

ইন্দ্রকান্তদা, ফণীদা, বিশ্বনাথবাবু, হেডস্যার সেই আশির দশকে ভাষা দিয়ে সেই কাজটাই করতেন, যা আমার জীবনে প্রথম শুরু করেছিল আমার মা– তা হল কল্পনার কারুকার্য। সেই কল্পনা মিথ্যে নয়, সেই কল্পনা বাস্তবের অভাবকে মায়া দিয়ে ঢেকে রাখে। এমনকী অনেকদিন আগের পাওয়া ভাঙা-স্বাধীনতা থেকে যদি মন উড়ে যায়, তাহলে আবার সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য সমুদ্রের অনেক ঢেউয়ের সামনে আমাদের দাঁড় করায়।
যে ইশকুলে পড়তাম সেই ইশকুলে ভাষার প্রতি গভীর যত্ন ছিল– বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, সংস্কৃত– এই চারটে ভাষার সুন্দর প্রকাশ দেখেছিলাম। ইন্দ্রকান্তদা হিন্দির মাস্টারমশাই, কী মিঠে নরম-ভঙ্গিতে হিন্দি বলতেন। বাংলার ফণীদা আর হিন্দির ইন্দ্রকান্তদা পাশাপাশি বসে। দু’জনেই ধুতি-পাঞ্জাবি। সামনে রবীন্দ্রজয়ন্তী। চারটি ভাষাতেই ছেলেরা মৌলিক লেখা পড়বে। তারই মহলা চলছে, লেখা পড়ে শোনাচ্ছে তারা। মাস্টারমশাইরা শুনছেন। উচ্চারণে অশুদ্ধি থাকলে শুধরে দিচ্ছেন। তার আগে লেখাগুলি দেখেছেন, বানান ভুল করলে ঠিক করে দিয়েছেন। ভাষা শিখতে হয়, ভাষা যে চর্চার বিষয় তা মাথায় আসতে আসতে ঢুকছে। রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত পুরুলিয়ার স্কুলটি কি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছিল?

রামকৃষ্ণ মিশনে ঢোকার আগে পড়তাম পুরুলিয়া জিলা স্কুলে। সেখানে বিশ্বনাথবাবু ছিলেন ইতিহাসের শিক্ষক। খুবই শান্ত, ছাত্রদের শাসন করতে পারতেন না। তাই তাঁকে ঘিরে ক্লাসে হই-হল্লার অবধি নেই। এই বিশ্বনাথবাবুকে অন্য চেহারায় পেয়েছিলাম এক স্বাধীনতা দিবসে। জিলা ইস্কুলের নতুন আসা হেডমাস্টারমশাই, নাম ভুলে গিয়েছি, একদিন স্কুলের ভরা-অ্যাসেম্বলিতে ‘জনগণ’ জাতীয় সংগীতের মাঝখানে থামিয়ে দিলেন আমাদের সবাইকে। ‘জল-ধিত-রঙ্গ’ এভাবেই তারস্বরে গান গাইতে অভ্যস্ত হয়েছিলাম, নতুন হেডস্যার বকলেন, বুঝিয়ে দিলেন ‘জলধি’ মানে কী। সেই জলধি-তরঙ্গ উচ্ছল হয়ে উঠেছে ‘তব শুভ নামে’। সেদিন আমাদের অ্যাসেম্বলিতে জাতীয় সংগীত দ্বিতীয়বার শুদ্ধ উচ্চারণে গীত হল। কয়েকদিন পর পনেরোই আগস্ট, স্বাধীনতা দিবস। বিশ্বনাথবাবু সেদিন সকালে আমাদের স্বাধীনতার গল্প বলেছিলেন। সেই বলার মধ্যে ছিল নমনীয় দীপ্তি। ক্লাসে আমাদের একেবারে সামলাতে পারতেন না, কিন্তু দেশের কথা বলতে গিয়ে কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গিয়েছিলেন। সেই বলার মধ্যে কারও প্রতি ক্রোধ ছিল না, কিন্তু দীপ্তি ছিল। সেই দীপ্তির কথা অনুষ্ঠান শেষে বোঁদে আর সেঁওভাজার ঠোঙা হাতে নিয়ে ভাবছিলাম। ‘নমনীয় দীপ্তি’ এই শব্দবন্ধ আমার এই বয়সের, কিন্তু সেই বয়সে শব্দটি তৈরি করতে না পারলেও ভাবটি টের পেয়েছিলাম।
আমরা জিলা স্কুলের মাঠে শুক্রবার টিফিনের পর ক্রিকেট খেলতাম। অমরবাবু আমাদের গেমস টিচার, আবার অঙ্ক শেখাতেন। তাঁর কাছ থেকে ব্যাট-বল-উইকেট নিতে হত। খবরের কাগজের খেলার পাতা আগাগোড়া পড়তাম। পুরুলিয়া শহরে টিভি দেখার উপায় তখন ছিল। আমাদের একটা মার্ফি রেডিও ছিল। সেই রেডিওর আঙুল-মুখে দেওয়া ছেলেটির ছবি খুব আপন-আপন লাগত। রেডিওতেই খেলা শোনা। ইংরেজিতে রিলে হত। বুঝতে পারতাম না, বাবা বুঝিয়ে দিত। তবে মূল কথাটুকু অর্থাৎ খেলার ফলাফল সেই টু-থ্রি-তেও বেতার-বাহিত ইংরেজিতে বোধগম্য। বিশেষত আউট বা বাউন্ডারি, ওভার-বাউন্ডারি হলে ধারাভাষ্যকার উত্তেজিত গলায় কথা বলতেন। খবরের কাগজে খেলার বিবরণে অবশ্য মন ভরে যেত। খেলার পাতার বাংলা পড়তে ভালো লাগে, অন্য পাতার বাংলার থেকে একটু যেন আলাদা। খবরের কাগজের পাতা থেকে ছবি কেটে খাতায় চিটিয়ে রাখতাম। কপিলদেব তখন আমাদের নয়নের মণি। ১৯৮৩ সালে লর্ডস-এ ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ভারত হারিয়ে দিয়েছে। কপিলদেবের হাতে ক্রিকেট বিশ্বকাপ। কাগজে কাগজে ছবি।

বাংলা ভাষা যে কেবল ইশকুল থেকে শিখতাম তা নয়। বাবার পিছু পিছু ছেলেবেলায় যে কত জায়গায় যেতাম। সংসারের হাট-বাজার, মুদির জিনিস, গম ভাঙানোর কল, রেশন দোকান। যখন যখন বাবা যেখানে যেত, আমিও সঙ্গ নিতাম। মুদির দোকান বড় আজব জায়গা। বাইরে অনেক লোক। এ এটা বলে তো সে সেটা। দোকানের ভেতর যারা– তারা জিনিস ঠোঙায় ভরছে, সরু সুতুলি দিয়ে ঠোঙা বাঁধছে, তারপর যাকে যেটা দেওয়ার দিয়ে দিচ্ছে। আমি জিনিস ঢালার পর খুব ঠোঙা পড়তাম। বাড়িতে যে কাগজ নেওয়া হত, ঠোঙা তো সেই কাগজেই সবসময় তৈরি হত না, ফলে ঠোঙায় অন্য কাগজের ভাষা পড়া হয়ে যেত। এক একটা কাগজের ভাষা এক এক রকম।
ইশকুলে যাওয়ার আগে আমার বাংলা শেখা মায়ের কাছে। বাংলা সত্যি-সত্যি আমার মাতৃভাষা। মায়ের কথা ছিল খুব গোছানো আর ছবির মতো। বিশেষত খেয়াল করেছিলাম, মা ভাষা দিয়ে আমাকে ভোলাত, অনেক অভাব দিত ঢেকে। ছোটবেলায় ভাত খেতে না চাইলে যেটুকু খেতে চাইছি না, সেই ভাতের অংশটি কয়েকটি গোল গোল গরাসে থালায় সাজিয়ে রাখত। এক একটা গোলের এক একটা নাম দিত। তারপর ‘কে খায়, কে খায়’ করে খাইয়ে দিত। একটু বড় হতেই দেখলাম, ভাষা দিয়ে ভুলিয়ে রাখার খেলা মা আরেকরকম ভাবে খেলছে। গরমকাল। বাবা হিমসাগর আম এনেছে। সেই সময় গরমকালে ‘লোড-শেডিং’ হত মারাত্মক। পুরুলিয়ার বিদ্যুতের জোগানদার সাঁওতাল ডিহি। সেখানে চুল্লি বসে যেত। পুরুলিয়ায় ‘লোডশেডিং’। দাদা কোথা থেকে শিখে এসেছিল সাহেবরা ‘লোডশেডিং’ বলে না ‘পাওয়ার কাট’ বলে। আমরা ‘L O N D O N’ লন্ডন খেলতাম। এভাবেই টেনে-টেনেই লন্ডন বলার দস্তুর, বলতে বলতে ছোটা, যার যেখানে বলা শেষ সে সেখানে থেমে যাবে। বলতে-বলতে যে সবার চেয়ে আগে ছুটে যেতে পেরেছে সে জিতে গেল। মা, বাবার আনা আম আমাদের মধ্যে ভাগ করে দিত। যখন বলতাম, ‘তুমি একটুও খেলে না?’, তখন মা আমের গল্প বলত। মায়েদের ছিল অনেক ক’টা আমবাগান। মায়ের ‘ঠামা’ সেই বাগান করেছিল। লোক ছিল বাগান দেখার। আম রাখা খাটের তলায়, টুকরি করে। সকালে ঠামা বেছে-বেছে পাকা আমগুলি কাটতে বসত। আম কাটা ছিল একটা পর্ব। যে আম বঁটিতে নিঃশব্দে কাটা যায় মোলায়েম ভাবে, সেই হল আসল হিমসাগর। কাটতে গিয়ে যদি আম বঁটিতে লেগে শব্দ করে তাহলে তার ‘হিমসাগরত্ব’ ভেজাল। মায়েদের গাছে ছিল ‘মধুগুলগুলি’। ছোট কিন্তু কী মিষ্টি কী মিষ্টি! আমের গল্পে মায়ের আম না-খাওয়ার কথা যেত হারিয়ে। আমরাও বাবার কেনা হিমসাগর খেয়ে ফেলতাম। কেবল আম খেতে খেতে বাবা ভুরুদু’টি কুঞ্চিত করে মায়ের গল্পে বিরক্ত হয়ে উঠত।
বাবার রুমালে বাঁধা মাস-মাইনেতে আমাদের সংসার চলত। মাসের শেষে টাকার টানাটানি। মা নানারকম নিরামিষ রান্না করত, কম পয়সার নিরামিষ ও কম পয়সার আমিষ। কম পয়সার আমিষ বলতে ডিমের অমলেটের মাখা-মাখা আলুহারা ঝোল। দুটো ডিম, চারটে তো বটেই, কখনও কখনও পেঁয়াজ আর ময়দার সাহচর্যে ছ’টা। অমলেট ভাজার আগে গ্লাসে ডিমদুটো ফেলে মা ফেটিয়ে নিত। পেঁয়াজ কাঁচা-লঙ্কা সহযোগে ফেটিয়ে নিতে নিতে বলত– ‘ডিম না ফেটালে অমলেট ফুলবে না। ফেটানোটাই আসল। সবাই পারে না। হাত ধরে যায় বলে পারে না। আমি পারি। ভাগ্যিস ভীম-ভবানীর মতো গতর পেয়েছি। নইলে সংসার চলত না। তোরা না খেতে পেয়ে ভেসে যেতিস।’ বলছে আর ফেটাচ্ছে, বলছে আর ফেটাচ্ছে। আমি চোখ গোল-গোল করে শুনছি। পুরো ডিম খেতে না-পাওয়ার দুঃখ আমার কোথায় যে হারিয়ে যাচ্ছে। আমি বাংলা ক্লাসে লিঙ্গ পড়েছি। স্ত্রী লিঙ্গ, পুং লিঙ্গ, ক্লীব লিঙ্গ। মা-ই পড়িয়েছে। সঙ্গে ছিন্ন-ভিন্ন একটা ইংরেজি গ্রামার বই থেকে জেন্ডার। আমি ভাবছি ‘ভীম-ভবানী’ কী লিঙ্গ! ভীম তো ছেলে আর ভবানী তো মেয়ে। মা তো স্ত্রী লিঙ্গ, বাবা তো পুং লিঙ্গ। মায়ের শক্তি ভীমের মতো, আবার ভবানীর মতো। ভাগ্যিস দু’জনের শক্তি পেয়েছিল, তাই এমন করে ডিম ফেটাতে পারল– তাই আমরা দুটো ডিমে ছ’টা ডিমের স্বাদ পেলাম। আমার মায়ের ভাষা যা নয় তাকে তাই করে দেখাতে পারত। সে মিথ্যে নয়, সত্য। সে রবীন্দ্রনাথের সেই কথাটার মতো, ‘সত্য বলবো, কিন্তু বানিয়ে বলবো।’

এই যে ইন্দ্রকান্তদা, ফণীদা, বিশ্বনাথবাবু, হেডস্যার সেই আশির দশকে ভাষা দিয়ে সেই কাজটাই করতেন, যা আমার জীবনে প্রথম শুরু করেছিল আমার মা– তা হল কল্পনার কারুকার্য। সেই কল্পনা মিথ্যে নয়, সেই কল্পনা বাস্তবের অভাবকে মায়া দিয়ে ঢেকে রাখে। এমনকী অনেকদিন আগের পাওয়া ভাঙা-স্বাধীনতা থেকে যদি মন উড়ে যায়, তাহলে আবার সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য সমুদ্রের অনেক ঢেউয়ের সামনে আমাদের দাঁড় করায়। ভাষা ঢেউয়ের মতো, উঠছে-পড়ছে-ভাঙছে আর ছড়িয়ে পড়ছে সাদা ফেনা। তা দেখার জন্য চাই থমকে বসে গল্প শোনার সময়। সেই ফেলা আসা আশিতে আমরা যারা বড় হচ্ছিলাম, তারা ভাষার সেই সময়টুকু দেখেছিলাম। দাঁড়ানোর জায়গা। সেই জায়গাতে আমাকে প্রথম পৌঁছে দিয়েছিল আমার মা, মাতৃভাষা। কাগজ দিয়ে বানানো নৌকা বর্ষার জল ভরা নালা বেয়ে একদিন না একদিন ঠিক সমুদ্রে পৌঁছে যাবে বলে ভাবতে শিখেছিলাম। ভুল শিখেছিলাম, ভুল তথ্য আমাদের বানানো সত্যের সম্ভাব্য সাগরে পৌঁছে দিত। সেখানে টুপ টুপ করে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ত মায়াময় শব্দের জলতরঙ্গ।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved