

সুমিত সরকারের ইতিহাসবোধের সঙ্গে একমত না-হলেও তাঁর রচনা পড়া জরুরি। মার্কসীয় ইতিহাসবিদদের বাজার খারাপ এখন। সহজেই নস্যাৎ করে দেওয়া হয় সেইসব লেখাপত্র। রাজনীতির কারবারিদের সেসব করতেই হয়। কিন্তু ইতিহাসচর্চায় খারিজ করতে হলে আরও একটু গভীরে যাওয়া দরকার। বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত কীভাবে, কোন পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয়তাবাদী বিশ্লেষণ কাঠামো থেকে সরে এসে নতুন তাত্ত্বিক কাঠামোর প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন তিনি, আর কীভাবেই বা তিনি নিজেকে ভেঙেছেন, প্রশ্ন করেছেন, বদলেছেন।
ইতিহাসবিদ হিসেবে সুমিত সরকারের সামগ্রিক মূল্যায়ন করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। তাঁর লেখাপত্র নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা বিভিন্ন সময়ে হয়েছে, এখন আরও হবে। ফিরে পড়া হবে স্বদেশি আন্দোলন নিয়ে তাঁর প্রামাণ্য বই, যা প্রথম প্রকাশের অর্ধশতাব্দী পরও একইরকম উজ্জ্বল। অবধারিতভাবে উঠে আসবে ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’ গোষ্ঠীতে তাঁর যোগদান এবং সেই সংঘ ত্যাগ করার কাহিনি। উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের প্রভাবে নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চায় ‘নিম্নবর্গের পতন’ ঘটে গিয়েছে বলে হইচই ফেলে দেওয়া প্রবন্ধের বাছা বাছা বাক্য হয়তো ছোট ছোট স্লাইডে সোশাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াবে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ভারতের ইতিহাস পড়ার প্রথম পাঠ্য হিসেবে গণ্য করা হত যে বই, সেই ‘মডার্ন ইন্ডিয়া’-ও আবার তাক (বা ইন্টারনেট) থেকে নামিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখবেন অনেকে।

ব্রিটিশ মার্কসীয় ‘হিস্ট্রি ফ্রম বিলো’ ধারায় তিনি ঔপনিবেশিক ভারতের নানা ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন। ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে মাথায় রেখে প্রশ্ন করেছেন বাংলার নবজাগরণের ধারণাকে। সামাজিক ইতিহাস রচনার পদ্ধতি কেমন হতে পারে, তা তিনি দেখিয়েছেন বেশ কিছু দীর্ঘ প্রবন্ধে। উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক আবহে বারবার মনে করিয়েছেন সংস্কৃতির ইতিহাস বস্তুবাদী জগতের থেকে বিযুক্ত করে দেখা সম্ভব নয়। পশ্চিম ইউরোপীয় আলোকপ্রাপ্তি-জাত চিন্তা ভাবনার সমালোচনা যখন বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী ধ্যান-ধারণাকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছে, তুলে ধরেছে ইউরোপীয় শাসক ও উপনিবেশিত শাসিতের দুই যুযুধান বর্গকে, সেই সময়ে তিনি বাঙালি ভদ্রলোকের সাংস্কৃতিক জীবনের নানা পরতের গভীর বিশ্লেষণের দিকে ঝুঁকেছেন, সামনে নিয়ে এসেছেন ‘মধ্যবিত্ত’র বহুমাত্রিকতা। হিন্দু ভদ্রলোক সমাজ ও তার সীমাবদ্ধতা অবশ্য তিনি স্বদেশি আন্দোলন নিয়ে গবেষণার সময় থেকেই আলোচনা করেছেন। প্রথম থেকেই নজর দিয়েছেন বিবিধ সূত্র থেকে ইতিহাস পাঠ করার উপর। সরকারি মহাফেজখানার পাশাপাশি প্রাথমিক সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন গল্প-উপন্যাস, বিবিধ প্রবন্ধ, সংবাদপত্র, জীবনী, নানাবিধ পুস্তিকা, বটতলা সাহিত্য।

সেই সূত্র ধরেই দেখতে পাই উনিশ-বিশ শতকের বাংলা এবং কলকাতা নিয়ে লেখা ‘কলিযুগ, চাকরি ভক্তি’ আর ‘দ্য ইমাজিন্ড সিটি’ প্রবন্ধ দু’টি। এই রচনাগুলিতে যেভাবে তিনি ঔপনিবেশিক বাংলায় (মূলত হিন্দু) মধ্যবিত্ত জীবন এবং কলকাতা শহর নিয়ে আলোচনা করেছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মকে নতুন গবেষণার দিশা বাতলে দেয়। ‘কথামৃত’ পাঠ করে বুঝতে চেয়েছেন উনিশ শতকের শেষ ভাগে বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের সংকট। সাংস্কৃতিক ইতিহাসচর্চার নতুন দিকও দেখায় এই প্রবন্ধটি। একটি টেক্সট খুঁটিয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে কীভাবে একটা ঐতিহাসিক কালপর্ব, একটা গোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনযাপন, ধর্মীয় ভাবাবেগ, গ্রাম-শহরের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক, বা সময়ানুবর্তিতার নিগড় বোঝা যেতে পারে, তার জরুরি নিদর্শন এই প্রবন্ধটি। ইতালীয় ইতিহাসবিদ কার্লো গিন্সবার্গের ‘মাইক্রোহিস্ট্রি’-র ছাপ যেমন দেখা যায়, তেমনই ছায়া পাওয়া যায় ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ এডওয়ার্ড টমসনের ‘টাইম-ডিসিপ্লিন’ নিয়ে আলোচনার। ঔপনিবেশিক বাংলায় দ্বন্দ্ব যে শুধু পশ্চিম ইউরোপীয় ধ্যানধারণা আর ভারতীয় জীবনযাত্রার দুই পক্ষের মধ্যে ছিল না শুধু, বরং পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ‘মধ্যবিত্ত’-এর শ্রেণিবিন্যাসও যে মন দিয়ে বোঝা দরকার, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছেন তিনি। আধুনিক বাঙালি জীবনের চিরপুরাতন যে প্রতিনিধি, সেই কেরানি জীবনের কথা তুলে এনেছেন কথামৃত থেকে, দেখিয়েছেন ‘কামিনী, কাঞ্চন, চাকরি’ কীভাবে রামকৃষ্ণের কথায় বারে বারে ফিরে এসেছে এবং কীভাবে আটপৌরে ভাষায় বলা সেইসব গল্প ভদ্রলোকদের টেনে নিয়ে গিয়েছিল কামারপুকুরের ‘অশিক্ষিত’ বামুনের কাছে।

কলকাতা শহরের ইতিহাস আলোচনায় ফের উঠে এসেছে নবজাগরণের কথা। বাঙালির গর্বের ও আবেগের শহর যে বিশ শতকের আগে খুব বেশি আহ্লাদের জায়গা ছিল না– এই সহজ কথাটা মনে করিয়ে দিয়েছেন। কলকাতার জনবিন্যাস নিয়ে আলোচনা দেখিয়ে দেয় শহরে বিভিন্ন গোষ্ঠীর উপস্থিতি। ১৯০১ সালের সেনসাস অনুযায়ী কলকাতায় বাংলাভাষী জনগণ ছিলেন ৫১.৩ %, অর্ধেকের সামান্য বেশি। কিন্তু সাধারণ আলাপ আলোচনায় তো উনিশ শতকের কলকাতা হল রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথের এলাকা, পশ্চিমি শিক্ষার আঁতুড়ঘর– পত্রপত্রিকা, সভা সমিতি মিলিয়ে এক জমজমাট ব্যাপার। কিন্তু সেই সময়ের লেখাপত্রে শহর নিয়ে শুধুই নঞর্থক কথাবার্তা! বটতলার পুস্তিকায় বা নকশা প্রহসনে যে ছবি পাওয়া যায় ব্রিটিশ ভারতের রাজধানীর, সে মোটেও গৌরব করার মতো নয়। পাশ্চাত্য শিক্ষা এক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি করেছিল যাঁরা ইংরেজ আপিসে চাকরি করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। কলকাতার ‘বাসা’ ছেড়ে ছুটিছাটায় যারা গ্রামের ‘বাড়ি’ গিয়ে আনন্দ পেতেন। উনিশ শতকে বসে বাংলার ‘নবজাগরণ’ বঙ্কিম খুঁজে পেয়েছিলেন ষোড়শ শতকের ধর্মীয় চেতনায়। আর অন্য দিকে ইংরেজ ইতিহাসবিদদের লেখায় শুধুই তাঁদের কথা, সেখানে নেটিভদের স্থান প্রায় নেই বললেই চলে।

এই পরিস্থিতি, সুমিত সরকারের মতে, বদলে গেল বিশ শতকের গোড়ার দশকে। স্বদেশি আন্দোলন, মোহনবাগানের শিল্ড জয়, কলকাতা থেকে রাজধানীর স্থানান্তর– হঠাৎ করেই যেন মধ্যবিত্ত বাঙালি কলকাতার প্রতি আবেগ তাড়িত হয়ে পড়ল। শিবনাথ শাস্ত্রী রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ (১৯০৪) বইতে উনিশ শতকের গোড়ার দশকের সঙ্গে পরবর্তীকালের পার্থক্য তুলে ধরে কলকাতা শহরের এক প্রগতির ছবি আঁকলেন। বিশ শতকের শুরুর মধ্যে অনেকেই শহরে থিতু হয়ে গিয়েছেন কয়েক প্রজন্ম ধরে, গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক অনেক সময়েই উৎসব অনুষ্ঠানে সীমিত হয়ে গিয়েছে। স্বদেশি আন্দোলনের সভাসমিতি-মিটিং-মিছিল শহরের রাজপথ, পার্ক আর হলগুলোতে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। এর পর মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে বাঙালির সরকার যখন তৈরি হয় তখন ভদ্রলোক সমাজে আরও দৃঢ়ভাবে নাগরিক মানসিকতা গড়ে ওঠে। আর এর পর থেকে ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে ‘রেনেসাঁ মিথ’, ১৯৪০-এর দশকের সংকটময় সময়ে ফিরে দেখা শুরু হয় উনিশ শতকে বাঙালির গৌরবের দিনগুলিকে, ১৯৪৬ সালে সুশোভন সরকার লেখেন ‘নোটস অন দ্য বেঙ্গল রেনেসাঁ’। ১৯৯০-এর দশকে লেখা এই প্রবন্ধে কলকাতার ইতিহাস নিয়ে যে নানা ইঙ্গিত সুমিত সরকার দিয়েছিলেন বা নতুন সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন, পরের তিন দশকে সেই সব বিষয় নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রামাণ্য গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে।

বর্ধমান, কলকাতা, ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ কাল অধ্যাপনা করেছেন, পড়িয়েছেন কয়েক প্রজন্মের ছাত্রদের। একই সঙ্গে নিয়মিত লিখে গিয়েছেন কালজয়ী সব প্রবন্ধ। বারে বারে করেছেন ইতিহাসচর্চার নতুন ধারার সঙ্গে বোঝাপড়া। তাঁর লেখনী ক্ষুরধার, তার্কিক। প্রবন্ধের পাশাপাশি যা ফুটে ওঠে বেশ কিছু গ্রন্থ সমালোচনায়। ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন নিয়ে একটি বইয়ের (যা পরবর্তীকালে ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃত) আলোচনায় লিখেছেন, “the seamless cultural hegemony of English education/literature can be assumed, since any testing-out of this proposition through analysis of the impact on educated Indians has been ruled out of court [in the book]. But all that has been ‘proved’, really, is that the British often had hegemonic intentions when they introduced English education and English literature: which should hardly qualify as stop-press news.”
আবার, ঔপনিবেশিক আমলে উত্তর ভারতের জনপরিসরে সাম্প্রদায়িকতা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে গ্রন্থ-সমালোচনায় বলেছেন,
“[The book] attempts nothing less than a history of North Indian communalism through a series of case-studies of shifting matrices of popular culture. A startling initial limitation, however, is the total absence of reference to any Indian-language source….But [the author] creates unnecessary problems for herself through an exceedingly naïve special pleading. Vernacular materials, [the author] argues, is ‘polemical’ or ‘didactic’ whereas with British administrative records one can easily ‘distinguish what they describe from what they attempt to explain.’ Archives, therefore, permit direct access to crowd actions, while the ‘problematic nature’ of written sources that Roger Chartier and Jacques Revel have diagnosed for early modern France somehow applies in India only to non-official material.”

সুমিত সরকারের ইতিহাসবোধের সঙ্গে একমত না-হলেও তাঁর রচনা পড়া জরুরি। মার্কসীয় ইতিহাসবিদদের বাজার খারাপ এখন। সহজেই নস্যাৎ করে দেওয়া হয় সেইসব লেখাপত্র। রাজনীতির কারবারিদের সেসব করতেই হয়। কিন্তু ইতিহাসচর্চায় খারিজ করতে হলে আরও একটু গভীরে যাওয়া দরকার। বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত কীভাবে, কোন পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয়তাবাদী বিশ্লেষণ কাঠামো থেকে সরে এসে নতুন তাত্ত্বিক কাঠামোর প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন তিনি, আর কীভাবেই বা তিনি নিজেকে ভেঙেছেন, প্রশ্ন করেছেন, বদলেছেন। স্বদেশি মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল-এর নতুন সংস্করণের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন প্রায় ৪০ বছর আগে লেখা বইয়ের খামতি কোথায় ছিল। নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন কী ভাবে জাতি-ব্যবস্থার কথা একেবারে অনুল্লেখিত থেকে গেল তাঁর সেই সময়ের গবেষণায়। এক সময় শিক্ষাজগতের সহযোগীদের সঙ্গ ত্যাগ করেছেন বৌদ্ধিক মতান্তরে। তাঁদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়েছেন, প্রশ্ন করেছেন, নিজের গবেষণায় দেখিয়েছেন বিকল্প দিশা। একই ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক মার্কসীয় রাজনৈতিক ভাষ্যের সঙ্গে মতানৈক্যও জানিয়েছেন জোরালোভাবে। সুমিত সরকারের লেখা শুধু স্বদেশি আন্দোলন বা বাংলার নবজাগরণের ইতিহাস পাঠ করার জন্য জরুরি নয়, বরং একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক ভারতে প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসচর্চার এক বিশেষ কালপর্বকে বোঝার জন্য।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved