chandrakanta murasingh and kakbarak sahitya academy | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ককবরক সাহিত্য অকাদেমি

আলাপ হল ককবরক কবি চন্দ্রকান্ত মুড়াসিংয়ের সঙ্গে। চন্দ্রকান্তের লেখার সঙ্গে আগেই পরিচিত ছিলাম কারণ ততদিনে কবি হিসেবে কিছুটা প্রতিষ্ঠিত। ওঁর কিছু কবিতা অনূদিত হয়েছে বাংলা ও ইংরেজিতে, সম্মানিত হয়েছেন দু’টি পুরস্কারেও। চন্দ্রকান্ত একবার অনুরোধ করলেন ককবরক ভাষার লোকসংগীত ও কবিতার একটি সংকলন বাংলা অনুবাদে সাহিত্য অকাদেমি থেকে প্রকাশ করতে।

শেষ আপডেট: জুলাই ৪, ২০২৬, ২১:০৯   
Facebook WhatsApp Messenger

৬.

ত্রিপুরার পূর্বদিকে মিজোরাম, পশ্চিমে কুমিল্লা, উত্তরে শ্রীহট্ট ও উত্তর-পূর্বে অসম আর দক্ষিণে চট্টগ্রাম। পর্বত আর আট নদীর দেশ ত্রিপুরা। ককবরক ভাষায় ‘পাহাড়’ হল মুড়া আর সে কারণে তিনটি পর্বতের নাম বড়মুড়া, দেবতামুড়া ও আঠারমুড়া; আর বাকি তিনটি লংতরাই, সাকানটাং ও জাম্পুই। পর্বতমালা থেকে সৃষ্টি হওয়া উত্তরমুখী চার নদীর ভেতর জুরি ধর্মনগরের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে আর বাকি তিন মনু, ধলাই ও খোয়াই যথাক্রমে কৈলাশহর, কমলপুর ও খোয়াই জনপদের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে। লংতরাই পর্বত থেকে জন্ম নেওয়া গোমতী নদী অমরপুর, উদয়পুর, সোনামুড়া হয়ে বাংলাদেশে মেঘনায় মিশেছে। আগরতলাতে যে হাওড়া নদী চোখে পড়ে সেটি বড়মুড়া বা বড় পাহাড় থেকে নেমে আগরতলা হয়ে পশ্চিমদিকে গিয়ে বাংলাদেশে তিতাসের সঙ্গে মিশেছে। অন‍্যদিকে লুসাই পাহাড় থেকে জন্ম নেওয়া মহুরী বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলার মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে । ত্রিপুরা সরকারের অতিথি নিবাসের প্রতিটি ঘরের একটি নাম আছে, আর তা ত্রিপুরার কোনও না কোনও নদীর নামে। একসময় বছরে দু’-চারবার ত্রিপুরা যেতে হত। তখন নদীগুলোর খোঁজখবর নিই আর কয়েকটা দেখেও আসি।

ত্রিপুরার ইতিহাস বেশ বর্ণময়, বিশেষ করে রাজপরিবারের কাহিনি। আগে ত্রিপুরাপতিকে বলা হত ‘ফা’ বা পিতা। একসময় প্রতিবেশী শাসকের আক্রমণে রাজত্ব হারিয়ে রত্ন ফা গৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নেন। ১৩৬৪ সালে তিনি গৌড়ের সুলতানের সাহায্য নিয়ে নিজের রাজত্বের অধিকার ফিরে পান। কৃতজ্ঞতায় ফা একশো হাতি এবং একটি মূল্যবান মাণিক্য গৌড়পতিকে ভেট দেন। খুশি হয়ে গৌড়পতি তাঁকে ‘মাণিক্য’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তারপর ত্রিপুরার রাজা হন ধর্ম মাণিক্য (১৪৩১-১৪৬২) যাঁর রাজত্বকালে বাংলা পদ্যে ‘রাজমালা’ রচিত হয়েছিল। রাজার আমন্ত্রণে ঐ সময়েই ত্রিপুরাতে মৈথিলি ও কান‍্যকুব্জের ব্রাহ্মণেরা যান। তারপর ধন্য মাণিক্য, বিজয় মাণিক্য, অমর মাণিক্য প্রমুখদের হয়ে আধুনিক পর্বে বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুর এবং রাধাকিশোর মাণিক্য বাহাদুর সিংহাসনে বসেন। এই রাধাকিশোর মাণিক্যের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আন্তরিক সম্পর্ক ছিল আর তাঁর আমন্ত্রণেই রবীন্দ্রনাথের ত্রিপুরা যাওয়া। বিশ্বভারতীর উন্নয়নে ত্রিপুরারাজ অর্থসাহায্য করেন। শান্তিনিকেতনে খোলের বোলের সঙ্গে মণিপুরী নৃত‍্য শিক্ষা দিতে বুদ্ধিমন্ত সিংহ এসেছিলেন ত্রিপুরার মহারাজার উদ্যোগেই। মহারাজ বীরেন্দ্রকিশোর মাণিক্য বাহাদুরের রাজত্বকাল ১৯০৯ থেকে ১৯২৩ আর মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুরের রাজত্বকাল ১৯২৩ থেকে ১৯৪৭। বীরবিক্রমের ইচ্ছাতেই ভারতভুক্তির প্রস্তাব যদিও ১৯৪৭ সালে মৃত্যুর কারণে তিনি তা দেখে যেতে পারেননি। ১৯৪৯-এর ১৫ অক্টোবর ভারতের সঙ্গে ত্রিপুরার সংযুক্তি। তখন কিরীটবিক্রম কিশোর মাণিক্যের সময়। ত্রিপুরা পূর্ণরাজ্যের মর্যাদা পায় ১৯৭২ সালের ২১ জানুয়ারি।

zoom
মহারাজ বীরেন্দ্রকিশোর মাণিক্য

কিন্তু এই রাষ্ট্রনৈতিক পূর্ণতার পিছনে এক অপূর্ণতার আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল। ১৯৪৭-এ দেশভাগের ফলে পাকিস্তান জন্ম নিল আর ত্রিপুরার একটি অংশ বিদেশ হয়ে গেল। ত্রিপুরার এক অংশ থেকে উচ্ছেদ হয়ে অন‍্য অংশে অজস্র ছিন্নমূল মানুষ চলে এলেন। পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য অংশ থেকেও লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই সন্ধানে পশ্চিমবঙ্গের মতো উত্তর-পূর্ব ভারতের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লেন। তাঁদেরই একটি অংশ ত্রিপুরায় এলেন। সেখানেই থামল না। পাঁচ ও ছয়ের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার কারণে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং আদিবাসীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলে আসতে বাধ্য হলেন। ১৯৭১-এ পূর্ববঙ্গের মুক্তিযুদ্ধ এবং পাক-ভারত যুদ্ধের কারণে আবার জনস্রোত বয়ে আসতে থাকল। ফলে জনবিন্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটল। আদি বাসিন্দারা আরও সংখ্যালঘু হয়ে উঠলেন এবং জঙ্গল, জমি ও জনসম্পদের ওপর স্থানীয় মানুষের নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পেতে থাকল। বাড়তে থাকল ক্ষোভ। সাতের দশকের শেষের দিকে দক্ষিণ ত্রিপুরার গোমতী উৎসমুখে ডম্বুর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়তে গিয়ে বিপুল সংখ্যক ককবরক ও রিয়াং সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ বাস্তুচ্যুত হলেন। শেফালি দেববর্মার একটি কবিতায় সে আতঙ্কের স্পষ্ট চিহ্ন আছে–

ডম্বুর উপত্যকার উচ্ছল নদী
বাঁধা হল পাহাড় কেটে
জলকে বশ মানাতে।

কয়েক পঙ্‌ক্তি পরে লেখা হল–

বন কমে দিনে দিনে
দ্রুত বাড়ে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি
হারিয়ে যায় রাতের ঘুম
এখন মাঝরাতে গান গায় রক্ত
আমার শিরায় উপশিরায়
শুনি হৃৎপিণ্ডের ঠক্ ঠক্ শব্দ
আর ছুঁয়ে দেখি ঘাড়।

এই পর্বে ত্রিপুরার যা খবরাখবর পেতাম তা অনেকটাই খবরের কাগজে। ত্রিপুরার বিষয়ে জানার উৎসাহও ছিল, কারণ শচীন দেববর্মন, ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মার মতো গুণীজনদের রাজ‍্য। তাছাড়া ত্রিপুরা থেকে বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রী আমাদের সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছিল।

আমি ততদিনে গল্পটল্প লেখা শুরু করেছি আর সাতের দশকের শেষ ও আটের দশকের শুরুতে বেশ কিছু পত্রিকায় লেখাপত্র ছাপাও হয়েছে। সে-সূত্রে আটের দশকের মাঝামাঝি আলাপ হল শ্যামাপদ চক্রবর্তীর সঙ্গে। ত্রিপুরার মহারাজা বীরবিক্রম কলেজ থেকে দর্শনশাস্ত্রে অনার্স করে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. এ. পড়তে এসেছে। সেও ততদিনে কিছু গল্প লিখেছে। বয়সে কিছুটা ছোট হলেও ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। শ্যামাপদের বাড়ি আঠারমুড়ার কোলে একটা নদীর পাড়ে খোয়াই গাঁয়ে। বলেছিল আমাকে ওদের গাঁয়ে নিয়ে যাবে। রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’-এর কারণে পাহাড়কোলের ওই গ্রামটিতে দইওয়ালার দেখা মিলবে এমন এক কল্পরাজ্যের বাসিন্দা হয়ে যাই শ্যামাপদের কথা শুনে, আর ‘খোয়াই’ নামটির ভেতরে জেগে ওঠে শান্তিনিকেতনের গা-ঘেঁষা গেরুয়া মোরামের উদাস প্রান্তরটি। তারপর সময়ের স্রোতে ভেসে যাই দু’জনেই। মাঝে মাঝে ত্রিপুরার উগ্রপন্থার কথা পড়ি। উত্তর-পূর্বের অন্যান্য রাজ্যের মতো ত্রিপুরাতেও নানান সশস্ত্র গোষ্ঠীর কথা শুনি। ১৯৮৮ সালে সরকার ও বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীগুলির ভিতর চুক্তি হয়, যার কথা খবরের কাগজে পড়ে মাঝেমধ্যে শ্যামাপদের কথা মনে পড়ত কিন্তু যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি।

zoom
আগরতলা রবীন্দ্র ভবন, ত্রিপুরা

এর বছর দশেক পরে, ১৯৯৮-৯৯ সাল নাগাদ ত্রিপুরার আগরতলায় যাই একটি সাহিত্যসভার কারণে। সন্ধেয় উদ্বোধন অনুষ্ঠানের শেষে রবীন্দ্রভবনের সমানে দাঁড়িয়ে দু’-চারজনের সঙ্গে কথা বলছি। হঠাৎ শুনি নীচু গলায় কে যেন ‘রামকুমারদা’ বলে ডাকল। পেছন ফিরে দেখি শ্যামাপদ। চিনতে ভুল হয়নি কারণ শ্যামাপদের মুখে সেই পরিচিত হাসি, যদিও কিছুটা ম্লান। দু’জনে গিয়ে বসলাম কাছাকাছি একটা খাবারের দোকানে । খোঁজ নিয়ে জানলাম শ‍্যামাপদ শিক্ষা দপ্তরে কাজ করছে আর ‘ছিন্নমূল’ নামে ওর একটা গল্প-সংকলন বেরিয়েছে। ওর বাড়ি খোয়াইয়ের কথা জিজ্ঞেস করতে বলল ওর মা ও বাবা ওখানেই থাকেন। ভাবলাম আগরতলা শহরে অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব শেষ করে ওদের উত্তর ত্রিপুরার আঠারমুড়া পাহাড়তলির গ্রামটিতে চলে গেলে মন্দ হয় না। বললাম সেকথা। আমার কথা শুনে খানিক চুপ থেকে শ্যামাপদ বলল, উগ্রপন্থীদের আতঙ্কে ওর মা-বাবা রাতে ঘরে তালা ঝুলিয়ে জঙ্গলে ঢুকে যান। সেখানে রাত কাটিয়ে সকালে বাড়ি ফেরেন। এ-অবস্থায় আমার না যাওয়াই ভালো। কথাটা শুনে মনে হল ছবির মতো সুন্দর একটা পাহাড়ি গাঁ কালবৈশাখীর ঝড়ে তছনচ হয়ে গেছে। তার দিন দুয়েকের ভিতর কলকাতায় ফিরি । ক’দিন পরে শ্যামাপদের পাঠানো এগারটি গল্পের সংকলন ‘ছিন্নমূল’ পাই। খুলে পড়ে দেখি লেখা আছে–

আচমকা কেঁপে ওঠে দুটি জনপদ, কামিনী পাড়া ও রজনীসর্দার পাড়া। অবিশ্বাস আর কান্নায় মাখামাখি রাত দীর্ঘ হয়।
গভীর রাতে নৈঃশব্দ‍্য ভাঙা ফিসফিসানি।

ভাবি গল্পের নিতাই মাস্টারের মতো শ্যামাপদের মা-বাবাও হয়তো রাতে তাকিয়ে থাকবেন আদিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়ের দিকে, আঠারমুড়ার জমাট অন্ধকারের দিকে।

এর কিছুদিন পরে উত্তাল রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যেই আলাপ হল ককবরক কবি চন্দ্রকান্ত মুড়াসিংয়ের সঙ্গে। চন্দ্রকান্তের লেখার সঙ্গে আগেই পরিচিত ছিলাম কারণ ততদিনে কবি হিসেবে কিছুটা প্রতিষ্ঠিত। ওঁর কিছু কবিতা অনূদিত হয়েছে বাংলা ও ইংরেজিতে, সম্মানিত হয়েছেন দু’টি পুরস্কারেও। চন্দ্রকান্ত একবার অনুরোধ করলেন ককবরক ভাষার লোকসংগীত ও কবিতার একটি সংকলন বাংলা অনুবাদে সাহিত্য অকাদেমি থেকে প্রকাশ করতে। ককবরক ভোট-বর্মী ভাষাগোষ্ঠীর বোড়ো শাখার অন্তর্গত। ত্রিপুরার তিপ্রা, রিয়াং, নোয়াতিয়া, জমাতিয়া, রুপিনী, কলই, মুড়াসিং এবং উছই সম্প্রদায় এই ভাষায় কথা বলেন।

zoom
ককবরক কবি চন্দ্রকান্ত মুড়াসিং

চন্দ্রকান্তের প্রস্তাবটি ভালোই কিন্তু এমন একটি সংকলন বাংলায় প্রকাশ করতে হলে নির্ভরযোগ্য অনুবাদকমণ্ডলী দরকার আর তা কর্মশালায় দু’-ভাষার বিশেষজ্ঞদের মত বিনিময়ের মধ্য দিয়ে অনুবাদের কাজ চালাতে হয়। আগরতলায় এ-কাজ করতে হলে একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন যারা ব্যবস্থাপনার দিকটি দেখবে আর কিছুটা অর্থনৈতিক দায়দায়িত্ব নেবে। গ্রামীণ ব্যাঙ্কের কর্মী চন্দ্রকান্ত মুখে-মুখে হিসেব করে বললেন যে কবি, অনুবাদক ও বিশেষজ্ঞ মিলে জনা পঁচিশ মানুষের পাঁচ দিনের কর্মশালায় মোটামুটি খরচ হাজার সত্তর। সেক্ষেত্রে সহযোগী সংস্থাকে নিতে হবে হাজার তিরিশ-পঁয়ত্রিশ টাকার দায়িত্ব। এই টাকা লাগবে কর্মশালার জন‍্যে ঘর ভাড়া, খাওয়া, রাতে থাকা ইত্যাদি খরচ মেটাতে। শমনোবলের কারণেই হোক কিংবা সন্ধের পানীয়ের প্রভাবে, চন্দ্রকান্ত জোর দিয়েই বললেন একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

তার পরের কয়েক মাসে ত্রিপুরায় রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে। হানাহানিও প্রায় নিত্যদিন চলছে। ২০০০ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি নাগাদ চন্দ্রকান্ত জানালেন ককবরক ভাষার লোকসংগীত ও কবিতা সংগ্রহের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে, কিন্তু সরকার বা ত্রিপুরার কোনও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুবাদ কর্মশালার কাজে উৎসাহ দেখাচ্ছে না। সবাই নানা কাজে ব‍্যস্ত । চন্দ্রকান্তকে মনমরা দেখাল। তার দিনকয়েক পরে ফোন করে বললেন সহযোগী প্রতিষ্ঠান যদি লাগেই তাহলে চন্দ্রকান্ত ‘ককবরক সাহিত্য অকাদেমি’ নামে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন। কিছুদিনের মধ্যে চন্দ্রকান্ত নিজেকে সভাপতি কিংবা সম্পাদকের মতো কোনও একটা উঁচু পদ দিয়ে ককবরক সাহিত্য অকাদেমি প্রতিষ্ঠা করলেন আর লেটার-হেডও ছেপে ফেললেন। এরপর চাঁদা তোলা। চন্দ্রকান্তের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় দেড় হাজার টাকা উঠল। গ্রীষ্মের ছুটিতে একটা ইস্কুলের ঘর মিলল নামমাত্র টাকায়। বাজার করে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা হল সেখানেই। চাল ও শাকসবজি কেউ কেউ বাড়ি থেকে আনলেন । আগরতলার বাইরে থেকে আসা কবি-অনুবাদকের থাকার ব‍্যবস্থা হল চন্দ্রকান্তর নিজের ও বন্ধুদের বাড়িতে। ফলে সত্তর হাজারের বাজেট নেমে গেল তিরিশে। সে টাকার দায়িত্ব সাহিত্য অকাদেমি নিল।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আগের দিন হঠাৎ মীনাক্ষী সেনের কাছ থেকে ফোন পেলাম। মীনাক্ষীর ‘জেলের ভেতর জেল’ বইটির লেখক ও সুপরিচিত কথাকার। কলেজের অধ্যাপনা থেকে ছুটি নিয়ে ত্রিপুরার উইমেন কমিশনের সচিবের দায়িত্ব সামলাচ্ছে। মীনাক্ষী ফোন করে বলল ককবরক-বাংলা কর্মশালা নিয়ে আগরতলায় উত্তেজনা তুঙ্গে। স্বাভাবিক কারণেই আপ্লুত হলাম। ঠিক পরেই মীনাক্ষী বলল ওই উত্তেজনা রাজনৈতিক কারণে এবং পরের দিন সরকার ও পাহাড় উন্নয়ন পরিষদের নেতাদের মধ্যে সভাঘরে গণ্ডগোল বাঁধবে। সমর্থক আসবে দু’-পক্ষেরই। মীনাক্ষী বলল কমিশনের কাজে ওর গুয়াহাটি যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এই কারণে পিছিয়ে দিয়েছে। কলকাতা থেকে আগরতলায় গেলাম কবি ও অনুবাদক শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে। শরৎদার যাওয়া কবিতার বিশেষজ্ঞ হিসেবে। তিনি দেখবেন অনূদিত কবিতার সাহিত্যগুণ এবং অনুবাদের মান। প্রয়োজনীয় সংস্কারও করবেন। সে যাত্রায় সঙ্গী ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির সহকর্মী শান্তনু গঙ্গোপাধ্যায়ও।

আগরতলায় নেমে খবরের কাগজে দেখলাম আগের রাতে উগ্রপন্থী আক্রমণের বলি হয়েছেন ১২-১৩ জন মানুষ। বেশ একটা থমথমে ভাব। কর্মশালার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখি সভাঘর কানায়-কানায় ভর্তি। রয়েছেন বিকাশ রায় দেববর্মা, রবীন্দ্রকিশোর দেববর্মা, সরোজ চৌধুরীর মতো অনুবাদক এবং নরেন্দ্রচন্দ্র দেববর্মা ও নকুল দাসের মতো লেখক। আছেন মন্ত্রী অনিল সরকার ও জীতেন চৌধুরী। সেইসঙ্গে উপজাতি স্বশাসিত জেলা পরিষদের নেতারা। আসলে মহানগরের বাইরে জনজীবন ছোট বলে অনেক সময় রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরও সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুষ্ঠানে ডাকতে হয়। তাতে সুবিধে হয় নানা দিক দিয়ে, মাঝেমধ্যে অসুবিধেও হয়। যেমন সেদিনের ঘণ্টা দেড়েকের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে পারদ তুঙ্গে উঠেছিল, অথচ ভাষা-সাহিত্যের সঙ্গে তার যোগ সামান্যই। সেইসঙ্গে এটাও বোঝা গিয়েছিল কেন ককবরক-বাংলা অনুবাদের কর্মশালায় কোনও প্রতিষ্ঠান রাজি হয়নি। বোধহয় এই উত্তেজনা এড়াতে। দু’-পক্ষের এই দ্বন্দ্ব ও সংঘাত চলেছিল প্রায় ২০০৩-’০৪ সাল পর্যন্ত। তারপর দু’ পক্ষ অনেকটা সমঝোতায় আসে।

পাঁচ দিনের কর্মশালায় যা তৈরি হল তা নিয়ে ২০০৩ সালে চন্দ্রকান্ত মুড়াসিংয়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘ককবরক লোকসংগীত ও কবিতা’ নামে একটি বই। তাতে রয়েছে এমনই এক অপূর্ব প্রাচীন গীত–

উঁচু ডাল থেকে তুলেছিলাম ফুল
আঙুল-ছাপ রয়েছে এখনো
তুমি ও আমি হেঁটেছিলাম পথ
রয়েছে এখনো পায়ের চিহ্ন।

আছে আশি-নব্বইয়ের রক্তাক্ত দিনগুলোর কথাও–

মানুষের কথা বলতে গিয়ে
আজ আমি বড় বেশি রক্তপাতের
কথা বলি
মনের মানচিত্র ভিজে যায় রক্তস্রোতে। (সুধন্য ত্রিপুরা)

কিংবা স্নেহময় রায়চৌধুরীর কবিতায়–

গুলির শব্দে অশান্তি বাতাসে
আতঙ্কে পালিয়ে গেছে জুমের লক্ষ্মী
এখন অভাবে অনাচারে
তোমার স্বপ্নের দেশে
আর বাসন্তী হাওয়া নেই।

গত বিশ বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে।‌ অনেকেই চলে গেছেন। শরৎ মুখোপাধ্যায় নেই, মীনাক্ষী সেন নেই, এমনকী বয়েসে সামান্য ছোট চন্দ্রকান্ত মুড়াসিং‌ও জীবনের মঞ্চ ছেড়ে চলে গেছেন। এখন ককবরক ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে পড়াশোনা ও গবেষণা হয়। ত্রিপুরা, প্রেসিডেন্সি ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চন্দ্রকান্তের কবিতা পড়ানো হয়। চন্দ্রকান্তের আগরতলার বাড়িতে বেশ কয়েকবার গেছি। ফলে চন্দ্রকান্তর ছেলে লিঙ্কনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। লিঙ্কন ইংরেজিতে কবিতা লেখে আর একটি কবিতার বই বছর দুই আগে প্রকাশ করেছে। লিঙ্কনের ইচ্ছেয় ভূমিকা আমিই লিখে দিয়েছি। মাস তিনেক আগে চন্দ্রকান্তের ব্যবহার করা জিনিসপত্র, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া মানপত্র ও স্মারক, চন্দ্রকান্তর লেখা ও অনুবাদ করা নানা ব‌ই ইত্যাদি নিয়ে ককবরক মানুষজন একটি সংগ্রহশালা তৈরি করেছেন। সেখানে আছে চন্দ্রকান্তের করা ‘গীতাঞ্জলি’-র সম্পূর্ণ ককবরক অনুবাদ। বিশ্বভারতী প্রকাশ করেছিল। আছে স্বরলিপি-সহ বেশ কিছু রবীন্দ্রসংগীতের অনুবাদের ব‌ইটিও।

আপাতত শান্তি কল্যাণ হয়ে থাকলেও, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং ভারতের অন্যান্য অংশে সংঘাত ও সংহার যে কোনও সময়ে শুরু হতে পারে। তাই নানা জাতিগোষ্ঠী এবং তাঁদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে আন্তরিক বিনিময়ে থাকা জরুরি। সংহতির প্রথম শর্তই হল সঙ্গে থাকা।

…………… মুখুজ্জের লিটফেস্ট-এর অন্যান্য পর্ব ……………

পর্ব ৫। অশান্ত মণিপুর ও এক বোহেমিয়ান কবি

পর্ব ৪। সাহিত্যের মণি-সন্ধান

পর্ব ৩। আমৃত্যু যৌবন-যাপন করে গিয়েছেন যে লেখক

পর্ব ২। মাজুলি দ্বীপ ও তার তিন বাসিন্দা

পর্ব ১। রাজা নয়, টুনটুনির গল্প

Chandrakanta Murasingh Kakbarak Bengali translation Kakbarak Sahitya Academy Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar tripura

Share this article on