Verrier Elwin and the Forgotten World of Tribal India। Robbar
Robbar
  • ১১ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ২৯ আগস্ট ২০২৬

অরণ্যে খুঁজে পাওয়া ভারত

ভেরিয়ার এল্যুইন নিজেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বলেছেন– ব্রিটিশ বর্ন ইন্ডিয়ান অর্থাৎ ইংল্যান্ডে জন্মানো ভারতীয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছু পরে, তরুণ বয়সেই তিনি ভারতে এসেছিলেন। কিন্তু সম্পূর্ণ অজানা এই দেশ তাঁকে আবিষ্ট করে ফেলে। ভারতের অরণ্য-পাহাড়ের মানুষ তাঁকে শিখিয়েছিল– মানুষকে বোঝার জন্য তার পাশে বসতে হয়। তার ভাষা শুনতে হয়। তার উৎসবের মধ্যে দাঁড়াতে হয়। তার দুঃখকে নিজের চোখে দেখতে হয়। ভারতবর্ষকে ভালোবেসে এদেশের আদিবাসী জনজাতিকে আপন করে তাদের সমস্যাকে আপন করে নিয়েছিলেন এই মানবপ্রেমী মানুষটি। দরিদ্র কুটিরে আদিবাসী মানুষের কথা বুঝতে বুঝতে তাদের হৃদয়ের ভাষাও বুঝতে চাইতেন।

শেষ আপডেট: আগস্ট ২৯, ২০২৬, ২০:০৪   
Facebook WhatsApp Messenger

মানুষ জীবন হারিয়ে জীবন খোঁজে, মানুষহারিয়ে খোঁজে মানুষ। তেমনই প্রাচীন ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে খোঁজে তার অতীত জীবনধারা, ভাষা-সংস্কৃতিকে। ইংল্যান্ডের এক তরুণ, অক্সফোর্ডের কৃতি ছাত্র ভেরিয়ার এল্যুইন খুঁজেছিলেন ভারতীয় জনজাতির মানবসত্তাকে। কোনও কোনও মানুষ একটি দেশকে আবিষ্কার করতে এসে শেষ পর্যন্ত আবিষ্কার করে ফেলেন নিজেকেই। ভেরিয়ার এল্যুইন উপলব্ধি করেছিলেন ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য একই হৃদয়ের পর্যাবৃত্তিক হৃৎস্পন্দন।’ তাঁর ভারত-জীবন যেন তেমনই এক আশ্চর্য আত্ম-আবিষ্কারের কাহিনি।

ভারতের জনজাতিদের কল্যাণকর্মে নিবেদিতপ্রাণ এল্যুইনের সামনে ভেসে উঠেছিল তাদের দুঃখ-আনন্দ-নৈরাশ্য-পরিপূর্ণতা। তিনি সম্মুখীন হয়েছিলেন বাস্তব সত্যের অভিজ্ঞতার। ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ-র কথায়, ‘a self-taught and self-trained anthropologist, Elwin ranged widely over the Indian heartland, studying and writing about tribes in the British ruled territories of Orissa, Bihar and the Central Provinces, as well as the large tribal chiefdoms of Bastar. His travels bore fruit in a series of ethnographies and folklore collections for ‘academic’ consumption, and in numerous policy pamphlets, reports, and newspaper articles for a more general audience…’। নৃবিজ্ঞানের প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত না-হয়েও ইংল্যান্ডের এক তরুণ কৃতী ছাত্র হয়ে উঠেছিলেন ভারতের আদিবাসী মানুষের একনিষ্ঠ বন্ধু, তাঁদের জীবন ও সংস্কৃতির গভীর পর্যবেক্ষক এবং স্বাধীন ভারতের আদিবাসী নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক।

২৯ আগস্ট, ১৯০২। ইংল্যান্ডের কেন্ট ডোভারে জন্মগ্রহণ করেন হ্যারি ভেরিয়ার হলম্যান এল্যুইন। বাবা এডমন্ড হেনরি এল্যুইন ছিলেন সিয়েরো লিওনের অ্যাংলিক্যান বিশপ। এল্যুইনের সাত বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যু তাঁর জীবনে বয়ে নিয়ে এসেছিল এক অপূরণীয় শূন্যতা। এল্যুইন প্রথমে ভর্তি হন পশ্চিমের চেলতেনহামের ডিন ক্লোজ স্কুলে। স্কুলের গ্রন্থাগারে বইয়ের রাজ্যে সন্ধান পেলেন ওয়ার্ডসওয়ার্থের রহস্যময় সর্বেশ্বরবাদের। অত্যন্ত ধার্মিক এভাঞ্জেলিক পরিবার থেকে আধুনিক, উদারমনা অক্সফোর্ডে তাঁর যাত্রা ১৯২১ সালে। ইংরেজি সাহিত্য এবং ধর্মতত্ত্ব দুই বিষয়েই পেলেন ফার্স্ট ক্লাস। মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি অক্সফোর্ডের উইনক্লিফ হলের ভাইস-প্রিন্সিপাল হন। ভারতবর্ষের সঙ্গে এল্যুইনের পরিবারের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ। অক্সফোর্ড জীবনের শেষ বছরগুলোতে এক আধ্যাত্মিক চিন্তা এল্যুইনকে আচ্ছন্ন করে তোলে। তাঁর মনে হয় তাঁদের পরিবার থেকে অন্তত একজন মানুষ ভারতবর্ষে যাক, কোনও কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নয়, শুধু সে দেশটির দরিদ্রতম মানুষকে সেবা করতে; যে দেশটি ব্রিটিশ শাসনে অবনত, সেই অবনত দেশের মানুষেরই স্বজন হয়ে উঠতে। সেই সুযোগ এল মিশনারি জ্যাক উইন্সলোর হাত ধরে। তিনি ছিলেন ‘খ্রিস্ট সেবা সংঘ’ নামক এক আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা। খ্রিস্ট সেবা সংঘে যোগদানের জন্য এল্যুইন ভারতের পুনে শহরে আসেন। সাল ১৯২৭।

সেই সময়ে ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের জোয়ার। ১৯২৮-এর জানুয়ারিতে সবরমতি আশ্রমে এল্যুইনের সঙ্গে গান্ধীজির প্রথম সাক্ষাৎ। ১৯২৮ থেকে ১৯৩২– ভেরিয়ার এল্যুইন মহাত্মা গান্ধী ও তাঁর অনুগামীদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন। এই সময়পর্বের অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠেছিল এল্যুইনের সমগ্র জীবনে উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন বেরিয়ে আসবেন খ্রিস্ট সেবা সংঘ থেকে, কোনও একটি রিক্ত, নিঃস্ব গ্রামে বসবাস করবেন, চেষ্টা করবেন সেখানকার মানুষের নিবিড় সান্নিধ্য অর্জনের। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন গুজরাতে অস্পৃশ্যদের মধ্যে কাজ করবেন। কিন্তু সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল বললেন, গুজরাত ইতিমধ্যেই পরিকীর্ণ সমাজসেবী আর মিশনারি প্রতিষ্ঠানে, সেখানে এল্যুইনের নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সহজ হবে না। তিনি তাঁকে পরামর্শ দিলেন উপজাতিদের মধ্যে কাজ করার। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের সঙ্গী যমনালাল বাজাজের মুখে এল্যুইন শুনলেন ‘গোণ্ড’ উপজাতিদের কথা। তাঁরই অনুপ্রেরণায় মধ্যপ্রদেশের এই চরম অবহেলিত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাজ করতে এল্যুইন উৎসাহিত হলেন। তরুণ এল্যুইনের সামনে উন্মোচিত হল এক নতুন দিগন্ত।

১৯৩২-এর ২৮ জানুয়ারি ভেরিয়ার এল্যুইন ও তাঁর বন্ধু শামরাও হিভালে গরুর গাড়িতে রওনা দিলেন মধ্যপ্রদেশের মাণ্ডলা জেলার করনজিয়া নামক গোণ্ড গ্রামের উদ্দেশে। এই সিদ্ধান্ত অবশ্য প্রশাসনের চোখে স্বস্তিদায়ক ছিল না। ১৯৩২ সালে ইংল্যান্ডে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সরকারি কর্মকর্তারা তাঁকে ভারতে ফেরার অনুমতি দিতে অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত এল্যুইনকে লিখিত অঙ্গীকার করতে হয় যে, তিনি গোণ্ডদের মধ্যেই কাজ করবেন, কোনও রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নেবেন না এবং রাজনৈতিক বিক্ষোভে যাঁরা সামিল হবেন তাঁদের থেকে তিনি নিজেকে যতদূর সম্ভব দূরত্বে রাখবেন এবং সরকারবিরোধী কোনও লেখালিখি তিনি করবেন না।

zoom
পদব্রজে। গান্ধীজির সঙ্গে

ভারতে ফিরে এল্যুইন ও শামরাও ফ্রান্সিসীয় ও গান্ধীবাদী ভাবাদর্শের মিশ্র ভিত্তিতে ছোট একটি আবাসিক আশ্রম প্রতিষ্ঠা করলেন গোণ্ডদের গ্রামে। গড়ে তুললেন ‘ক্ষুদ্র সেবাকর্মী বাহিনী’। প্রথমে সংগঠনের নাম ছিল ‘গোণ্ড সেবা মণ্ডল’। ১৯৪৯ সালে এর নামকরণ হয় ‘Tribal Welfare & Research Unit’ (TWRU)। নর্মদার তীর ধরে গোণ্ডদের জীবনের ছন্দকে খুঁজেছেন এল্যুইন। গোণ্ডদের জীবনের ছোঁয়া পেতে রয়ে গিয়েছিলেন অমরকণ্টকের কাছে করনজিয়া গ্রামে। সাতপুরা বিন্ধ্যপর্বতের বনভূমির ছায়ায় দেখেছেন তাদের সরল জীবনযাপন। দেখলেন গোণ্ডদের সংস্কৃতি প্রাণবন্ত তাদের নাচ আর গানে। গোণ্ডদের কবিতা আকাশ-মাটি, অরণ্য-পাহাড় ও নদীর– পরিবর্তমান ঋতুর, মানুষের নানা আবেগ ও ভালোবাসায় নিরাবরণ ও লজ্জাহীন– সমস্ত বিধিনিষেধ মুক্ত। বসন্তের আগমনে বনের শাখায় যে সবুজের সমারোহ ঘটে তাকে কর্মনৃত্যে প্রতীকী রূপে তুলে ধরে তারা। এল্যুইনের ‘Leaves from the Jungle: Life in a Gond Village’ (1936) মধ্যপ্রদেশের গোণ্ডদের নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধান।

১৯৩৬-এ এল্যুইন ও শামরাও চলে গেলেন সহওরোছাপার উপত্যকায়। বাইগা জনজাতিদের গ্রাম। সেখানে গড়ে তুললেন কুষ্ঠরোগীদের হোম। বাইগাদের কাছে ‘অরণ্য আনন্দময়’, ‘অরণ্য শুভ আকাঙ্ক্ষার ভূমি’। এই অরণ্য তাদের প্রথমজীবনের প্রেম-ভালোবাসার আবাস; যেখানে তারা অকুতোভয়ে লড়াই করে। এখানে এসে এল্যুইন প্রথম উপলব্ধি করেন এই মানুষদের স্বাধীনতাহীনতার অপরিসীম বঞ্চনা। লিখলেন, ‘The Baiga’ (1939)। এরপর তাঁরা এলেন পাটানগড়ে। গড়ে তুললেন দাতব্য চিকিৎসালয়, স্কুল, কুষ্ঠাশ্রম। আদিবাসী মানুষদের জীবন সম্পর্কে এল্যুইনের প্রাথমিক ধারণা ছিল খুবই সীমিত। তাদের সুখ-দুঃখ, তাদের বেঁচে থাকার লড়াই তাঁকে ভাবতে শিখিয়েছিল। আদিবাসী বন্ধুকে তিনি জেলে যেতে দেখেছেন, কারও মাছ ধরা কিংবা শিকারে যাওয়ার অধিকার আটকে যেতে দেখেছেন, দেখেছেন কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বন অথবা জমির ওপর তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তখন ধীরে ধীরে এল্যুইন উপলব্ধি করেছেন– আদিবাসী মানুষের দুর্বলতা প্রকৃতির দেওয়া নয়, অনেকটাই সমাজের একদল লোভী মানুষের তৈরি। তাদের যে শক্তি, যে স্বাধীনতা, যে নিজস্ব জীবনযাপনের অধিকার ছিল, তাদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতার জোরে তা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অথচ সেই ক্ষত সারিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো ক্ষমতা এল্যুইনের ছিল না।

এরপর এল্যুইন কাজ করেন আগারিয়া গোষ্ঠীর মধ্যে। তারা কামার, লোহা গলায়। এল্যুইন বাস্তব অভিজ্ঞতায় অনুভব করেছিলেন আগারিয়াদের ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আগারিয়াদের নিয়ে লেখা তাঁর বইটি প্রকাশ পায় ১৯৪২ সালে। নাম ‘The Agaria’।

১৯৪০ সালের মে মাসে সেনসাস অফিসার হিসাবে এল্যুইন বাস্তারে এলেন। বাস্তারের প্রতি এল্যুইনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন স্যর ডব্লু. ভি. গ্রিগসন, যিনি ভারতের আদিবাসী সমস্যার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন আপনজন হয়ে। সেখানে তাঁর বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয় দক্ষিণের বাইসন-হর্ন মারিয়া এবং উত্তরের মুরিয়া জনগোষ্ঠীকে ঘিরে। মারিয়াদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তাদের বিবাহ-নৃত্য। সেই নৃত্যানুষ্ঠানে পুরুষদের মাথায় থাকে মোষের শিঙের শিরস্ত্রাণ, গলায় ঢোলক; তারপর তারা ঘুরতে ঘুরতে একটি বড় বৃত্ত রচনা করে; আর মেয়েরা সেই বৃত্তের মধ্যে ঘোরে। আদিবাসী ভারতবর্ষে এ এক অতুলনীয় নৃত্যসুষমা। দরিদ্র, নিঃস্ব আদিবাসী মানুষ নৃত্যের ছন্দে পরমাবিষ্ট হয়ে খুঁজে পায় জীবনের এক তাৎপর্য।

মুরিয়া উপজাতিদের মধ্যে এল্যুইন দেখলেন ঘোটুলের উপস্থিতি। ঘোটুল বা গ্রামের ডরমিটরি মুরিয়া জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, সাংস্কৃতিক বিকাশের দ্যোতক। ঘোটুলের মূলকথা যৌবনকে কার্যকর করা– বস্তুগত চাহিদার চেয়ে মুক্তি ও সুখকে বড় করে দেখা– বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা, পরোপকারিতা ও ঐক্যচেতনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। এই অভিজ্ঞতার কথা এল্যুইন লিপিবদ্ধ করেছেন ‘The Muria and their Ghotul’ (1947) গ্রন্থে। বাস্তারের আদিবাসীদের প্রয়োজন অনুভব করে তিনি চিত্রকূটে একটি আশ্রমও প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময়ের মধ্যেই এল্যুইন হয়ে উঠছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর চোখ দিয়ে শহুরে ভারত প্রথমবার অরণ্যের ভারতকে নতুন করে দেখতে শুরু করেছিল।

১৯৪২ সালের ডিসেম্বর মাসে এল্যুইন প্রথম ওড়িশায় যান। তাঁর কাজ ছিল বোনাই, কেওনঝড় ও পাল লহরার আদিবাসী অঞ্চল পরিদর্শন করে সেখানকার মানুষের জীবনচর্চার ওপর অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ করা। ওড়িশার কেওনঝড়ের জুয়াং-রা বেড়া দিয়ে ঘেরা জমিতে বসবাসের ঘর তৈরি করত। সব ঘরের মুখোমুখি দরজা। যেন সবার ঘর সবার জন্য। বাসগৃহের এই নির্মাণ কৌশল তাদের জীবনযাপনের আন্তরিক সম্পর্ককে স্পষ্ট করে। প্রকৃতির কোলে প্রকৃতির রসদে এদের জীবন কাটে। গোদাবরী নর্মদা মহানদী সুবর্ণরেখার তীরে এমনই তাদের জীবনধারা। দলবদ্ধ জীবনেই ছোট-বড় সংসার, তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, স্বপ্ন। এর মধ্যেই  উৎসব আর গান। গোধূলির অবসানে শুক্লপক্ষের আলো-আঁধারিতে নৃত্যের তালে বেজে উঠত ঢোল-মৃদঙ্গের শব্দ। নিবিড় রাত্রির অন্ধকারে বসত তাদের আনন্দের হাট। এর পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেছেন একটি মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথাও। একদিন রাতে তিনি পাল লহরায় জুয়াং উপজাতিদের গ্রামে গিয়ে দেখেন বৃদ্ধা মহিলারা কটিদেশে এক টুকরো নেকড়া জড়িয়ে প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় মাটির মেঝেতে কুঁকড়ে শুয়ে কম্পমান অগ্নিশিখা থেকে যৎসামান্য উত্তাপ সংগ্রহের আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এই জুয়াংদের প্রায় সকলেরই স্বাস্থ্য অত্যন্ত খারাপ, নানা ব্যাধিতেও তারা আক্রান্ত। ওড়িশা সফরের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটল তাঁর তিনটি গ্রন্থে: ‘Bondo Highlander’ (1950), সাওরাদের নিয়ে ‘The Religion of an Indian Tribe’ (1955) এবং ‘Tribal Myths of Orissa’ (1954)।

এল্যুইন বলেছিলেন, আদিবাসীরাই তাঁকে আনন্দ ও সরলতার গুরুত্ব শিখিয়েছে। বর্ণ ও ছন্দের প্রতি তাদের আসক্তি তাঁর মনে প্রত্যক্ষভাবে সাড়া ফেলেছিল। বাইগারা তাঁকে গহীন অরণ্যের সঙ্গে পরিচয় করে দিয়েছিল। কুট্টিয়া কোণ্ড ও মারিয়ারা তাঁর মধ্যে সৌন্দর্য চেতনার প্রজ্জ্বলন ঘটিয়েছে। সাওরাদের নিয়ে তিনি চিন্তাভাবনা করেছেন, তাদের ভালোবেসেছেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন নৃবিজ্ঞানের যথার্থতা লুকিয়ে আছে মানুষের প্রতি ভালোবাসায়। তাই তিনি লিখেছিলেন, ‘The essence and art of anthropology is love. Without it, nothing is fertile, nothing is true.’ তিনি আরও বলেন, ‘For me anthropology did not mean field work: it meant my whole life. My method was to settle down among the people, live with them, share their life as far as an outsider could, and generally do several books together.…This meant that I did not depend merely on asking questions, but knowledge of the people gradually sank in until it was part of me. And with knowledge came the desire to help.’

মধ্য ভারতের ভূগোল পেরিয়ে এল্যুইনের দৃষ্টি পৌঁছেছিল উত্তর-পূর্ব ভারতে। ‘The Aboriginals’-এ এল্যুইন লিখেছেন আসাম মণিপুরের নাগা জীবনের কষ্টের কাহিনি। সেই সৈন্যসাজের নাগা মানুষদের আর দেখা যেত না। দারিদ্র আর মহামারী তাদের সারা বছরের সঙ্গী। শীত থেকে বর্ষা পরণে একই পোশাক। বর্ষায় ভেজা পোশাক শুকত রোদ উঠলে। পাহাড়ের গায়ে দম বন্ধ করা ছোট ঘর। পুষ্টিহীন অনেকেরই শরীরে বাসা বাঁধে ক্ষয়রোগ। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভের পর প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ভারতের উত্তর-পূর্ব কোণে বসবাসকারী উপজাতিদের সমস্যা সমাধানের জন্য অনুরোধ জানালেন এল্যুইনকে। ভারত সরকার এল্যুইনকে ১৯৫৩ সালে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত সংস্থার (North East Frontier Agency) উপজাতি বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করে। তাঁর বই ‘A Philosophy for NEFA’ (1957) ভারত সরকারের উপজাতীয় নীতি এবং উপজাতীয় উন্নয়ন প্রশাসনে নতুন পথ খুলে দিয়েছিল। ১৯৬০ সালে এল্যুইনকে তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি কমিশনের সদস্য হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিল। ভেরিয়ার এল্যুইন বলেছিলেন, ‘পাহাড় ও সমতলের ঐক্য জাতীয় স্বার্থেও যেমন প্রয়োজন, তেমন প্রয়োজন পাহাড় ও অরণ্যের মানুষদের স্বার্থে। আমরা পরস্পরকে সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় করতে পারি। আদিবাসীদের আমরা অনেক কিছু দিতে পারি, আবার ওদেরও অনেক কিছু আছে, যা আমাদের দেওয়ার মতো।’

zoom
লোক ঐতিহ্যের নানা রং-রূপে মুগ্ধ ছিলেন এল্যুইন

এল্যুইনের মানুষকে জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল সাহিত্যপাঠের সূত্রে। ধর্মতত্ত্ব নিয়ে তাঁর পড়াশোনা মানুষ সম্বন্ধে কৌতূহল বাড়িয়ে তুলেছিল। তিনি লিখেছেন, ‘The science of God led me to the science of human beings’. এ. এইচ. কুইগগিন লিখেছিলেন যে, ‘His anthropology might be called Philanthropology. His great service to science was to lay the foundations and to build the framework of anthropology well and truly on sound scientific principles; his service to humanity was to show that ‘the proper study of mankind’ is to discover Man as a human being, whatever the texture of his hair, the colour of his skin or the shape of his skull’.

সাহিত্য ও দর্শনে এল্যুইনকে প্রভাবিত করেছিল ইয়েটস, সুইনবান, টি.এস.ইলিয়ট, ওয়ার্ডসওয়ার্থের চিন্তাধারা। পরে কাছে পেয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথকে। এঁদের আদর্শে অনুপ্রাণিত এল্যুইন নৃবিজ্ঞানের মধ্যে খুঁজেছিলেন মানবসত্তাকে। আদিবাসী মানুষের জীবনে এল্যুইন আনতে চেয়েছিলেন মুক্ত ভাবনা, মুক্তির স্বাদ। তিনি এইসব পিছিয়ে থাকা মানুষের নিজস্ব সমাজ কাঠামোকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন। চেয়েছিলেন তাদের জন্য সংরক্ষিত অঞ্চল গড়ে তুলতে। উপমহাদেশের আদিবাসী জীবন তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল নিজস্ব জগৎ।

এল্যুইন মনে করেন ভারতের আদিবাসীরা এদেশের ভূমিজ সন্তান। এল্যুইন চেয়েছিলেন এই জনজাতির যে অতীত আছে, তাদের সংস্কৃতির উত্থান-পতন আছে, সবাই তা জানুক, চিনুক। সবাই ওদের স্নেহ ও শ্রদ্ধা করুক। আদি জনজাতি তাদের লোকজীবনের ধারা, নিজস্ব ভাষা ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে। জনগণনায় তারা রয়ে গেছে শুধু পরিসংখ্যান হিসেবে। একজন গবেষক যখন দূর থেকে কোনও সমাজকে ‘গবেষণার বিষয়’ হিসেবে দেখেন, তখন সেই সমাজের মানুষ হয়ে ওঠে পরিসংখ্যান। কিন্তু এল্যুইনের লেখায় এই জনজাতি পরিসংখ্যানের সীমা ছাড়িয়ে গল্প হয়ে উঠেছে। মহারাষ্ট্রের উপকূলভাগের ঘন সংবদ্ধ পাহাড় থেকে দক্ষিণের নীলগিরি, নাল্লামালাই, মধ্যভারতের বিন্ধ্য, সাতপুরা পেরিয়ে ছোটনাগপুরের মালভূমিতে এল্যুইন দেখেছিলেন অগণ্য আদিবাসী মানবসমাজকে। তাদের গান আছে, প্রেম আছে, হাসি আছে, ভয় আছে, দেবতা আছে, জঙ্গল আছে, উৎসব আছে। তাদের নিজস্ব নৈতিকতা ও সৌন্দর্যবোধ আছে। বন, পাহাড়, নদী কিংবা জমিকে আমরা যখন কেবল সম্পদ হিসেবে দেখি, তখন সেই ভূখণ্ডের সঙ্গে শতাব্দী ধরে বসবাস করা মানুষের স্মৃতি ও সংস্কৃতির মূল্য কোথায় থাকে? এল্যুইনের কাজ আমাদের সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

zoom
ইংল্যান্ডে জন্মানো এক ভারতীয়

ভেরিয়ার এল্যুইন নিজেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বলেছেন– ব্রিটিশ বর্ন ইন্ডিয়ান অর্থাৎ ইংল্যান্ডে জন্মানো ভারতীয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছু পরে, তরুণ বয়সেই তিনি ভারতে এসেছিলেন। কিন্তু সম্পূর্ণ অজানা এই দেশ তাঁকে আবিষ্ট করে ফেলে। ভারতের অরণ্য-পাহাড়ের মানুষ তাঁকে শিখিয়েছিল– মানুষকে বোঝার জন্য তার পাশে বসতে হয়। তার ভাষা শুনতে হয়। তার উৎসবের মধ্যে দাঁড়াতে হয়। তার দুঃখকে নিজের চোখে দেখতে হয়। ভারতবর্ষকে ভালোবেসে এদেশের আদিবাসী জনজাতিকে আপন করে তাদের সমস্যাকে আপন করে নিয়েছিলেন এই মানবপ্রেমী মানুষটি। দরিদ্র কুটিরে আদিবাসী মানুষের কথা বুঝতে বুঝতে তাদের হৃদয়ের ভাষাও বুঝতে চাইতেন। সেইসব মানুষের ভাষার লিখিত রূপ ছিল না। প্রচলিত গান লোকগাথার সবই ছিল মৌখিক। এল্যুইন তাদের লোককবিতাকে লিখে রেখেছেন ডায়েরির পাতায়। সেখানে পেয়েছি প্রকৃতির কথা, বর্ষা-বৃষ্টির কথা। সেখানে আছে ফসল তোলার গান আবার অনাবৃষ্টি অনাহারের কথা। তাদের গানে জায়গা করে নিয়েছে দুর্ভিক্ষের কষ্ট, আবার কখনও গানের অন্তরে মিশে আছে উৎসব পার্বণের গান। এই লোকসম্পদকে এল্যুইন আজীবন চেয়েছিলেন আপামর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। হাজার মাইল দূরে ইংল্যান্ড থেকে এসে এদেশের জনজাতিকে আপন করে ভালোবেসে তাদের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন মানবতার বার্তা। ফিরিয়ে দিয়েছিলেন আদি জনজাতি মানুষজনের আত্মসম্মান, ওদেরও যে কেউ ভালোবাসে, সেই অনুভব।

তথ্য সহায়তা

Devi, M., & Saha, P. (2000). Verrier Elwin-er Adivasi Jagat. New Delhi: Sahitya Akadeni.

Elwin, V. (1964). The Tribal World of Verrier Elwin: An Autobiography. Bombay: Oxford University Press.

Guha, R. (2014). Savaging the Civilized: Verrier Elwin, His Tribals and India. Gurgaon: Allen Lane an imprint of Penguin Books (Originally Published in 1999, University of California Press / Oxford University Press).

 

anthropology British Ghotul Indian Tribe Jawaharlal Nehru Mahatma Gandhi Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar The Agaria The Baiga The Muria Vallabhbhai Patel Verrier Elwin

Share this article on