Robbar

মাহেশের রথের সারথি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 22, 2026 1:19 pm
  • Updated:July 22, 2026 1:19 pm  

বর্ধমান রাজাদের কাটানো দিঘির উত্তরপাড় অতিক্রম করে রাস্তার ধারে ঠাকুরপাড়া। কমলাকর পিপিলাইয়ের বংশধরদের বসতি। ঠাকুরপরিবারের অধিকাংশই জীবন জীবিকার প্রয়োজনে বাংলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। কমলাকর পিপিলাই প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ ও গোপীনাথ রয়েছেন ছোট মন্দিরে। মূল রাস্তার ধারে ছোট দোলমঞ্চ। জগন্নাথ মূর্তিটি সম্ভবত মাহেশের স্মৃতি বহন করে চলেছে। 

স্বপনকুমার ঠাকুর

৪২.

প্রায় সকলেই জানেন, ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম জগন্নাথের রথযাত্রা পালিত হয় হুগলির মাহেশে। এবং সে রথযাত্রা পুরীর আদলে প্রথম শুরু করেন নিত্যানন্দের দ্বাদশ গোপালের অন্যতম গোপাল-কমলাকর বা কমলাকান্ত পিপিলাই।

কিন্তু অনেকেই বোধহয় জানেন না, কমলাকর পিপিলাই মাহেশের ভূমিপুত্র হলেও পূর্ব বর্ধমানের একটি জনপদে শ্রীপাট স্থাপন করে বসবাস করেছেন আমৃত্যু। সেই শ্রীপাট লুপ্ত হলেও তাঁর বংশধরেরা এখনও সেই গ্রামে বাস করছেন।

মহাপ্রভুর মহাকাব্যে নিত্যানন্দ ব্রজের বলাই। শ্রীচৈতন্যের আদেশে নীলাচল থেকে তিনি ফিরে এলেন বাংলায়। সঙ্গে তাঁর ভাবানুগামীরা। দু’চোখে জেগে উঠল বৃন্দাবন। সেই যমুনার নীপবন। সেই গোচারণভূমি। সেই ব্রজের রাখালবৃন্দ শ্রীদাম, সুদাম, দাম, মহাবল, বসুদাম…। গঙ্গা তখন ‘নীল যমুনার জল’।

নবদ্বীপের নিতাই বাড়ির কাষ্ঠনির্মিত নিত্যানন্দ প্রভুর বিগ্রহ

নিত্যানন্দের একান্ত ঘনিষ্ঠজন অভিরাম, সুন্দর ঠাকুর, ধনঞ্জয় পণ্ডিত, গৌরীদাস, কমলাকর পিপিলাই প্রমুখ ভক্তবৃন্দ। তাঁরা তখন ব্রজের দ্বাদশ গোপাল। এক একটি অলৌকিক চরিতামৃত যেন। 

শুধু ভাবে নয়, গোপালদের রূপেও এল পরিবর্তন। গোপবেশ, বেণুকর, মাথায় শিখীপাখা। চরণে রুনুঝুনু নুপূর। নিত্যানন্দের নির্দেশে তাঁর প্রিয় গোপালবৃন্দ বৈষ্ণবধর্ম প্রচারের জন্য গাঙ্গেয় বাংলায় ছড়িয়ে পড়লেন।

নামসংকীর্তনে, গানে, কাব্য রচনায়, হরি ও গৌরকীর্তনে মজে উঠল গৌড়-বাংলা। গোপালবৃন্দের বাসভূমিকে কেন্দ্র করে তৈরি হল গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের নব্য প্রচারক্ষেত্র। নতুন নামকরণ হল– ‘শ্রীপাট বাড়ি’। 

দ্বাদশ গোপাল এবং তাঁদের শ্রীপাট-সংক্রান্ত প্রথম উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেন শ্রীঅমূল্যধন রায় ভট্ট। ১৩৩১ বঙ্গাব্দে রচিত গ্রন্থের নাম শ্রীশ্রীদ্বাদশ গোপাল বা শ্রীপাটের ইতিবৃত্ত। তিনি লিখেছেন (পৃ. ১-১৩), শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলায় সখাগণের নাম গোপাল। গোপালরা চার ভাগে বিভক্ত– যথা সুহৃৎ, সখা, প্রিয়সখা এবং নর্মসখা। শ্রীনিত্যানন্দ গোপাল পদমর্যাদায় অভিষিক্ত করেছিলেন ১২ জন ঘনিষ্ঠ অনুগামীকে। এঁরাই ‘দ্বাদশ গোপাল’ নামে বিখ্যাত। 

তবে গোপালের সংখ্যা নিয়ে গোলযোগ আছে। লোচনদাসের চৈতন্যমঙ্গলের সূত্রখণ্ডে দ্বাদশ গোপালের কথা থাকলেও মাত্র আটজন গোপালের নাম আছ। কবি কর্ণপুর গৌরগণোদ্দেশদীপিকায় ১৫ জন গোপালের নাম লিখেছেন। তবে দু’টি তালিকাতেই কমলাকর পিপিলাইয়ের নাম উল্লিখিত হয়েছে।

শ্রীখণ্ডের কবি রামগোপাল দাস রসকল্পবল্লী-সহ ‘পাটনির্ণয়’ নামে ক্ষুদ্র বই রচনা করেন। গ্রন্থে আটটি ধাম, বারোটি মহাপাট এবং বারোটি শ্রীপাট সবমিলিয়ে ৩২টি পাটবাড়ির কথা আছে। দ্বাদশ গোপালের শ্রীপাট-সংক্রান্ত সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য বই অভিরাম দাসের পাটপর্যটন।

অম্বিকাচরণ ব্রহ্মচারী বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় (দ্বিতীয় সংখ্যা ১৩১৮ সন) পুথিটি ছাপেন। রচনার নাম ‘পাট-পর্য্যটন এবং শ্রীঅভিরাম ঠাকুরের শাখানির্ণয়’; (পৃ. ১০৭-১১২) পুথিটি অন্তত সতেরো শতকের শেষার্ধে রচিত হয়েছিল। গ্রন্থে পাঁচটি ধাম ছাড়াও দ্বাদশ গোপালের শ্রীপাট ১২টি এবং ১৭টি প্রখ্যাত বৈষ্ণব ভক্তদের নিবাস-সহ মোট ৩৪টি শ্রীপাটের কথা আছে। 

আদি মাহেশের রথযাত্রা, উনিশ শতকের ছবি

কমলাকর সম্পর্কে খুবই কম তথ্য জানা যায়। চৈতন্যচরিতামৃতের আদি খণ্ডের একাদশ পরিচ্ছেদে উল্লিখিত হয়েছে, তিনি নিত্যানন্দের শাখাভুক্ত ছিলেন। প্রেমভক্তির জন্য ভক্তসমাজে শ্রদ্ধা ও ভক্তির পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। চৈতন্যভাগবতে তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে– ‘পণ্ডিত কমলাকর পরমা উন্মাদ’। জয়ানন্দ লিখেছেন, ‘নিজ অঙ্গ কাটিল তবু বাহ্য জ্ঞান নাই’। (উত্তর খণ্ড)

সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বৈষ্ণব অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখা যায়। পানিহাটিতে রঘুনাথদাসের দধিচিড়া উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন। কাটোয়ায় দাস গদাধরের প্রয়াণ মহোৎসব-সহ খেতুড়ি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। অনুমান করা যায়, কমলাকর পিপিলাই ষোল শতকের শেষের দিকে প্রয়াত হয়েছিলেন। কেননা এরপর আর কোনও প্রাচীন গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে তথ্যাদি মেলে না।

কমলাকরের ‘পিপিলাই’ উপাধি নিয়ে একসময় যথেষ্ট বিভ্রান্তি দেখা গিয়েছিল। চৈতন্যচরিতামৃতের কালনা সংস্করণে লেখা হয়েছিল, ‘একদা শ্রবণ সময়ে নয়নে পিপ্পলীচূর্ণ প্রদান করত অশ্রু নিঃসরণ করায় মহাপ্রভু ইহার নাম পিপ্পলাই রাখিলেন।’ গবেষক রমাকান্ত চক্রবর্তীও সেই ভুল তথ্য সম্পর্কে নীরব ছিলেন (বঙ্গে বৈষ্ণবধর্ম গ্রন্থ, আনন্দ সংস্করণ, পৃ. ১০২)। আসলে, ‘পিপিলাই’ রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের প্রাচীন গাঁইনাম।

নগেন্দ্রনাথ বসু তাঁর ‘বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ বিবরণ’ গ্রন্থে লিখেছেন, পিপ্পলি বা পিপলাই গ্রামটি বীরভূম জেলার মল্লারপুরের কাছে অবস্থিত। (পৃ. ১৩৬)। অনেকে বর্ধমান জেলার মন্তেশ্বর থানার পিপলনকে গ্রামকেও নির্দেশ করেন। গ্রামনাম পিপ্পলি থেকে পিপিলাই পদবীটি এসেছে। যেমন মনসামঙ্গলকাব্যের প্রাচীন কবির নাম বিপ্রদাস পিপিলাই।

আদিতে কমলাকরের কোথায় শ্রীপাট ছিল তা নিয়ে পরস্পর বিরোধী তথ্য রয়েছে। বৃন্দাবনদাস লিখেছেন নিত্যানন্দ তাঁকে সপ্তগ্রাম দান করেন। কিন্তু রামগোপালদাসের পাটনির্ণয় থেকে জানা যায় সপ্তগ্রামে উদ্ধব মিশ্র ও সুগ্রীব মিশ্রের শ্রীপাট ছিল। পাটপর্যটনে সপ্তগ্রামের কৃষ্ণপুরে উদ্ধারণদত্তের শ্রীপাট উল্লিখিত হয়েছে। জয়ানন্দ লিখেছেন, কমলাকরকে পানিহাটি দান করা হয়েছিল। পাটনির্ণয় ও পাটপর্যটনে পানিহাটি রাঘব পণ্ডিত, দয়মন্তী এবং শ্রীরামদাস ঠাকুরের শ্রীপাট হিসাবে চিহ্নিত।

একমাত্র অভিরামদাসের পাটপর্যটনে কমলাকর পিপিলাইয়ের জন্মস্থান ও শ্রীপাট সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে। কবি লিখেছেন,

আকনা মাহেশে জন্ম জাগেশ্বরে স্থিতি।
কমলাকর পিপিলাই এই সে নিশ্চিতি।।

কমলাকর মহাবল পূর্বনাম হয়।।

কমলাকরের জন্মস্থান আকনা-মাহেশ গ্রাম। তিনি ব্রজের মহাবল গোপাল। তাঁর শ্রীপাট ছিল জাগেশ্বর গ্রামে। 

প্রখ্যাত বৈষ্ণবসাহিত্য গবেষক বিমানবিহারী মজুমদার কমলাকর পিপিলাই সম্পর্কে একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি করে লিখেছেন, ‘কমলাকর পিপ্পলায়ী ব্রাহ্মণ, শ্রীরামপুরের দুই মাইল দক্ষিণে আকনা মাহেশে জন্ম, জাগেশ্বরে স্থিতি’ (শ্রীচৈতন্যচরিতের উপাদান, পৃ. ৬২৯)। বিমানবিহারী মজুমদার পাটপর্যটনের তথ্য মেনে নিলেও তিনি জাগেশ্বর গ্রামের অনুসন্ধান করেন নাই।

অমূল্যধন রায় ভট্ট মাহেশের তৎকালীন জগন্নাথ সেবক প্রসাদদাস অধিকারীর প্রদত্ত তথ্যের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়েছিলেন। ফলে জাগেশ্বর গ্রামের অনুসন্ধান না-করেই অনুমান করেছিলেন, জাগেশ্বর লিপিকর প্রমাদসম্ভূত শব্দ। মূল শব্দ হয়তো ‘জগন্নাথ’ ছিল (পৃ. ৮৪)। 

আকনা-মাহেশ গ্রামের ভূমিপুত্র শ্রাদ্ধানন্দ দেবশর্মা ফিল্ড স্টাডি করে লিখেছিলেন মাহেশমঙ্গল বা মাহেশ পরিচয়। প্রকাশকাল– ১৩৫৫ সাল। গ্রন্থটি আকর তথ্যে পরিপূর্ণ। গ্রামটি ছিল দশপাড়ার। এর মধ্যে অন্যতম হল অধিকারী পাড়া। এঁরাই জগন্নাথের সেবার অধিকারী। গ্রামটি ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। গ্রামের মালাপাড়া এবং আকনাপাড়া নিয়ে গঠিত হয়েছিল বল্লভপুর গ্রাম। আকনাপাড়াতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রামসীতার বিগ্রহ। তারপরে অনেক ভাঙাগড়ার পর্ব পেরিয়েছে। বর্তমানে মাহেশ ক্ষুদ্র স্থানে পরিণত হয়েছে।

অমূল্যবাবু ও শ্রাদ্ধানন্দ প্রদত্ত মাহেশের জগন্নাথ ও কমলাকর পিপিলাই সম্পর্কে গুরুত্ত্বপূর্ণ তথ্যাবলির পর্যালোচনা প্রয়োজন। কেননা উভয়ে কমলাকরকে ‘বহিরাগত’ বলেছেন। অমূল্যবাবুর মতে কমলাকরের পূর্বনিবাস সুন্দবনের নিকটবর্তী খালিজুলি গ্রামে। শ্রাদ্ধানন্দের মতে, মেদিনীপুরের হিজলির নিকটবর্তী উক্ত স্থানটি। তবে এই নামে কোনও গ্রামের কোনও অস্তিত্ব সুন্দরবন অঞ্চলে বা হিজলির সন্নিকটে বর্তমানে নেই।

অমূল্যবাবু লিখেছেন, জগন্নাথ প্রতিষ্ঠাতা ধ্রুবানন্দ কমলাকর সম্পর্কে স্বপ্নাদিষ্ট হয়েছিলেন। ধ্রুবানন্দের অন্তিমকালে কমলাকর মাহেশে আসেন এবং জগন্নাথের সেবার ভার প্রাপ্ত হন । পাটপর্যটনের মতে কমলাকর মাহেশের ভূমিপুত্র ছিলেন।

মাহেশের জগন্নাথ বর্তমানে যেমন

শ্রাদ্ধানন্দ অতিরিক্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। যেমন তিনি লিখেছেন, শ্রীপাটের অধিকারীরা বরাবর তন্ত্রোক্ত বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষিত। (ধানসিড়ি সংস্করণ, ২০১৬, পৃ. ৮৭) সুতরাং অধিকারীদের কুলদেবী ছিলেন তন্ত্রোক্ত কোনও দেবী। একে সঠিক তথ্য বলেই মনে করি। 

জাগেশ্বর গ্রামে কমলাকরের উত্তরপুরুষরা পুজো করেন পালযুগের ধাতব তারামূর্তি। উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি। দেবী তাঁর ক’টি সামান্য হেলিয়ে ললিতাসনে উপবিষ্ট ফোটা পদ্মের ওপর। দ্বিভুজা দেবীর দু’হাত হাঁটুর উপর স্থাপিত। কটিদেশে নাগের বন্ধনী। দীর্ঘ জটামুকুট। মূর্তিটি ক্ষয়ে যাওয়ার কারণে বোঝা যায় না বৌদ্ধ অক্ষোভ্য মূর্তির অবয়ব ও অবস্থানকে। কানে দীর্ঘ কুণ্ডল। প্রলম্বিত কেশ বাহু পর্যন্ত। বাম হাতের কাছে নাগের উপস্থিতি। 

এটি পিপিলাইদের কুলদেবী। পরে কমলাকর বৈষ্ণবধর্মে দিক্ষিত হলেও কুলদেবীর মর্যাদাকে অস্বীকার করেননি। বর্তমানে মঙ্গলচণ্ডী রূপে পূজিত হচ্ছে।

কমলাকরের প্রতিপত্তির কালে তাঁর আপন ভাই নিধিপতি এবং অন্যান্য জ্ঞাতিবর্গ মাহেশে বসতি স্থাপন করেন। শ্রাদ্ধানন্দ লিখেছেন, ‘নিধিপতির বংশধরেরা কমলাকরের বংশধরগণের সহিত অন্নভোক্তা নহেন’ (পৃ. ৮৭)। এর থেকে বোঝা যায়, কমলাকর বা তাঁর বংশধরদের সঙ্গে জ্ঞাতিবিরোধ হয়েছিল। 

কমলাকর পিপিলাইদের কুলদেবী ধাতব তারামূর্তি, বর্তমানে মঙ্গলচণ্ডী হিসাবে পূজিত

শ্রাদ্ধানন্দ আরও জানিয়েছেন– পিপিলাই গোষ্ঠীর অন্যান্যরা জগন্নাথের সেবা নিতে রাজি হননি। ‘আমি ৬৫ বৎসর পূর্বেও চার ঘর পিপিলাই দেখিয়াছি’ (পৃ. ৮৮)। এর অর্থ হল একসময় গোটা পিপিলাই বংশই ছিল জগন্নাথের সেবার অধিকারী। শ্রাদ্ধানন্দ প্রদত্ত এবং অন্যান্য তথ্যাবলি থেকে কয়েকটি যুক্তিসঙ্গত অনুমান করা যায়।

১. জগন্নাথ বহু আগে থেকেই সেবিত হয়ে আসছেন মাহেশে। অন্তত মহাপ্রভুর আগে থেকে। 

২. মাহেশের সেবাইত ছিলেন উক্ত গ্রামের পিপিলাই ব্রাহ্মণরা। বহিরাগত হলে তা কমলাকরের পূর্বপুরুষরা হবেন, কমলাকর নন।

৩. কমলাকর মাহেশের জগন্নাথ সেবাইত বংশের বংশধর ছিলেন।

৪. তাঁদের কুলদেবী ছিলেন তারাদেবী। 

৫. মাহেশ পরিত্যাগ করে কমলাকর পিপিলাইয়ের জাগেশ্বরে স্থিতির অন্যতম কারণ জ্ঞাতিবিরোধ বা ভ্রাতৃবিরোধ।

জাগেশ্বর পূর্ব বর্ধমান জেলার প্রাচীন এক জনপদ। ‘জাগেশ্বরডিহি’ নামে বর্তমানে পরিচিতি। প্রাচীন নামটি জানা যায় আঠেরো শতকের একটি গ্রাম্যগাথায়, ‘জাগেশ্বরে দিয়ে দিঘি নাম রহিল’ (বর্ধমান রাজবংশানুচরিত, রাখালদাস মুখোপাধ্যায়, ১৩২১, পৃ. ৪০-৪১) 

জাগেশ্বর গ্রামে পূজিত কষ্টিপাথরের নাড়ুগোপাল

গ্রামের পূর্বদিকে বর্ধমান-কাটোয়া মোঘল আমলের প্রাচীন রাস্তা। দক্ষিণ পূর্বে শীতলগ্রাম। শীতলগ্রামে শ্রীপাট ছিল ধনজয় পণ্ডিতের। জাগেশ্বর গ্রামের দক্ষিণ দিকে অনাদিলিঙ্গ শিব ‘যজ্ঞেশ্বর’। ইনি গ্রামদেবতা। তাঁর নামেই গ্রামের নাম ‘জাগেশ্বর’। 

বর্ধমান রাজাদের কাটানো দিঘির উত্তরপাড় অতিক্রম করে রাস্তার ধারে ঠাকুরপাড়া। কমলাকর পিপিলাইয়ের বংশধরদের বসতি। ‘ঠাকুর’ পদবি কাশিমবাজারের জমিদারদের কাছ থেকে পাওয়া রাজ-উপাধি। আসল পদবি অধিকারী, বাৎস্য গোত্র। পঞ্চ প্রবর।

ঠাকুর পরিবারের অধিকাংশই জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে বাংলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। বর্তমানে ছয় ঘর বাস করছেন জাগেশ্বরে। কমলাকর পিপিলাই প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ ও গোপীনাথ রয়েছেন ছোট মন্দিরে। মূল রাস্তার ধারে ছোট দোলমঞ্চ। জগন্নাথ মূর্তিটি সম্ভবত মাহেশের স্মৃতি বহন করে চলেছে। 

ঠাকুরবাড়ির দুর্গাদালানের পিছনে দিয়ে সামান্য খানিকটা গেলেই বর্তমান চুনারীপাড়া বা রাজবংশীপাড়া। প্রায় চার কাঠা ফাঁকা চত্বরে টিনের দোচালা। দু’পাশে বাড়িঘর। দোচালার পূর্বদিকে ছোট্ট পুকুর। অঙ্গনে সুপ্রাচীন তমালবৃক্ষ। রয়েছে তুলসীমঞ্চ। এর নাম বড় ঠাকুরের আখড়া বা পাট বা থান। এটিই আসলে কমলাকর পিপিলাইয়ের শ্রীপাট বা আদিবসতি স্থান। এখন তিনি লোকদেবতা হিসাবে পূজিত হচ্ছেন। 

বড় ঠাকুরের পাটে সংরক্ষিত বৃহৎ বিষ্ণুমূর্তির একাংশ

বড়ঠাকুরের দোচালায় দু’টি অসাধারণ প্রস্তর ভাস্কর্যের অংশবিশেষ পূজিত হচ্ছে। একটি সূর্যমূর্তির কোমর থেকে ঊর্ধ্বাংশ। পাশাপাশি অবস্থিত একটি বড় ভোগবিষ্ণু মূর্তির অংশবিশেষ। মূর্তি দু’টি পাওয়া গেছে লুপ্ত জনপদ ধেঞার পুকুর সংস্কার করতে গিয়ে। মধ্যযুগে ধেঞাই ছিল মূল জনপদ। জাগেশ্বর ছিল তার ক্ষুদ্র মৌজা।

বর্তমানে জাগেশ্বরের উত্তর মাঠ ধেঞা। মোগল আমলে ধেঞা মহাল বা পরগনায় পরিণত হয়। এখনও ধেঞার স্মৃতি বহন করে চলেছে দু’টি প্রাচীন জলাশয়। একটি ধেঞার পুকুর, অপরটি মিদ্দেপুকুর। আটের দশকে ধেঞার পুকুর সংস্কার করতে বহু প্রাচীন মূর্তি ও পুরাসম্পদ পাওয়া গিয়েছিল। সেসব হস্তান্তরিত হয়েছে। 

সৌভাগ্যবশত উক্ত মূর্তিদু’টি জাগেশ্বরবাসীরা তুলে নিয়ে এসে বড়ঠাকুরের পাটে রেখে দিয়েছেন। হরিদাস দাস তাঁর শ্রীশ্রী গৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধানে (পৃ. ১১৬১) অনুমান করে লিখেছেন, কমলাকর বৃন্দাবনে দেহ রাখেন। কিন্তু বংশপরম্পরা সূত্রে জানতে পারি– ধেঞাতে বড়ঠাকুরের সমাধি ছিল। কিন্তু ক্ষেত্রানুসন্ধানে কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। শোনা যায়, মোগল আমলের সমৃদ্ধ জনপদ ধেঞা বা ধেঁয়াতে বৈষ্ণবধর্মের প্রচারের দায়িত্ব পেয়েছিলেন কমলাকর পিপিলাই। 

সরকারি নথিপত্রে ধেঞার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরিতে। ধেঞা তখন সরকার সরিফাবাদের ২৬টি মহাল বা পরগনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। নবাবি আমলে চাকলা বর্ধমানের অন্তর্গত হয়েছিল ধেঁয়া। ১৭৯৩ সালের পুলিশ ট্যাক্সের রিটার্ন থেকে বর্ধমান চাকলার ৬১টি পরগনার মধ্যে ধেঁয়ার অস্তিত্ব আছে। 

ঠাকুর পরিবার পূজিত জগন্নাথ গোপীনাথ রাধা বিগ্রহ

বেঙ্গল এণ্ড আগ্রা এনোয়াল গাইড এণ্ড গেজেটিয়ারে (খণ্ড দুই, ১৮৪২, পৃষ্ঠা. ৪১০-৪১৩) উল্লিখিত পূর্ব বর্ধমান জেলার ৬৪টি পরগনার মধ্যে ধেঁয়ার স্থান ১০ নম্বরে। ১৮৪৭ সালে ধেঁয়া পরগনার পরিবর্তে মঙ্গলকোট যুক্ত হয়। কাটোয়া, মঙ্গলকোট ও কেতুগ্রাম থানা নিয়ে গঠিত হয় কাটোয়া মহকুমা। 

কমলাকর পিপিলাই ও মাহেশের জগন্নাথ নিয়ে গবেষক মহলে এখনও কিংবদন্তি, লোকশ্রুতিই প্রধান ভরসা। আশা করি এবার তাঁরা বিষয়টির উপর যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে ঐতিহাসিক আলোচনায় প্রবৃত্ত হবেন।

…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলি অন্যান্য পর্ব ………….

পর্ব ৪১: জগন্নাথের শবরযোগ

পর্ব ৪০: ভিটের ভাস্কর্য

পর্ব ৩৯: হারানো নদীপথ, হারানো জলরেখা

পর্ব ৩৮: বর্ষামঙ্গল

পর্ব ৩৭: তরুর ঠাকুরঘর

পর্ব ৩৬: জাল রাজার রাজনীতি

পর্ব ৩৫: ঢেঁকি মোটেই অকম্মার নয়

পর্ব ৩৪: বহুরূপে সম্মুখে তোমার

পর্ব ৩৩: আলকাপ: বিরল মায়ার স্মৃতিচিহ্ন

পর্ব ৩২: তালবাহার

পর্ব ৩১: পোড়ামাটির শিল্পকে জনপ্রিয় করেছে কাঁঠালিয়ার শিল্পীরা

পর্ব ৩০: মৎস্য দেবতা মৎস্য ভোগ

পর্ব ২৯: কুবের পুজোর আচার থেকেই সোনা কেনা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়

পর্ব ২৮: বৈশাখ বিষ্ণুর প্রিয়, পুরাণের শ্রেষ্ঠ মাস?

পর্ব ২৭: গর্জন থেকেই গাজন

পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?

পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের

পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল

পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?

পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন

পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া

পর্ব ২০: মাদারি কা খেল

পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়

পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর

পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা

পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে

পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম

পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন

পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান

পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি

পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল

পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই

পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?

পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব

পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!

পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই

পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা

পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত

পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস

পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর

পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প