unpublished diary of hungry poet satindra bhowmik | Robbar
Robbar
  • ৩১ আশ্বিন ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ১৮ অক্টোবর ২০২৬

কমলকুমারকে না দেখলেই ভালো হত!

ডায়েরির নাম– আমার জার্নাল। শুরু হচ্ছে ১৯৬৩ সালে। সময়কাল ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত। আন্দোলনের প্রতি বীতশ্রদ্ধতা, কোথাও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, সে বন্ধু সন্দীপন, শৈলেশ্বর-শক্তি থেকে দেবেশ রায় এবং চেনা-অচেনা আরও অনেকেই। রয়েছে আত্মবিশ্লেষণ, আত্ম-অন্বেষণ থেকে আত্মসমালোচনা। সতীন্দ্র ভৌমিকের অপ্রকাশিত ডায়েরির কয়েকটি পাতা।

প্রতিকৃতি: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়। টীকা: দময়ন্তী দাশগুপ্ত। সৌজন্য: অভীক ভৌমিক

শেষ আপডেট: অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ১৫:৪৫   
Facebook WhatsApp Messenger
zoom

গতকল‌্য রাত্রিযোগে তোমার চিঠি পাইলাম। তোমার অপূর্ব লিপিকুশলতায় পরিতৃপ্ত হইলাম।

কেন জানি না আমার মনে হইতেছে তোমাকে কতদিন দেখি না। তোমাকে ছাড়িয়া আর থাকিতে পারা অসম্ভব হইয়া উঠিবে।

পরশ্বদিবসে শ্রীযুক্তবাবু কমলকুমার মজুমদার মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ হইল। পথে অপরিচিত অবস্থায় তিনি আলাপ করিতে আসিলে হয়তো আমি কথাই বলিতাম না। তিনি অতিমাত্রায় মদ‌্যপান করিয়া থাকেন। চেহারায় একটা তুমি কে বটেক ছাপ পুরামাত্রায় বহন করিয়া চলেন। কালো। স্বাস্থ‌্যবান। লাল চক্ষু। হঠাৎ দেখিলে মনে হয়, অদ‌্য শনিবার এবং ভদ্রলোক রেস খেলিয়া সর্বস্বান্ত হইয়া আসিলেন। কিংবা বলিতে পারো, তিনি মানুষের অচৈতন‌্য সমুদ্রে নিমগ্ন হইয়া আছেন। কিন্তু তাঁহার অন্তর্জলি যাত্রাই কাল হইল। কাজেই দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া আকৃষ্ট হইয়া তাঁহার আলাপ শুনিতে লাগিলাম। তিনি বিল্বমঙ্গলের বর্ণনা দিতেছিলেন। অর্থাৎ কলিকাতার বেশ‌্যাপল্লির বিভিন্ন মৌখিকচিত্র অঙ্কন করিতেছিলেন। আমরা দলবদ্ধ হইয়া তাহাই শুনিলাম। সঙ্গে ছিল সন্দীপন। শক্তি। উৎপল। সুভাষ এবং আরো অনেকে। ভদ্রলোক কথা শেষ করিয়া কথাশিল্পে গেলেন। আমি মনে মনে গালে হাত দিয়া ভাবিতে বসিলাম। ভদ্রলোককে না দেখিলেই ভাল হইত।

৭.১২.৬৩ ॥ দুপুর॥

zoom
zoom

জনৈক চিন্তিত পাঠক কর্তৃক প্রচারিত
অন্যের ছায়ারা নিজের দর্পণে

দীর্ঘকালপর এষণার দ্বিতীয় সংকলন পাইলাম। কৃত্তিবাস পড়িয়াছি সম্প্রতিও, অধুনা লিটল ম‌েগাজিনের ভিতর এগুলি অন‌্যতম। এষণা অগ্রহায়ণ সংখ‌্যা পড়িয়া যুগপৎ উল্লসিত এবং বিমূঢ় হইলাম। দুই পরস্পর বিপরীত স্রোতে আছাড় খাইলাম। মুদ্রণপ্রমাদবহুলতায় ফণিমনসার ফুল তুলিবার কথা স্মরণ হইল। কিছুদিন নাভিঃশ্বাস বহিবার পর অকস্মাৎ এই পত্রিকাগুলো বন্ধ হইয়া যাইবে এ কথাও ঠিক। তথাপি, এই শিশুদের বলিষ্ঠ হাত-পা-হৃৎপিণ্ড ও মগজের কথা অনেককাল মনে থাকিবে।

এষণা পড়িয়া কেন যে আমি বিপর্যস্ত হইয়া এমন কাণ্ড করিতে বসিলাম– বোধ হইতেছে, বাঙালী বলিয়াই। এই পত্রিকাতে অনেক বিপরীতধর্মী আলোচনা স্থান পাইয়াছে। ইহা সম্পাদকীয় গৌরব।

উৎপল বসুর গোলকিপারির জার্সিটা ভাল লাগিল। কিন্তু গোল বাঁচাইতে তিনি তেমন পারঙ্গম হন নাই। সমীর রায়চৌধুরীর ব‌্যাককিপিং আশাপ্রদ হয় নাই। বল ধরিবার চাইতে তিনি ছুটিয়াছেন বেশি। স্টপার শৈলেশ্বর ঘোষ মজাইয়াছেন! কবিদের ভিতর তিনি বহুক্ষণ দম ধরিয়া খেলিয়াছেন। কবিতা এক, সমালোচনা ভিন্ন আর। তিনি যদি ভাল স্টপার হইতে চান আর একটু কম অহঙ্কারী হউন। দুইহাতে তরবারি লইয়া যুদ্ধ দেখিতে কদাকার হয়। অন্তত যৌনব‌্যাপারে শ্রীঘোষ কিছুটা সংযত হইতে পারিতেন। কিন্তু, দুঃখের বিষয় তিনি গতবারের সংখ‌্যাতেও যৌনপ্রদর্শনীর টিকেট বিক্রয় করিয়াছেন। বস্তুত ইঁহাদের রচনাকে আদৌ কবিতা বলা যায় কি? ইঁহাদের কবি না বলিয়া প্রদর্শক [Exhibitionist] বলাই সমীচীন। হাফ ব‌্যাকে মলয় রায়চৌধুরীর চিৎকার কানে কর্কশ ঠেকিল। তিনি চিৎকার করিয়াই দম ফুরাইলেন, খেলিবেন কখন? সেন্টারহাফে সতীন্দ্র ভৌমিক দুই পায়েই খেলিয়াছেন। কিন্তু তেমন বল সাপলাই করিতে পারেন নাই। সংকোচ করিবার কারণ কি ছিল, যদি তিনি আর একটু বিশদ হইতেন? তিনি কি বন্ধুকৃত‌্য করিবার জন‌্যই দীপেন-সন্দীপন-শ‌্যামল-সুনীল-উৎপল-শক্তির নামগান করিলেন? গদ‌্যপ্রসঙ্গে কমলকুমার, দেবেশ মতির ধুয়া কি চলিত না? লেফ্ট উইং-এ সন্দীপন ডুবাইলেন। অত ফাউল করিলে বিপক্ষদলের ফ্রি-কিক ঠেকাইবে কে? সন্দীপনের কতিপয় মোসাহেব বন্ধু ছাড়া বাংলাদেশের তরুণ কবির দল ‘অচল’– এমন ধাষ্টামি সাহিত‌্যালোচনা নহে। সমস্ত বক্তব‌্যটাই সন্দীপনের বদহজমের ঢেকুর বলিয়া বোধ হইতেছে। অবশ‌্য শেষদিকে জীবনানন্দের প্রশস্তি গাহিয়া স্বয়ং নিজের অসুখের কবিরাজি চিকিৎসা করিয়াছেন!

বিশ্বনাথ বসুর চিঠি ছাপানো কি ঠিক হইয়াছে? অমন আক্রমণ অশোভন বলিয়া মনে হয়। শক্তিসুনীল দুইজনই হালবাংলার প্রতিষ্ঠিত কবি। দীর্ঘদিনযাবৎ লিখিতেছেন। [সন্দীপন উৎপলও অবশ‌্য] কাজেই গেঞ্জির নীচে তাঁহাদের যে-ক্ষত লুক্কায়িত রহিয়াছে তাহা টানিয়া নগ্ন করিয়া জনসাধারণকে দেখাইবার কি ছিল? ওদিকে শ্রী সুশীল রায় ধ্রুপদীতে সুনীলকে একহাত লইলেন! বসুমতীতে শ্রীসতীন্দ্র ভৌমিকের ‘গণপতিদা’ও তো সুনীল, নাকি সন্দীপন স্বয়ং? অবশ‌্য শক্তিও হইতে পারেন। ধ্রুপদীতে সুশীল রায় বিশ্বেশ্বর সামন্ত, পরিচয়ে দেবেশ রায় হাংরিদের চুলকাইয়াছেন আবার হাংরিরাও পরস্পর চোখ মটকাইতেছেন– ব‌্যাপারটা বুঝিতে পারিতেছি না। নাকি, এঁরা এক নামবলিতেই বৃহস্পতি শুক্র ও রবিবার সারিতেছেন?

গোলাপী লেখক সুভাষ ঘোষের ভাষার আড়ষ্টতার জন‌্যই অমন একটা গল্প মার খাইল। নিজের মোটরে স্বয়ং চাপা পড়িবার মতো সহানুভূতিশূন‌্য করুণতা আর নাই। দেবী রায় সন্দীপনের ছায়া ধরিয়াছেন– তাহাও পিছন দিক হইতে।

কাঁচামাল কারখানায় গিয়াছে– তৈরি হইলেই কৃত্তিবাস ও সম্প্রতির উপর আলোচনা প্রকাশিত হইবে।

zoom
zoom

প্রচারিত॥ প্রথম সপ্তাহ, জানুয়ারি, ১৯৬৪

সকল প্রাপ্তিগণ হতচকিত। সুশীল রায়: কে করেছে জানো সতীন্দ্র? সুভাষ-শৈলেশ প্রতিছত্রের নবতম ব‌্যাখ‌্যানে মশগুল। এমন হেডিং অভূতপূর্ব শোনে নি কখনো। সমগ্র বাংলাদেশে কী ঘটছে এষণা কী করলো সাহিত‌্যজগতে গল্পসংকলন এমন জোরদার করতে হবে নামখোদাই কদম বাড়াবে। প্রথম রাত্রির নির্ঘুম শৈলেশ সুভাষের বিস্মিত প্রশ্ন আমার অনুত্তেজনার কারণ কী।

বীরুদা বললেন, এত জোলো জ্ঞানী ওরা, গভীরতা মাপতে ডিঙি ডুব।

আমি নিরুত্তরে সর্বত্রই শুধু হাসির ভূমিকায় ড্রপ ফেলছি।

zoom

১০ জানুআরি
১৯৬৪

অশোক চট্টোপাধ‌্যায় বলল, আমাদের বন্ধুরাই কেউ এ কীর্তি করেছে। আমাদের এখন খুঁজে বের করতে হবে সেই দস‌্যুমোহনকে। সুভাষ বলল, খুঁজুন তো!

২১.১.৬৪

zoom

স্মৃতি নাকি চাকা

১৬ জানুআরি,
১৯৬৪

মনে মনে তোমার একটা তারবার্তা আশা করেছিলাম। কোলকাতায় যে তাণ্ডব চলছে তার জন‌্য উদ্‌বিগ্ন হয়ে হয়তো তুমি টেলি করতেও পারো– এমন ভাবছিলাম। এমন অবস্থায়, আমি নিশ্চয় টেলিগ্রাম পাঠাতাম। কিন্তু আমার এতটা আশা করবার কোনো মানে হয় না। কেননা, কাগজ কিংবা রেডিও কোনোটাতেই কোলকাতার ছবি হুবহু বর্ণিত হচ্ছে না। অত দূর থেকে এতদূরের…

অতকথার কাজ কি– মনটা বড় ডুকরে ডুকরে উঠছে। এভাবে পারা যায় না। পারা উচিতও নয়। প্রতিদিন মনে হয় ক্লান্তপদে বাড়ি ফিরে আরও ক্লান্তি বাড়িয়ে লাভ কি?

শৈলেশ্বর ঘোষ রণজিৎ বিশ্বাস আপিসে এসেছিল। এদের আর সহ‌্য করতে পারছি নে আজকাল। না সুভাষ না শৈলেশ। বড়ো চপল বুদ্ধিহীন অহংকারী। সমীর রায়চৌধুরী লিখেছেন চিঠিতে, শৈলেশের মতো কবি তিনি এযাবৎকাল দেখেন নি। অমন কবিতা তার আজন্মকাল মনে থাকবে। অবশ‌্য অন‌্য সমালোচক আবার শৈলেশকে exhibitionist বলে ব‌্যঙ্গ করেছেন!

zoom

আসলে শৈলেশ কোনোদিনই কবিতা লিখতে পারবে কি না সন্দেহ। অত মাথাঘামানো নগ্নতা কখনো কাব‌্যসৌন্দর্য হয় না। কবিতা শুধুমাত্র বুদ্ধিজাত হতেই পারে না।

সম্প্রতিতে আমার গদ‌্যরচনাটি বেরুলেই হাংরিদের সঙ্গে সরাসরি গোলযোগ সুরু হবে। জানিনা, অশোক চট্টোপাধ‌্যায় ছাপবেন কি না! বাংলাদেশে একটা কাগজ নেই যে চুটিয়ে লিখব! লিটল ম‌্যাগাজিনে আর কতদূর কি করা যায়। একশ পাঠকের বেশি খদ্দের নেই। সব তো ফ্রি ডিস্‌ট্রিবিউশন!

পরিচয় এবং চতুষ্কোণে গল্প দুটো ছাপা হলে বোঝা যেত পাঠকরা কি চায়! সিদ্ধেশ্বর তো প্রতিদিনই হাসেন গল্প করেন আর মুখ‌ কাঁচুমাচু করে বলেন– না এখনো পড়া হয়নি! কবে যে পড়া হবে, কে জানে? নাকি এর পিছনেও কোনো রাজনীতিক প‌্যাঁচ আছে?

আমার ইচ্ছে একটা মজার সিরিঅস উপন‌্যাস লিখব। তারপর দেখব, লেখা না চাইতেও ছাপতে দেয়!

রাত্রি

zoom

হৃৎপিন্ডের রং ভাববো এবং গাছের ধর্ম সবুজ ভুলে গিয়ে সেই রাতেই গাছের পাতা আঁকব।

বীরুদা বললেন, তবু আমি বলব, আগে আঁকার গ্রামারটা শিখে নিই তারপর গ্রামার ভুলব।

কিন্তু আমার ছবি আঁকা হবিমাত্র, পেশা নয়। গল্প লেখা পেশা নয় জীবন। কাজেই গল্প না লিখে থাকতে পারি না। কিন্তু ছবি না আঁকলে ভাল লাগে না। মনটা খুঁৎ খুঁৎ করে এ ক্ষেত্রে কেন আমি গ্রামার শিখে সময় নষ্ট করব। যা খুশি আঁকলেই যেখানে আমি তৃপ্ত থাকছি, কি বলেন।

এই ধরনের নানারকম আলোচনা আমাদের চলছে। আমি এখন মুক্ত গাছের মতো। প্রতিরক্ষার ঘেরাটোপ ছিটকে ফেলে দিয়েছি। এষণা, H.g. শৈলেশ সুভাষ এবং পৃথিবীর সমস্ত উজবকগোষ্ঠীর হাত থেকে আমি রেহাই পেয়েছি। আ. থাকলে নিশ্চয় আমি নাচতাম। চিৎকার করে গান গাইতাম, আমি যা ভাবব তাই আমি লিখব আঁকব– কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না।

[কিন্তু মশা আটকাতে পারবে বলে মনে হচ্ছে, এত রক্ত খাচ্ছে যে আর টেবিলে বসেই থাকতে পারছি নে।]

কোলকাতার কাগজগুলোর সম্পাদক প্রায় সকলেই Dull. প্রতিষ্ঠিত কাগজের সম্পাদকগুলো শুধুমাত্র বেতনভুক মাকালফল। না বোঝে গল্পের টেকনিক না বোঝে expression। সস্তাদরে প্রেমের ন‌্যাকামিগুলো ছেপেই ওরা সাহিত‌্যিকের মর্যাদা এবং পরমায়ু রক্ষা করতে চায়। আমাদের দেশের পাবলিশারগুলোও হাতীর মতো স্থূল। কেউই পাঠক তৈরি করতে চায় না। পাঠকদের দ্বারাই পাবলিশার নিয়ন্ত্রিত হয়। এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার প্রতিফলন কেমন করে সম্ভব।

অমৃতে আজ গল্পটা [ভুলসিঁড়ি] এক মাকালফলের হাতে দিয়ে এলাম। হয়তো না পড়েই ফেরৎ দেবেনা। অবশ‌্য ভদ্র হলে। নতুবা ওয়েস্টপেপার বাস্কেটে।

প্রসাদ বলল, নারায়ণ গাঙ্গুলি কিন্তু অনেক পড়েন। ওঁর লেখায় তাই ধার আছে।

‘ছিল এখন নেই।’–বীরুদা বললেন।

‘দেখলাম যতদিন রাজনীতির সঙ্গে এঁরা যুক্ত ছিলেন ভাল গল্প লিখতেন, তারপরই গেঁজিয়ে গেলেন। যেমন সমরেশ বসু। একমাত্র মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ই জীবন দিয়ে সাহিত‌্য করে গেলেন, আর কাউকে তো অমন দেখছি না।’– বীরুদা থামতেই বললাম, ‘জগদীশ গুপ্ত’।

কেমন যেন হয়ে গেলাম। আমি কি জীবন দিয়ে সাহিত‌্য করতে পারব না?

zoom

৮.২.৬৪

শনিবার
রাত্রি দশ

আজও চিঠি না পেয়ে একটা অবিশ্বাস‌্য ড্রামা কল্পনা করেছিলাম। হয়তো বাড়িতে গিয়ে দেখব আ. বিছানায় শুয়ে আছে। ‘অবিশ্বাস‌্য’ গল্পটা আজ লিখেছি। এবড়োখেবড়ো সময়ে গল্পটা শেষ করেছি। ফলে ভাষা এবং শব্দচয়ন হালকা এবং ভোঁতা হয়েছে। বীরুদাকে পড়ে শোনালাম। বললেন, ‘‌‘মুখে যেমন বলেছিলেন, তেমন তীক্ষ্ণ হয় নি। কিন্তু একদম Original গল্প হয়েছে। ছাপলে হয়। আপনি কিন্তু থামবেন না। লিখে যাবেন।”

রাত চারটেয় উঠে লণ্ঠন জ্বেলে মশারির ভিতরই বসে যাই লিখতে। পাঁচটা নাগাদ ঘুমিয়ে পড়ি। সাড়ে ছটায় বেডটি খাই। আবার কিছুক্ষণ লিখি। দাড়িকামাবার জন‌্য উঠতে হলো। পায়খানা গেলাম। দাঁত মাজলাম। অনেকগুলো জামাকাপড় সার্ফে কাচলাম। এবং ৯টার গাড়িতে আপিসে এলাম।

আপিসে গিয়ে পাঠসংকলনের ১ ফর্মা প্রুফ পড়েই পাঁচ মিনিটের জন‌্য বাইরে গিয়ে সিগারেট খেতে খেতে ক্রিকেটের রিলে শুনি। এবারও ভারত টসে জিতেছে।

আপিসে এসেই গীতবিতানের প্রুফ পড়তে বসে যাই।

ইতিমধ্যে বলুর ফোন এলো। কুড়িটা টাকা সংগ্রহ করে বলুকে লিখি:

॥শৈবাল দিঘি রে বলে উচ্চ করি শির             দিঘি = প্রয়োজন।

লিখে রেখো একবিন্দু দিলেম শিশির॥            শৈবাল = হস্তগত।

২০.০০।। মঙ্গলের উষা বুধে পা যথা ইচ্ছা তথা যা॥

তারপর সিগারেট ধরিয়ে আর একবার পায়খানা যাই।

ঘড়ি দেখলাম ১.১০। বলুর আপিস থেকে পিয়ন এলো তার হাতে খাম এঁটে চিঠি+টাকা দিয়ে দিলাম। এবং গল্পটা লিখতে শুরু করলাম। প্রফুল্লদা বললেন, তখন থেকে কি খোদাই করছেন?

‘গুডমর্নিং’–স্মিতআস্যে সুচিত্রা মিত্র ঢুকলেন।

খানিকক্ষণ গল্পগুজব করলাম। এবং সুচিত্রা চলে যেতেই আবার কিছুটা এগিয়ে রাখলাম গল্পটা।

আপিস ছুটি হতেই বীরুদার কাছে গেলাম। ওঁর কাছ থেকে চাবি নিয়ে আমাদের ‘ডার্কচেম্বারে’ গেলাম। এখানে বসে বসে গল্পটা শেষ করলাম।

মানসিকক্লান্তিতে অবসাদগ্রস্ত। দু-চেয়ার এক করে একটু ঘুমের প্রত‌্যাশা করলাম। ঘুম এলো না। স্বপ্ন দেখলাম। আ. কি সব বলল, ঘুম ভাঙতেই সবকিছু ভুলে গেলাম।

zoom

শনিবার, দুপুর

১৫.২.৬৪

কেন যে কিছু ভাল লাগছে না জানি না। মনে হচ্ছে আমার বুদ্ধির চোখ দুটো বুজে যাচ্ছে। মাথায় কিছু খেলছে না। শুধু ঘুমিয়ে থাকি।

সুচিত্রা মিত্র বললেন, সতীন্দ্রবাবুকে এমন গম্ভীর দেখছি কেন?

খারাপ লাগল শুনে। সত্যি কি আমি গম্ভীর/বুড়ো/সিরিঅস হচ্ছি?

কাল বীরুদার ওখানে দুপুরে আলুসিদ্ধ ভাত খাবার অনুরোধ আছে। বিনয়ে আলুসিদ্ধ নয়– বাস্তবিকই। কেউ নেই বাড়িতে। সবাই জলপাইগুড়িতে গেছেন। বীরুদা বাড়ি পাহারা দিচ্ছেন। কিন্তু আমার যেতে ইচ্ছে করছে না।

কিচ্ছু ভালো লাগছে না।

zoom

———————————————

সূত্র: 

১. বীরুদা: পুরো নাম বারীন্দ্র সরকার। ইনি সতীন্দ্র ভৌমিকের প্রথম কবিতার বই ‘প্রহত প্রহর’-এর প্রকাশক ছিলেন।

২. Hg: Hungry generation

৩. বলু: সমবয়সি ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পুরো নাম অনন্তকুমার বসু। অকৃতদার এই মানুষটি স্কটিশচার্চ কলেজিয়েট স্কুলের ইংরেজি বিদ্যার শিক্ষক ছিলেন।

৪. প্রফুল্লদা: প্রফুল্লকুমার দাস। প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষক। ছিলেন দিনেন্দ্র সংগীতায়তনের অন্যতম কর্ণধার।

৫. আ: স্ত্রী আলপনা। পরবর্তী জীবনে যিনি কথাসাহিত্যিক ও দান্তে অনুবাদক আলপনা ঘোষ নামে পরিচিত।

৬. প্রসাদ: সম্ভবত বন্ধুস্থানীয়। তবে এঁর পুরো পরিচয় জানা যায়নি।

Bengali Poetry Hungry generation KamalKumar Majumdar Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on