memoir of late ketaki kushari and rabindra-praxis | Robbar
Robbar
  • ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ১০ অক্টোবর ২০২৬

কেতকীর রবীন্দ্রনাথ

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, প্রয়াত হয়েছেন কেতকী কুশারী ডাইসন। বহু ব্যবহারে, বহু গবেষণায়, বহু পুনর্লিখনে যখন রবীন্দ্রচিন্তা ক্লান্ত, বিমর্ষ– তখন একেবারে নতুনভাবে রবীন্দ্রনাথকে দেখার দৃষ্টি নিয়ে এসেছিলেন তিনি। তাঁর গবেষণার ফলন ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’ বইটি। সে বইয়ের অক্ষরবন্ধু ছিলেন শিল্পী, শিল্প সমালোচক সুশোভন অধিকারী। এই তর্পণ সেই গবেষণা, বই তৈরি ও কেতকীর রবীন্দ্রনাথকে চিনিয়ে দেয়।     

শেষ আপডেট: অক্টোবর ১০, ২০২৬, ১৪:৪৮   
Facebook WhatsApp Messenger

‘গবেষণা’ আর ‘লড়াই’– দু’টি শব্দের মধ্যে কি কোনও মিল আছে? আছে কোনও ভাবনাগত সামঞ্জস্য? এহেন শব্দেরা পাশাপাশি বসলে হঠাৎ একটা ধাঁধা তৈরি হয় বটে। তবে বিচিত্র অভিজ্ঞতায় টের পেয়েছি ক্ষেত্রবিশেষে এমন শব্দযুগল পরোক্ষভাবে হলেও প্রায় সমার্থক হয়ে উঠতে চায়। একটু খোলসা করে বলা যাক। রূপকথার রেশ জড়িয়ে বলতে পারি– অনেক দিন আগের কথা। প্রকৃতপক্ষে আটের দশকের শেষভাগ। বিদুষী লেখিকা কেতকী কুশারী ডাইসনের আহ্বানে এক ব্যতিক্রমী গবেষণার কাজে আমন্ত্রিত হয়েছি। সুযোগ পেয়েছি তাঁর সঙ্গে একত্রে কাজ করার। সংক্ষেপে গবেষণার বিষয়– রবীন্দ্রনাথের ছবি ও সাহিত্যে রঙের ব্যবহার।

zoom

আপাতদৃষ্টিতে বেশ নিরীহ ঠেকলেও তা কেবল ‘রঙের তালিকা’ তৈরির মতো সরল নয়। এর অন্দরে নিহিত রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিজাত সীমাবদ্ধতার বীজ। যা কবির ঘনিষ্ঠবৃত্তের পরিজনরা জানলেও সৃষ্টির বৃহত্তর পরিসরে রবীন্দ্রনাথের সীমাবদ্ধ বর্ণদৃষ্টির বিশেষত্ব এবং তার প্রভাব প্রসঙ্গে কোনও গভীরতর অনুসন্ধান হয়নি। সেই গবেষণা, অনুসন্ধানের অন্দরে প্রবেশ করতে গিয়ে যথেষ্ট লড়াই করতে হয়েছিল আমাদের। সর্বতোভাবেই সে এক দুর্মর অ্যাকাডেমিক লড়াই। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও চিত্রকলার পটে সংগ্রথিত গবেষণাটি যৌথভাবে হলেও স্বাভাবিকভাবে লড়াইয়ের পুরোভাগে ছিলেন কেতকী কুশারী ডাইসন। বিলেতের জার্নালে প্রকাশিত গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিকফোর্ড এবং কলকাতার চক্ষু-বিশেষজ্ঞ জ্যোতির্ময় বসুর যুগ্মভাবে লিখিত নিবন্ধ ‘রবীন্দ্রচিত্রকলায় বর্ণান্ধতার আভাস’ ছিল এই গবেষণার বীজ। লেখাটি কেতকীকে আলোড়িত করে। অন্বেষণ করে বুঝতে চান, দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার সঙ্গে আজীবন সংগ্রাম চালিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ! এ কাজ সহজ ছিল না। সাহিত্যের পাশাপাশি এক চিত্রকর-গবেষককে তাঁর প্রয়োজন। প্রয়োজন রবীন্দ্রনাথের ছবিতে রং ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক আলোকপাত করতে সক্ষম এমন বিজ্ঞানীর। যদিও মূল কাজটি সাহিত্য ও চিত্রকলা-নির্ভর।

zoom
কেতকী কুশারী ডাইসন

এই গবেষণার প্রাক্কালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিকতোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’। যেখানে বেণীর মতো গেঁথে দিয়েছেন চরিত্রদের– রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, ওকাম্পো আর লেনারড এলমহারস্ট, পাশাপাশি উপন্যাসের প্রান্তে স্বতন্ত্র পর্বে এসেছেন ‘নতুন বৌঠান’, কাদম্বরী দেবী। আছে এঁদের প্রত্যেককে নিয়ে অনুসন্ধিৎসু বিচার-বিশ্লেষণ। কেতকী জানিয়েছেন, ‘সব কিছুকে ধরে রাখে একটি ঔপন্যাসিক কাহিনীর ফ্রেমওয়ার্ক এবং নায়িকা অনামিকার চোখ’। সেইসঙ্গে আবর্তিত হয়েছে ওকাম্পোকে নিয়ে গবেষণারত অনামিকার ব্যক্তিজীবনের টানাপড়েন, রঞ্জন আর অশনিকে ঘিরে তার ভাবনা আর সম্পর্কের জটিলতা, মুহূর্তের আবেগ আর স্থিতধী ভালোবাসায় ঘেরা ফল্গুস্রোতের নিবিড় অনুভব। আজও আমাদের মনে পড়ে না এর সমান্তরাল কোনও উপন্যাসের কথা। বাংলা উপন্যাসের প্রেক্ষিতে এর আঙ্গিকের কাঠামো নতুনত্বের সন্ধান দিয়েছে বললে অত্যুক্তি হয় না। শুধু কি তাই, ভাষার অভিঘাত, শব্দচয়নের অভিনবত্ব পাঠকের মনকে মাঝেমাঝে স্তব্ধ করে দেয়। বিশেষত উপন্যাসের যে অংশে গবেষণার সূত্রে পথিক অনামিকার সঙ্গে জার্মানিতে বন্ধু অশনির সাক্ষাৎ এবং অশনির প্ররোচনায় তাদের একত্রে রাত্রিবাস ঘটেছে– সাধুভাষায় লিখিত সেই পর্বের নিবিড় বর্ণনা চমকে ওঠার মতো। এমন সাহসী অথচ শীলিত অক্ষরমালা সহসা চোখে পড়ে কোথায়? রবীন্দ্রনাথের ১২৫ জন্মবর্ষের প্রাক্কালে বইটি ‘আনন্দ পুরস্কার’-এ সম্মানিত হলেও উপন্যাস ঘিরে বিতর্কের ঝড় কেতকীর পিছু ছাড়েনি। তার মধ্যে অন্যতম, যে লেখার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নাম জড়িত সেখানে অনামিকা ও অশনির একত্রে শয্যার এমন ঘনিষ্ঠ অনুষঙ্গ কি একান্তই জরুরি ছিল? তবে কি উপন্যাসের ছায়ায় কবি আর ওকাম্পোর সম্পর্ক নিয়ে লেখিকা কোনও নীরব ইশারা মেলে দিলেন ইত্যাদি!

zoom

এই উপন্যাসের পরে ইংরেজি ভাষায় কেতকীর গবেষণা ‘In Your Blossoming Flower-Garden’– যা রবীন্দ্রনাথ ও ভিকতোরিয়া ওকাম্পোর সম্পর্ক এবং উভয়ের চিঠিপত্রকে ঘিরে। বিস্তৃত গবেষণার আধারে আর্জেন্টিনার সেই অনুরাগিণীর প্রতি সম্পর্কের আখ্যানে কেতকী এক অজানা ঘটনার কথা প্রকাশ করেছেন। গ্রন্থে যুক্ত করেছেন ওকাম্পোর একটি অপ্রকাশিত লেখার টুকরো– যেখানে রবীন্দ্রনাথ একদিন আনমনে তাঁকে স্পর্শ করেছেন। এমন অংশ নিয়ে বিতর্ক শুরু হতে দেরি হয়নি। কেতকীর মনে হয়েছে, ‘সাহিত্য-একাডেমি’ প্রকাশিত ৪৭৭ পাতার সেই বইতে সকলে যেন এই একটা প্যারাগ্রাফের উপরেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে, ঠিক যেমনভাবে মণ্ডামিঠাইয়ের উপরে হামলে পড়ে শিশুরা। উল্লেখ্য, বইটি যেমন তাঁকে খ্যাতি এনে দিয়েছে, তেমনই বিতর্কিত করেও তুলেছে। অনেকের মতে কেতকী মানেই কনট্রোভার্সি– এ তাঁর সচেতন প্রয়াস। কেতকীর মতে, ‘…কতগুলো তথ্যের প্রাসঙ্গিকতা এক দৃষ্টিকোণ থেকে একটু প্রান্তিক, আবার অন্য একটা দৃষ্টিকোণ থেকে ততটা প্রান্তিক নয়। আর রিসার্চের কাজে কখন যে কোন প্রান্তিক ডিটেলটা কেন্দ্রিক হয়ে উঠবে, তা কি সবসময় আগে থেকে বলা যায়? বিশেষত যেখানে তিন দেশের তিনজন মানুষের দেওয়া-নেওয়ার একটা গল্প বলা হচ্ছে। একটা আন্তঃসাংস্কৃতিক কাহিনীতে এমন অনেক আলোছায়া থাকে যেগুলির তাৎপর্য ধরতে তুলনীয় আন্তঃসাংস্কৃতিক চোখ লাগে। আমার সেরকম একজোড়া চোখ আছে বলেই যা-যা আমার কাছে অর্থবহ বা কৌতূহল-জাগানিয়া মনে হয়েছে সেগুলো আমি চয়ন করে দিয়েছি, বাদ দিইনি। লুকানো ইন্টারকানেকশন খুঁজে বার করাই তো গবেষকদের একটা কাজ।’ নিঃসন্দেহে এই ভাবনা কেতকীর গবেষণার অন্যতম প্রধান স্বর। ভিকতোরিয়া ওকাম্পো এবং রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শঙ্খ ঘোষের প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’-এর কথা এখানে স্মরণ করতেই হয়। পরবর্তীকালে কেতকী সশরীর আর্জেন্টিনার বুয়েনোস এয়ারিসের ওকাম্পো আর্কাইভ, ব্রিটেনের ‘ডার্টিংটন হল’ ইত্যাদিতে গিয়ে তন্নিষ্ঠ অনুসন্ধান করে এসেছেন। সমসাময়িক পর্বে আরেকটি ঘটনা স্মরণ করতে হয়, শেক্সপিয়রের জন্মস্থান ‘স্ট্র্যাটফোর্ড’-এ স্থাপিত রবীন্দ্রমূর্তির সঙ্গে সংযুক্ত রবীন্দ্রকবিতার অনুবাদ সম্পর্কিত বিতর্কের কেন্দ্রভূমিতেও অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান ছিল কেতকীর। 

zoom
রবীন্দ্রনাথ ও ভিকতোরিয়া ওকাম্পো

এমতো অবস্থায় কেতকী যখন রবীন্দ্রনাথের বর্ণদৃষ্টির বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে গবেষণা করতে উদ্যোগী হলেন, তখন বাধা তীব্রতর হয়ে উঠেছে। যেখানে গবেষণার বিষয় রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিজনিত সীমাবদ্ধতা, সেখানে বিরোধিতা অবশ্য নতুন কথা নয়। সাদাসাপ্টা বাঙালির মতে– এ হতেই পারে না, নিশ্চয়ই কেতকী এখানে ঋষিতুল্য রবীন্দ্রনাথের ভাবমূর্তিকে আরও কালিমালিপ্ত করতে উঠে-পড়ে লেগেছেন। রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তাকে খাটো করার এ এক গভীর ষড়যন্ত্র– গবেষণার গোড়ায় এহেন উতপ্ত আবহে কেতকীর পাঠানো প্রোজেক্ট নিয়ে বিবেচনা করতে শান্তিনিকেতন যথেষ্ট সময় নেয়, ক্রমে সে চলে যায় বাতিলের দলে। এদিকে রবীন্দ্রনাথের মতো সৃজনশীলতার বিপরীতে এই অনুসন্ধান যে একান্ত জরুরি– কেতকী তা মর্মে মর্মে অনুভব করেন। তাঁর ব্যক্তিজীবনের দৃষ্টিজাত সমস্যার সঙ্গে অজান্তে জড়িয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের দেখার প্রেক্ষিত। মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের বর্ণদৃষ্টিতে যদি কোনও ঘাটতি থেকে থাকে, তাহলে এই প্রতিকূলতার মধ্যে ভাষায় তো বটেই, ছবিতেও এমন মহৎ শিল্পী হয়ে উঠলেন কোন ইন্দ্রজালে? এ কি সিরিয়াস গবেষণার বিষয় নয়?

zoom
রবীন্দ্রচিত্র

কাজে বাধা পেয়ে সুতীব্র বেদনায় কেতকী ফিরেছেন কবিতার কাছে। এই সময়ের চিঠির একটা টুকরো– ‘কবিতাগুলোর মধ্যে এত কান্না মিশে গেছে… সত্যিই একটা মানসিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। হয়তো কবিতাগুলো লিখতে পেরেছি বলেই টিকে আছি।’ কী আশ্চর্য! যে কাজের জন্য শান্তিনিকেতন আর্কাইভ ঘেঁটে অনুপুঙ্খ অনুসন্ধান জরুরি, ছবি, চিঠিপত্র ও অন্যান্য বিষয়ের সমস্ত রসদ যেখানে রাখা– বাধা পড়ল সেখানে। সাহিত্যের আলোচনায় তেমন অসুবিধা নেই, মুদ্রিত রবীন্দ্ররচনাবলি সহজেই প্রাপণীয়। কিন্তু তাঁর চিত্রকলা তখনও প্রায় অজ্ঞাত। কেবল ‘চিত্রলিপি’র গোটাকয়েক চেনা ছবি আর মাত্র দু’-একটা ক্যাটালগের গোটা পঞ্চাশেক ছবি ছাড়া আড়াই-হাজার রবীন্দ্রচিত্রের সিংহভাগ রবীন্দ্রভবনে– তা বাদ দিয়ে এই গবেষণা অসম্ভব! যাঁকে দেবতার আসনে বসিয়ে কেবল ফুলের মালায় বাৎসরিক কর্তব্যসাধন করে চলেছি, সেই রবীন্দ্রনাথ কীভাবে তাঁর দৃষ্টির সীমাবদ্ধতাকে জয় করলেন– তা খতিয়ে দেখতে আমাদের কোনও আগ্রহ নেই! অথচ আমরা জানি প্রতিবন্ধের সঙ্গে সংগ্রাম প্রতিভাকে শানিততর করে, ধারকে করে তোলে তীক্ষ্ণতর। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে কি তাই হয়েছিল? কীভাবে প্রকৃতির বর্ণনা করতেন তিনি, কীভাবে নির্মাণ করতেন বর্ণভাষা, সৃজন করতেন বর্ণপ্রতিমা? দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার পাশে কি অন্য কিছু সহায়ক হয়ে উঠেছিল? শ্রুতি, ঘ্রাণ, স্পর্শ কি তাঁর দৃষ্টির অপূর্ণতাকে পরোক্ষভাবে ভরাট করেছে? এইসব নানা প্রশ্ন এখানে ভিড় করে আসে। কবিতায় চোখের প্রত্যক্ষ দেখাকে অনেকটা আলংকারিক স্তরে উৎক্ষিপ্ত করে নেওয়া সম্ভব, গদ্যাংশে তা সহজ নয়। তাই কি কবিতার শব্দবিন্যাসে তিনি অমন আশ্চর্যরকমের স্বতন্ত্র! ছবির প্রতি তাঁর আকর্ষণ চিরকালের, তবে কি দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা জগতে প্রবেশে বিলম্বের অন্যতম কারণ? ঠিক কোন পথে তিনি হয়ে উঠলেন চিত্রশিল্পী? কী সেই আত্মনির্মাণের ইতিহাস– এমনটাই ছিল এই গবেষণার অভিমুখ। অথচ সামনে পাহাড়প্রমাণ বাধা। কিন্তু কেতকীর মতো অদম্য গবেষককে থামিয়ে দেওয়া সহজ ছিল না, জ্ঞান এবং বৈদগ্ধের স্বপক্ষে তাঁর নিরন্তর লড়াই। শান্তিনিকেতনের দীর্ঘ নীরবতায় তিনি কলকাতার একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার প্রস্তাব পাঠালে সেখানে তা সাদরে গৃহীত হয়। অবশেষে সেখান থেকেই কেতকী শান্তিনিকেতনে এসে এ বিষয়ে গবেষণা করবার সুযোগ পেয়েছেন। এ এক নিষ্ঠুর আয়রনি!

zoom
কেতকী কুশারী ডাইসনের একটি কাব্যগ্রন্থের চতুর্থ প্রচ্ছদ

বিলেত থেকে কেতকী ওঁর স্বামী রবার্ট (যিনি নিজে একজন বিজ্ঞানী) এবং অক্সফোর্ডের দৃষ্টিবিজ্ঞানী এড্রিয়ান হিল– তিনজন শান্তিনিকেতনে এলেন, ক্রমে শুরু হল গবেষণার প্রাথমিক পর্ব। রবীন্দ্রনাথের কিছু বিশেষ ছবি নির্বাচন করে দুই বিজ্ঞানীর রং-সম্পর্কিত পরীক্ষা শুরু হল। ইতিমধ্যে অধ্যাপক হিল উদয়ন বাড়িতে একটি মনোজ্ঞ আলোচনা করলেন, ফরাসি শিল্পী মোনের দৃষ্টি-অভিঘাত নিয়ে। যেখানে তাঁর আঁকা ‘লিলি-পন্ড’ ক্রমশ দৃষ্টির অভিঘাতে বিমূর্ত ছবিতে রূপান্তরিত হয়ে উঠছে। অর্থাৎ দৃষ্টির অভিঘাতে চিত্রকরের রঙের প্যালেটের পরিবর্তন কোনও নতুন কথা নয়। এ বিষয়ে রেমব্রান্টকে নিয়েও গবেষণার কথা শোনা যায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বেলায় আমরা ‘নৈব নৈব চ’। এবারে প্রাথমিক বাধা কাটলেও, কাজ শুরু হওয়ার কিছুদিন পরে কলকাতার একটি দৈনিকপত্র গবেষণার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে লেখা শুরু করে। কেতকী তখন অক্সফোর্ডে ফিরে গিয়েছেন, সেখান থেকে কাগজের সম্পাদকীয় দপ্তরে গবেষণার বিষয়ে চিঠি দিলেও খবরের কাগজে কটূক্তির মাত্রা চরমে পৌঁছয়। অবশেষে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন শিবনারায়ণ রায়, গৌরকিশোর ঘোষ, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রমুখের মতো ব্যক্তিত্ব। কাগজের ধারাবাহিক বন্ধ হল। এবারে প্রোজেক্টের চিত্রগত গবেষণার তাগিদে, বিশেষত রবীন্দ্রচিত্রে আধুনিক বিশ্বশিল্পের প্রভাব বিষয়ে চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা জরুরি।

zoom

দৃষ্টির সীমাবদ্ধতাই কি রবীন্দ্রনাথকে বিদেশি শিল্পের দিকে ঠেলে দিয়েছে? সেখান থেকে পেয়েছেন কোনও নতুন পথের সংকেত? এইটে প্রত্যক্ষ বুঝে নিতে নানা মিউজিয়াম, আর্ট গ্যালারি, অভিলেখ্যাগার ইত্যাদি খতিয়ে দেখতে আমাকে পাড়ি দিতে হয়েছে ইংল্যান্ড, জার্মানি আমেরিকা এবং প্যারিস। সে এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা, আরেকটা ইতিহাস! অবশেষে বছর পাঁচেকের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে দীর্ঘ গবেষণাগ্রন্থ ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’। বই প্রকাশের পরেও লড়াই থেমে যায়নি, সমালোচনার ঝড় উঠেছে– এসবই আজ ৩০ বছর আগের ইতিহাস। স্বীকার করতে বাধা নেই, এই মাপের গবেষণাগ্রন্থ সমগ্র বিশ্বের পরিপ্রেক্ষিতে নিঃসন্দেহে বিরল। প্রখরতর লড়াইতে অবশেষে কেতকীই জয়ী হয়েছেন। এই তো, মধ্য-সেপ্টেম্বরে তাঁর পার্থিব শরীরের লড়াই শেষ হল। ওঁর মায়ের মৃত্যুর পরে যে চিঠি লিখেছিলেন তার দু’-একটা লাইন মনে পড়ছে, ‘‘… কোমায় থেকে মা চলে গেলেন– এক দিক থেকে শান্তিতেই চ’লে গেছেন, ঘুমের মধ্যে। অনেকদিন থেকেই ক্ষয় ঘটছিলো– মনের একটা ক্ষয় আমরা বুঝতেই পারছিলাম– মস্তিস্ক তো দেহেরই অংশ, দেহের অন্যান্য ক্ষয়ের মতো এটাও বোঝা যায়।’’ এ যেমন সত্যি, তেমনই এ-ও নির্মমভাবে সত্যি– সৃষ্টিকাজের কোনও ক্ষয় নেই। বাধা ঠেলে সর্বদা সে আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। 

Ketaki Kushari Dyson Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Victoria Ocampo

Share this article on