


বাঁকুড়ার নাড়িচা গ্রামের সর্বমঙ্গলা, পাল-সেন যুগের মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তিতে নিত্য পূজিত হন। দেবীর নিত্যসেবার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল পোড়ামাছের ভোগ। একে স্থানীয়ভাবে বলে খালাপোড়া। বাৎসরিক পুজো পৌষ সংক্রান্তিতে। পয়লা মাঘ সেই উপলক্ষে জমজমাট মেলা বসে। শিবের গাজনে হাজরা পুজোর অন্যতম উপচার শোলমাছ পোড়ার ভোগ। অনেক স্থানে ক্ষেত্রপালের ভোগেও লাগে পোড়া শোলমাছ। বনেদিবাড়ির দুর্গাপুজোয় অনেকসময় মাছের ভোগ দেওয়া হয়।
৩০.
মাছের সঙ্গে ভারতীয়দের সম্পর্ক প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে। বিভিন্ন প্রত্নক্ষেত্র থেকে মাছের কাঁটা, মাছ ধরার সরঞ্জাম, বঁড়শি ইত্যাদি পাওয়া গিয়েছে। মিলেছে মাছের মোটিফযুক্ত নান্দনিক পোড়ামাটির পাত্রাংশ। পাণ্ডুরাজার ঢিবি দ্রষ্টব্য। মাছ বাঙালির খাদ্য তালিকার অন্যতম উপকরণ। পোড়া থেকে শুরু করে ভাজা ঝোল ঝাল অম্বল সবেতেই স্থান করে নিয়েছে মীন-পদাবলি।
বাঙালি এয়োস্ত্রীর অন্যতম চিহ্ন হল মাছ খাওয়া। বিয়ে মানেই মাছের উপস্থিতি– প্রাকৃত থেকে শিল্পকলা। মাছের আলপনা ছাদনাতলার সৌন্দর্য। মাছ, স্থাপত্য ও লোকজ শিল্পকলাতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছে। মাছবাছুনি পুতুল বাংলার পোড়ামাটির আকর্ষণীয় শিল্প। বৈষ্ণবীয় রথযাত্রার দারু পুতুলেও স্থান করে নিয়েছে মাছবাছুনি। এমনকী লোকায়ত স্তরের একাধিক মৎস্যদেবী আবিষ্কৃত হয়েছে বাংলা তথা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রত্নক্ষেত্র থেকে।

টেরাকোটা ফলকে বেশ কিছু দেবীমূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে– যাঁদের লোকায়ত মৎস্যদেবী রূপে চিহ্নিত করা যায়। এই ধরনের দেবীমূর্তি পাওয়া গিয়েছে মথুরা অঞ্চল থেকে, উত্তর ২৪ পরগনার হাদিপুর, মঙ্গলকোট চন্দ্রকেতুগড় অহিচ্ছত্র ইত্যাদি প্রত্নস্থান থেকে। মূর্তিগুলি ছাঁচে তোলা, দণ্ডায়মান দেবীমূর্তি। অপূর্ব সুন্দরী। ক্ষীণ কটি। সুগঠিত স্তনদ্বয়। প্রশস্ত নিতম্ব। মাথার চুল খোঁপা-বাঁধা। চারুলোচনা।
বাম হাত কটি-বিন্যস্ত মুদ্রায় বা মেখলায় স্পর্শ করা। ডান হাতে ঝোলানো জোড়া মৎস্য বা মৎস্যমিথুন। এই ধরনের নয়টি টেরাকোটা ফলক সংরক্ষিত রয়েছে মথুরা মিউজিয়ামে। একটি রয়েছে বোস্টন মিউজিয়ামে। (Gangetic Valley Terracotta Art, P. L. Gupta, p. 76)
তবে সব সময়ে যে মৎস্যমিথুন দেখা গিয়েছে তা নয়। মথুরা মিউজিয়ামে টেরাকোটা ফিমেল প্ল্যাক নং ২২৪৩ মূর্তিটিতে দেখা যায়, দেবীর ডান হাতে তিনটি মৎস্য ঝোলানো আছে। (Handbook of the Sculptures in the Curzon Museum of Archaeology, Muttra, p. 21)।

অধিকাংশ গবেষকদের মতে মূর্তিগুলি শুঙ্গ যুগের শৈলীতে নির্মিত হয়েছে। ঐতিহাসিক ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন– ‘এই জাতীয় মূর্তিকে মৎস্যদেবীর প্রতিরূপ বলে চিহ্নিত করা যায়’। (লোকশিল্প বনাম উচ্চমার্গীয় শিল্প, পৃ. ৪১)
লৌকিক প্রবাদে ‘মাছের মায়ের পুতের শোক’ বলে যতই বিদ্রুপ করা হোক না কেন, মাছ প্রজননের প্রতীক। সেই কারণে বিয়েতে মাছ দেওয়ার রীতি আজও বঙ্গ জীবনের অঙ্গ। এছাড়া মৎস্যমিথুনের আলাদা তাৎপর্যও দেখা যায় বিবিধ ধর্মীয় সংস্কৃতিতে।
জোড়া মাছের মোটিফ শুধু হিন্দু ধর্মে নয়, জৈন ও বৌদ্ধধর্মে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। জৈনধর্মে স্বস্তিক, শ্রীবৎস, নন্দব্রত বা ধ্বজ, বর্ধমানক, ভদ্রাসন, কলস, মৎস্যযুগম এবং দর্পণ– এই আটটি পবিত্র চিহ্নকে ‘অষ্টমঙ্গল’ বলা হয়। ।

বৌদ্ধধর্মেও জোড়া মৎস্য দিব্য প্রেমের প্রতীক। অনেকেই একে সৌভাগ্যের চিহ্ন বলেছেন। দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ, ছত্র, বিজয়পতাকা, ধর্মচক্র, পবিত্র অঙ্কন, পদ্মফুল পূর্ণ কলস, এবং জোড়া সোনালি রঙের মাছ। বৌদ্ধদের কাছে এগুলি পরম পবিত্র বস্তু।
লোকধর্মে জোড়া ইলিশমাছের মধ্যে বিয়ে দেওয়া হয়। বাংলার ধীবররা গঙ্গাপুজোর দিনে গঙ্গায় মাছ ছাড়েন। মাছের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তিনটি বিষয়– প্রজনন, ভূমির উর্বরতা এবং যজুর্বেদ অনুসারে জল। জলেই প্রাণের বিকাশ সম্ভব হয়েছিল। জল হল জীবন স্বরূপা। ভূমির সঙ্গে মাছের সম্পর্কের সূত্রে মৎস্যমিথুনধারী দেবীকে পণ্ডিতগণ বসুধারা দেবী রূপে চিহ্নিত করেছেন।
মথুরা অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত এবং বোস্টন মিউজিয়ামে সংরক্ষিত মৎস্যমিথুনধারিণী এক টেরাকোটা মূর্তির নিচে ব্রাহ্মী লিপিতে খোদিত দেবীর নাম পাওয়া যায়। এ কে কুমারস্বামী মূর্তিলেখের পাঠোদ্ধার করে লিখেছেন, দেবীর নাম সুধাতা। লেখটি পুনরায় পঠিত হয়। পরিষ্কৃত হয়– দেবীর নাম সুধারা। কিন্তু মূর্তিলেখের আদ্যক্ষর ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। আদি অক্ষর ছিল ‘ব’। সুতরাং দেবীর নাম বসুধারা রূপে সনাক্ত করেছেন বিশিষ্ট পণ্ডিত গবেষক ভি এস আগরওয়াল। (Gangetic valley Terracotta Art, P. L. Gupta, P. 76)

বসুধারা বসু বা ধনীদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ইনি প্রাচীন পৃথিবী বা বসুন্ধরা দেবী। অথর্ববেদে বসুন্ধরাকে ‘হিরণ্য বক্ষ’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ যাঁর গর্ভে নিহিত রয়েছে ধনসম্পদ। বৌদ্ধসাহিত্যে ‘বসুন্ধরা’ বা ‘বসুধারা’ ধরিত্রীদেবীর প্রতিরূপ। বুদ্ধদেব যখন পরম বোধিলাভ করেন, তখন ধরিত্রমাতাকে সাক্ষী মানেন। ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় বুদ্ধদেবের এই ভাস্কর্যটি খুবই জনপ্রিয়।
বৌদ্ধসাহিত্যে বসুধারা হলেন ধনদেবতা জম্ভলার স্ত্রী। পঞ্চধ্যানী বুদ্ধের অন্যতম রত্নসম্ভব বা অক্ষোভ্য থেকে উদ্ভূত দেবী বসুধারা। ধ্যান অনুসারে দেবীর ডান হাত বরদ মুদ্রায় প্রকাশিত। পদতলের কাছে থাকে রত্নকলস। বাম হাতে থাকে ধান্যমঞ্জরী। প্রাচীন মূর্তিতে জোড়া মাছ ঝোলানো থাকত।
বসুধারার মূর্তিপুজো বর্তমানে হারিয়ে গেলেও, আজও বিবাহ, উপনয়ন প্রভৃতি মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে দেওয়ালে ঘৃতের ধারা অঙ্কন করা হয়। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে একবার দেবতা ও ব্রাহ্মণদের মধ্যে বিবাদ শুরু হলে উপরিচর বসু দেবতাদের পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন। এর ফলে ব্রাহ্মণদের অভিশাপে উপরিচর বসু চলৎশক্তি রহিত হয়ে ভূগর্ভে পতিত হন।

দেবতারা যজ্ঞের হবি থেকে উপরিচরের খাবারের ব্যবস্থা করেন ঘৃতের ধারা দিয়ে। ঘৃতের ধারা এখানে জল বা প্রবাহের প্রতীক যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধরিত্রীর উর্বরতা, বৃষ্টির কামনা সমৃদ্ধি ইত্যাদি। বসুধারা নামে একটি নারীব্রতও দেখা যায় বাংলার লোকজীবনে।
মৌর্য শুঙ্গ যুগের স্থাপত্যে, বিশেষ করে ভারহুত সাঁচি অমরাবতী প্রভৃতিতে জাতক কাহিনি সংশ্লিষ্ট একাধিক মাছের চিত্র খোদাই করা আছে। মাছের মতো কানের দুলও মেয়েদের কাছে একসময় খুব আদরণীয় ছিল। রাঢ়ের ধর্মীয় সংস্কৃতিতে মাছ উল্লেখযোগ্য উপকরণ। তান্ত্রিকদের পঞ্চ ম-কারের উপচার মৎস্য। শাক্তদেবীদের ভোগে মাছ লাগে। ক্ষীরগ্রামের মহাদেবী যোগাদ্যার ভোগে মাছ অত্যাবশ্যক উপকরণ। মাছের সঙ্গে শাক্ত-শৈব ধর্মের দেবদেবীর যোগ আছে।

বাঁকুড়ার নাড়িচা গ্রামের সর্বমঙ্গলা, পাল-সেন যুগের মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তিতে নিত্য পূজিত হন। দেবীর নিত্যসেবার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল পোড়ামাছের ভোগ। একে স্থানীয়ভাবে বলে খালাপোড়া। বাৎসরিক পুজো পৌষ সংক্রান্তিতে। পয়লা মাঘ সেই উপলক্ষে জমজমাট মেলা বসে। শিবের গাজনে হাজরা পুজোর অন্যতম উপচার শোলমাছ পোড়ার ভোগ। অনেক স্থানে ক্ষেত্রপালের ভোগেও লাগে পোড়া শোলমাছ। বনেদিবাড়ির দুর্গাপুজোয় অনেকসময় মাছের ভোগ দেওয়া হয়।
বিষ্ণুর অবতার মালায় মৎস্য-অবতারের কাহিনি সকলেই জ্ঞাত আছেন। বাংলায় শাক্তদেবীর মৎস্যরূপের লোককাহিনিও শোনা যায়। বাংলায় প্রাচীন প্রস্তর মূর্তিতে গন্ধেশ্বরী পুজিত হন পূর্ব বর্ধমান জেলার শিমুলিয়া গ্রামে। দেবীর আবির্ভাব-কাহিনিতে মাগুরমাছ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছে। দেবীর স্বপ্নাদেশে সেবাইত জানতে পারলেন, শিমুলিয়ার অদূরবর্তী কাত্যায়নী দিঘির ঈশান কোণে মাগুরমাছ রূপে আড়ার মধ্যে আছেন গন্ধেশ্বরী দেবী। পরে সেখান থেকে মাগুর মৎস্যরূপী দেবীকে উদ্ধার করলে দেবী দুর্গামূর্তিতে পরিণত হন।
লোককাহিনিটি তাৎপর্যপূর্ণ সন্দেহ নেই। হয়তো পূর্বে মৎস্যরূপী কোনও মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তীকালে সেই মুর্তির পরিবর্তে সিংহবাহিনী দুর্গামূর্তি গন্ধেশ্বরী হিসাবে শিমুলিয়াতে প্রতিষ্ঠিত হয়। শিমুলিয়ার গন্ধেশ্বরী পুজোয় আজও জোড়া মাগুরমাছ বলি হয় এবং দেবীর ভোগে লাগে।

মাছ শুধু দেবতাদের প্রিয় নয়, অপদেবতা বা ব্যন্তর দেবতা ভূতদের খুবই প্রিয়। রাতে মাছ-মাংস তেনাদের জন্য অনেকেই গৃহের বাইরে আনেন না। মেছোভূতদের আবার প্রিয় খাদ্য অন্য কিছু নয়, কাঁচা কিংবা রান্না করা মাছ।
…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব ………….
পর্ব ২৯: কুবের পুজোর আচার থেকেই সোনা কেনা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়
পর্ব ২৮: বৈশাখ বিষ্ণুর প্রিয়, পুরাণের শ্রেষ্ঠ মাস?
পর্ব ২৭: গর্জন থেকেই গাজন
পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?
পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের
পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল
পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?
পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন
পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া
পর্ব ২০: মাদারি কা খেল
পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়
পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর
পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা
পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে
পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম
পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন
পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান
পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি
পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল
পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই
পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?
পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব
পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!
পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই
পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা
পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত
পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস
পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর
পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved