madar pir culture and kama worship in bengal by Swapan Kumar Thakur
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

মাদারি কা খেল

বাঁশ নিয়ে শুধু পির-কেন্দ্রিক উৎসব নয়; উত্তরবঙ্গে বাঁশ– যৌনতা, প্রজননের প্রতীক হিসাবে মদনকাম বা কামদেবের পুজোয় ব্যবহৃত হয়। বসন্তকালে মদন বাসন্তী শুক্ল ত্রয়োদশী ও চতুর্দশীতে কামদেবের পুজো একসময় সর্বভারতীয় উৎসব ছিল। সেখানে অবশ্য মূর্তির মাধ্যমে পূজিত হতেন কামদেব। কিন্তু উত্তরবঙ্গে বাঁশের প্রতীকে তিনি পূজিত হন। লোকশ্রুতি– মদন হলেন কামদেবের পুত্র। দীর্ঘ একটি বাঁশকে লাল কাপড়ে সজ্জিত করে মদনকাম পূজিত হন। পুজোয় লাগে চালগুঁড়ি দুধ চিনি দ্বারা পাকানো এক বিশেষ নাড়ু।

Published by: Robbar Digital

Posted:February 19, 2026 8:07 pm | Updated:February 20, 2026 8:18 pm  
Facebook WhatsApp Messenger
madar pir culture and kama worship in bengal by Swapan Kumar Thakur

২০.

দম মাদার! দম মাদার! মাদারি কা খেল!

পাক্কা ২৬ ও ২৪ হাত লম্বা জোড়া বাঁশের নাচন-কোঁদন। আবার শুধু ঝাড়ের বাঁশও নয়। অসমাপ্ত মহব্বতের নায়ক-নায়িকা– মামা ও ভাগ্নির বিয়ের আয়োজন।

একজনের গায়ে জড়ানো লাল-সাদা কাপড়। অন্যজনের লাল-সবুজ। মাথায় চমরি গাইয়ের উমরো-ঝুমরো চুল। বাঁশের গায়ে অগুনতি রঙবেরঙের মানত করা রুমাল। কোথাও বা গিঁটে-গিঁটে ঝুলছে পাকা কলার ছড়া। 

দরগাতলায় পরে ঢোলের জারি। ঢোল-কাঁসি আর সানাই বাদনের যুগলবন্দিতে বাঁশ নাচাতে শুরু করেন মাদার ভক্তরা। বাজনার তালে-তালে বাঁশ কখনও হাতের তালু, পেট, ঘাড়, কপাল, বুক ছুঁয়ে যায় চমৎকার গতি বিক্ষেপে। 

নাটকীয় মূর্ছনা আর সাবলীল ব্যালেন্সের কয়েকটি নান্দনিক চিত্রমালা। খেমটি নাচ, একঘেয়ে নাচ, ঘোড়া কিংবা জংলি নাচের হরেক কিসিমের তালে-তালে মাদার নাচে জবর।

zoom
মাদার পিরের আস্তানা

কখনও মাদার যায় ‘খেপে’। অন্য ভক্ত সামাল দেয়। সে তখন মাটিতে উপুর হয়ে পড়ে। মুখ ঘষে। ভর হয়। শ্লথ হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় আলতা-মাখা চেরা তালপাতার ছোট বা গুচ্ছ। ভক্তের বৃত্তটি তখন সমস্যার বৃত্তান্ত কবুল করতে থাকে।

মাদার দেয়াসিন জানুতে আঘাত করে আর ভাঙা হিন্দিতে বিড়বিড় করে কী সব বলে খাদিমকে। তিনি আবার পল্লবিত করেন মুশকিল আসানের টোটকাকে। ভক্তদের ওষুধ বাতলে দেন। মুশকিল আসান করেন। তারপর একসময় ভূমিসজ্জা থেকে তড়াক করে উঠে পুনরায় নাচাতে শুরু করে মাদার।

পির-কেন্দ্রিক সুফিধর্মের অন্যতম সিলসিলা মাদারি সম্প্রদায়। লোকপুরাণ অনুসারে বেহেস্ত থেকে একবার হারুত আর মারুত নামে দুই ফেরেস্তা নামে মর্তে। এক সুন্দরী আওরতের সঙ্গে পেয়ার আশনাই-এ জড়িয়ে পড়ে। জন্ম হয় মাদারের। এক দেবকল্প শিশু।

ঐতিহাসিকদের মতে চতুর্দশ শতকের বিখ্যাত সুফি সাধক বদিউদ্দিন মাদার ছিলেন এই সিলসিলার প্রবর্তক। তাঁর তিরোভাবের বার্ষিক অনুষ্ঠান মাদার উৎসব। ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানে মাদার সাহেবের জন্মদিন পালিত হয় রবিউল আউয়াল মাসের ১৭ তারিখে। এই দিন ভক্তরা একটা মানত করা কালো গাইগোরু কুরবানি দিয়ে মাংস বিতরণ করে। একে বলে গাইলুটনা ।

পূর্ববঙ্গে, বিশেষ করে ফরিদপুর অঞ্চলে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে মাদার-পির। এখনও মাদার-পিরের বাৎসরিক উৎসব উপলক্ষে বাংলাদেশে বন্দনা পালাগান ও ছুকরি নাচ হয় জম্পেশ। আমাদের বাংলায় আঠেরো শতকের মন্দির-টেরাকোটা ফলকে মাদারনাচের খোদাইচিত্র দেখে বোঝা যায় এর কী দারুণ জনপ্রিয়তা ছিল একসময়। 

পূর্ব বর্ধমান জেলায় কড়ুই কৈতন আলমপুর ঔরঙ্গাবাদ, কেতুগ্রামের জ্ঞানদাস কাঁদরা আরগন খাসপুর খলিপুর বামুনডি প্রভৃতি গ্রামে জৈষ্ঠ মাসে মাদার-পিরের উৎসবে সামিল হন প্রান্তিক শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের মুসলমানগণ। তথকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দু নরনারীরাও মাদার লোকউৎসবে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

zoom
সাঁকো পির

মাদার উৎসবের তিনটি অঙ্গ– মাদারে পালনীয় আচার কৃত্যাদি, মাদার নাচ ও মাদারের বিয়ে। তবে বিয়ের অনুষ্ঠান আর হয় না বললেই চলে। পাটুলি কাঁদরায় কোনওরকমে এখনও টিকে আছে। মাদার উৎসবের সময় মেলা বসে কেতুগ্রামের আর্গন গ্রামে। লোকসংস্কৃতির গবেষক মুহম্মদ আয়ুব হোসেন আমাকে আমাকে একটি মাদার ছড়া দিয়েছিলেন। সেখানে ভ্রাম্যমান মাদারের উপস্থিতি আগে কোন কোন গ্রামে হত, তার নির্দেশিকা আছে–

তিলডাঙা ভবানীবেড়া
বাঁকুই বাঁশড়া
শামুক শিয়ালা
সূচপুর রাউতাড়া
সাইলোর ডাঙাপাড়া
নতুনগাঁ কাজিপাড়া।।

রাজুর রাইখাঁ
রতনপুর কাটারি
আরগুন খাসপুর
মাদার যায় বাড়ি বাড়ি

ঢেমুন মেয়ের আঠারো কলা
যদি যায় পাপুড়ি
তো বলে যায় খলা।।

প্রিয় পাঠক, বুঝতেই পারছেন– মাদার উৎসব কী জনপ্রিয় ছিল বর্ধমান বীরভূমের সীমান্তবর্তী এই সকল গ্রামে।

zoom
পিরতলায় মাটির ঘোড়ার স্তূপ

সাধারণত অমাবস্যা পূর্ণিমা বাদ দিয়ে কোনও এক রবিবারে উৎসবের সূচনা। মাদার-ভক্ত হিন্দু-মুসলমান নরনারীরা পিরের মাজারে বা দরগাতলায় সন্ধের দিকে হাজির হন। খাদিমের নির্দেশে স্থানীয় পির-পুকুরে গত বছরের মাদার বাঁশদু’টি খুঁজে নিয়ে আসা হয় দরগাতলায়।

সোমবারে কাটা হবে ২৬ ও ২৪ হাত দু’টি নতুন বাঁশ। বৃহস্পতিবারে দু’টি অনুষ্ঠান; দিনের বেলায় আইবুড়ো ভাত অর্থাৎ দুধ-পায়েসের বিশেষ সিন্নি। রাতে ঢোল-সানাইয়ের বাজনা আর পুরনো দু’টি মাদার নিয়ে লাকড়া ভাঙার পর্ব। শুকনো কুলকাঠ ভাঙা হয় এদিন। 

অনুষ্ঠানটির সঙ্গে মিল রয়েছে শিব বা ধর্মরাজের গাজনের লাকরা ভাঙার প্রথার। রবিবারের সকালে প্রথমে মাদারের স্নান। তারপর মাদার সাজানো। রাতে কুলকাঠের আগুন– আঙারে ভক্তরা হাঁটে আর মাদার নিয়ে সুরেলা গলায় ডাকে: দম মাদার! দম মাদার!

এদিন কোথাও কোথাও চলে গান-বাজনা। আতশবাজির প্রদর্শন।

মাদারের বিয়ের অনুষ্ঠান হলে প্রথমে ‘রুমভোলা’ অর্থাৎ নবান। চিনি দুধ কলা আতপ চালের সঙ্গে মিশিয়ে মাদার পিরের সিন্নি। রবিবার সকালেই গায়ে হলুদ। বাঁশে মাখানো হয় তেল-হলুদ। পরে জোড়া মাদারকে নিয়ে যাওয়া হয় স্নান করাতে। স্নানের পর খাদিম পিতলের কোঁড়ল অর্থাৎ কলসি মাথায় নিয়ে ধান দুর্বা আর আমের শাখা-সহ বিশেষ ঘট নিয়ে আসে পুকুর থেকে। সোমবার ভোরে বিয়ে। ছেলেমেয়ের বিয়েতে যা যা লাগবে সব হাজির করা হয় মাদারতলায়।

মামা-ভাগ্নির দু’ তরফের দু’জন উকিল আসেন। বিয়ের কাপড়চোপড় তত্ত্বতালাশ দু’ পক্ষই বুঝে নেন। এবার দু’ পক্ষের উকিলের কথাকাটাকাটি শুরু হয় ভাঙা হিন্দিতে। ‘এটা কই? সেটা কই?’ ইত্যাদি নিয়ে শুরু ধীরে ধীরে বাক-বিতণ্ডা-হাঙ্গামা। হঠাৎ একপক্ষ বলে ওঠেন– ‘মাদারের বিয়ে নাহি হোঙ্গা। মামা-ভাগ্নি হ্যায়। এ বিয়ে নাহি দুঙ্গা…’

বেজে ওঠে ঢোল কাঁসি সানাইয়ের লাগনাই বাজনা। শুরু হয় মামা-ভাগ্নি মাদারের রঙবাহারি নাচ। এর সঙ্গে বেশ মিল রয়েছে মাঝিগ্রামের শাকম্ভরীদেবীর সঙ্গে দেউলেশ্বরের শেষপর্যন্ত বিয়ে না-হওয়ার আচার-কৃত্যাদিতে। মামা-ভাগ্নির বিয়ের প্রসঙ্গে সুফি দর্শনের যত গূঢ় তত্ত্বকথাই থাকুক না কেন, এটি এক প্রাচীন বিবাহ-প্রথা। অতুল সুরের ‘ভারতের বিবাহের ইতিহাস’ (পৃ. ১৭) থেকে জানা যায়– দক্ষিণ ভারতে মামা-ভাগ্নির বিয়ে একসময়ে প্রচলিত ছিল।

zoom
মদনকামের পুজো

মাদার উৎসবকে শরিয়তপন্থী মুসলমানদের অনেকেই ‘ইসলাম বিরোধী’ বলে মনে করেন। অনেকেই বলেন ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত তথাকথিত নিম্নবর্ণের ডোম-চাঁড়ালদের এটি বাৎসরিক উৎসব। বাঁশের কাজ ও বাঁশবাজি ডোম-চাঁড়ালদের প্রাচীন পেশা। ঈশানচন্দ্র ঘোষ অনুদিত জাতকের চতুর্থ খণ্ডের চিত্র-সম্ভূত জাতকের উল্লিখিত দুই চণ্ডালের জীবিকা ছিল ‘বংশী ধোপন’ অর্থাৎ বাঁশবাজীর খেলা।

বাঁশ নিয়ে শুধু পির-কেন্দ্রিক উৎসব নয়; উত্তরবঙ্গে বাঁশ– যৌনতা, প্রজননের প্রতীক হিসাবে মদনকাম বা কামদেবের পুজোয় ব্যবহৃত হয়। বসন্তকালে মদন বাসন্তী শুক্ল ত্রয়োদশী ও চতুর্দশীতে কামদেবের পুজো একসময় সর্বভারতীয় উৎসব ছিল। সেখানে অবশ্য মূর্তির মাধ্যমে পূজিত হতেন কামদেব। কিন্তু উত্তরবঙ্গে বাঁশের প্রতীকে তিনি পূজিত হন। লোকশ্রুতি– মদন হলেন কামদেবের পুত্র। দীর্ঘ একটি বাঁশকে লাল কাপড়ে সজ্জিত করে মদনকাম পূজিত হন। পুজোয় লাগে চালগুঁড়ি দুধ চিনি দ্বারা পাকানো এক বিশেষ নাড়ু।

মাদার বাঁশের সাজসজ্জার সঙ্গে প্রাচীন ইন্দ্রধ্বজোৎসবের ইন্দ্রধ্বজের রূপসজ্জার চমৎকার মিল দেখা যায়। বৃহৎ সংহিতার ৪৩ অধ্যায়ে বরাহমিহির ইন্দ্রধ্বজোৎসব নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি দিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ধ্বজ বা দণ্ডের সজ্জা। ইন্দ্রের ধ্বজে নানা ধরনের বস্তু দিয়ে অলঙ্কৃত করা হত– ছত্র, গোলাকৃতি দর্পণ, চন্দ্রাকৃতি অলংকার, ছোট-ছোট বাক্স-পেঁটরা, নানা রঙের ফুল, কলার ছড়া, আখের টুকরো, সাপের প্রতিকৃতি, সিংহ বা অন্যান্য পশুর লাঙ্গুলের চুল ইত্যাদি।

zoom
কামদেব

মালদা তথা বরেন্দ্রভূমির অন্যতম লোকউৎসব হল ‘গম্ভীরা’ বা শিবের গাজন। ৩০ চৈত্র হয় গাজন উপলক্ষে আহারাপূজা। ‘আহারা’ শব্দটির অর্থ আহার বা ভোজন। গাজনের উপসংহার। মাশান নাচের পর থাকে হর-পার্বতীর পুজোর হোম এবং ব্রাহ্মণ ও কুমারী ভোজন। ভোজনের পর একটি কাঁচা বাঁশ গম্ভীরার পাশে পোঁতা হয়। বাঁশের মাথায় থাকে কলার মোচা এবং কাঁচা আমের থোকা। তবে মাদারের মতো বাঁশের নাচন-কোঁদন আহারায় দেখা যায় না।

………………..পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব………………..

পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়

পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর

পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা

পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে

পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম

পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন

পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান

পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি

পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল

পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই

পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?

পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব

পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!

পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই

পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা

পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত

পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস

পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর

পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প

bengali folk culture Folk culture madari pir cult Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on