Sasimukhi and gramophone record of theatre songs। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শশীমুখীর কণ্ঠে প্রথম গ্রামোফোনে রেকর্ড হয়েছিল বাংলা থিয়েটারের গান

কাশীনাথ চট্টোপাধ্যায়, লালচাঁদ বড়াল প্রমুখ যে থিয়েটারের গান গেয়েছেন, সে গায়ন কখনও-ই ‘বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা’ হয়ে দেখা দেয়নি, যা ‘নটী’কণ্ঠে প্রকাশ পেয়েছিল। তিনের দশকে থিয়েটারের গানের প্রধান পুরুষ-কণ্ঠ কৃষ্ণচন্দ্র দে’র ‘সত্যের সন্ধান’ নাট্যের বা ‘সীতা’ নাট্যের গানের গায়ন স্বতন্ত্র উল্লেখের দাবিদার। কালের বিশুষ্ক বাতাসে একদিন থিয়েটারের গানের উছল-ধারা হারিয়ে গেলেও, চলমান চিত্রের সুরপটে সে ধরেছে অন্য মূর্তি।

শেষ আপডেট: নভেম্বর ৩০, ২০২৫, ১৬:০৩   
Facebook WhatsApp Messenger

উনিশ শতকের সাংগীতিক রুচি-কোলাহল ছানবিন করে শেষমেশ দেখা গেল, বাঙালির কোমল হিয়া যে বীণার সুরে রণিত হয়েছে, তার নাম ‘কাব্যগীতি’। এমনকী সেই সময়ে গজিয়ে ওঠা সংগীত-কোলাহলের মধ্যেও যেগুলি বাণী ও সুরে সম্পদবান, সেগুলিই স্থায়ী হয়েছে তাদের মনের মণিকোঠায়। কিন্তু খেয়াল করার বিষয়, এই গীত-সম্পদের রসগ্রহণের ক্ষেত্রে তারা সূক্ষ্ম বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। যে বাঙালি কান্তকবি রজনী সেনের ‘প্রাণের পথ বয়ে গিয়েছে সে গো’ গানটি মোহিত হয়ে শুনছেন, সেই বাঙালিই গিরিশ ঘোষের ‘পারস্য-প্রসূন’ নাট্যের ‘রসের গুঁড়ো বুড়ো আমার খায় না কেবল আড়ে গেলে’ গানটি সযত্নে পরিহার করছেন। দু’টি গানই বাংলা কাব্যগীতির আওতাভুক্ত, তফাত কেবল রঙের। সেই রঙের তারতম্যের বিচারেই বাংলা কাব্যগীতির আসরে ‘নাট্যগীতি’ ঠিক প্রেমের বস্তু হিসেবে পরিগণিত না হলেও, মায়াময় হাতছানির বিষয় ছিল।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের ‘নতুনদা’র কথা এ-প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায়। যিনি ডিঙিতে বসে গিরিশচন্দ্রের ‘আবু হোসেন’ মঞ্চনাট্যের ‘ঠুন্‌ ঠুন্‌ পেয়ালা’ গানটি হাততালি দিয়ে, ‘মেয়েলি নাকীসুরে’ গাইছিলেন। বাংলা থিয়েটার-মহলে আগাগোড়া এ-হেন দ্বৈত-সত্তাধারী বাঙালিবাবুদের আনাগোনাই ছিল সর্বোচ্চ। ‘নেমেসিস’-এর মতোই শতাব্দীর মধ্যভাগে বাংলা থিয়েটারের মায়াবী সুর তাদের আচ্ছন্ন করে। ক্রমে অনুরাগ রূপায়িত হয় প্রেমে। নতুন শতাব্দীর প্রথম ভাগে, বিনোদনের নতুন কেতায় এই গীতধারাই হয়ে উঠল তাদের যাপন-সঙ্গী। গীতসুধারসে জর্জরিত হয়ে মান্যতা দিল ‘ছোটলোক’-এর থিয়েটারিপনাকে। বাঙালির থিয়েটার-প্রেমের সেই সূত্রের সন্ধান মেলে এক সংগীতবেত্তার জবানিতে– ‘শৌখিন আসর থেকে ভিখারির কণ্ঠে পর্যন্ত গিরিশ ঘোষের গান শোনা যেত।’

বস্তুতপক্ষে উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের দুইয়ের দশক পর্যন্ত কেবল বাংলা থিয়েটারের গানের এবং থিয়েটার-গন্ধী গানের অজস্র ছোট-বড় সংকলনগুলির প্রকাশ এবং সেগুলির জনপ্রিয়তা লক্ষ করার মতো। নাট্যগীতিকে ঘিরে এই বিপুল কর্মকাণ্ড তো কেবল বিষয়টির বিশুদ্ধ লোকপ্রিয়তার নিরিখে সম্ভব নয়, জাতির নাট্য-ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্দেশ্যও যথেষ্ঠ বলবতী ছিল আর তাকে ফলবতী করেছে বোধ করি, ছুঁতে না ছুঁতে মিলিয়ে যাওয়া মঞ্চের মায়া-সরসীটিকে স্থায়িত্ব দেওয়ার তাগিদটিও।

সাগরপারের একটি চোঙামুখো হরবোলা যন্ত্রের উপস্থিতিতে বাঙালির নিছক বিনোদনী-গীতবিলাস ঠাঁইবদল করল সংগীত-সংস্কৃতিতে। বাঙালি আপন ঐতিহ্যে বরণ করে নিল সেই ‘ফোনোগ্রাফ’ বা ‘গ্রামোফোন’ যন্ত্রটিকে। শুরু হল সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। যে অধ্যায় গর্বের, যে অধ্যায় সৃষ্টির প্রতি সম্মান জ্ঞাপনের।

এই সম্মান-প্রদর্শনের প্রক্রিয়াটি সূচিত হল অসচেতনভাবেই! ১৯০২ সালের ৮ নভেম্বর, দিনটা শনিবার। ঘটল এক আশ্চর্য কাণ্ড! চিৎপুরের অখ্যাত, আলো-আঁধারি পল্লিতে গ্রামোফোনের অভিষেক ঘটল এক চতুর্দশীর গায়নে।

zoom
গায়িকা-অভিনেত্রী শশীমুখী

গ্রামোফোন কোম্পানির ধ্বনি-প্রযুক্তিবিদ ফ্রেডারিক উইলিয়ম গেইসবার্গের নির্দেশে বাংলা থিয়েটারের ‘নেপোলিয়ন’ অমরেন্দ্রনাথ দত্তর ক্লাসিক থিয়েটারের গায়িকা-অভিনেত্রী শশীমুখীকে নিয়ে আসা হল যন্ত্রটির সামনে। বিস্ময়াবিষ্ট শশীমুখী তাঁর অমার্জিত, তবুও উদার কণ্ঠস্বর পেশ করলেন। মোমের চাকতির ওপর অনুরণিত হতে লাগল অমরেন্দ্রনাথের থিয়েটারে সদ্য অভিনীত, নতুন ধরনের গীতিনাট্য ‘শ্রীকৃষ্ণ’ (১৮৯৯)-এ ‘শ্রীরাধা’ চরিত্রের গীত-সংলাপ ‘কাঁহা জীবনধন, বৃন্দাবন প্রাণ,/ কাঁহা মেরি হৃদয়কি রাজা।/ শূন্য হৃদয়পুরী, আও আও মুরারী,/ মোহন বাঁশরী বাজা।।’

সেই গান গেইসবার্গ সাহেবের আখ্যায় ‘miserable’ হলেও তা কি কেবল বহু অভিনয়-রজনীতে, এক রঙ্গনটীর, দর্শকসমীপে তাঁর শিক্ষা ও অভিনয় দক্ষতার প্রদর্শন? নাকি মথুরানিবাসী শ্রীকৃষ্ণের বিরহে ব্যাকুলা, সাজানো শ্রীরাধিকার কৃষ্ণ দর্শনের জন্য আকুল আর্তিমাত্র? না, এই গানে মিশে গেল দৈনন্দিন পঙ্কিল জীবনোদ্ভূত এক আশ্চর্য আলো। চতুর্দশী নটীর সারল্য প্রতিভাত হল গৌড়সারং রাগের অকৃত্রিম সহজিয়া চলনে। তাঁর গায়নে বয়ঃসন্ধিকালীন প্রেমের অজানা ব্যাকুলতার সরল সুর ও নিয়ত আশা-নিরাশার দোলাচলে যাপিত বাস্তব-জীবন-অভিজ্ঞতার সাহচর্যে এই গান হয়ে উঠল এক উচ্চারণ। গ্রামোফোন কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থ চরিতার্থ করে আর অধরা মঞ্চ-মাধুরীকে ঘূর্ণায়মান শ্রুতিবন্ধনে আবদ্ধ করে, শ্রোতার অন্দরে সেদিন প্রতিষ্ঠা পেল অমরেন্দ্র-মঞ্চগীতি।

অমরেন্দ্রনাথ দত্তের বদান্যতায় এই প্রথম, মঞ্চ-পরিসরে শুনতে পাওয়া গান যখন-তখন শোনবার সুযোগ হল। তখন থেকে পাঁচের দশক পর্যন্ত গ্রামোফোন রেকর্ডের যাত্রাপথের সঙ্গে অন্বিত হয়ে গেল বাংলা থিয়েটারের গান। বাংলা থিয়েটার কেবল দর্শক নয়, জন্ম দিল রসজ্ঞ শ্রোতারও। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে থিয়েটারের গান সংরক্ষণের একটি উপায় হল।

zoom
অমরেন্দ্রনাথ দত্ত

প্রশ্ন উঠতে পারে, থিয়েটারের গান সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা কেন বোধ হল? তার উত্তর প্রদানের জন্য এই প্রবন্ধ-পরিসর ও বিষয়গত ব্যাপ্তির কথা স্মরণে রেখে, কেবল উত্তর দানের জন্য একটি বাক্য খরচ করাই যথেষ্ট। সেটি হল, অন্যান্য গানের তুলনায় বাংলা থিয়েটারের গান, তার চরিত্রগত কারণেই বহুসিদ্ধি আর সুর ও বাণীর চিরন্তন সাধক বাঙালির গীত-পিপাসার নিবারক। এই ধারার গান যুগপৎ রূপের নেশা আর রসের তৃষ্ণা নিবারণ করেছে। ১৩২৮ বঙ্গাব্দে পাঁচ খণ্ডে প্রকাশিত করুণাকান্ত ভট্টাচার্য কর্তৃক সংগৃহীত ও সংকলিত ‘থিয়েটার সঙ্গীত’ নামক গ্রন্থমালার ভূমিকাটি পাঠ করলে এ-বিষয়ে কিঞ্চিৎ ধারণা জন্মাবে। কিন্তু লক্ষণীয়, এই গীতধারায় ‘থিয়েটারি গান’ আর ‘থিয়েটারের গান’ বা নাট্যগান দুই-ই আছে, তবু যে গানগুলি রেকর্ডে ধৃত হচ্ছে, সেগুলি প্রায় সবই ‘থিয়েটারের গান’।

মাইকেল কিনিয়রের নির্মিত তালিকা ধরে এগলে ভারতবর্ষে গ্রামোফোন রেকর্ডের প্রথম দুই গায়িকাভিনেত্রী বা ‘সংস্ট্রেস’ শশীমুখী ও ফণিবালা, দ্বৈত এবং একক গায়নে যে গানগুলি গাইছেন; যেমন ‘সরল মনে, সরল প্রাণে’, ‘নয়ন গলিয়ে যায় সুনীলিম গগনে’ কিংবা ‘নিমেষের তরে শরমে বাধিল’, সবক’টিই ভীষণরকম থিয়েট্রিক্যাল উপাদানে সমৃদ্ধ থিয়েটারের গান, কোনওটিই ‘থিয়েটারি গান’ নয়। বেদানাবালা দাসীর কণ্ঠে অতুলকৃষ্ণ মিত্রের ‘হিরণ্ময়ী’ নাট্যের ‘গয়লা দিদি লো’ কিংবা ‘আমার বুকে পিটে সেঁটে ধরেছে’ গান দু’টি ছাড়া, সবগুলিই একটি ভালো থিয়েটারের মতোই চিত্র-কাব্য-সুর-সংলাপের চতুর্স্পর্শে উজ্জ্বল। সবিশেষ উল্লেখযোগ্য কিন্নরী-কণ্ঠ-নিঃসৃত সবক’টি গানই যেন তাঁদের প্রখর জীবনবোধে উদ্দীপ্ত। রঙ্গ-জীবন আর রঙ্গমঞ্চ-যাপনের পরিচয়বাহী, দু’টিই রঙ্গমঞ্চের দান।

মিস্‌ সুবাসিনী যখন ‘হামির’ নাট্যের ‘সাধের সাগর জনমের মতো শুকায়ে গেল’ গানটি রেকর্ড করেন, তখন সেই গানে যেমন ‘লছমি’ চরিত্রের সুর-সংলাপ ধ্বনিত হয়, ঠিক তেমনই নিয়ত আশা-নিরাশার দোদুল্যমানতার ব্যক্তিজীবনও প্রতিভাত হয়। এই সময়ে সুখী গৃহকোণে শোভিত গ্রামোফোন থিয়েটারের গানে উছলে উঠল নীরদাসুন্দরী, নরীসুন্দরী, বিনোদিনী (গাইনী), মানদাসুন্দরী, বেদানাবালা দাসী, আশ্চর্যময়ী দাসী, প্রমুখের সুর-সঙ্গতে। হরেক বিনোদিনীর ভিড়ে রেকর্ড লেবেলে মঞ্চের নামের সঙ্গেই মুদ্রিত হল ‘গাইনী’, ‘হাঁদি’ ইত্যপ্রকার ডাকনাম। এতে গান শোনবার সময়ে গায়িকার গায়ন-বৈশিষ্ট্যটিও নিশ্চয়ই বিচার করতেন থিয়েটার-প্রেমী শ্রোতারা আর কার কতগুলি রেকর্ড বিক্রি হচ্ছে, সে নিয়েও গায়িকামহলে স্বাস্থ্যকর রেষারেষি থাকাও অসম্ভব নয়।

সূচনাকাল থেকে বাংলা থিয়েটারের কিন্নরীরা যেমন থিয়েটারের গানের মহলটি মাতিয়ে রেখেছিলেন, সেই বিচারে কিন্নরকণ্ঠের হদিশ তেমন সুলভ নয়। যদিও জনপ্রিয় নাট্যদৃশ্যের মুদ্রণে মেলে কিন্নর-কিন্নরীর সহবাসের চিহ্ন। একমাত্র অমরেন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে কুসুমকুমারীর দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘প্রায়শ্চিত্ত বা বহুত আচ্ছা’ নাট্যের ‘আমি চিরকাল unmarried থাকতাম’ গানটির গায়ন ব্যতিক্রমী নিদর্শন।

কাশীনাথ চট্টোপাধ্যায়, লালচাঁদ বড়াল প্রমুখ যে থিয়েটারের গান গেয়েছেন, সে গায়ন কখনও-ই ‘বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা’ হয়ে দেখা দেয়নি, যা ‘নটী’কণ্ঠে প্রকাশ পেয়েছিল। তিনের দশকে থিয়েটারের গানের প্রধান পুরুষ-কণ্ঠ কৃষ্ণচন্দ্র দে’র ‘সত্যের সন্ধান’ নাট্যের বা ‘সীতা’ নাট্যের গানের গায়ন স্বতন্ত্র উল্লেখের দাবিদার। কালের বিশুষ্ক বাতাসে একদিন থিয়েটারের গানের উছল-ধারা হারিয়ে গেলেও, চলমান চিত্রের সুরপটে সে ধরেছে অন্য মূর্তি। ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সত্যজিৎ রায়ের ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিতে ‘সুনয়না’র গাওয়া ‘ভালোবাসার তুমি কী জানো’ গানটির গায়নে যে পরিশীলিত অভিমান প্রকাশ পেয়েছে, তা যথার্থ ‘ফিল্মি’ বিষয় হলেও, বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে, নায়িকার ভাণ-ভালোবাসার নতুন উচ্চারণ আমাদের ফেলে আসা থিয়েটারি উত্তরাধিকারের কাছেই ঋণী করে রাখে।

Girish Chandra Ghosh gramophone gramophone record Miss Sashimukhi Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on