


অজস্র অশ্লীল যৌনগন্ধী শব্দের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল যৌনাঙ্গ ও সংশ্লিষ্ট নারী-পুরুষ সম্পর্কের রসায়নমূলক, যেমন ‘ঢেমন-ঢেমনি’, ‘মাং’, ‘নাং’ ইত্যাদি। ‘ঢেমন-ঢেমনি’ বা ‘ঢেমনাসাপ’ ত্রিমাত্রিক যৌন-নৃতাত্ত্বিক সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করে। ‘ঢেমন’ হল কামাতুর নাগর। ঢেমনি– কামুক যৌনসঙ্গী। ঢ্যামনাসাপ– উত্থিত পুরুষাঙ্গের প্রতীক। ঢেমনাসাপের প্রাগার্য নাম ‘ধামন’। মধ্যযুগীয় যৌনগন্ধী সংগীতের নাম ছিল খেউড়, ছ্যাঁচর, ছাড়াও ধামালী। বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকাব্যে যৌনগন্ধী গান বা ছড়া হিসাবে ধামালীর উল্লেখ আছে।
আলোকচিত্র: সুদীনবিথুন চ্যাটার্জী
৪৯.
নিকানো মাটির উঠোনে জোৎস্নার চন্দন। আলপানার আঁকিবুঁকির মাঝে পদ্ম, শাপলা দিয়ে সাজানো বেদি। তার উপরে অধিষ্ঠিত ভাঁজো। নৃত্যরতা মৃণ্ময়ী কুমারীদেবী। গলায় শালুকফুলের মালা। দু’ হাতে কাশফুলের চামর। চতুর্দিকে সাজানো শসপাতার সরা কপটে। কুচো ফলের নৈবেদ্য। পাঁচকলাই ভিজে। মোমবাতির নরম আলোতে সমগ্র পরিবেশ মায়াবী ও বিস্ময়কর হয়ে উঠেছে।
কিশোরী মেয়েরা সাজগোছ করে হাজির হয়েছে ভাঁজোতলায়। হাতে হাতে পুজোর অর্ঘ্য। সেগুলিও সাজানো হচ্ছে। ছেলেপুলে বয়স্ক মহিলা পুরুষরাও ভাঁজো দেখতে ভিড় জমাচ্ছে। নমো নমো করে পুজো সারতেই বেজে উঠল ঢোলকাঁসির যুগলবন্দি।

‘–দিধিন ধিন তাক্রু, তাক্রু… তাক্রু! কাঁই নানা– কাঁই নানা–’
একবার তেহাই মেরে সমে আসতেই বন্দনা ছড়া বলতে বলতে ভাঁজোকে প্রদক্ষিণ করে শুরু হল নাচ।
‘ভাঁজো লো কলকলানি মাটি লো সরা।
ভাঁজোর গলায় পড়িয়ে দেব পঞ্চফুলের মালা।।
পঞ্চফুল থোকা থোকা গলায় পরেছি।
বর্ধমানের কড়াই এনে নুচি ভেজেছি।।’
কোমরে এক হাত, অপর হাত উপরে তুলে খানিকটা বাম কাতে ভাঁজ হয়ে মণ্ডলাকারে নৃত্য। নিছক লোকনৃত্য নয়, ফসলের বেড়ে ওঠার শরীরী অভিনয়। লোকনৃত্যের এই বিশেষ ছন্দটির সঙ্গে ক্লাসিক্যাল ওড়িশি নৃত্যের ‘ত্রিভঙ্গ’ ও গুজরাটি ‘গর্বাচক্রে’র নৃত্যমুদ্রার মিল আছে। নাচ ও ছড়া চলবে সেই রাত দশটা অবধি। এর নাম ‘ছোটভাঁজোই’। অল্পবয়সী মেয়েরা মূলত এই পর্বে অংশগ্রহণ করে।

আসল নাচ মাঝরাত থেকে। তখন যুবতী বউঝিরা আসবে নাচতে। পুরুষের প্রবেশ সেখানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। চটের আড়ালে চলে যাবে বাজনদার। দু’ হাতে কাঁচের চুরি। চুলে বাহারি খোঁপা। নাকে নথ, মাথায় টায়রা। কাপড় পায়ের গোছের ওপরে ওঠানো। আলতা কামানো পা। নুপুরের রিনিঝিনি। কারও কারও সুরায় ঢুলু ঢুলু কাজল টানা দীঘল চোখ।
এর নাম ‘বড় ভাঁজোই’। তখন আর প্রচলিত ছড়া নয়। রঙের ছড়া। রসের ছড়া। খিস্তি খেউড়ের ছড়া। উদ্দাম নাচ আর ছড়া কাটাকাটি।
‘তোর যৈবনের লদীতে লাগে উথাল রসের ঢেউ।
কামড় দেবার ভোমর তোর জুটল নাকো কেউ।
লাগর হে!’
পালটি মেরে সই বলে,
‘শাগের গোঁড়া পটলা ছেঁড়া গা উসো খুসো
এখন তুমি বাড়ি যাও, ভোরবেলায় এসো।
লাগর হে!’
এসব ছড়া প্রকাশযোগ্য হলেও ‘রসের ছড়া’, ‘রঙের ছড়া’ তথাকথিত আধুনিক ভদ্রসমাজ ও ভদ্রসাহিত্যে ব্রাত্য। তারাশঙ্করের ‘হাঁসুলিবাঁকের উপকথা’য় কাহারপাড়ার বড় ভাঁজোইয়ের যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে সেখানে রং-রসের ছড়ার উল্লেখ থাকলেও কোনও দৃষ্টান্ত ইচ্ছে করেই হয়তো লেখক দেননি। কারণ এসব ছড়ায় অশ্লীল গালাগালি-বাচক শব্দের বাহুল্য দেখা যায়। যেমন–
‘মাঙের গাঙে বাঙ (বান) এসেছে চ্যাং ছিঙুরির টানে।
(তোকে) ঢেমনি বলে এমনি এমনি, ছুটিস নাঙের পানে।।’

অজস্র অশ্লীল যৌনগন্ধী শব্দের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল যৌনাঙ্গ ও সংশ্লিষ্ট নারী-পুরুষ সম্পর্কের রসায়নমূলক, যেমন ‘ঢেমন-ঢেমনি’, ‘মাং’, ‘নাং’ ইত্যাদি। ‘ঢেমন-ঢেমনি’ বা ‘ঢেমনাসাপ’ ত্রিমাত্রিক যৌন-নৃতাত্ত্বিক সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করে। ‘ঢেমন’ হল কামাতুর নাগর। ঢেমনি– কামুক যৌনসঙ্গী। ঢ্যামনাসাপ– উত্থিত পুরুষাঙ্গের প্রতীক। ঢেমনাসাপের প্রাগার্য নাম ‘ধামন’। মধ্যযুগীয় যৌনগন্ধী সংগীতের নাম ছিল খেউড়, ছ্যাঁচর, ছাড়াও ধামালী। বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকাব্যে যৌনগন্ধী গান বা ছড়া হিসাবে ধামালীর উল্লেখ আছে,
‘সব গোপী ছাড়ী বনমালী।
মোরে কেহ্নে বোলএ ধামালী।।’ (দানখণ্ড)
লক্ষ করার বিষয় হল, ‘ধামালী’ শব্দটিরও উৎস সংস্কৃত ‘ধামন’। মূলে হয়তো প্রাগার্য ‘ধামন’ অর্থাৎ ঢেমনাসাপ। লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ ড. ওয়াকিল আহমেদও মনে করেন, ধামালী বা ধামাইল প্রাগার্য লোকসংস্কৃতির আদিম গীতিনৃত্য। সুতরাং ভাঁজোর ‘ছড়া-নৃত্য’ ধামালীর গ্রাম্য সংস্করণ।
‘নাং’ শব্দটির মূলে আছে নগ্ন। বিশিষ্টার্থে উপপতি বা নাগর। ‘মাং’ শব্দটির সোর্স কোলমুণ্ডারি, যার অর্থ নারীর যোনি। (A Mundari English Dictionary, মণীন্দ্রভূষণ ভাদুড়ী) ভাঁজোর খিস্তিখেউড় আসলে প্রাগার্য যোনিপুজো বা মাতৃকা উপাসনার অবক্ষয়িত এক লৌকিক রূপ, যেখানে সৃষ্টি সম্পর্কিত মানব অঙ্গগুলিকে উচ্চারণ করা হয় আদিম যাদুবিশ্বাসে। ভাঁজোর সরা শেষপর্যন্ত নারীর যোনির প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। মিলে যায়, হরপ্পার শাকম্ভরী সিলমোহরের সেই নগ্ন মূর্তির যোনিদেশ থেকে নির্গত লতাপাতার ন্যারেটিভের সঙ্গে।

সুতরাং আমাদের কাছে এসব ছড়া অশ্লীল বলে মনে হলেও, যাঁরা ভাঁজোর পুজো করেন– তাঁদের কাছে মন্ত্র স্বরূপ। তাঁরা বিশ্বাস করেন, এই ছড়া কাটাকাটি শুনতে ভাঁজো ভালোবাসেন এবং এর ফলে জমিতে ফলন হবে উত্তম।
নৃতাত্ত্বিকদের মতে, মহিলাদের প্রজনন ক্ষমতা এবং প্রকৃতির উৎপাদন ক্ষমতা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। স্যার জেমস ফ্রেজার তাঁর ‘গোল্ডেন বাউ’ গ্রন্থে লিখেছেন, আদিম সমাজে বিশ্বাস ছিল মানুষের যৌনতা প্রজনন অঙ্গ বা কামোদ্দীপনার মাধ্যমে প্রকৃতিকে উত্তেজিত ও উর্বরা করা যায়।
সরায় ডালশস্য বা শনের নতুন চারা যখন বড় হচ্ছে, তার চারপাশে নিবিড় কামনাবাসনার পরিবেশ তথা আদিরসাত্মক ছড়া কাটাকাটি করে প্রকৃতির সৃজনীশক্তিকে বর্ধিত করা হচ্ছে। এটি আসলে অনুকরণাত্মক জাদুবাদের দৃষ্টান্ত। মূলকথা হল প্রকৃতিতে যা ঘটাতে চায়– আচারের মাধ্যমে মানুষ তার হুবহু অনুকরণ করে।
তাঁরা বিশ্বাস করতেন, গাছে ফুলফল আসা উদ্ভিদের যৌন মিলনের ফল। সেই কারণে মেয়েরা যৌনতার এমন এক আবহ সৃষ্টি করে, যাতে প্রকৃতির কাম উত্তেজনাকে বর্ধিত করা যায়। সুতরাং ফ্রেজারের দৃষ্টিতে ভাঁজোর ব্রতিনীরা সুনিপুণ অভিনেত্রী। ‘সরা’ নামক ল্যাবরেটরিতে আদিরসাত্মক নাচ-ছড়ার মাধ্যমে রবিচাষের রূপকটিকে ফুটিয়ে তুলছেন। এটাই আন্তর্জাতিক শস্যদেবীর পুজোর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

দেবী দুর্গাও তার ব্যতিক্রম নন। ভাঁজোকে ‘দুর্গার বড়দিদি’ বলে লোকসমাজে। দুর্গাও আদিতে শস্যদেবী শাকম্ভরী রূপেই পূজিত হতেন। গবেষকদের মতে, দেবী দুর্গার মহিষমর্দিনী রূপটি শস্যদেবীর তুলনায় অর্বাচীন। শাকম্ভরী রূপের পুজোটিও আজও রাঢ়বঙ্গে পত্রিকা বা মুণ্ড রূপের দুর্গা আরাধনায় লক্ষ করা যায়। পত্রিকাপুজো আসলে নির্বাচিত গাছ, পাতা ও ফলের সমন্বয়ে গঠিত। ভাঁজোর আরাধনায় অঙ্কুরিত শস্য প্রধান উপকরণ।
ভাঁজোর মতো দুর্গাপুজোতেও একসময় আদিরসাত্মক নাচ-গান, অশ্লীল ভঙ্গির প্রচলন ছিল। তার নাম শাবোরৎসব। কালিকাপুরাণ রঘুনন্দনের তিথিতত্ত্বে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে। উনিশ-বিশ শতকে অনেক বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোয় নবমীর রাতে দেবীর সম্মুখে আদিরসাত্মক খেউড় গান করা বিধিবদ্ধ রীতি ছিল। তার নাম ছিল ‘নবমীর খেউড়’।
আরও দু’টি গৌণ কারণ এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের নিজস্ব কামনা-বাসনার প্রকাশ করার কোনও স্বাধীনতা ছিল না। সারা বছর ধরে জমে থাকা আবেগ যৌনচেতনা ইত্যাদি ছড়া কাটাকাটির মধ্যে প্রকাশ পায়। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে ‘ক্যাথারিসিস’ বলে। গ্রাম্যভাষায় এর নাম ‘মুখে ভাঙা’। রাঢ়ের লোক-উৎসবে এই প্রক্রিয়াটি খুব স্বাভাবিকতার সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। যেমন শিবের গাজনে ‘চোতক্ষেপা’র কার্যকলাপ। ‘যেমন খুশি সাজো’র ঢঙে মানুষ তথাকথিত অশ্লীল নাচগান আমোদ-কৌতুক করে থাকেন এবং সেদিন লোকে খারাপ বা অশ্লীল মনে করে না।

দ্বিতীয়ত, প্রাগার্য তান্ত্রিক বা লোকজ সহজিয়া দর্শনের জন্য রাঢ় অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকে সুপরিচিত। লোকজ তান্ত্রিক বা দেহবাদে কাম বা যৌনচেতনাকে কোনওদিন পাপ বলে মনে করেনি। বরং আদিরসকে সৃষ্টির আদিম সৃজনী শক্তির প্রকাশ বলে মনে করত।
ভোর থেকে শুরু হয় ‘বাসিভাঁজো’। ভাঁজোতলায় ছোট ছোট মেয়েরা পুনরায় নাচের পর বিসর্জনের জন্য নদীতে যায়। একইভাবে অন্যান্য দলও নদীর ঘাটে আসে। শুরু হয় একপ্রস্থ দলগত ছড়া কাটাকাটি। ভাঁজো বিসর্জন দিয়ে সরার অঙ্কুরগুলি বাড়িতে নিয়ে এসে বিভিন্ন দেবস্থানে অর্ঘ্য হিসাবে প্রদান করার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
আলবিরুনির ‘তহকিক-ই-হিন্দ’ (সম্পা. কেয়ামুদ্দিন আহমেদ পৃ. ২১৪) গ্রন্থের ৭৬ অধ্যায় থেকে জানা যায়, সেকালে ভাদ্রমাসের তৃতীয়াতে মহিলারা একধরনের ব্রত পালন করতেন। তার নাম ‘হরবালী’ বা ‘হরিতালী’। ব্রতের নিয়ম অনুযায়ী মহিলারা পাত্রে বিভিন্ন ধরনের বীজ বপন করে পুজোর দিনে সদ্যোদ্গত অঙ্কুরে ফুলের পাপড়ি এবং সুরভিত জলের ছিটে দিয়ে রাত জেগে উৎসব পালন করতেন। পরের দিন সকালে পুষ্করণী বা নদীতে বিসর্জন দিতেন।
আলবিরুনি কথিত অঙ্কুরোদ্গমের উৎসবটি মূলত ভারতের উত্তর, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে অনুষ্ঠিত হত। উত্তর ভারতে নবরাত্রির অঙ্গ হিসাবে হরিয়ালি বা ক্ষেতড়ি উৎসব আজও প্রচলিত অনুষ্ঠান। নবরাত্রির শুরুতে যব বা বার্লি অঙ্কুরিত করতে দেওয়া হয় মাটির পাত্রে। নয় দিন ধরে জলের ছিটা দিয়ে দশেরায় বিসর্জন করা হয়। একে বলে ‘ক্ষেতড়ি বীজনা’।

উত্তর ভারতের এই আদিম শস্য-আচারটি রাঢ় অঞ্চলে ভাঁজো ব্রতের আকার নিয়েছে। ক্ষেতড়ি বীজনাতেও সম্ভবত আদিতে রসের গান বা ছড়া নিঃসন্দেহে প্রচলিত ছিল। দ্রুত আর্যীকরণ হবার ফলে লুপ্ত হয়েছে। কিন্তু নাগরিক পরিমণ্ডল বা ব্রাহ্মণ্যধর্মের ঘেরাটোপের বাইরে থাকার জন্য ভাঁজোর ক্ষেত্রে সেটি সম্ভবপর হয়নি।
যদিও বড় ভাঁজোই বর্তমানে লুপ্ত হয়ে গেছে।
বাংলায় সেনযুগেও যে ভাঁজো উৎসবটি হত– তার প্রমাণ মেলে ‘সেখশুভোদয়া’ গ্রন্থের একটি ছড়া-গানে। ভাদ্রমাসে ব্রতোপলক্ষে মেয়েরা গঙ্গায় (অঙ্কুরিত) সরা-মালসা ভাসিয়ে গান করতে করতে বাড়ি ফিরছিল। দুই ডাকিনী তাদের সঙ্গে মিশে যায়। অলৌকিক ক্ষমতাধারী সেখ মন্ত্রশক্তির সাহায্যে তাদের গতি রোধ করে। তখন তারা অনুরোধ করে ছড়া কাটে–
হঙ যুবতি পতিয়ে হীন
গঙ্গা সিনাইবাক জাইয়ে দিন।
দৈব নিয়োজিত হইলো আকাজ।
বায়ু না ভাঙ্গ ছোট গাছ।।
ছাড়ি দেহ কাজু মুঞি জাঙ ঘর।
সাগর মধ্যে লোহার গড়।।
ড. সুকুমার সেন ছড়াগানটি প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘ভাদুগানের সবচেয়ে পুরানো নিদর্শন বলিয়া গ্রহণ করা যায়’। (বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, পৃ. ৮৪) কিন্তু এটি ভাদুগান নয়, ভাঁজোর ছড়াগান। ‘শেখশুভোদয়া’র লেখক হলায়ুধ মিশ্র ১৯ পরিচ্ছেদে গানটির প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘তস্মিন সময়ে ভাদ্রমাসে সর্বে গ্রামিণ্যঃ হস্তে কৃত্বা মালসা সরাব ভাজা ইতি খ্যাতঃ’। এখানে ভাদ্রমাস ও ভাজা (ব্রত) দু’টি আলাদা শব্দে নির্দিষ্ট হয়েছে। ভাজাব্রত বর্তমানে ‘ভাজোই’ বা ‘ভাঁজো’ নামে সুপরিচিত, ভাদু নয়।

দ্বিতীয়ত, ভাদুর সঙ্গে ভাঁজোর মিল থাকলেও মূল পার্থক্য হল ভাদুতে অঙ্কুরিত শস্যের সরা মালসা ভাসানের কোনও আচার বা প্রসঙ্গ নেই। এটি ‘বাসি ভাঁজো’র সরা ভাসানোর আচার।
সুতরাং উক্ত ছড়াগানটি ভাঁজোর প্রাচীনতম সাহিত্যিক নিদর্শন।
…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব ………….
পর্ব ৪৮: ভাঁজো আমাদের আদি কৃষি-লোকবিজ্ঞান
পর্ব ৪৭: মাঠ মাটি মানুষ
পর্ব ৪৬: গুজব কিংবা হুপুই: সে যুগের ‘ভাইরাল’
পর্ব ৪৫: সর্প হয়ে দংশন করো, ওঝা হয়ে ঝাড়ো
পর্ব ৪৪: অলৌকিক জলযাত্রা
পর্ব ৪৩: হরেক রকম হুড়ুম
পর্ব ৪২: মাহেশের রথের সারথি
পর্ব ৪১: জগন্নাথের শবরযোগ
পর্ব ৪০: ভিটের ভাস্কর্য
পর্ব ৩৯: হারানো নদীপথ, হারানো জলরেখা
পর্ব ৩৮: বর্ষামঙ্গল
পর্ব ৩৭: তরুর ঠাকুরঘর
পর্ব ৩৬: জাল রাজার রাজনীতি
পর্ব ৩৫: ঢেঁকি মোটেই অকম্মার নয়
পর্ব ৩৪: বহুরূপে সম্মুখে তোমার
পর্ব ৩৩: আলকাপ: বিরল মায়ার স্মৃতিচিহ্ন
পর্ব ৩২: তালবাহার
পর্ব ৩১: পোড়ামাটির শিল্পকে জনপ্রিয় করেছে কাঁঠালিয়ার শিল্পীরা
পর্ব ৩০: মৎস্য দেবতা মৎস্য ভোগ
পর্ব ২৯: কুবের পুজোর আচার থেকেই সোনা কেনা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়
পর্ব ২৮: বৈশাখ বিষ্ণুর প্রিয়, পুরাণের শ্রেষ্ঠ মাস?
পর্ব ২৭: গর্জন থেকেই গাজন
পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?
পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের
পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল
পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?
পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন
পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া
পর্ব ২০: মাদারি কা খেল
পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়
পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর
পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা
পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে
পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম
পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন
পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান
পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি
পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল
পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই
পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?
পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব
পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!
পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই
পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা
পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত
পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস
পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর
পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved