


বাংলার মধ্যবিত্ত পরিবারও দশকের পর দশক ধরে একই মন্ত্র আউড়েছে– রাজনীতিতে জড়িও না, পড়াশোনায় মন দাও। সাতের দশকের নকশাল আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী স্মৃতি বাংলার মধ্যবিত্তকে রাজনীতি-বিমুখ করে তুলেছিল। আজ যখন সেই সরকারি চাকরির দরজাটাই দুর্নীতিতে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন এই প্রজন্মের সামনে বাবা-মায়ের শেখানো পথটাই অচল হয়ে পড়ছে। তখনই রাস্তায় নামাটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে, আর নেহারা সেই কারণেই রাস্তায় নামছেন।
বহুদিন পরে আবার পড়ে ফেললাম, চাণক্য সেনের ‘পুত্র পিতাকে’ উপন্যাস। যখন প্রথম ছাত্র রাজনীতি করা শুরু করেছি, তখন কেউ একজন দিয়েছিল পড়তে। এখন বইটা পাওয়া যায় কি না জানা নেই, তবে যাঁরা বড় হচ্ছে, স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে কলেজে ঢুকছে, তাঁদের অনেকেই হয়তো এই বইটি পড়েছে। এই বইটি আসলে দুটো প্রজন্মের কথোপকথন। এক যুবক, তাঁর ২৪ বছরের জন্মদিনে তাঁর বাবার লেখা একটি চিঠি পায়, সেই জায়গা থেকে শুরু হয় উপন্যাসটি। চলমান সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে চলা এক প্রজন্মের সঙ্গে সেই ব্যবস্থার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া প্রজন্মের কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে উঠে আসা বামপন্থা ও দক্ষিণপন্থার আদর্শের বিতর্ক। দক্ষিণপন্থী রাজনীতি যেমন চলমান ব্যবস্থাপনার পক্ষে দাঁড়ানোর কথাই বলে, সেখানে বাম রাজনীতি আসলে শুধু মতাদর্শের লড়াই নয়, প্রশ্ন করতে শেখার লড়াই। সেই প্রশ্ন পরিবারের বিরুদ্ধে, নিজের বাবার বিরুদ্ধেও হতে পারে, সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তো বটেই। সেখান থেকেই শুরু হয় খোঁজ। নতুন পথের দিশা হয়তো প্রশ্ন থেকেই আসে।

অনেকে বলে থাকেন, ১৮৬২ সালের ইভান তুর্গেনেভের উপন্যাস ‘ফাদারস অ্যান্ড সন্স’ এই উপন্যাসের আদলে চাণক্য সেন তাঁর উপন্যাসটি লিখেছিলেন। উদার অভিজাততন্ত্র এবং ধ্বংসে বিশ্বাসী উদীয়মান বিপ্লবীদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে ১৯ শতকের রাশিয়ায় প্রজন্মগত এবং মতাদর্শগত সংঘর্ষের অন্বেষণ করে যা লেখা হয়েছিল, পরবর্তীতে তা ভারতের তথা বাংলার প্রেক্ষাপটে চাণক্য সেন লেখেন।

নেহা বোরা, সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন। ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’-এর সর্বভারতীয় সভাপতি। যন্তর-মন্তরের লড়াই যাঁকে সারা ভারতে নতুন পরিচিতি দিয়েছে, সেই নেহা কলকাতার একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময়ে বলেন যে, তিনি যখন শিলিগুড়িতে দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন, তখন থেকে তিনি দক্ষিণপন্থী রাজনীতি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন, কারণ তাঁর শিক্ষকেরা তাঁকে বেশ কিছু লেখকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তার মধ্যে যেমন ছিল পাবলো নেরুদা, তেমন ছিল অরুন্ধতী রায়। ভবিষ্যতে এই লেখকদের লেখা তাঁর জীবনের দিশা তৈরি করতে সহায়তা করেছিল বলেই নেহা ওই সভায় বলছিলেন।

নেহার কথার পরিপ্রেক্ষিতেই উঠে আসে অনেক কথা। নেহা যখন ২৩ দিন যন্তরমন্তরে অনশন করছিলেন, তখন কোনও একটি সংবাদমাধ্যমে নেহা নিজেই বলেন, তাঁর পরিবারের বিশেষ করে বাবা তাঁর রাজনীতির সমর্থক তো নয়, উল্টে তাঁর অবস্থান নেহার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। এই কথা প্রকাশ্যে আসার পরেই দক্ষিণপন্থী দলের সমর্থকরা নেহার উদ্দেশে বলা শুরু করেন, যে নিজের পরিবার থেকে সমর্থন পায় না, সে পুরো দেশের সমর্থন কী করে পাবে?
এখানেই আসলে সেই বিতর্কটা ফিরে আসে, পরিবার আগে না দেশ আগে? আজকের জেন-জি’র অভিভাবকদের কিন্তু হিসেব দিতে হবে তাদের রাজনীতির জন্য, যা এই সংকট তৈরি করেছে। সরকারের ব্যর্থতা, পরীক্ষার দুর্নীতি, বেকারত্ব– এসব তো আগেও ছিল, কিন্তু আসল প্রশ্নটা লুকিয়ে আছে, ওই প্রজন্মের নীরবতার মধ্যে। যে প্রজন্ম, নিজেরাই রাজপথ ছেড়ে নিজেদের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারে মনোযোগ দিয়েছিল। যারা ভেবেছিল, প্রতিষ্ঠানের ভিতরে থেকে নিজের পদোন্নতি পাওয়াটাই যথেষ্ট। যারা তাদের সন্তানদেরও হাতে ধরে শিখিয়েছিল, মাথা নিচু করে পড়ে যাও, একটা ভালো চাকরি জোগাড় করো, তাহলেই দেশের ভালো হবে। নিজের ভালো আর দেশের ভালো একে-অপরের পরিপূরক। আর এখানেই একটা প্রশ্ন আসে। সেটা হচ্ছে, এই আন্দোলন যতটা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে, ততটাই কি নিজেদের বাবা-মায়ের প্রজন্মের বিরুদ্ধেও?

আজকের নেহা বোরা-সহ সমস্ত জেন-জি’র দাবিগুলো আসলে খুব একটা বিপ্লবী হয়তো নয়। এরা ১৯৬৮ সালের প্যারিসের ছাত্র আন্দোলনের মতো ব্যবস্থা ভেঙে ফেলতে চায় না। এদের দাবি সহজ। তারা প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি চায়। পরীক্ষায় সততা চায়, শিক্ষার উন্নত মান চায় আর চাকরি চায়। এগুলো কোনও বিপ্লবী স্লোগান নয়। এগুলো সাংবিধানিক ভাষাতেই বলা অত্যন্ত সাধারণ ন্যায্য দাবি। তাহলে প্রশ্ন হল, এত সাধারণ দাবি নিয়ে কেন এত তীব্র বিক্ষোভ? কেন হাজার হাজার তরুণ রাস্তায় নামছে, পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ করছে, নিজেদের ‘ককরোচ’ বা আরশোলা বলে পরিচয় দিয়ে ব্যঙ্গ করছে ক্ষমতাকে?
আসলে আজকের প্রজন্ম ভয়কে অস্বীকার করছে, মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা, এই ভয়কে বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই ভয়ের বীজ বোনা হয়েছিল আরও আগে। এই প্রজন্মের বাবা-মায়েরা চেয়েছে তাঁদের সন্তানেরা যাতে প্রচলিত ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখিয়েছে আর প্রশ্ন না-করতে শিখিয়েছে। তাঁরা নিজেরাই একটা ‘প্রতিবাদ-বিরোধী’ সংস্কৃতি তৈরি করেছে। সেখান থেকেই নেহার পরিবারের সঙ্গে নেহাদের বিরোধ শুরু। যদি খেয়াল করা যায়, যাঁরা নেহার ওই বক্তব্যের বিরোধ করছেন, তাঁরা কেউই হয়তো নেহাদের প্রজন্মের মানুষ নন। তাঁরা গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে জীবনটাকে প্রশ্নহীন আনুগত্য প্রদর্শন করার মধ্যে দিয়েই শেষ করে দেন এবং চান তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মও ওই মতাদর্শেই চলুক। বাবা-মায়ের প্রজন্মের ব্যর্থতা এখানেই সবচেয়ে গভীর।

আমরা যখন কোনও ব্যবস্থার পতন দেখি, তখন স্বাভাবিকভাবে রাজনীতিবিদদের দোষ দিই। প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বিচারক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, এমনকী, ব্যবসায়ীরাও, এরা প্রত্যেকে যখন নিজের পেশাগত দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে, শুধু ব্যক্তিগত উন্নতিকেই লক্ষ্য বানায়, তখনই প্রতিষ্ঠানের ক্ষয় হয়। এই কারণেই আজ ভারতের রাজনীতি এই কদর্য জায়গায় পৌঁছেছে। এক দলের হয়ে ভোটে জিতে, শুধু নিজেদের স্বার্থে জনমতকে লাথি মারা যায়, দেশের সর্বোচ্চ পদাধিকারীর পাশে গিয়ে হাসি মুখে বসা যায়! তিনিও আলিঙ্গন করেন এইসব মানুষকেই। কিন্তু যাদের এর বিরুদ্ধে প্রশ্ন করার দায়িত্ব ছিল, তাঁরা কী করলেন? বিশ্ববিদ্যালয়, আদালত, সমস্ত স্বশাসিত সংস্থা, সংবাদমাধ্যম, কর্পোরেট জগৎ, সিভিল সার্ভিস– এসব কিন্তু একদিনে এই জায়গায় এসে পৌঁছয়নি। অসংখ্য ছোট ছোট মানিয়ে নেওয়া, এড়িয়ে চলা, আপস আর নীরবতার মধ্য দিয়ে। এটাই ছিল সেই খাপ খাইয়ে নেওয়ার নীতি, যা এক সময় বিদ্রোহের বিপরীত মেরু বলে মনে হত। কোনও ছাত্র পড়াশুনা করে পরীক্ষা দিয়ে জানতে পারলেন, যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গিয়েছে, তখন বাবা-মায়েরা বুঝিয়েছেন, এই ধরনের ঘটনা তো ঘটতেই পারে, আবার পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিলেই সমস্যা মিটে যাবে! ঠিক যেমন অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে, আরও একটু পড়াশোনার সুযোগ বাড়ে– অনেকটা সেইরকম যুক্তি। তাঁরা কোনও দিন একবারও বলেননি, এই দুর্নীতির বিরোধিতা করতে। এই আপসগুলো নিজেরাই নিজেদের সন্তানদের জন্যই করেছিলেন, আর তার ফল কিন্তু আজকের অচলাবস্থা।

বাংলার মধ্যবিত্ত পরিবারও দশকের পর দশক ধরে একই মন্ত্র আউড়েছে– রাজনীতিতে জড়িও না, পড়াশোনায় মন দাও। ওই কলেজে রাজনীতি হয়, ওই কলেজে খুব গোলমাল ইত্যাদি। সাতের দশকের নকশাল আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী স্মৃতি বাংলার মধ্যবিত্তকে রাজনীতি-বিমুখ করে তুলেছিল। সেই প্রজন্মই পরে তাদের সন্তানদের শিখিয়েছে, রাজনীতি মানেই বিপদ, নিরাপদ পথ হল সরকারি চাকরি বা প্রাইভেট সেক্টরে ভালো বেতনের কাজ। আজ যখন সেই সরকারি চাকরির দরজাটাই দুর্নীতিতে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন এই প্রজন্মের সামনে বাবা-মায়ের শেখানো পথটাই অচল হয়ে পড়ছে। তখনই রাস্তায় নামাটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে, আর নেহারা সেই কারণেই রাস্তায় নামছেন।

নেহার বাবার বিরোধিতা সত্ত্বেও তাই নেহারা সবার সামনেই বলছেন, ‘তোমাদের এই পথ আর কাজ করছে না’। মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে তারা যা বলছে, তা আসলে তাদের বাবা-মায়ের প্রজন্মের প্রতি একটা কঠিন প্রশ্ন– ‘তোমরা কেন চুপ ছিলে?’ যখন অন্যান্য চরিত্র প্রচলিত জীবনে স্থায়ী হয়, অনমনীয় আদর্শের ওপর মানুষের সংযোগের স্থায়ী শক্তিকে তুলে ধরা আসলে সেই আদর্শগত লড়াই, যা নেহা বোরা-সহ আজকের নতুন প্রজন্ম করছে আর আঙুল তুলছে আমাদের দিকে, যাঁরা ভেবে এসেছি, সন্তানকে দুধে-ভাতে রাখাটাই কাজ, সন্তানকে শিক্ষা ‘কিনে’ দেওয়াটাই কাজ। একবারও তো আমরা রাষ্ট্রের দিকে আঙুল তুলে বলিনি, প্রতিটি নাগরিকের শিক্ষার অধিকার, স্বাস্থ্যের অধিকারটাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ঠিক যেন উপন্যাসে, ২৪ বছরের শ্বেতকেতু তাঁর বাবাকে বলছে, ‘তোমরা প্রাপ্তবয়স্করা, বড়রা, তোমাদের, পৃথিবীব্যাপী তোমাদের, জীবনটাকে এবং তার সঙ্গে গোটা পৃথিবীকে বিস্বাদ, বিপন্ন করে তুলেছ। সঙ্গে সঙ্গে বিপন্ন করে রেখেছ আমাদের বর্তমান, ভবিষ্যৎ। অথচ আমাদের নিয়ে তোমাদের বিলাপের শেষ নেই।’
……………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন সুমন সেনগুপ্ত-র অন্যান্য লেখা
……………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved