manipuri literature and attending a lit fest in kakching by Ramkumar Mukhopadhyay
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

সাহিত্যের মণি-সন্ধান

ফেরার পথে কাকচিং বাজারে ঢুকব ভেবেছিলাম, কিন্তু দেখি আধাসামরিক বাহিনী আর পুলিশে ছয়লাপ। বুঝলাম কিছু একটা ঘটেছে। ফিরে এলাম ইয়াইমার বাড়িতে। ওঁর স্ত্রী আবার ছেলের কথা বলতে লাগলেন। আমাকে নিজেকেও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্যে গ্রাম ছেড়ে আসতে হয়েছিল। তখন মা খুব চিন্তায় থাকত। সেকথা মনে পড়ায় আমি ইংরেজিতে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম। জয়চন্দ্র সিং মণিপুরীতে অনুবাদ করে দিচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখি মহিলার চোখ থেকে জল পড়ছে।

Published by: Robbar Digital

Posted:May 31, 2026 4:15 pm | Updated:June 1, 2026 1:09 pm  
Facebook WhatsApp Messenger
manipuri literature and attending a lit fest in kakching by Ramkumar Mukhopadhyay

৪.

২০০৭ সালের প্রথম দিকের কথা। গোটা তিন সভার কারণে মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের একটা হোটেলে উঠেছি। শুতে রাত হয়েছে। কলিংবেলের শব্দে ঘুম ভাঙল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সাড়ে সাতটা। শীতকালে এত সকালে কে এল ভেবে দরজা খুলি। দেখি, দরজায় দাঁড়িয়ে এক যুবক। এক মুখ হেসে বলে, ‘আমি বীরমঙ্গল। চিনতে পারছেন?’ ঘুম থেকে উঠলে আয়নাতে নিজেকেই চিনতে পারি না, আর বীরমঙ্গল! ভিতরে এসে বসতে বলি। তারপর মুখ-হাত ধুয়ে এসে হোটেলের রুম-সার্ভিসে ফোন করে চা দিতে বলি। চা খাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করি, ‘এত সকালে?’ বীরমঙ্গল বলল, ‘আপনি বেলায় ব‍্যস্ত হয়ে পড়বেন বলে ভোর সাড়ে পাঁচটার কাকচিংয়ে বাস ধরেছি।’

এতক্ষণে মনে পড়ল ইম্ফলের একটা অনুষ্ঠানে বীরমঙ্গলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ইম্ফল থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে কাকচিংয়ে থাকে। রাস্তা অনেক জায়গায় সরু আর ভাঙাচোরা বলে যেতে-আসতে সময় লাগে। বীরমঙ্গল চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, আগেরবার যখন দেখা হয়েছিল কাকচিংয়ে সাহিত্য অকাদেমির একটা অনুষ্ঠান করব বলে কথা দিয়েছিলাম। বীরমঙ্গল সকালবেলায় দিন ঠিক করতে এসেছে। অনেক কিছুতেই মাথা নাড়ি, কিন্তু সেটা যে কথা দেওয়া নয়– তা বীরমঙ্গলকে বোঝাব কেমন করে? কিন্তু যে যুবক দেড় ঘণ্টা বাসে চড়ে দিন ঠিক করতে এসেছে, তাকে ফেরানোর সাধ‍্যি কার? ওঠার সময় বীরভদ্র বলল, কাকচিং থেকে মায়ানমার সীমান্ত ৪০-৫০ কিলোমিটার। সেখানেও অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করবে। মায়ানমারের আইন-শৃঙ্খলার অবস্থা ঠিকঠাক থাকলে, মায়ানমারে ঢুকে বেশ কিছুটা ঘুরে আসা যাবে। বীরমঙ্গলকে ওঠার আগে ডিম-পাউরুটি খাওয়ালাম।

এর কয়েকদিন পরে কাকচিং থেকে রাজেন্দ্র সিং নামে একজন যুবক কলকাতা দফতরে একটি চিঠি পাঠাল। কাকচিংয়ে আগে কোনওদিন সাহিত্য অকাদেমির অনুষ্ঠান হয়নি, তাই তাদের প্রতিষ্ঠানও একটি সাহিত্যসভা করতে চায়। রাজেন্দ্রকে মনে পড়ল। ছিপছিপে চেহারা, বয়স বছর ৩৫। একবার ইম্ফলের অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছিল। রাজেন্দ্রর সঙ্গে ছিলেন বছর ৫০-৫৫-র সত‍্য সিং। মণিপুরের সবচেয়ে বড় কাঠের আসবাবের কারখানা ওঁর। প্রায় নিরক্ষর কিন্তু সাহিত‍্যগত প্রাণ।

zoom
কাকচিং

মার্চ মাসের মাঝামাঝি কাকচিংয়ে দু’টি অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা হল। সীমান্ত শহর মোরেহ্-তে অনুষ্ঠান করা গেল না, কারণ মায়ানমারের সেনাবাহিনী ঢুকে প্রায় দু’-আড়াইশো লোকজনকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। বীরমঙ্গল বিলাপ করতে লাগল যে মোরহ্-তে নিয়ে যেতে পারল না। ওকে বোঝালাম, লোকজন তুলে নিয়ে যাওয়ার দিন ওখানে থাকলে ৫-১০ দিনের আগে ছাড়া পেতাম না। বীরেন্দ্র একজনের কথা বলল, যার নামে মায়ানমার সীমান্তের বাঘ আর গরু এক ঘাটে জল খায়! সেই না কি আমাদের দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছিল। এরপর আর তর্ক চলে না।

অনুষ্ঠানের দিন সকাল আটটা নাগাদ খবর পেলাম কাকচিং থেকে লোকজন নিতে এসেছে। নিতে আসার দরকার ছিল না, কারণ আমাদের সঙ্গে গাড়ি ছিল, আর সঙ্গী ছিলেন অকাদেমির মণিপুরী পরামর্শদাতা সমিতির আহ্বায়ক এবং মণিপুরের জওহরলাল নেহরু ডান্স অকাদেমির অধিকর্তা জয়চন্দ্র সিং। বয়স আমারই কাছাকাছি। তিনিও হোটেলে আমার ঘরে এলেন। হোটেলের তিনতলা থেকে নেমে বেরনোর মুখে দেখি চারটে গাড়িতে করে প্রায় ১৩-১৪ জন নিতে এসেছেন। এ একেবারে কনভয়! ব‍্যবসা-বাণিজ‍্যের শহর হিসেবে কাকচিংয়ের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো বলে জানি, কিন্তু এতখানি বৈভব বলে আশা করিনি। আমাদের গাড়ির সামনে দুটো গাড়ি আর পিছনে দুটো। নিজেকে ভিআইপি বলে মনে হচ্ছিল। গাড়ির সারি এগিয়ে চলে। শহর ছেড়ে যেতেই নীল পাহাড় আর লম্বা গাছের শ্রেণি চোখে পড়ে। মণিপুর উপত্যকার ৭০ ভাগ হল বনাঞ্চল। ফলে অজস্র গাছপালা, লতাগুল্ম, পাখি আর প্রজাপতি। মাঝেমাঝে গঞ্জ চোখে পড়ে। মেয়েরা স্তূপ করে রাখা লঙ্কা, আলু-বেগুন, কাপড় ও শুঁটকি মাছ বিক্রি করছে। দোকানে চিনা ও কোরিয়ান খেলনা, ছাতা, মশারি ইত্যাদি দেখা যাচ্ছে। কোথাও মন্দির, কোথাও আবার মণ্ডপ চোখে পড়ে। মণিপুরের মণ্ডপে সাহিত‍্যসভা, বিয়ের অনুষ্ঠান, কীর্তন থেকে রণনৃত‍্য পর্যন্ত হয়।

রাস্তার পাশে একটা মুসলমান গ্রাম চোখে পড়ল। শুনলাম মণিপুরে মুসলমান ধর্মের মানুষেরা ‘মেইতেই-পঙ্গল’ নামে পরিচিত। এই ‘পঙ্গল’ শব্দটা ‘বঙ্গাল’ বা ‘বেঙ্গল’ শব্দের পরিবর্তিত রূপ বলে কেউ কেউ মনে করেন। এর কারণ এঁদের অধিকাংশই অনেককাল আগে বঙ্গদেশ থেকে মণিপুরে যান ব‍্যবসা কিংবা যুদ্ধের মতো কাজে। এই মুসলমানেরা মণিপুরী মেয়েদের বিয়ে করেন। এই মেয়েদের কেউ কেউ বাড়িতে এখনও মণিপুরী লোকাচার পালন করেন বলে শোনা যায়।

সে গ্রাম ছেড়ে দু’ পাশে ফাঁকা মাঠ দেখতে পেলাম। ধান কাটার পরে জমি রোদ খাচ্ছে। নতুন ফসল কিছুদিন পরে রোওয়া হবে। যেতে যেতে এক সময় কাকচিং শহরে পোঁছে গেলাম। শহরে লোকজনের সংখ্যা ভালোই বলে মনে হল। দোকানগুলো বেশ জমজমাট। চারপাশের গ্রাম ও গঞ্জের ব‍্যবসাদারেরা এখানে নিশ্চয়ই কেনাকাটা করতে আসে। পাইকারি ব‍্যবসা ভালোই হয়। আর খানিক এগিয়েই সত‍্য সিংয়ের কাঠের গোলা ও আসবাবের কারখানা। শ’ দুয়েক খাট, শ’ খানেক আলমারি আর অসংখ্য চেয়ার ও টেবিল রাখা আছে। শুনলাম উত্তর-পূর্বের অন‍্যান‍্য রাজ্যেও এসব আসবাব পাঠানো হয়। ৬০ জন মিস্ত্রি কাজ করেন।

কাঠের তৈরি বাড়ির দোতলায় অফিসঘর ও অতিথিনিবাস, আর তিনতলায় ১০০ জন মানুষ বসার মতো একটা সুন্দর কাঠের সভাঘর। এটি সত‍্য সিং তৈরি করেছেন সাহিত‍্যের প্রতি ভালোবাসায়। যদিও নিজে লেখেন না এবং মঞ্চেও ওঠেন না। শুনলাম একজন সাধারণ কর্মী থেকে সত‍্য সিং এখানে পৌঁছেছেন শ্রম ও সততার জোরে। তাঁর এই উত্থানে বড় ভূমিকা ছিল রাজেন্দ্রর বাবার, এই অঞ্চলের এক সময়ের কমিউনিস্ট নেতা। বিধানসভার সদস্যও ছিলেন। সভাঘরে কবিতা ও গল্পপাঠ আর আলোচনা চলল ঘণ্টাদুয়েক ধরে। তারপর নিরামিষ ও আমিষ নানা পদ-সহ শতাধিক মানুষের মধ‍্যাহ্ন ভোজন। তরকারিতে মশলা কম, কিন্তু কড়া ঝাল দেওয়া দেশি মুরগির মাংস আর কালো চালের পায়েস খেতে বেশ ভালো লাগল।

দুপুরের খাওয়ার পরে পাড়ার গায়ের একটা মঞ্চে অনুষ্ঠান শুরু হল। এটি বীরমঙ্গলের উদ‍্যোগে। গান দিয়ে সূচনা। প্রায় ২০ জন কবিতা পড়লেন। গল্প ও নাটকের অংশবিশেষও পড়া হল। সে সাহিত্যের অন্যতম বিষয় তখন মণিপুরে ঘটে চলা রক্তক্ষয়ী ঘটনা ও মৃত্যু। সন্ধে নামলে গুলিগালার শব্দ আর আধাসামরিক বাহিনীর ভারী গাড়ির সশব্দ যাতায়াত তখন মণিপুরের মানুষের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। প্রায় ১৬টি রাজনৈতিক গোষ্ঠী মণিপুরে গোপন আস্তানা থেকে কাজ করছিল। মাইনের দিনে প্রায় ২০ শতাংশ টাকা তাদের হাতে তুলে দিতে হত। অন্যদিকে আধাসামরিক বাহিনী সন্দেহের বশে মাঝরাতে বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে তল্লাশি চালাতেন। সে এক ভয়ানক অভিজ্ঞতা বলে বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক কুঞ্জমোহন সিং তাঁর বাড়িতে বসে আমাকে একবার শুনিয়েছিলেন। অন‍্যদিকে আর এক অধ্যাপক বলেছিলেন যে, তিনি বাড়িতে বাইরের প্রাচীর দেননি– যাতে জঙ্গি সংগঠনের লোকজন লুকিয়ে থাকলে পুলিশের লোকজন সহজে ঢুকতে পারেন।

zoom
অশান্ত মণিপুরের পথঘাট

অনুষ্ঠান শেষ হতে প্রায় সন্ধে। হোটেলে যাব বলে সব ঠিক, হঠাৎ পাঁচ-সাতজন মিলে আলাদাভাবে কিছু একটা আলোচনা করলেন। ফোনেও কীসব কথাবার্তা হল। শেষে আমাকে বললেন যে হোটেল নয়, থাকার ব্যবস্থা হয়েছে কাকচিংয়ের কাপড় ব‍্যবসায়ী ইয়াইমা সিংয়ের বাড়িতে। শুনলাম আরামে থাকা যাবে, আর নিরাপত্তাও বেশি। বেশ কয়েক বছর হস্টেলে থাকার ফলে, কোথাও গেলে কারও বাড়ির চেয়ে হোটেল বা গেস্ট-হাউস আমার বেশি পছন্দের; কিন্তু পরিস্থিতি বিশেষে কিছু জিনিস মেনে নিতে হয়।

ইয়াইমা সিংয়ের বাড়িটি দোতলা আর বার্মা টিকের আসবাব দিয়ে সাজানো। চায়ের কাপ থেকে জলের পাত্র সবই বেশ সযত্নে নির্বাচন করা। ছোট সংসার, স্বামী-স্ত্রী আর এক ছেলে ও এক মেয়ে। দম্পতির দু’জনেরই বয়েস চারের কোঠায়। মেয়ের বিয়ে হয়েছে মণিপুরেই আর ছেলে বিয়ের পর দিল্লিতে এমএ পড়তে গেছে। বউ শাশুড়ির কাছে আছে। উত্তর-পূর্ব ভারতে সশস্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হওয়ার পর অনেক মধ‍্য ও উচ্চবিত্ত পরিবার ছেলেদের রামকৃষ্ণ মিশনের পুরুলিয়া, নরেন্দ্রপুর, দেওঘর, সেন্ট জেভিয়ার্স ইত্যাদি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিত। ছেলে ও মেয়েরা বড় হলে উচ্চশিক্ষার জন্যে দিল্লি, হায়দ্রাবাদ, চেন্নাইয়ে চলে যেত। ইয়াইমা এক সময়ে লেখালেখি করতেন, এখন কয়েকটি সাহিত্য প্রতিষ্ঠানকে নানাভাবে সাহায্য করেন। পরিবারটির সঙ্গে জয়চন্দ্রের পুরনো সম্পর্ক, আর তা বেশ আন্তরিক। আমাদের আড্ডায় একটু পরেই ইয়াইমার স্ত্রীও এসে যোগ দিলেন। আমি মাঝেমাঝে দিল্লি যাই শুনে ছেলের দিল্লিবাসের নানা অভিজ্ঞতার কথা বোঝাচ্ছিলেন। ভাষা-দূরত্ব অনেকটাই দু’ হাত নেড়ে, গলা তুলে ও নামিয়ে আর চোখ ছোট-বড় করে কমিয়ে দিচ্ছিলেন। বাকিটুকু জয়চন্দ্র অনুবাদ করে দিচ্ছিলেন। মাতৃতান্ত্রিক মণিপুরী সমাজের মেয়েরা কথাবার্তায় অনেক সাবলীল ও স্বচ্ছন্দ।

শুয়োরের মাংস, মুরগির মাংস, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পানীয় সমেত রাতের খাবার খাওয়া হল। দোতলায় শুতে গিয়ে ছাদে উঠলাম। দেখি সামনের মাঠে চাঁদের আলোর বান ডেকেছে। বাড়ির বাঁ-দিকে ঘন কলাবাগান। ডানদিকে বাঁশবন। জোনাকির ঝাঁক সেখানে মহানন্দে নৃত্য করছে। বাড়ির অবস্থান দেখে মনে হল, শহর ছেড়ে একটা পাড়ার প্রান্তে বাস গড়া হয়েছে, প্রাকৃতিক পরিবেশের কাছাকাছি থাকতে।

পরের দিন সকালে তিনটে গাড়ি ও জনা বারো যুবককে সঙ্গে নিয়ে সত‍্য সিং এলেন। আমাদের নিয়ে গেলেন মাইল দুয়েক দূরে পাহাড়ের পাদদেশে। সেখানে গিয়ে দেখি দুটো ট্রাক্টর পাশাপাশি চলার মতো চওড়া মাটির রাস্তার দু’ পাশে জমির পর জমি আলুর চাষ হয়েছে। ওঁরা বললেন শত শত একর জুড়ে এখানে আগে ছিল জলাভূমি। রাজেন্দ্রর বাবা পাহাড় থেকে নেমে আসা জল একটা গভীর খাল কাটিয়ে বের করা ও জলাজমি মাটি ফেলিয়ে উঁচু করার ব‍্যবস্থা করেন। ফলে দিগন্তবিস্তৃত মাঠে চাষাবাদ শুরু হয় ও এ অঞ্চলের কৃষি-অর্থনীতি বদলে যায়। আমি যখন চোখের সামনে এই দৃশ‍্য দেখছি, তার তিনদিন আগে পুলিশের গুলিতে পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রামের ১৪ জন চাষি মারা গেছেন।

zoom
ইম্ফলে আলুচাষ

ফেরার পথে কাকচিং বাজারে ঢুকব ভেবেছিলাম, কিন্তু দেখি আধাসামরিক বাহিনী আর পুলিশে ছয়লাপ। বুঝলাম কিছু একটা ঘটেছে। ফিরে এলাম ইয়াইমার বাড়িতে। ওঁর স্ত্রী আবার ছেলের কথা বলতে লাগলেন। আমাকে নিজেকেও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্যে গ্রাম ছেড়ে আসতে হয়েছিল। তখন মা খুব চিন্তায় থাকত। সেকথা মনে পড়ায় আমি ইংরেজিতে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম। জয়চন্দ্র সিং মণিপুরীতে অনুবাদ করে দিচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখি মহিলার চোখ থেকে জল পড়ছে। আমি থতমত খেয়ে গেলাম। ভাবলাম আমার কোনও কথায় আঘাত পাননি তো? জয়চন্দ্র মহিলার কান্না জড়ানো কথা শুনে বললেন, কান্নার কারণ হল– ইংরেজি না-জানার কারণে আমার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারছেন না। তবে মহিলা চোখ মোছার সময় বললেন যে, পরেরবার আমি কাকচিংয়ে আসার আগে ইংরেজি শিখে ফেলবেন। আর যাওয়া হয়নি কাকচিং। আমি নিজেও মণিপুরী ভাষার বর্ণমালা আর ব‍্যবহারিক শব্দ ও বাক্য শিখতে শুরু করেছিলাম, কিন্তু শেষ করতে পারিনি।

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর সামান্য ঘোরাঘুরি করে ইম্ফল রওনা হওয়া। আগের দিনের মতোই আবার সামনে দুটো গাড়ি আর পিছনে দুটো। সঙ্গে ১৩-১৪ জন যুবক। সন্ধের মুখে ইম্ফলে পৌঁছে গেলাম। ওঁরা কাকচিংয়ে ফিরে গেলেন। জয়চন্দ্র সিংকে নিয়ে আমি হোটেলের ঘরে গেলাম। হাউস-কিপিংকে চা পাঠাতে বললাম। জয়চন্দ্র বন্ধু-মানুষ। এবার রাতে হোটেলে না-যাওয়ার কারণ বললেন। আমাদের যে হোটেলে থাকার কথা সেখানে আগের দিন বিকেলে কোনও একটা আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপের চারজন সদস‍্য রাতে থাকার জন্যে ঢুকেছিল। তখন কিডন্যাপিং করে পণ চাওয়ার ঘটনা বেশ ঘটছিল। তাই হোটেলের লোকজন সেই গোপন খবরটি আগাম বীরমঙ্গল আর রাজেন্দ্রকে জানিয়ে দেয়। পুলিশ ও আধিকারিক বাহিনী ভোররাতে খবরটা পেয়ে হোটেল-সমেত বাজার এলাকা ঘিরে ফেলেন। পরের দিন তাঁদেরই বাজারে দেখি।

আমি জয়চন্দ্র সিংকে প্রশ্ন করি– তা হলে ইয়াইমার বাড়িতে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেল কেমন করে? শুনলাম, ইয়াইমা স্থানীয় মানুষ আর বড় ব‍্যবসায়ী। ফলে তাঁর লোকজন রাতে বাড়ির চারপাশে চোখ রেখেছিল। যারা চোখ রেখেছিল, তারা ছোট উগ্র গোষ্ঠীর চেয়ে ঢের শক্তিশালী। পথেও গাড়ি আটকানোর ভয় ছিল। তাই আগে ও পিছনে দু’টি করে চারটি গাড়ি। সবাই যন্ত্রপাতি সঙ্গে নিয়ে তৈরি হয়েই এসেছিলেন।

বুঝলাম, ‘কনভয়’ শব্দটির ভাবগত উৎস হলো ‘ভয়’।

…………… মুখুজ্জের লিটফেস্ট-এর অন্যান্য পর্ব ……………

পর্ব ৩। আমৃত্যু যৌবন-যাপন করে গিয়েছেন যে লেখক

পর্ব ২। মাজুলি দ্বীপ ও তার তিন বাসিন্দা

পর্ব ১। রাজা নয়, টুনটুনির গল্প

Imphal Kakching Literary Fest Manipur Manipuri literature Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on