identity & politics of pratapchand in the history of burdwan | Robbar
Robbar
  • ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাল রাজার রাজনীতি

‘সন্ন্যাসীরাজা’ চলচ্চিত্রের চেয়েও রোমাঞ্চকর প্রতাপচাঁদের জীবনালেখ্য। মহারাজ তেজচাঁদ রায়ের পুত্র প্রতাপচাঁদ ঠাকুমা বিষেণকুমারীর অতিরিক্ত স্নেহে ও প্রশ্রয়ে ক্রমশ আলালের ঘরের দুলাল হয়ে ওঠেন রাজকুমার। এদিকে বিমাতা কমলকুমারী এবং তাঁর সহোদর-ভ্রাতা পরাণচাঁদ কাপুর তাঁর ঘোরতর শত্রু হয়ে ওঠেন। প্রতাপচাঁদ তা জানতেন। সুতরাং তিনিও সুযোগ খুঁজতেন। সঞ্জীববাবু লিখেছেন, একবার জ্বলন্ত কলকে পরাণবাবুর পিঠে দেগে দিয়েছিলেন প্রতাপচাঁদ। 

শেষ আপডেট: জুন ১০, ২০২৬, ১৮:৫৫   
Facebook WhatsApp Messenger

৩৬.

দীর্ঘদেহী। বলিষ্ঠ গড়ন। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সৌম্য সুন্দর পুরুষ। স্নিগ্ধ টানা চোখ। ভক্তের কাছে তিনি ‘রূপ’ বা গৌরাঙ্গ রূপে পরিচিত। সেই নব-গৌরাঙ্গের একদিন উদয় হল শ্রীপাট শ্রীখণ্ডে। ভক্তগৃহে স্বরূপাঙ্গ বা নিত্যানন্দ-সহ অবস্থান করলেন আটদিন।

শ্রীখণ্ড মাতোয়ারা হয়ে উঠল নামসংকীর্তনে। নেপথ্যে রচিত হতে থাকল জটিল রাজনীতির টানটান চিত্রনাট্য। আত্মপ্রকাশের তৎপরতা। তারপর অনেকটা সময় কেটে গেছে। উল্টে গেলো পাশার দান। পালটে গেলো ভবিতব্য। 

zoom
গগন ঠাকুরের আঁকা শ্রীচৈতন্য

ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বর্ধমানরাজ প্রতাপচাঁদ থেকে ‘জালরাজা’র তপ্ত তকমা। গৌরাঙ্গ থেকে সত্যান্বেষী ‘সত্যনাথ’। জীবন-নাট্যের ধূসর যবনিকা! 

জাল-রাজার জীবনী রচিত হল চৈতন্যচরিতামৃত কাব্যের আধারে এক লীলারসময় পাঞ্চালিকা কাব্য– ‘প্রতাপচন্দ্র লীলারস প্রসঙ্গ সঙ্গীত’। শিষ্য-কবি শ্রীখণ্ডের শ্রীঅনুপচন্দ্র দত্ত। রচনাকাল ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দের (১২৫০ সাল) ১৩ অগ্রহায়ণ। প্রতাপচাঁদের আরেক ভক্ত শ্রীখণ্ডের দুর্গামঙ্গল দাসের পৃষ্ঠপোষকতায় অধুনা বিস্মৃতপ্রায় কাব্যটি রচিত হয়েছিল। 

প্রায় ৪০ বছর পর প্রতাপচাঁদের বৈচিত্রময় বিতর্কিত, রহস্যময় এবং নিয়তি-তাড়িত দুর্ভাগ্যতাড়িত জীবন নিয়ে গদ্যরচনা করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের দাদা সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়– ‘জাল প্রতাপচাঁদ’, ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে। 

১৭৯১ সালে প্রতাপচাঁদের জন্ম। ১৮২১ সালে কালনায় তাঁর অন্তর্জলীযাত্রায় ঘোষিত ‘মৃত্যু’। বর্ধমানে ১৮৩৪ সালে ধূমকেতুর মতো এক ব্যক্তির অভ্যুদয়। নিজেকে ‘প্রতাপচাঁদ’ বলে দাবি। ১৮৩৪-৩৮। শুরু হল প্রতাপচাঁদকে কেন্দ্র করে আসল-নকল প্রমাণ করার বিখ্যাত মামলা-মোকদ্দমা। শেষ বিচারে তিনি ‘জালপ্রতাপচাঁদ’ হিসাবে আইনি স্বীকৃতি পেলেন। 

তবু শেষ হয়েও হইল না শেষ। সত্যনাথ রূপে নিজস্ব ভক্তবৃত্তে পরিচিত হলেন জালপ্রতাপচাঁদ। ১৮৫৩ সালে সত্যনাথ প্রয়াত হলেন। 

zoom
জাল প্রতাপচাঁদ সত্যনাথ

নিছক ইতিহাসাশ্রিত থ্রিলারধর্মী উপন্যাস ভাবলে সৃষ্টি ও স্রষ্টাকে হয়তো সঠিক বিচার করা যাবে না। কারণ ‘জালপ্রতাপচাঁদ’ রীতিমতো সরকারি ও ক্ষেত্রসমীক্ষা-জাত তথ্য জোগাড় করে লেখা ইতিহাস। শুধুমাত্র পরিবেশন করা হয়েছে উপন্যাসের ঢঙে। সুকুমার সেন লিখেছেন– ‘জালপ্রতাপচাঁদ (১৮৮৩) ইতিহাস কাহিনী হইলেও লিখিবার গুণে উপন্যাসের মতোই চিত্তাকর্ষক।’ (বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, তৃতীয় খণ্ড, পৃ. ২০৩) 

শ্রীখণ্ডের কবি অনুপচন্দ্রের লেখা ‘প্রতাপচন্দ্র লীলারস প্রসঙ্গ সঙ্গীত’ জাল-প্রতাপচাঁদের জীবদ্দশায় রচিত। পণ্ডিত গবেষক গৌতম ভদ্র ‘জাল রাজার কথা বর্ধমানের প্রতাপচাঁদ’ গ্রন্থে কাব্যটি সম্পর্কে লিখেছেন– ‘তাঁর (অনুপচন্দ্র দত্ত) কাব্যের মূল পোঁতা আছে সঞ্জীবচন্দ্রের বৃত্তের বাইরে এক ভিন্ন জগতে, অন্য এক সামাজিকতায়, প্রতাপচাঁদের দৈবী সত্তায়।’ (পৃ. ২১৬) 

অনুপচন্দ্রের কাব্যে ‘দৈবীসত্তায় মূল পোঁতা’ থাকলেও প্রতাপচাঁদি আলেখ্যর বহু ঐতিহাসিক উপাদান নিহিত আছে। তবে সেই আলোচনা গৌতমবাবুর গ্রন্থে অনুপস্থিত। অথচ অনুপচন্দ্রের গ্রন্থের তথ্য মিলিয়ে সঞ্জীবচন্দ্রের গ্রন্থ পড়লে জাল-প্রতাপচাঁদের ইতিহাস নিষ্ঠার সত্যতা সম্পর্কে পাঠকের ধারণা আরও দৃঢ় হবে সন্দেহ নেই।

অনুপচন্দ্রের কাব্য ধরে মেলাবার প্রথম প্রয়াস করেছিলেন করেছিলেন ‘বীরভূমি’ পত্রিকার সম্পাদক নীলরতন মুখোপাধ্যায়। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ১৩১০ সালে প্রকাশিত ‘পুঁথির বিবরণ’ শীর্ষক লেখা (পৃ. ১৭৩) থেকে জানা যায়, পুথির সংগ্রাহক ছিলেন শ্রীযুক্ত বাবু রঙ্গলাল মুখোপাধ্যায়। ‘বীরভূমি’ পত্রিকায় ১৩০৮-’০৯ বঙ্গাব্দে নির্বাচিত অংশ ছাপা হয়েছিল।

সঞ্জীবচন্দ্র ‘জালপ্রতাপচাঁদ’ রচনায় যে তথ্যনিষ্ঠা দেখিয়েছেন ও পরিশ্রম করেছেন, তাতে অনুপচন্দ্রের কাব্যটি তাঁর নজরে এলে নিঃসন্দেহে উল্লেখ করতেন। মনে হয়, আইনের বিচারে প্রতাপচাঁদ জাল শনাক্ত হলে কোম্পানি ও বর্ধমান রাজন্যশক্তির ভয়ে অনুপের কাব্যের প্রচারও সীমিত হয়ে পড়ে। অনুপচন্দ্র চলে যান বিস্মৃতির অন্তরালে। 

‘সন্ন্যাসীরাজা’ চলচ্চিত্রের চেয়েও রোমাঞ্চকর প্রতাপচাঁদের জীবনালেখ্য। মহারাজ তেজচাঁদ রায়ের পুত্র প্রতাপচাঁদ। ঠাকুমা বিষেণকুমারীর অতিরিক্ত স্নেহে ও প্রশ্রয়ে ক্রমশ আলালের ঘরের দুলাল হয়ে ওঠেন রাজকুমার। এদিকে বিমাতা কমলকুমারী এবং তাঁর সহোদর-ভ্রাতা পরাণচাঁদ কাপুর তাঁর ঘোরতর শত্রু হয়ে ওঠেন। প্রতাপচাঁদ তা জানতেন। সুতরাং তিনিও সুযোগ খুঁজতেন। সঞ্জীববাবু লিখেছেন, একবার জ্বলন্ত কলকে পরাণবাবুর পিঠে দেগে দিয়েছিলেন প্রতাপচাঁদ। 

প্রতাপচাঁদ যেমন সাহসী বুদ্ধিমান বিচক্ষণ ছিলেন, তেমনই আমোদ-প্রমোদে উদ্দাম। কুস্তী লড়া, সাঁতার কাটা, ঘুড়ি ওড়ানো ছিল নেশা। সাহেবসুবোদের সঙ্গে অনর্গল ইংরাজিতে কথা বলতে পারতেন। মদ্যপানে রাজকীয় আসক্তি। প্রতাপ ছোট থেকেই অতিরিক্ত ঘামতেন। এই বৈশিষ্ট্য অনুপচন্দ্র ও সঞ্জীবচন্দ্র উভয়েই উল্লেখ করেছেন। 

অল্প বয়সেই বাবার কাছে বিষয়সম্পত্তি লিখে নিয়ে বিষয়বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিলেন। ফলে তখন থেকেই তার বিরুদ্ধ-শক্তি আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। কোর্টে সাক্ষ্য দিতে যাওয়া জাল প্রতাপের জবানিতে সঞ্জীবচন্দ্র লিখেছেন–

‘বিমাতা মহারানি কমলকুমারী আমার পরম শত্রু ছিলেন। আমার বয়স যখন ষোল কি সতের তখন তিনি দুইবার আহারের সঙ্গে আমায় বিষ দেন। একবার আমি তাহা ফেলিয়া দিই, আর একবার তাহা একটা ইঁদুরকে খাইতে দিই। ইঁদুর তাহা খাইয়া তৎক্ষণাৎ মরে। সেই অবধি আমার অন্ন আমি স্বতন্ত্র পাক করাইতাম। পরাণ আর বসন্তলালবাবু আমার সর্বনাশ করিবার নিমিত্ত সহস্র ফাঁদ পাতিতেন। আমি তাহা হইতে কৌশলে উদ্ধার হইতাম। কিন্তু শেষে তাঁহারা আমার পিতার মন ভার করিয়া দিলেন যে, তাহার আর কোন উপায় করিতে পারিলাম না।’

পিতার সঙ্গে প্রবল দ্বন্দ্বের ফলে প্রতাপচাঁদ অধঃপাতে যেতে লাগলেন। মদের নেশায় ডুবে গেলেন। শেষে অদৃষ্ট দোষে গুরুতর পাপগ্রস্থ হলেন। এটাই প্রতাপচাঁদের জীবনের ট্রাজেডির কেন্দ্রবিন্দু। 

কিন্তু কী এমন পাপ কার্য করেছিলেন, যার ফলে ১৪ বছর অজ্ঞাতবাসের সিদ্ধান্ত প্রতাপচাঁদকে নিতে হয়েছিল– মামলা-মোকদ্দমায় কেউ জিজ্ঞাসা করেননি। সঞ্জীবচন্দ্র এ বিষয়ে নীরব থেকে গেছেন। অনুপচন্দ্রও ইঙ্গিত করেছেন তাঁর কাব্যে– অগম্য গমন শব্দদ্বয়ে।

‘অখাদ্য ভোজন আর অগম্য গমন যার
অপেয় পানাদি পাপ জন্য।’

সঞ্জীবচন্দ্র লিখেছেন– ‘প্রতাপচাঁদের মৃত্যুর বিবরণ এই মাত্র প্রকাশ আছে যে, রাত্রি দেড় প্রহরের সময় কানাত দ্বারা ঘাট ঘেরিয়া তাঁহাকে অন্তর্জলি করা হয়। সে সময় বিস্তর লোক তথায় উপস্থিত ছিল, কিন্তু তাহারা সকলে কানাতের বাহিরে দাঁড়াইয়া ছিল। মৃত্যুর দুই চারিদিন পরেই রাষ্ট্র হইল প্রতাপচাঁদ পলাইয়াছেন।’

অনুপচন্দ্রের কাব্যে বিষয়টি বিস্তারিত লেখা হয়েছে। প্রতাপচাঁদ যখন অম্বিকা কালনায় প্রবেশ করলেন তখন থেকেই নগরবাসী তাঁকে দেখার জন্য ভিড় জমিয়েছিল। অন্তর্জলির জন্য গঙ্গাতটে কানাত দিয়ে ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। ভিতরে আসন করে অসুস্থ প্রতাপচাঁদ বসেছিলেন। সঙ্গে পরাণ কাপুর এবং ব্রহ্মানন্দ। হঠাৎ করে গঙ্গায় নেমে তিনি স্তব-স্তুতি করলেন। পরাণকে বললেন– 

এ রাজ্যের রাজকাজ কিয়ৎকাল অব্যাজ
পিতাপুত্রে কর অধিকার।

দিনের বেলায় ক্ষৌরকর্ম সারলেন। হরিদ্রা আমলকি মেখে স্নান করে আহার গ্রহণ করলেন। দিন অবসানে সকলের অলক্ষে তিনি গঙ্গায় ডুব দিয়ে ১০০ হাত দূরে উঠলেন। একটি নৌকা আগে থেকেই ঠিক করে নিদির্ষ্ট স্থানে ছিল। সেই নৌকায় তিনি উঠলেন।

বিস্তর খোঁজাখুঁজি শুরু হল। পরাণ কাপুর ভয় পেয়ে গেলেন। রাজা তেজচন্দ্র জানতে পারলে আর রক্ষে থাকবে না। ব্রহ্মানন্দ উপায় বাতলালেন। কাঠের সিন্দুকের মধ্যে বাজনিয়া শঙ্খ রেখে কম্বল দিয়ে মুড়ে তার ওপর একপ্রস্থ গঙ্গার মাটি লেপে পোড়ানো হল। এর ফলে মড়া পোড়ার মতো গন্ধটাও ছড়িয়ে পড়ল।

কিন্তু জনসাধারণ সহজে বিশ্বাস করল না প্রতাপচাঁদের মৃত্যু। জনশ্রুতি ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মতো– প্রতাপচাঁদ মারা যাননি। তিনি পলায়ন করেছেন মাত্র। কবি অনুপচন্দ্র কাব্যিক ভাষায় লিখেছেন–

‘পবনে করি স্মরণ কহিলেন বিবরণ
জগতে জানাহ এই বাণী।
প্রতাপচন্দ্র জীবিতমান পুনঃ আসি বর্ধমান
অধিষ্ঠান হইবেন জানি।।’

জালপ্রতাপচাঁদের অজ্ঞাতবাস পর্বটি বেশ রোমাঞ্চকর। সঞ্জীবচন্দ্রের লেখায় স্বয়ং জাল প্রতাপচাঁদের লেখা ফর্দতে ১৪ বছর অজ্ঞাতবাস পর্বের সংক্ষিপ্ত বিবরণ রয়েছে। অনুপচন্দ্রের কাব্যে বিস্তারিত লেখা হয়েছে। প্রতাপচাঁদ কালনা থেকে হরিদাস কাণ্ডারীর ছদ্মবেশে নৌকা চালিয়ে নবদ্বীপে পৌঁছলেন। নবদ্বীপে তাঁর সঙ্গে মিলিত হলেন মুর্শিদাবাদের নবাব। তিনি ফকিরের ছদ্মবেশ ধরলেন। নৌকা ছেড়ে দিয়ে এবার স্থলপথে দু’জনে উজ্জ্বলনগরে গেলেন। সেখানে যোগযাগে বিশ্বাসী শ্যামলাল ব্রহ্মচারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। প্রসঙ্গত, এই উজ্জ্বলনগর হল কৃষ্ণনগরের গোয়াড়ি। 

সঞ্জীবচন্দ্রের গ্রন্থে সাক্ষীদের একাংশ জাল প্রতাপচাঁদকে বলেছেন শ্যামলালের জ্যেষ্ঠ পুত্র নিরুদ্দিষ্ট কৃষ্ণলাল। কিন্তু এই তথ্য ধোপে টেকেনি। সাক্ষীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন একদা প্রতাপচাঁদের ঘনিষ্ঠ রামকৃষ্ণ। রামকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় প্রথমে ছিলেন প্রতাপচাঁদের শিষ্য কৃপানন্দ। পরে খ্রিস্টান হয়েছিলেন। কৃপানন্দের কথা আছে অনুপচন্দ্রের প্রতাপচাঁদি পালায়। ইনিও শ্রীখণ্ডে অনেকদিন ছিলেন। 

প্রতাপচাঁদ কামরূপ-কামাখ্যায় যোগযাগ তন্ত্রশিক্ষা করলেন। নেপাল বদ্রিনাথ চন্দ্রশেখর ত্রিকূট হরিদ্বার কাশী কাঞ্চী প্রয়াগ অযোধ্যা ব্রজধাম বৃন্দাবন গোকুল মথুরা মিথিলা জনকপুর দ্বারকা বৈদ্যনাথ-সহ নানা তীর্থ ভ্রমণ করলেন। গিয়েছিলেন–

মুলতান দিল্লী লক্ষনৌ বোম্বাই ইরান।
তুর্কিস্থান মক্কা মদিনা মাধাই।। 

সঞ্জীবচন্দ্রের লেখার সঙ্গে অনুপচন্দ্রের লেখার বেশ মিল পাওয়া যায় এই অংশে। তবে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত তথ্য জানা যায় একমাত্র অনুপচন্দ্রের ‘লীলারস সঙ্গীত’ থেকে। প্রথমত, পঞ্জাবে রঞ্জিত সিংহের শুধু আতিথ্য গ্রহণই করেননি প্রতাপচাঁদ; তিনি সেখানে বিবাহ পর্যন্ত করেছিলেন এবং তাঁর ঔরসজাত এক সন্তানও ছিল।

zoom
কালনার প্রতাপেশ্বর মন্দির

দ্বিতীয়ত, অজ্ঞাতবাস পর্বের নবম বছর গত হলে, গয়াতে থাকাকালীন তাঁর প্রথমা পত্নী প্যারীকুমারী গিয়েছিলেন স্বামীর উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান করতে। ছদ্মবেশে এসেছিলেন প্রতাপচাঁদ প্যারীকুমারীর কাছে।

কবি লিখেছেন, ‘গোপন মিলন এই লোকে অপ্রকাশ’। প্যারীকুমারী তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন–

প্রতাপচন্দ্র জীবিতমান পিণ্ড দিতে নাই।
গয়াভূমে এই কথা সবারে জানাই।। 

অনুপচন্দ্রের কাব্যে শ্রীখণ্ড গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পর্বটি সঞ্জীবচন্দ্রের লেখায় নেই। প্রতাপচাঁদ যে রাজনীতিতে অতি বিচক্ষণ ছিলেন, তা এই শ্রীখণ্ড পর্ব থেকে বোঝা যায়। বেশ আঁটঘাট বেঁধেই জালপ্রতাপচাঁদ বর্ধমানে গিয়েছিলেন। অজ্ঞাতবাস পর্ব শেষ করে কলকাতার বরানগরে ঘাঁটি গাড়েন। আর তাঁর দোসরকে পাঠান উত্তররাঢ় পরিভ্রমণ করতে। এটা যে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছিল তা বোঝা যায়।

স্বরূপাঙ্গ অর্থাৎ মুর্শিদাবাদের একই ভাগ্যবিড়ম্বিত ছদ্মবেশী নবাব। তিনি মুর্শিদাবাদ হয়ে জজান পাঁচথুপি সোনারুন্দি হয়ে বর্ধমানের মশাগ্রামে জমিদারের সঙ্গে মিলিত হলেন। বর্ধমানে প্রায় এক মাস থাকেন। বর্ধমানেই তিনি পরিচিত হন শ্রীখণ্ডের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব দুর্গামঙ্গলবাবুর কর্মচারী দীননাথের সঙ্গে। তারপর অঘ্রান মাসে শ্রীখণ্ডে এলেন স্বরূপাঙ্গ। কিন্তু স্বরূপাঙ্গের প্রকৃত পরিচয় কাব্যে উদ্‌ঘাটিত হয়নি।

শ্রীখণ্ডের জোড়া শিবতলা পেরিয়ে উত্তরমুখে কিছুটা গিয়ে দীননাথের সঙ্গে প্রবেশ করলেন দুর্গামঙ্গলবাবুর বাড়িতে। এখানে স্বরূপাঙ্গ সাত মাস ছিলেন। দুর্গামঙ্গলবাবু বরানগর থেকে প্রতাপচাঁদকে আনার জন্য শ্রীখণ্ড থেকে পাঠালেন দীননাথ পরাণ মুখার্জী কানাই নাপিত এবং রামানন্দকে। কিন্তু সেবার প্রতাপচাঁদ এলেন না। পরে দুর্গামঙ্গলবাবু পুনরায় প্রতাপচাঁদকে আনতে পাঠালেন। এবার প্রতাপচাঁদ শ্রীখণ্ডে আসার উদ্দেশ্যে কলকাতা থেকে নৌকাযোগে পাড়ি জমালেন সাগর বসু, গোবিন্দ ঘোষ-সহ। 

অনুপচন্দ্র ও সঞ্জীবচন্দ্রের রচনায় সামান্য তথ্যগত পার্থক্য থাকলেও আসল পার্থক্য তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিগত। একজনের দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে তথ্যনিষ্ঠ ঐতিহাসিক তথা আধুনিক যুক্তিবাদী; অন্যজন সেখানে ভক্ত এবং তাঁর কাব্য মধ্যযুগীয় চৈতন্যচরিত আখ্যানের ঢঙে পরিবেশিত হয়েছে। 

কবি অনুপচন্দ্র দত্ত প্রতাপচাঁদি লীলা রচনার উপাদান পেয়েছিলেন স্বয়ং প্রতাপচাঁদের কাছে। এবং অনুমান করা যায়, এতে গুরুর নিজের উৎসাহ ছিল। প্রতাপচাঁদ নিজের ইয়াদাস্ততে উল্লেখযোগ্য ঘটনা লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। সেই নোটবই বাজেয়াপ্ত হয় বাঁকুড়ায়। সুতরাং কাব্যটি লেখার বিষয়ে গুরুর ভূমিকা ছিল– এমন অনুমান অসঙ্গত নয়।

আজও ইতিহাস আর আইনের যক্ষপুরীতে বন্দি জালপ্রতাপচাঁদ। শুধু রক্তকরবীর মতো জ্বলজ্বল করছে অনুপচন্দ্র ও সঞ্জীবচন্দ্রের বই দু’টি।

…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলি অন্যান্য পর্ব ………….

পর্ব ৩৫: ঢেঁকি মোটেই অকম্মার নয়

পর্ব ৩৪: বহুরূপে সম্মুখে তোমার

পর্ব ৩৩: আলকাপ: বিরল মায়ার স্মৃতিচিহ্ন

পর্ব ৩২: তালবাহার

পর্ব ৩১: পোড়ামাটির শিল্পকে জনপ্রিয় করেছে কাঁঠালিয়ার শিল্পীরা

পর্ব ৩০: মৎস্য দেবতা মৎস্য ভোগ

পর্ব ২৯: কুবের পুজোর আচার থেকেই সোনা কেনা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়

পর্ব ২৮: বৈশাখ বিষ্ণুর প্রিয়, পুরাণের শ্রেষ্ঠ মাস?

পর্ব ২৭: গর্জন থেকেই গাজন

পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?

পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের

পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল

পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?

পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন

পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া

পর্ব ২০: মাদারি কা খেল

পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়

পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর

পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা

পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে

পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম

পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন

পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান

পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি

পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল

পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই

পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?

পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব

পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!

পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই

পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা

পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত

পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস

পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর

পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প

Burdwan False Pratapchand history of burdwan pratap chand Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on