traditional giant sweets of dolyatra fair in east burdwan | Robbar
Robbar
  • ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন

রায় দোগাছিয়া গ্রামের রায় পরিবারের দোল উৎসব পাঁচ দিনের। প্রথম দিন মেড়া পোড়া। দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম দিন পর্যন্ত পালা করে এক একটি দেববিগ্রহ দোলমঞ্চে উপস্থিত হন দীর্ঘ শোভাযাত্রা করে। দোল উৎসবকে কেন্দ্র করে যাত্রাপালার অভিনয় ও নানাবিধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে। মেলার অন্যতম আকর্ষণ বড় ল্যাংচা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মদনমোহনের ঐতিহ্য। মেলার কয়েকদিন তাঁর ভোগে লাগে বড় ল্যাংচা। সব থেকে বড় আকারের ল্যাংচার মূল্য পড়ে দু’ হাজার টাকা। বাংলায় একমাত্র এই মেলাতেই দু’ হাজার টাকার মূল্যের বড় ল্যাংচা পাওয়া যায়।

শেষ আপডেট: মার্চ ৪, ২০২৬, ১৯:২৭   
Facebook WhatsApp Messenger

২২.

পূর্বস্থলী স্টেশন থেকে পশ্চিম মুখে পারুলিয়া হয়ে দাস্তিপাড়ার তে-মাথার মোড়। সেখান থেকে ডাইনে আরও দু’ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করতে পারলেই উৎসব-মুখর রায়-দোগাছিয়া গ্রাম।

এখানকার দোল উৎসব বিখ্যাত। একাধিক রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ, সুউচ্চ মন্দির, নান্দনিক দোলমঞ্চ, তাকে ঘিরে ইতিহাস-লোকশ্রুতি, দোলমেলা আর মানুষের ভিড়ে জমজমাট। দু’ হাজার টাকা মূল্যের ‘বড় ল্যাংচা’ মিষ্টির আকর্ষণে হাজির হন বাইরের পর্যটক থেকে গ্রাম-গ্রামান্তরের অসংখ্য মানুষ-জন। 

zoom
মেলার মূল আকর্ষণ ‘বড় ল্যাংচা’

আসা-যাওয়ার পথে দু’পাশে শুষ্ক নদী খাতের ছবি। ফাঁকা মাঠ। কোথাও বিল। কোথাও পুকুর। কোথাও আবার খাত বুঝিয়ে পত্তন হয়েছে ছোট ছোট গ্রাম। রৌদ্রদগ্ধ মধ্যাহ্ন। মাঝে মাঝে ভাঁটফুলের জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে বাংলার গন্ধ। বারতা দিচ্ছে– ‘বসন্ত এসে গেছে’। 

আমার সঙ্গী ক্ষেত্রসমীক্ষক নির্মলেন্দু পাল। তিনি এলাকার ভূমিপুত্র। হাতের তালুর মতো এলাকাটি চেনা। দেখিয়ে দিচ্ছিলেন– গঙ্গার একাধিক শাখা কোনও এক সময়ে এতদ অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মিশে গেছে খড়িনদীর গর্ভে। কিংবা সমান্তরাল পথে অগ্রসর হয়ে মিশেছে ভাগীরথীতে।

রায় দোগাছিয়া– পূর্ব বর্ধমান জেলার নাদনঘাট থানার অন্তর্ভুক্ত এক সময়কার বৃহৎ জনপদ। তখন অবিশ্যি এর নাম ছিল দোগাছিয়া। কালক্রমে একাধিক পাড়া স্বতন্ত্র গ্রামে পরিণত হয়েছে। যেমন পশ্চিমে সোনারুদ্র, পূর্বে রায়পুর, উত্তরে দাস্তিপাড়া ইত্যাদি। বর্তমানে রায় দোগাছিয়ার জনসংখ্যা হাজার পাঁচেক। গ্রামের দক্ষিণে প্রবাহিত হচ্ছে খরস্রোতা খড়িনদী। নদী পেরলে মন্তেশ্বর থানার ভূমণ্ডল।

zoom
জোড়া জোড়া শিবমন্দির

রায়-দোগাছিয়ার প্রবেশপথের সামনেই হাটতলা। সপ্তাহে দু’দিন হাট বসে। বাম দিকে বৃহৎ জলাশয়ের ধারে দু’জোড়া ‘জোড়-শিবমন্দির’। আটচালা বিশিষ্ট। উচ্চতা প্রায় ২৫ ফুট করে। গর্ভগৃহে আদ্দিকালের শিবলিঙ্গ। শিবরাত্রি উপলক্ষে পুজো চলে দু’দিন। 

হাটতলা থেকে সামান্য এগিয়ে গেলেই ফাঁকা চত্তরে রায়-চৌধুরী পরিবারের সুউচ্চ দোলমঞ্চ। এখানেই বসেছে জমজমাট দোল-মেলা। ঘর গেরস্থালির জিনিসপত্র থেকে ‘হরেক মাল’ ৫০ টাকার বিকিকিনির হাঁক-ডাক। আর আছে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিপটি।

এমন দর্শনীয় দোলমঞ্চ পশ্চিমবঙ্গে বিরল বলা যেতে পারে। প্রায় ফুট ছয়েক উঁচু প্লাটফর্ম। তার উপর চারদিকের বারান্দা যুক্ত গোলাকার চাতাল। চাতালগুলিকে ধরে রেখেছে বৃত্তাকার স্তম্ভ শ্রেণি। ভিতরে দোল-গর্ভগৃহ। কেন্দ্রস্থলে উঁচু বেদিতে দেবতার অধিষ্ঠান। উপরে পঞ্চচূড়া স্থাপত্য। দেবতার পায়ে আবির দিতে হলে কাঠের অস্থায়ী সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে। দোলমঞ্চের উচ্চতা ভূমি থেকে প্রায় ৪০ ফুট।

zoom
৪০ ফুট উঁচু দোলমঞ্চ

পশ্চিমে খানিকটা এগিয়ে গেলে দক্ষিণমুখী রায়বাড়ির ঠাকুরতলা। পশ্চিমদিকে পূর্বমুখী বৃহৎ আটচালা গোপীনাথ মন্দির। অন্তত ৫৫ ফুট উঁচু। এ মন্দির বর্ধমান জেলার অলংকার ও অহংকার। আর্চ-বিশিষ্ট অলিন্দযুক্ত দেশীয় শৈলীর স্থাপত্য। প্রায় ২৫ ফুট বর্গাকার উঁচু ভিত্তিভূমিতে প্রাচীন মন্দিরটি অবস্থিত। তিনটি দিকই অলঙ্কৃত। 

টেরাকোটা ফলকগুলির খুব একটা বৈচিত্র না থাকলেও হস্তীমুখ, শৈবমন্দিরের অলংকরণ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রয়েছে কৃষ্ণলীলার নানা আলেখ্য-ফলক। মন্দিরের প্রতিষ্ঠালিপি লুপ্ত হলেও দেবায়তনটি যে অষ্টাদশ শতকের তৈরি, সন্দেহ নেই। বারংবার সংস্কার হওয়ার ফলে আদি ফলকগুলি প্রায় বিনষ্ট হয়ে গেছে। কালের প্রহারে মন্দির অনেকটা ভূমিগর্ভে বসে গেছে। লোনা ধরায় ফলকগুলিও বিনষ্টপ্রায়।

zoom
মন্দির অলংকরণ

গোপীনাথ মন্দিরের গর্ভগৃহে আধিষ্ঠান করেন রায়েদের প্রাচীন কৃষ্ণবিগ্রহগুলি। গোপীনাথ-রাধা, রাধানাথ, শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র-রাধা এবং একক কৃষ্ণবিগ্রহ মদনমোহন। নামে গোপীনাথ মন্দির হলেও সর্বাপেক্ষা প্রাচীন কৃষ্ণবিগ্রহ মদনমোহন। প্রায় ফুট চারেক উচ্চতার কালো কষ্টিপাথরে নির্মিত দাঁইহাট ঘরানার অপূর্ব বংশীধারী কৃষ্ণবিগ্রহ। 

আদিতে যে কৃষ্ণবিগ্রহের সঙ্গে রাধামূর্তি ছিল না, মদনমোহন তাঁর দৃষ্টান্ত। এ মূর্তি সম্ভবত দোগাছিয়ার গ্রাম্যদেবতা ছিলেন। পরে রায়েদের অধীনে আসে। গ্রামবাসীদের মতে, এঁর অপর নাম ‘খ্যাপা মদনমোহন’। তাঁর পুজোর কোনও ত্রুটি হলে গ্রামে অগ্নুৎপাত কিংবা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। সকলে খুব সাবধানে থাকেন দোলের দিনগুলিতে।

zoom
গোপীনাথ মন্দির

গোপীনাথ কিংবা শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র আড়াই ফুট উচ্চতার বিগ্রহ। কালো পাথরে তৈরি বংশীধারী। ত্রিভঙ্গিম ঠামে দণ্ডায়মান। পাশে ধাতুর তৈরি রাধারানি। রাধানাথ মূর্তি চুরি গেছে। চারদিনের দোল উৎসবে তাঁরা পালা করে দোলমঞ্চে আসীন হন। প্রথম দিন শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র, দ্বিতীয় দিনে গোপীনাথ, তৃতীয় দিনে রাধানাথের অনুপস্থিতিতে তাঁর হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র। চতুর্থ বা শেষ দিনে দোলমঞ্চ আলোকিত করেন মদনমোহন বিগ্রহ। 

গোপীনাথ মন্দিরের ডান পাশে দক্ষিণমুখী দালানমন্দিরে নিত্য পূজিত হন রায়েদের দশভুজা। মহিষমর্দিনী মূর্তি। এ মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রায়বাড়ির খ্যাতনামা পুরুষ অধরচন্দ্র রায়ের দ্বিতীয়া পত্নী। দশভুজার আবির্ভাব নিয়ে লোকশ্রুতিটিও বেশ মনোজ্ঞ।

zoom
গোপীনাথ বিগ্রহ

অধরচন্দ্র রায় অষ্টাদশ শতকের পানিহাটি বরানগরের ভাগ্যান্বেষী কায়স্থ বংশীয় পুরুষ। ফারসি ভাষায় অসাধারণ বুৎপত্তির জন্য এবং বৈষয়িক বিষয়ে তীক্ষ্ণ মেধাবী হবার কারণে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁয়ের চোখে পড়ে যান তিনি। অধরচন্দ্র, দেওয়ানি বা কর সংগ্রহে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। মুর্শিদকুলি তাঁর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে মেড়তলার তালুকদারি দেন।

পূর্বস্থলী থেকে উত্তরে গঙ্গা তীরবর্তী মেড়তলা জনপদ। মেড়তলা কৃত্তিবাসের আমলেও উল্লেখযোগ্য স্থান ছিল। রামায়ণ পাঁচালিতে ভগীরথের গঙ্গা আনয়ন বৃত্তান্তে মেড়তলার নাম উল্লেখ আছে–

চলিলেন গঙ্গামাতা করি বড় ত্বরা।
মেড়াতলা নাম স্থানে যায় সরিদ্বরা।।

zoom
মদনমোহন বিগ্রহ

অধরচন্দ্র নিত্য সেখানে গঙ্গাস্নান করতেন দীর্ঘ সময় ধরে। একদিন নবাবের এক প্রভাবশালী আমলা উজানে বজরায় চেপে মুর্শিদাবাদ যাচ্ছিলেন। কয়েকজন মাঝিমাল্লা দীর্ঘ কাছি ধরে গুণ টেনে আগে আগে যাচ্ছিল। সে সময় অধরচন্দ্র গঙ্গায় আবক্ষ অবগাহন পূর্বক তর্পণ করছিলেন। গুণের কাছি বা দড়া তাঁর মস্তক স্পর্শ করলে তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে উপস্থিত পাইকদের গুণ কেটে দেবার হুকুম দিলেন।

পরে বুঝতে পারলেন কাজটি তাঁর ঠিক হয়নি। অচিরে তাঁর উপর নবাবি অত্যাচার শুরু হতে পারে। সেই ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তিনি স্ত্রী ও পর্যাপ্ত সম্পদ নিয়ে দোগাছিয়ায় পালিয়ে গেলেন। পরে নবাব মুর্শিদকুলির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে শুধু ভয় থেকে মুক্ত হলেন না, সেই সঙ্গে দোগাছিয়া মুলুকের দায়িত্ব পেলেন।

দোগাছিয়ার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গঙ্গার এক শাখানদী যমুনা। সেখানেই গড়খাত কেটে বৃহৎ আবাস তৈরি করলেন। প্রতিষ্ঠা করলেন গৃহদেবতা গোপীনাথের মন্দির। প্রথমা স্ত্রী নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করলেন। অধরচন্দ্রের দ্বিতীয়া স্ত্রী দশভুজা মহিষমর্দিনী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ নিয়েও লোকশ্রুতি আছে। 

zoom
শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র বিগ্রহ

একদিন তিনি স্বপ্নে নির্দেশ পেলেন, যমুনা নদীর গর্ভে নিমজ্জিত গাছের ডালপালার মধ্যে আটকে আছেন দেবী দশভুজা। সেখান থেকে উদ্ধার করে তাঁকে যেন রায়বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন। পরে জানা যায়, একদল ডাকাত অষ্টধাতুর মূর্তিটি কোথাও থেকে চুরি করে যমুনা বেয়ে যাচ্ছিল। নিমজ্জিত গাছের ডালপালার আঘাতে নৌকাডুবি হয়। সেখানেই আটকে ছিল দেবীমূর্তিটি।

অধরের দ্বিতীয়া স্ত্রী দশভূজাকে গোপীনাথের মন্দিরের পাশে আলাদা দেবালয়ে মহিষের মাথার উপর প্রতিষ্ঠা করেন। দেবীর নিত্যপূজা হয়। বাৎসরিক পূজা শারদীয় দুর্গোৎসবে। মূল মূর্তিটি কয়েক দশক আগে চুরি হয়ে গেছে। দশভুজার মন্দিরটি দালান শ্রেণির। পুরাতন মন্দিরও ভেঙে গেছে। 

অধরের পাঁচ পুত্র, সুতরাং কালক্রমে দেবসেবা পাঁচটি তরফে বিভক্ত ছিল। বর্তমানে রায় পদবি কায়স্থরা প্রায় ৬০ ঘরে পরিণত হলেও, অধিকাংশই জীবন-জীবিকার টানে দেশবিদেশে নাড়া বেঁধেছেন। বর্তমানে সাত-আট ঘর রয়েছেন দোগাছিয়া গ্রামে। দেবসেবা চলে কিছু ভূসম্পত্তি এবং প্রায় ৬০টি পুকুরের লিজ দেওয়া আয় থেকে। দেবসেবা চালায় ট্রাস্টি বোর্ড। দৈনিক সেবাকার্য ও বাৎসরিক দোল উৎসব পালিত হয় সাড়ম্বরে।

zoom
দশভুজা বিগ্রহ

রায় দোগাছিয়া গ্রামের রায় পরিবারের দোল উৎসব পাঁচ দিনের। প্রথম দিন মেড়া পোড়া। দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম দিন পর্যন্ত পালা করে এক একটি দেববিগ্রহ দোলমঞ্চে উপস্থিত হন দীর্ঘ শোভাযাত্রা করে। দোল উৎসবকে কেন্দ্র করে যাত্রাপালার অভিনয় ও নানাবিধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে। মেলা চলে প্রায় দিন দশেক। প্রচুর জনসমাগম ঘটে। এটাই গ্রামের মূল উৎসব।

মেলার অন্যতম আকর্ষণ বড় ল্যাংচা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মদনমোহনের ঐতিহ্য। মেলার কয়েকদিন তাঁর ভোগে লাগে বড় ল্যাংচা। সব থেকে বড় আকারের ল্যাংচার মূল্য পড়ে দু’ হাজার টাকা। বাংলায় একমাত্র এই মেলাতেই দু’ হাজার টাকার মূল্যের বড় ল্যাংচা পাওয়া যায়।

ভাজা ল্যাংচার উৎপত্তি বর্ধমানে। জনৈক খোঁড়া কারিগর এ মিষ্টান্নটি তৈরি করেছিলেন প্রথম। তিনি লেঙচিয়ে বা খুঁড়িয়ে চলতেন বলে মিষ্টির নাম হয় ল্যাংচা। শক্তিগড়ের ল্যাংচা বিখ্যাত। মিস্টির উপকরণ বলতে ময়দা, খোয়া বা দুধের গুঁড়ো, চিনির সিরাপ ও ঘি বা তেল। খোয়া মিশ্রিত ল্যাংচা ঘি বা তেলে কড়া করে ভেজে চিনির সিরাপে ডোবায়। রঙ হয়ে ওঠে লাল-কালো বা কালশিটে। 

zoom
ছানার বড় ল্যাংচা

একই রকমের মিষ্টি পান্তুয়া। সুজি ছানা দুধ ঘিয়ে ভাজা চিনির রসে ডোবানো। পান্তুয়ার আরেক সংস্করণ লেডিকেনি। ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং-এর স্ত্রী-র ভারত আগমন উপলক্ষে স্থানীয় ময়রারা তৈরি করেছিলেন। বলাবাহুল্য শক্তিগড়ের ল্যাংচা জি-আই তকমা পেয়েছে। 

দোগাছিয়ার ল্যাংচা আসলে নোড়াকৃতি রসগোল্লা। কোনও ভাজা মিষ্টি নয়। স্থানীয় নাম রসগোদা। দোগাছিয়া ময়রা ও ঘোষেরা এই মিষ্টির উদ্ভাবক। মিষ্টি তৈরির তিনটি মূল উপাদান– বিশুদ্ধ ছানা, চিনির সিরাপ ও সামান্য ময়দা। দু’ হাজার টাকা মূল্যের বড় ল্যাংচায় লাগে আড়াই থেকে পৌনে তিন কেজি ছানা ও ৫০ গ্রাম ময়দা। দীর্ঘক্ষণ ছানাকে বিশেষ কৌশলে ঠেসে ময়দার আঠায় জোড় দিয়ে রসে ফোটানো চলে। একটি চার নম্বর কড়াইতে ওই মাপের দু’টি মিষ্টি বানাতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। ধীরে ধীরে মিষ্টির গায়ের রং খানিকটা গৈরিক বর্ণ ধারণ করে। প্রায় দেড় ফুট নোড়াকৃতি এই মিষ্টির চাহিদা মেলায় তুঙ্গে। 

দু’ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন ১০০ টাকা মূল্যের বড় ল্যাংচা মেলার বিরাট আকর্ষণ। প্রায় সাতটি মিষ্টির দোকান বসে মেলায়। প্রতিটি দোকানেই মিষ্টির রমরমা বিক্রি। বিশিষ্ট মিষ্টি-কারিগর বাসুদেব ঘোষ জানালেন, প্রচুর চাহিদা থাকলেও বেশি করতে পারি না। কারণ এটি সময়সাপেক্ষ ও দক্ষ হাতের কাজ। তাকবাগ একটু গড়বড় হলেই মিষ্টির ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা ষোল আনা। বিদেশেও এই মিষ্টির কদর আছে। তবে আমরা জি-আই পাইনি। কেননা এটা একান্তই আমাদের গ্রামের শিল্প। যদিও বর্ধমান জেলার বৈষ্ণব মেলাগুলিতে এই মিষ্টি এখন অনেকেই করছেন। কিন্তু বড় ল্যাংচা একমাত্র এখানেই হয়।

কৃতজ্ঞতা: প্রবীর রায়চৌধুরী

…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলি অন্যান্য পর্ব ………….

পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া

পর্ব ২০: মাদারি কা খেল

পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়

পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর

পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা

পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে

পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম

পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন

পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান

পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি

পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল

পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই

পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?

পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব

পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!

পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই

পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা

পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত

পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস

পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর

পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প

Basanta Utsav Dolyatra Folk culture Mythology Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on