করে ওই প্রসঙ্গের চর্চা আপাতত থাক। গুরুগ্রামের ওই উদ্যোগপতি সমাজমাধ্যমে যা লিখেছেন, তার নির্যাস মোটামুটি এরকম–

এক ২৫ বছরের যুবকের ইন্টারভিউ নিলাম। মুখের ওপর সোজা বলে দিল, ‘কাজ করব না শনিবার’। জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বয়সের তুলনায় এই উত্তরটা একটু বেশি আলসেমি মাখানো হয়ে যাচ্ছে না? এই প্রশ্নে সে বিন্দুমাত্রও বিচলিত হল না। বরং যা বলল, তা ইন্টারভিউতে সাধারণত কেউ বলে না। বলল, ‘অফিসের বাইরে আমার একটা জীবন আছে স্যর’। শুনলাম, ও শনিবার ক্রিকেট খেলে। পরিবার আছে। সময় দিতে হয়। বললাম, এসব তো সন্ধে সাতটার পরেও করতে পারো। তা ছাড়া, রবিবার তো আছেই। ফের একটা উত্তর পেলাম, যা শোনার আশা আমি করিনি কখনও। বলল, ‘আমার দাদা আমেরিকায় কর্মরত স্যর। ওখানে সবাই সোম থেকে শুক্র কাজ করে। দুনিয়ার সবচেয়ে উন্নত জায়গা মার্কিন মুলুক। শুধুমাত্র কাজের দিনগুলোতেই কাজ করে যদি ওরা চূড়ান্ত সফল হতে পারে, আমরা পারব না কেন?’

নেটদুনিয়ায় তুমুল শোরগোল শুরু হয়েছিল এই পোস্ট ঘিরে। একদল লিখছেন, ‘কী ডেঁপো ছেলে রে বাবা! কেরিয়ার শুরু করার সময়ই এত হুটোপাটি? দেশের বেকারত্বের হিসেব রাখো? জীবন বড় লম্বা হে। হাইওয়ে নয়। বাম্পার, স্পিড ব্রেকারের অভাব নেই।’ আর এর বিপক্ষে অস্ত্র শানিয়েছেন অন্যপক্ষ। তারাও সংখ্যায় কম ভারী নয়। বলছেন, ‘বেশ করেছ বাছা। জিতে রহো। সাবেকি, পচা, গলা নিয়ম আর কতদিন? আগে ভালো করে বাঁচব। তার পরে কাজ। কাল হো না হো।’ 

উদ্যোগপতির লেখা এখনও শেষ হয়নি অবশ্য। আরও বেশ কিছু কথা জুড়েছেন তিনি। কী লিখছেন দেখে নিই।

আজ পর্যন্ত কত লোকের ইন্টারভিউ নিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। সব বলে, দুশো শতাংশ দেব স্যর। উইকএন্ডে কাজ? নো প্রবলেম। চাকরিতে ঢুকে, আট মাসে বিধ্বস্ত হয়ে অন্য রাস্তা দেখে। এই ছেলেটি আলাদা ছিল। ওকে নিয়েছিলাম, সেলস-এর রোলে। আমার সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল। গত দুটো কোয়ার্টারে ও সেরার সেরা হয়েছে। মিথ্যে বলে না। সৎ। সপ্তাহান্তে ক্রিকেট খেলে। গিটার বাজায়। পরিবারকে সময় দেয়। ওকে আমি অলস বলেছিলাম। কিন্তু যত লোকের সাক্ষাৎকার নিয়েছি, ওর মতো পরিষ্কার মনের মানুষ দেখিনি।

হাওয়াবদল ঘটছে না কি শুধুমাত্র অফিসের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখার রেওয়াজে? নেতৃত্বে জেন-জি? অসরকারি সংস্থায় কর্মরত আমরা এবং আমাদের থেকে বয়সে কিছুটা বড় মানুষদের মুখে সবসময় শুনে এসেছি কাজ নিয়ে পাগলামি এবং সেই পাগলামিকে শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে নিয়ে যাওয়ার কথা। আমার এক খুড়তুতো দাদা দুনিয়াখ্যাত তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার শিখরে উঠেছেন। কাজের দিনে গত ১০ বছর ধরে রোজ বাড়িতে ফেরেন রাত ১১টায়। কলার তুলে বলেন, “শনি-রবি আমার সবচেয়ে ব্যস্ততার দিন। সারা সপ্তাহের না দেখা ইমেলগুলোর উত্তর দিতে দিতেই দু’দিন পেরিয়ে যায়, টুক করে। সঙ্গে থাকে পরের সপ্তাহের জন্য জবরদস্ত প্ল্যানিং।” আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। বৌদি চোখের কোণে অশ্রুবিন্দু নিয়ে বলে, “দু’জনে মিলে হলে গিয়ে শেষ দেখা সিনেমার নাম কী জানো? অটোগ্রাফ। কত সালে মুক্তি পেয়েছিল মনে আছে? ২০১০!” আমার মুখটা আরও বড় হাঁ হয়ে যায়। বৌদির চোখের কোণের জলের মধ্যে অবশ্য সোনার ঝিলিক লেগে থাকে। পুরো পরিবারের মিডিওকার ভাইবোনদের মধ্যে দাদা দাঁড়িয়ে থাকে এক আকাশচুম্বী বাড়ির মতো।

ছবি বদলাচ্ছে নিশ্চয়ই। ৪৪টি দেশের আধুনিকতম প্রজন্মের প্রায় ২৩,৫০০ মানুষের মধ্যে বছরখানেক আগে সমীক্ষা চালিয়েছিল এক প্রখ্যাত ব্রিটিশ সংস্থা। উঠে এসেছে কিছু ম্যাজিক তথ্য। নয়া প্রজন্মের মাত্র ৬ শতাংশ জানিয়েছেন, সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে সংস্থার একেবারে শীর্ষপদে ওঠার কথা। কর্মজীবনে ভালোভাবে বাঁচার লক্ষ্য তাঁদের কাছে বদলায়নি। শুধু বদলে গিয়েছে সেই লক্ষ্যের সংজ্ঞা। সফল কেরিয়ারের ধারণার মধ্যে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ছে ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্সও। জীবনের দাড়িপাল্লায় ভারী ডেজিগনেশনের অন্যদিকে তাঁরা নির্দ্বিধায় চাপিয়ে দিচ্ছেন উচ্চপদের সঙ্গে কম্বো অফারে চলে আসা দায়িত্বজনিত স্ট্রেসকেও। এক ফুট দূরে দাঁড়িয়েও চোখে দূরবিন লাগিয়ে তাঁরা জরিপ করছেন পাল্লার মাঝখানে থাকা নির্দেশক কাঁটা। টাকার থেকে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে জব স্যাটিসফ্যাকশন। আন্দাজ করতে পারি, ‘টাকাটাই শেষ কথা, বাকি সব বাতুলতা, টাকা কথা রাখে’– লাইনটা কানে এলে চোখ কুঁচকোবেন আধুনিক প্রজন্মের প্রতিনিধিরা। ঘণ্টার কাঁটার থেকে মিনিটের কাঁটা তাঁদের আকর্ষণ করছে অনেক বেশি। হাওয়ায় ভাসছে তাঁদের কোরাস– হে লং টার্ম, তুমি তফাত যাও।

zoom
‘মডার্ন টাইমস’ ছবির দৃশ্য

গুরুগ্রাম কাণ্ড কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বদলে যাওয়া বৃষ্টির এক ফোঁটা জল মাত্র। অর্জিত ছুটির দিনে, সপ্তাহান্তে কাজ করার প্রস্তাব এলেই উত্তরে জুড়ছে বারুদগন্ধ। আরও একটি ঘটনার কথা বলা যাক। সামাজিক মাধ্যমে বহুচর্চিত। বস বললেন, ‘ক্লায়েন্টরা ভগবান। ওদের খুশি রাখতে হবে। সারা সপ্তাহ তো কাজ করবেই। লেগে পড়ো সপ্তাহান্তেও।’ ঝটিতি উত্তর এসেছিল, ‘করব না। তাড়াবেন আমায়? তাড়ান।’ বসের দৃষ্টিতে এবারে মিশল রক্তিম আভা। জেন-জি কর্মী চোখ নাচিয়ে বললেন, ‘বাবাহ!’ মাঝখানের কয়েক সেকেন্ড শুনল শুধু স্তব্ধতার গান। জেন-জি বললেন, ‘ক্লায়েন্টের একটা ফোটো রেখে দিন আপনার বাড়িতে। আপনার স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি হাত জোড় করে সেই ফোটোর সামনে প্রার্থনা করুক প্রতিদিন।’

কেউ কেউ বলতেই পারেন, এ কি অপূর্ব জেন দিলে বিধাতা আমায়।

নতুন দিনের তাতে অবশ্য বয়েই গেল।

corporate culture office time Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Week end Work life balance

Share this article on