


রং লাগে মূলত তিনটি– সাদা খড়ি, লাল ও কালো। আগে জৈবরং লাগাতেন শিল্পীরা। এখন খোলাবাজার থেকে রং কিনে এনে ব্যবহার করেন। রং গুলতে লাগে কাঁই-আঁটা। খড়ি দেওয়ার কালো রঙে চুল চোখ আঁকেন। লাল রঙের ব্যবহার বেশি। নারীদের সিঁথির সিঁদুর, ঠোঁট, হাতের তালু সিপাইয়ের টুপি লাল রঙের। এরপর লাল ও কালো রেখার ব্যবহার পুতুলগুলিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
৩১.
পোড়ামাটির হাঁড়িকুড়ি থেকে শৌখিন দ্রব্য, দেবতৈজসপত্রাদি থেকে মন্দির-মসজিদের অলংকৃত চূড়া, ছেলেমেয়েদের খেলনা; মিনিয়েচার পাত্র থেকে ঐতিহ্যবাহী টেরাকোটা পুতুল ইত্যাদি প্রায় শতাধিক পটারি আইটেম যে গ্রামে আজও নিয়মিত তৈরি হচ্ছে, তার নাম মুর্শিদাবাদ জেলার কাঁঠালিয়া গ্রাম।
শুধু দু’-পাঁচঘর কুম্ভকার নন, প্রায় চার শতাধিক পরিবার কাঁঠালিয়া গ্রামে বংশানুক্রমে বসবাস করছেন। তৈরি করে চলেছেন টেকসই মজবুত দৃষ্টি-সুখকর মৃৎপাত্র, যার চাহিদা সারা বাংলা জুড়ে ক্রমবর্ধমান। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে পোড়ামাটির শিল্পকে কাঁঠালিয়ার কুম্ভকাররা জনপ্রিয় করে তুলেছেন।

পোড়ামাটির ঘোড়া দু’ রঙের হয়– লাল ও কালো। দু’টি মাপের পাওয়া যায়– ৫ ইঞ্চি ও ৮ ইঞ্চি। হাতে-গড়া ঘোড়াগুলি স্লিপযুক্ত, ফলে চকচকে ভাবটা সবসময় থাকে। ৫ ইঞ্চি ঘোড়ার পাইকারি রেট প্রতি ১০০ পিস ২০০ টাকা। বড় মাপের ঘোড়াগুলি ৪০০ টাকা। কালো ঘোড়ার দাম একটু বেশি। ৫০ থেকে ১০০ টাকায় ওঠানামা করে। এছাড়া আরেক শ্রেণির ঘোড়া তৈরি করেন শিল্পীরা। তবে সেটি কাল্ট অবজেক্ট নয়, পুতুল ঘোড়া। উচ্চতা মোটামুটি ৫ ইঞ্চি। রং করা এই ঘোড়ার মূল্য মোটামুটি ৬০ টাকা থেকে ৮০ টাকা।

ছেলেমেয়েদের খেলনার অন্যতম উপাদান ক্ষুদ্রাকৃতি পোড়ামাটির তৈজসপত্রাদি। বিভিন্ন প্রত্নক্ষেত্র থেকে এই ধরনের অসংখ্য মিনিয়েচার পাত্র পাওয়া গিয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে এগুলি দেবপূজায় কিংবা খেলনা রূপে প্রাচীনকালে ব্যবহৃত হত। দেবপূজায় এই ধরনের পাত্রের ব্যবহার সীমিত হলেও, গ্রাম বাংলার ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা পুতুলখেলায় পোড়ামাটির পাত্রাদি ব্যবহার করে। বিভিন্ন মেলায় এই ধরনের আইটেম আজও দেখা যায়– কাঠের ঢেঁকি, পালকি ইত্যাদির সঙ্গে প্লাস্টিকের বাসনকোসন এবং পোড়ামাটির ছোট-ছোট পাত্র।

কাঁঠালিয়ার ক্ষুদ্র পাত্রের প্রখ্যাত শিল্পী হলেন চাঁদু পাল। তিনি ও তাঁর পত্নী আদুরী পাল এই ধরনের প্রায় ১৪টি আইটেম তৈরি করেন, যার চাহিদা তুঙ্গে। চাঁদুবাবু গ্রাজুয়েট হলেও বাপ-ঠাকুরদার পেশাকে ভালোবেসে গ্রহণ করেছেন। তাঁর খেলনা পাত্র পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ক্রেতারা কিনে নিয়ে যান।
চাঁদুবাবুর আইটেমগুলির মধ্যে অন্যতম হল উনুন, হাঁড়ি, শিলনোড়া, জাঁতা, থালা, সিলিমচি, বাটি, গেলাস, ডিস, জলের জগ, কড়াই, তাওয়া, মাটির প্রেসারকুকার ইত্যাদি। এগুলি মূলত চাকে তৈরি করে আকার দেওয়া হয়। তারপর লাল মাটির স্লিপ লাগিয়ে ভাটিতে পোড়ানো হয়। প্রতিটি আইটেম প্রতি একশোতে পড়ে ১০০০ টাকা বা ১৫০০ টাকা।

কাঁঠালিয়ার পুতুলশিল্প অন্যান্য স্থানের মতো মহিলাদের হাতেই আদিতে তৈরি হত। ক্ষেত্রসমীক্ষা সূত্রে কাঁঠালিয়ার আদি মহিলা-শিল্পীর নাম জানা যায়– ফুলটুসি পাল। পরবর্তীকালে এই শিল্পটি বাঁচিয়ে রেখেছেন প্রবীণ শিল্পী সাধন পাল, চাঁদু পাল, আদুরী পাল, বন্দনা পাল প্রমুখরা। পুতুলশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মেলার যোগ। স্থানীয় মেলায় পুতুলগুলি বিক্রি করা হত। ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা মূলত এর ক্রেতা। কাঁঠালিয়ার পুতুল বর্তমানে স্থানীয় মেলা ছাড়াও খানিকটা প্রচারের আলো পাওয়ার ফলে, বাংলার পুতুলশিল্প রসিকদের কাছে অত্যন্ত আদরণীয় হয়েছে।
বাংলার পুতুলশিল্পের মূল বৈশিষ্ট্য প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে আজও প্রায় একই রকমের আকৃতি, ছন্দ এবং সরলতা বর্তমান। প্রিমিটিভ কোয়ালিটির নিদর্শন স্বরূপ, কাঁঠালিয়ার পুতুলশিল্পে শিল্পীরা হাত-পা-শরীরের বিভিন্ন অংশ রিয়ালিস্টিক্যালি প্রদর্শন করেন না। মোটা লাইন বা কার্ভ লাইন ব্যবহার করে বোঝানোর আদিম চেষ্টা দেখা যায়।

পোড়ামাটির মোড়াদৈনন্দিন গার্হস্থ্য জীবনের সাদাকালো যাপন-শৈলী তাঁদের পুতুলের বিষয়বস্তু। কাঁঠালিয়ার পুতুল যেমন একক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, তেমনই একাধিক চরিত্রের সমন্বয়ে সামাজিক ন্যারেটিভ প্রকাশ করেছে। যেমন মা শিশুকে প্রসারিত পায়ের উপরে রেখে তেল মাখাচ্ছেন। উকুন বাছানি, দুই সখির আলিঙ্গন, জাঁতা ঘোরানো দুই মহিলা, দাইমা ও আঁতুরঘরের প্রসূতি, দই বা দুধ বেচুনি গোয়ালিনী, বউদের ঢেঁকিতে ধান ভানা, হাতি বা ঘোড়ায় চড়া লাল টুপি-পরা সিপাই বা দারোগা, ট্যাঁপাটেঁপি, ঘোড়া ইত্যাদি।

কাঁঠালিয়ার পুতুলগুলির উচ্চতা ৫ ইঞ্চি থেকে ৭ ইঞ্চি। চওড়া প্রায় ৭ থেকে ৮ ইঞ্চি। ওজন ১০০ গ্রাম থেকে শুরু করে ৩০০ গ্রাম পর্যন্ত। একই ফ্রেমে পুতুল থাকে দু’টি বা তার অধিক। পুতুলগুলির দেহকাণ্ডটি তৈরি হয় চাকে। মুখটি নির্মিত হয় ছাঁচে এবং হাত-পা এবং পাদপীঠ নির্মিত হয় হাতের সাহায্যে। পুতুল পোড়ানো হয় সাধারণ বা গ্যাসের ভাটিতে। পোড়ানোর পূর্বে নারকোলের ছোবরা দিয়ে ভালো করে বার্নিশ করেন শিল্পীরা।

রং লাগে মূলত তিনটি– সাদা খড়ি, লাল ও কালো। আগে জৈবরং লাগাতেন শিল্পীরা। এখন খোলাবাজার থেকে রং কিনে এনে ব্যবহার করেন। রং গুলতে লাগে কাঁই-আঁটা। খড়ি দেওয়ার কালো রঙে চুল চোখ আঁকেন। লাল রঙের ব্যবহার বেশি। নারীদের সিঁথির সিঁদুর, ঠোঁট, হাতের তালু সিপাইয়ের টুপি লাল রঙের। এরপর লাল ও কালো রেখার ব্যবহার পুতুলগুলিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।

লাল ও কালো রঙের জোড়া তির্যক, বক্র, উলম্ব, অনুভূমিক ইত্যাদি রেখা বিভিন্ন স্থানে প্রয়োগ করে পুতুলগুলিকে আকর্ষণীয় করেন শিল্পীরা। যেমন হাতের ক্ষেত্রে সমদূরত্বে জোড়া অনুভূমিক কালো ও লাল রেখার চমৎকার ব্যবহার দেখা যায়। গলায় অলংকার বোঝাতে ভি-আকৃতির লাল রেখা আঁকেন। স্তনদ্বয়ে লাল রঙের বৃত্ত থাকে। পাদপীঠে লাল-কালো জোড়া রেখার তির্যক ব্যবহার দেখার মতো। কত কম রঙে কত বৈচিত্র আনা যায় তার সার্থক দৃষ্টান্ত কাঁঠালিয়ার পুতুলশিল্প। অনেক সময় রং হয়ে যাওয়ার পর তরল এরারুট মাখিয়ে অভ্র ছড়িয়ে চাকচিক্য আনেন।
…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব ………….
পর্ব ২৯: মৎস্য দেবতা মৎস্য ভোগ
পর্ব ২৯: কুবের পুজোর আচার থেকেই সোনা কেনা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়
পর্ব ২৮: বৈশাখ বিষ্ণুর প্রিয়, পুরাণের শ্রেষ্ঠ মাস?
পর্ব ২৭: গর্জন থেকেই গাজন
পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?
পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের
পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল
পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?
পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন
পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া
পর্ব ২০: মাদারি কা খেল
পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়
পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর
পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা
পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে
পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম
পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন
পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান
পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি
পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল
পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই
পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?
পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব
পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!
পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই
পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা
পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত
পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস
পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর
পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved