Evolution of Alkap Folk Performance। Robbar
Robbar
  • ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আলকাপ: বিরল মায়ার স্মৃতিচিহ্ন

আলকাপ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছিল প্রতিযোগিতামূলক পালা। রাত গড়িয়ে দিন পর্যন্ত পাল্লা চলত আলকাপের। দলের হার-জিত নির্ধারণ হত অদ্ভুতভাবে। মঞ্চের মধ্যে দড়িতে দু’দলের মাঝে টাঙিয়ে দেওয়া হত কলা আর মেডেল। কোনও একজন প্রভাবশালী মাতব্বর শেষপর্যন্ত ঘোষণা করতেন, কোন দিল জিতল আর কারা হারল। যে দল হেরে যেত, তারা কলা পেত। মেডেল পেত মাতব্বর কথিত জয়ীরা।

শেষ আপডেট: মে ১৯, ২০২৬, ২১:০১   
Facebook WhatsApp Messenger

৩৩.

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘মায়ামৃদঙ্গ’ উপন্যাস মূলত ধ্রুপদী লোকনাট্য আলকাপ অবলম্বনে রচিত। আলকাপের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছোকরাকে কেন্দ্র করে ওস্তাদ ও সহশিল্পীদের হৃদয়ের রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব, জীবন যন্ত্রণা থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টা, বিশিষ্ট লোকদর্শন বা তত্ত্ব উপন্যাসের অন্যতম উপজীব্য বিষয়। পাশপাশি আলকাপ লোকনাট্যের লুপ্ত দু’টি আঙ্গিকের সন্ধান পাওয়া যায়। বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে ‘মায়ামৃদঙ্গ’-র গুরুত্ব এই কারণে অপরিসীম।

আলকাপ লোকনাট্যে মেয়েদের হৃদয় ও মুখমণ্ডল-বিশিষ্ট তরুণ পুরুষ, যার পোশাকি নাম ‘ছোকরা’। সে চেতনে-অবচেতনে এক অবাঞ্ছিত ভালোবাসা বা মায়াজালের বাতাবরণ সৃষ্টি করে এবং নাট্যদলের কমবেশি সকলকে প্রলুব্ধ করে। এই অসবর্ণ ভালোবাসা বড়ই বিপজ্জনক। ভালোবাসার টান যেমন মারাত্মক, পরিণতিও তেমনই ভয়ংকর।

উপন্যাসের দুই প্রধান চরিত্র ওস্তাদ ঝাঁকসু বা ঝাঁকসা আর ওস্তাদ সনাতনকেও এরজন্য জীবনে কঠিন মূল্য দিতে হয়েছিল। অবশ্য সেই মায়ার টান থেকে তারা সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেনি। উপন্যাসের শেষে দেখি সনাতন ওস্তাদ সুধার বেদনার্দ্র স্মৃতি-সংরাগকে কোনওরকমে চাপা দিয়ে সুবর্ণ ছোকরাকে সঙ্গী করে ওস্তাদ ঝাঁকসুর উদ্দেশেই রওনা দেয়, নতুন শিল্পী জীবনের সন্ধানে। সিরাজ লিখেছেন–

‘অনেক গান আর মায়া ভরা একটা জগতের দিকে হেঁটে যেতে যেতে দুটি মানুষ একসঙ্গে গুণ গুণ করে ওঠে… গাইতে গাইতে একটা হাত আরেকটা হাত ধরে থাকে। একটা শরীর আরেকটা শরীরকে ছোঁয়।… সুবর্ণকে ছুঁয়ে থেকে একটা নতুন পালা বাঁধবার সাধ হয়।’

ছোকরা– আলকাপ দলের সাক্ষাৎ মোহিনী মায়া। এমনিতে পুরুষ। কিন্তু মেয়েদের মতো তার দীঘল কেশ। দু’হাতে চাঁদির চুড়ি। গায়ে লালচে হাওয়াই শার্ট। পরনে ডোরাকাটা পাজামা। পায়ে কাবুলি চপ্পল। চিবুক সামান্য পুরু। নিটোল গাল। টানা চোখ ভুরুর ওপর।

পুরুষ, তবু পুরুষ নয়। আবার নারী, তবু নারী নয়। এমনই তার সাজপোশাক আর মানসিক গড়ন। রাতের আসরে মঞ্চে তৈরি করে মায়া, বিভ্রম। আসর ভাঙলেও সেই মায়ায় জড়িয়ে থাকে তার সৃষ্টিকর্তা ওস্তাদ। এমনকী ‘গেনে’র গোটা দলটাই যায় জড়িয়ে।

zoom
ছোকরা– আলকাপ দলের সাক্ষাৎ মোহিনী মায়া

মঞ্চের রেশ এসে পড়ে শিল্পীদের বাস্তব জীবনের প্রাত্যহিকীতে। একটুকু ছোঁয়া, একটা কটাক্ষ, একটা চুম্বন– যেন সেই মায়াজগতের জাদুবাস্তবতা তৈরি করে। শুধু ওস্তাদ নয়, সঙাল, কপে থেকে পাশকপেরাও তার একটুকু অঙ্গ স্পর্শ করার জন্য লালায়িত থাকে।

শীতের দীর্ঘ রাত ভেঙে গেনের দল যায় হুল্লোড় করতে করতে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। এক মেলা থেকে আরেক মেলায় জমায় পাড়ি। সুদীর্ঘ পথের ক্লান্তি মুছে যায় ছোকরার আলগা পরশের উত্তাপে। 

এমনই এক সাক্ষাৎ মায়া আলকাপের দলের ‘ছোকরা’।

লেখক জানিয়েছেন– রাত্রির শোভা যেমন চাঁদ, তেমনই আলকাপের দলের শোভা ছোকরা। ওস্তাদই তৈরি করেন ছোকরাকে। তাঁর সাধন-সমন্বিত তালিমেই ছোকরার ভিতরে গড়ে ওঠে মোহিনী মায়ার কিশলয়। সযত্ন অনুশীলনে ধীরে ধীরে তার ভেতর থেকে জন্ম নেয় মায়ায় গড়া এক কিন্নরী। যে পুরুষ নয়। কিম্পুরুষ নয়। নারী নয়। ছোকরা। 

ভুল হবে, যদি তাকে মনে করা হয় তৃতীয় লিঙ্গের দৃষ্টান্ত। দেহের দিক থেকে এরা সত্যিকারের পুরুষ। সময়-সুযোগ-পরিস্থিতি এলে এদের ভিতর থেকেও কিন্নরীর খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারে পৌরুষদীপ্ত আদিম রূপটি। যেমনটি হয়েছিল ওস্তাদ ঝাঁকসার স্ত্রী ঢপবালী গঙ্গামণি আর ওস্তাদের আদরের ছোকরা শান্তির দৈহিক মিলনে।

ছোকরার কাজই হল তার কিন্নরী-সত্তা দিয়ে চেতনে-অবচেতনে শিল্পী বা দর্শকের চিত্তে মায়া-বিভ্রম সৃষ্টি করা। এই মায়ার টানে ওস্তাদ পর্যন্ত মন্ত্রমুগ্ধ থাকে। তাই প্রকৃত ছোকরা হারিয়ে ওস্তাদ হয়ে যায় মণিহারা ফণি। সব ছোকরা কিন্তু বিরল মায়া তৈরি করতে পারে না। সিরাজ লিখেছেন–

‘অধরাকে যত ধরতে চায় দেখে রক্ত মাংসের ক্লেদ, ব্যর্থতার গ্লানি। ইষ্টদেবতা সেখানে নেই। তার বাস মনের মধ্যে। তাকে হাতের মুঠোয় পেতে তাপ লাগে। মোহ ভেঙে গেলে যা পড়ে থাকে তা অশ্লীল। তার নাম সমকামিতা।’

কিন্তু এই উপন্যাস তো সমকামিতাকে প্রশ্রয় দেয় না, শিল্পীরা মনে-প্রাণেই শিল্পী। তাদের লোকদর্শনেও রয়েছে সত্য-সুন্দরের সাধনা। বাগদেবীর আরাধনা। ছোকরার মোহমায়ার নেপথ্যে যখন রূঢ় বাস্তবতাকে দর্শন করে, তখনই তার মন থেকে জেগে ওঠে জীবনের প্রতি ঘৃণা। কিন্নররূপী ইষ্টদেবী হারিয়ে তখন সে বুঝতে পারে, এটাই হল অশ্লীলতা, সমকামিতা। তখন থেকেই তার জীবনে ট্রাজেডি শুরু।

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বৈতালিক’ উপন্যাসের বিষয়বস্তুতেও আলকাপ শিল্পীদের কথা আছে। কিন্তু বৈতালিকের সঙ্গে মায়ামৃদঙ্গের তুলনা করা ভুল। কেননা সেখানে লোকশিল্পীদের দ্বন্দ্ব, বিক্ষুব্ধ হৃদয়ের হাহাকার বা ট্র্যাজেডি নেই। বরং রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পের নায়কের মতো মায়ামৃদঙ্গের চরিত্ররা শিল্পের মোহমায়ায় আবিষ্ট থেকে শেষপর্যন্ত আক্ষেপ করে বলে, ‘সব ঝুট হ্যায়!’ ‘মায়ামৃদঙ্গ’ উপন্যাসের অন্যতম ওস্তাদও বলেছিলেন, ‘এ নেশায় বড় পাপ। বড় যন্ত্রণার জীবন আলকেপেদের।’

আলকাপ সম্পর্কে সিরাজ লিখেছেন– ‘আলকাপের পালার নাম কাপ। ওস্তাদ ঝাঁকসা বলে সংস্কৃত মূলে কাপট্য থেকে কাপ– ব্যঙ্গরসাত্মক নাটক। আর আল– আল মানে হুল, মৌমাছির হুল। মধু খেতে হলে জ্বালাও সইতে হবে। তাই কেমন কাপ? না– যার আল আছে।’

আলকাপের পাশাপাশি ‘আলকাটাকাপ’ নামেও নাট্যরীতি রয়েছে। লেখকের মতে ‘আলকাটাকাপ’ শব্দের অর্থ হল– ‘অযথার্থ, কিম্ভূত, উদ্ভট, বিকৃত’। লেখক দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় ‘আল’ শব্দের ব্যখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেন– ‘আল শব্দটি আহ্লাদের অপভ্রংশ। আহ্লাদ > আল্লাদ > আল। এটি পুরানো বাংলা শব্দ’।

‘আলকাপ’ শব্দটি ‘আল’ ও ‘কাপ’ যোগে সৃষ্ট। ‘আল’ শব্দের অর্থ যে হুল, তা বোঝা যায় একসময় গোরু-মোষের পায়ের খুরে এক ধরনের লোহার চাকতি হুল বা পেরেক মেরে বসানো হত। এর নাম ছিল আল মারা। আবার ছেলেদের খেলনা লাট্টুর শেষে যে লোহার গজাল থাকে, তাকেও বলা হয় ‘আল’।

দ্বিতীয়ত, ‘আল’ শব্দটি যে আহ্লাদ থেকে এসেছে, তার নিশ্চিত প্রয়োগ আজও গ্রামবাংলায় শোনা যায় লোকপ্রবাদে, যেমন অতিরিক্ত আহ্লাদি মেয়েকে বলা হয়–

‘আল গিদেরি রাধা।
বরকে বলে দাদা।।’

‘কাপ’ শব্দটি সংস্কৃত কাপট্য থেকে এলেও– কপট, ছদ্ম, মায়াবী, বাজিকর ইত্যাদি বিচিত্র অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন ভারতচন্দ্র লিখেছেন– ‘কেহ বলে ঐ এলো শিব বড় কাপ’। রাঢ় বাংলায় ‘কাপ’ বলতে সঙদার একক অভিনেতাকে নির্দেশ করে। ‘কাটার কাপ’ বলেও একটি শব্দবন্ধ ব্যবহৃত হয় কিম্ভূত-কিমাকার বোঝাতে।

উপন্যাসে তিন ধরনের আলকাপের নাট্য-আঙ্গিকের কথা উল্লিখিত থাকলেও, দুই ধরনের নাট্য-আঙ্গিকের কথাই সবিস্তার বলা হয়েছে। একটি ওস্তাদ ঝাঁকসা পরিচালিত, অপরটি ‘আধুনিক আলকাপ’, যার ওস্তাদ ছিলেন সনাতন। দু’টি ধারাই বর্তমানে লুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এই কারণে লেখক লিখেছেন– ‘আলকাপ-এর শেষ নায়ক বলতে শুধু আমিই এখনও বেঁচে আছি। বেঁচে আছি শুধু বিরল মায়ার স্মৃতিটুকু নিয়ে।’

ওস্তাদ ঝাঁকসা পরিচালিত ‘আলকাপ’ লোকনাট্যে ওস্তাদ, ছোকরা, সঙাল– এই তিনজন মূল আলকেপে। তবে কোনও কোনও দলে আর একজন ছোকরা থাকে। ‘পাশকপে’ অর্থাৎ, দোহারি থাকে তিনজন। সুরপার্টিতে হারমোনিয়াম মাস্টার, তবলচি ছাড়াও কোনও কোনও দলে আড়-বাঁশিবাদক একজন থাকতেন। এছাড়া একজন বাহক থাকত। কোনও কোনও দলে মালিক বা ম্যানেজারকেও দেখা যেত। এই নিয়ে পুরো ‘গেনের দল’ গঠিত হত।

দোহারিরা দোহারির সঙ্গে কত্তাল বাজাতেন। প্রবেশ-প্রস্থানের কোনও গেট থাকত না। মঞ্চ হত চাঁদোয়া টাঙিয়ে। ঝাঁকসার দলে বাহক ছিল রঘুনন্দন। নাসির উদ্ধব আর বটো ছিল দোহারি। সনাতন ওস্তাদ পরিচালিত আধুনিক আলকেপের ম্যানেজার ছিলেন আমির আলি। বাহক নফর আলি। হারমোনিয়াম বাদকের নাম কাদু বা কাদের আলি। আর একজন ছিলেন দলের গুণিন, তার নাম কালাচাঁদ বাউরি।

আলকাপ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছিল প্রতিযোগিতামূলক পালা। রাত গড়িয়ে দিন পর্যন্ত পাল্লা চলত আলকাপের। দলের হার-জিত নির্ধারণ হত অদ্ভুতভাবে। মঞ্চের মধ্যে দড়িতে দু’দলের মাঝে টাঙিয়ে দেওয়া হত কলা আর মেডেল। কোনও একজন প্রভাবশালী মাতব্বর শেষপর্যন্ত ঘোষণা করতেন, কোন দিল জিতল আর কারা হারল। যে দল হেরে যেত, তারা কলা পেত। মেডেল পেত মাতব্বর কথিত জয়ীরা।

একই পালা বারবার মঞ্চস্থ করার সুযোগ থাকে বলে, প্রতিবার নতুন চেহারা পায়। ঘষামাজায় প্রতিবার বাহুল্য-বর্জিত হয়ে নতুন নতুন কথা আসে। ফলে আলকাপ শেষপর্যন্ত একটি নিটোল নির্মেদ নাট্য রূপে পরিবেশিত হয় দর্শকের মধ্যে।

আলকাপে থাকে গান, নাচ, অভিনয়, ছড়া, ঠেসছড়া, কবিয়ালি তত্ত্বকথা, বাকচাতুরি, শ্লেষ-ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর হাস্যরসের ফোয়ারা। আর থাকে সমাজ-সংসারের তীব্র সমালোচনা। আলকাপ কাউকে ছেড়ে কথা বলে না।

ওস্তাদের কাজ শুধু ছোকরা তৈরি বা দল পরিচালনা করা নয়, তিনি আলকাপের আসরে মুখ্য চরিত্র। কবিগানের কবিয়ালের মতো তার সাজ। কোঁচানো ধুতি। গায়ে পাঞ্জাবি, গলায় চাদর বা উত্তরীয়। মাথায় লম্বা চুল। হিন্দুর বেদ-পুরাণ, মুসলমানদের কোরান-হাদিস তাঁর কণ্ঠস্থ। আসরে প্রবেশ করে করজোরে দাঁড়ান। কখনও কখনও বন্দনাগান করেন। তাঁর মাধ্যমেই আলকাপের তত্ত্বকথা বা লোকদর্শন ব্যক্ত হয়। 

আলকাপ পঞ্চরঙের ডালি হলেও, এর মূল আধার হল ‘কাপ’ অর্থাৎ ছোট নাটক। রাঢ় অঞ্চলে একেই বলে ছক নাটক। এই নাটক বিচিত্র রসের হলেও মূলরস রঙ্গব্যঙ্গ-মূলক হাস্যরস। দুই ধরনের কাপ মূলত অভিনীত হত। একটি আলকাপ, অর্থাৎ যে কাপে বা নাটকে ‘আল’ অর্থাৎ হুল আছে। ‘হুল’ মূলত সমাজ-সংস্কারের তীব্র সমালোচনা। লোকশিল্পীদের কাছে আলকাপ এক ধরনের চাবুক। দর্শকের চিত্তে হাস্যরসের আধারে মারা চাবুক। সিরাজ অবশ্য আলকাপকে মৌচাকের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দর্শক, মধু পান করার উদ্দেশ্যে নাটক দেখতে আসে। মধু খেতে হলে মৌমাছির হুলেও বিদ্ধ হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ‘আলকাটারি’ কাপ, অর্থাৎ, উদ্ভট বিকৃত, কিম্ভুত রসের কাপ নাটক। এই প্রকার নাটকে ভাঁড়ামির প্রভাব বেশি থাকে।

দুই প্রকার কাপের মূল চরিত্র ‘সঙাল কপে’। সামগ্রিকভাবে আলকাপের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র সঙাল। খানিকটা বেঢপ চেহারা, তেমনি অঙ্গভঙ্গী, উপস্থিত বুদ্ধি, কথার পিঠে কথার যোগান দেওয়া ইত্যাদি সব মিলিয়ে হাস্যরসের মূল আধার তিনি। লোকদর্শনের পাশাপাশি লোকশিক্ষা দিতে কাপের জুড়ি মেলা ভার। 

আলকাটারি কাপও ‘মায়ামৃদঙ্গ’-এ উল্লিখিত হয়েছে। তবে এই কাপকে বিকৃত বা উদ্ভট রসের না বলে রঙ্গব্যঙ্গ-মূলক কাপ বলা চলে। এই উপন্যাসে শুধু আলকাপ নয়, বর্তমানে বিলুপ্ত একাধিক লোকনাট্য আঙ্গিকের সন্ধান পাওয়া যায়। রাঢ় অঞ্চলে একদা প্রচলিত ছিল ছ্যাঁছড় দলের পালাগান, মালদহ অঞ্চলের আলকাপ গান। এ-সমস্ত প্রসঙ্গই উপন্যাসে এসেছে।

বর্তমানে আলকাপ বলতে এক মিশ্র লোকনাট্যকে বোঝায়। ওস্তাদ বলতে বর্তমানে সঙালকে নির্দেশ করে। রাঢ় অঞ্চলে সঙাল পরিচালিত কৌতুকপূর্ণ নকশা-নাটককে বলে ছক দেওয়া বা কাপ দেওয়া। ‘ছোকরা-প্রথা’ অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। পরিবর্তে দলে এসেছে একাধিক মহিলা চরিত্র। সম্পূর্ণভাবে লুপ্ত হয়ে গিয়েছে দোহারি প্রথা। 

সুরপার্টিতে যাত্রার অনুকরণ দেখা যায়। ক্লারিওনেট ফ্লুট, ক্যাসিও ইত্যাদির সংযোজন ঘটেছে। মঞ্চ পুরো যাত্রার মতো। প্রবেশ-প্রস্থানের জন্য দু’টি গেট দেখা যায়। ছক বা কাপের পাশাপাশি দলে যাত্রার মতো ছোট-ছোট যাত্রাপালার উপস্থাপন দেখা যায়। 

একমাত্র কাপে দেখা যায় অলিখিত বা মুখে-মুখে সংলাপ তৈরি করার প্রাচীন প্রথাটুকু। বর্তমানে ‘আলকাপ’ শব্দটিরও অবলুপ্তি ঘটেছে। তার বদলে এসেছে ‘পঞ্চরস’ বা ‘লেটো’ শব্দটি।

…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলি অন্যান্য পর্ব ………….

পর্ব ৩২: তালবাহার

পর্ব ৩১: পোড়ামাটির শিল্পকে জনপ্রিয় করেছে কাঁঠালিয়ার শিল্পীরা

পর্ব ৩০: মৎস্য দেবতা মৎস্য ভোগ

পর্ব ২৯: কুবের পুজোর আচার থেকেই সোনা কেনা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়

পর্ব ২৮: বৈশাখ বিষ্ণুর প্রিয়, পুরাণের শ্রেষ্ঠ মাস?

পর্ব ২৭: গর্জন থেকেই গাজন

পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?

পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের

পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল

পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?

পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন

পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া

পর্ব ২০: মাদারি কা খেল

পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়

পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর

পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা

পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে

পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম

পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন

পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান

পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি

পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল

পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই

পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?

পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব

পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!

পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই

পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা

পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত

পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস

পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর

পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প

Alkap Artist folk art folk performance Narayan Gangopadhyay Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Syed Mustafa Siraj বৈতালিক মায়ামৃদঙ্গ

Share this article on