memoir of rahul arunoday banerjee by rinka chakraborty। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাহুল, দেরি করেও তোমার লেখা এসে পৌঁছবে না আর

কিছু মানুষ খুব চুপচাপ আমাদের জীবনে ঢুকে পড়ে। তারপর একসময় বুঝি– তারা কতটা জায়গা দখল করে ছিল। রাহুলও তেমনই। আমরা, ‘রোববার’, ‘রোববার ডট ইন’– প্রত্যেকের মন ভার। রাহুল হয়তো আর নতুন লেখা লিখবে না আমাদের জন‌্য, রাহুল দেখিয়ে দিল– কীভাবে সহজ থাকা যায়, কীভাবে শব্দ দিয়ে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানো যায়।

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৩, ২০২৬, ২০:৫৫   
Facebook WhatsApp Messenger

অসমাপ্ত শব্দের মতো চলে গেল রাহুল। কিছু মানুষ থাকে আলো নিয়ে। তারা চলে গেলে শুধু একজন মানুষ হারিয়ে যায় না– আলোও নিভে যায় একটু একটু করে। রাহুলের চলে যাওয়াটা তেমনই। যে-কিছুক্ষণ আগেও ছিল কাজের মধ্যে, হাসির মধ্যে, লেখার মধ্যে– সে মানুষটা চলে গেল এমন আচমকা। যে আমার থেকে মাত্র এক বছরের ছোট, যার ‘চিরদিনই…’ দেখে মেট্রো সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে প্রবল কান্নাকাটি করেছি, রিল আর রিয়েল যে-ছেলেটা এমনভাবে ঘেঁটে দিয়েছিল– উসকোখুসকো ‘কৃষ্ণ’ তো ছিল সবার মনের মানুষ– কী আশ্চর্য এই সমাপতন না?

টেকনিক্যালি ওর কিন্তু ৪৩ হয়নি। এই বছর অক্টোবরে হওয়ার কথা ছিল। আর্টিস্ট ফোরামের একটি লেখায় ২০১৮ সালে ও লিখেছিল– ‘মৃত্যুর পর নিজেকে বেশ রাজকীয় লাগছে আমার ।…৪২ তো যাওয়ার বয়স নয়।… বেরিয়ে এলাম জল থেকে, শরীর অবশ্য অন্যরা তুলছে…।’ এই লেখাটি আমি স্বচক্ষে পড়িনি। খবরে দেখানো এই ‘তথ‌্য’ বারবার ঘুরেফিরে আসছে আমার ‌‘ফিড’-এ। তত অবাক হচ্ছি। শুনেছি মহামানবরা ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন। রাহুল তো রক্তমাংসের শিরদাঁড়া সোজা রাখা একটা স্পষ্টবক্তা ছেলে! যে ছেলে– যখন পুলিশকে সবাই গাল পাড়ে, তখন সেই শত বদনামের ভাগী পুলিশের ‘মানবিক’ মুখ তুলে ধরতে দ্বিধাবোধ করে না।

zoom
শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

রাহুল নেই। এই ‘নেই’ শব্দটা মেনে নিতে খুব অসুবিধে হচ্ছে, কারণ রাহুলকে যতটুকু চিনেছি, জীবনমুখী সে। এক অদ্ভুত প্রাণশক্তিতে সে মানুষকে সহজেই কাছে টেনে নিত। আমার সঙ্গে তার ব‌্যক্তিগত দহরম মহরম না-থাকলেও রাহুলকে বেশি চিনি লেখার সূত্রে, কর্মসূত্রে। অনেক মানুষ স্বীকৃতি দিতে ভুলে যায়। চেনা মানুষের সঙ্গে অচেনার মতো মেশে। রাহুল কিন্তু মনে রেখেছিল আমাকে। ওর লেখা এডিট করার সুযোগ পেয়েছি– আর সেই সুযোগটাই এখন মনে হচ্ছে বড় প্রাপ্তি। কত লেখা অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। কত গল্প আর লেখা হবে না। সহজ বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সেই শক্তিশালী লেখাগুলো আর নতুন করে পাব না আমরা।

রাহুলকে প্রথমবার দেখি আমাদের দফতরে, ‘রোববার’-এর গোড়ার দিকে সেই ছোট্ট ঘরে, যেখানে গাদাগাদি করে আমরা ক’জন বসতাম। এই ঘরে অরিজিৎ সিং-ও আড্ডা দিয়ে গিয়েছে অনিন্দ‌্যদার সঙ্গে। অরিজিৎ তখন ‘দ‌্য অরিজিৎ সিং’ হয়নি। মুম্বইতে টুকটাক কাজ আর সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছিল। সেই ঘরেই একদিন এসে হাজির রাহুল-প্রিয়াঙ্কা। সাফল্যের স্বাদ, সেলিব্রিটি ছোঁয়াচ লেগেছে গায়ে। কিন্তু কী সহজ-সরল দুটো মানুষ। বলা ভালো, ছেলেমানুষের মতো। কোনও দিনই সেলিব্রিটিসুলভ পাঁয়তারা কষতে দেখিনি। সময়ের সঙ্গে পরিণত হয়েছে, কাজ বেড়েছে, সময় কমেছে, কিন্তু মাতব্বর মনে হয়নি একবারও। ‘চিরদিনই…’ দেখে যে প্রবল কেঁদেছি, এবং ছড়িয়েছি, সেকথা যথারীতি ফাঁস করে দিয়েছিল অনিন্দ‌্যদাই। সামনে হিরো, আমি লজ্জায় জিরো। অমন দুঃখধোয়া ফ্রেম, কে না কেঁদেছে! তার ওপরে জানতে পারলাম প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে তার সত্যি প্রেম। মুখ মনের আয়না। তাই সেই মুখ লুকিয়ে সেখান থেকে কাট।

রাহুল যে ভালো লেখে, সেটা জেনেছি অনেক পরে। ‘রোববার’-এ যখন একটা-দুটো কভার স্টোরি লেখা শুরু করল। তারপর শুরু হল কলাম– ‘কলোনি কল্লোলিনী’। রাহুল আসলে ভালো লিখত না, ভালো ‘ভাবা’ প্র‌্যাকটিস করত। যে মানুষের অন্তরটা শুদ্ধ, সোজা, তার লেখা তত বেশি মন ছোঁয়। লেখার মধ্যে কোনও ভারী শব্দ থাকত না। অথচ কী গহিন!

কিন্তু এই লেখা পেতে কালঘাম ছুটে যেত। অনেকবারই হয়েছে একেবারে অন্তিম মুহূর্তে রাহুলকে ‘একটু লিখে দেবে’ বললেই ঝাঁপিয়ে পড়ে যেমন আমাদের লিখে দিয়েছে, তেমনই কম ঝুলিয়ে পাট করেনি! কলাম যখন শুরু হল, প্রথম প্রথম যেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে! তারপর?

–শুটিংয়ের বড় চাপ গো! কাল ফিরেছি অনেক রাতে। আমি বললাম, ‘তার আগের দিন?’
–‘আউটডোর তো! কখন দিন-রাত এক হয়ে যাচ্ছে, বোঝাই যাচ্ছে না!’
–কিন্তু তোমার কলাম তো কম্পোজ করতে যাবে! পাতা ছাড়তে আর বেশি সময় নেই!
–এই দিচ্ছি। একটু অ‌্যাডজাস্ট করে নাও, প্লিজ।

কী আর উপায় ‘অ‌্যাডজাস্ট’ করা ছাড়া! রাগ হত খুব। তার মধ্যে হাতের লেখা বাবা রে! জড়িয়ে-মড়িয়ে কী যে লিখত, রাজুদা আর বিদ্যুৎদাই ছিল উদ্ধারকর্তা। লেখাটা এডিট করার পর রাগ গলে জল। এত বকাঝকা করতাম, নিজেকে লোন রিকভারি এজেন্ট মনে হত। তারপরেও ভেবেছি– এই অপেক্ষা সার্থক। যত ব‌্যস্তই থাক, লেখার মেজাজ চাপলে রাহুল অন‌্য মানুষ।

কিছু মানুষ খুব চুপচাপ আমাদের জীবনে ঢুকে পড়ে। তারপর একসময় বুঝি– তারা কতটা জায়গা দখল করে ছিল। রাহুলও তেমনই। আমরা, ‘রোববার’, ‘রোববার ডট ইন’– প্রত্যেকের মন ভার। রাহুল হয়তো আর নতুন লেখা লিখবে না আমাদের জন‌্য, রাহুল দেখিয়ে দিল– কীভাবে সহজ থাকা যায়, কীভাবে শব্দ দিয়ে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানো যায়।

জীবন বড় অদ্ভুত। যারা সবচেয়ে সহজ, সবচেয়ে উজ্জ্বল– তাদের বিদায়টাই সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। রাহুল চলে গিয়েছে। কিন্তু তার লেখা রয়ে গেল। স্মৃতি রয়ে গেল। শিখিয়ে দিয়ে গেল– পরের জন‌্য কিছু ফেলে রেখো না। জীবন খুব অনিশ্চিত। এই আছ, এই ভ‌্যানিশ।

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন রিংকা চক্রবর্তী-র অন্যান্য লেখা

………………………

Film Star Indian actor Memories Rahul Arunoday Banerjee Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar কলোনি কলকাতা

Share this article on