three famous rumors of bengal of twentieth century | Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

গুজব কিংবা হুপুই: সে যুগের ‘ভাইরাল’

ভিন্ন ভিন্ন সময়ের তিনটি গুজব। অথচ সামাজিক মনস্তত্ত্বের দিক থেকে এক সুতোয় গাঁথা। তিনটি গুজবের অন্তর্তদন্ত করলে দেখা যায়, লোকায়ত সমাজ যখন কোনও তীব্র বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, অথচ তার কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা নিজেদের কাছে স্পষ্ট হয়নি, তখন সেই অবদমিত ভীতি আদিম লোকসংস্কৃতির চেনা ছাঁচে ফেলে নতুন গুজব রূপে ছড়িয়ে পড়েছে।

Published by: Robbar Digital

Posted:August 26, 2026 6:22 pm | Updated:August 26, 2026 6:22 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

৪৬.

বিদ্যুৎবিহীন পল্লির নিশীথ রাত্রি। মাটির বাড়ি। আলান্ত শরীর। কত্তা-গিন্নি ঘুমিয়ে কাদা। চারদিকে জমাট বাঁধা অন্ধকার। গাছের মগডালে জোনাকি পোকার ঝিকিমিকি। থমকে থমকে দূর থেকে ভেসে আসছে কুকুরের গর্জন। শিয়ালের হুক্কাহুয়া।

হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার প্রবল শব্দ! 

কর্তার ঘুম চটকাতেই আওয়াজ বন্ধ। শুধু শুনশান নিস্তব্ধতা ভেঙে রাত-চরা পাখি ধায় ডানা ঝাপটিয়ে। 

ভয়ে কেঁপে ওঠল মোড়ল ।

জলের ঘটিটার দিকে হাত বাড়াতেই এক অলৌকিক ফেরিওয়ালা যেন সুর করে ডাকছে। 

‘দই নেবে গো– মাছ নেবে গো–’

মোড়লের তো বুকশূল হওয়ার জোগাড়। সে স্পষ্ট শুনতে পেল। একবার নয়। দু’বার। আপাদমস্তক চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়ে ঠক ঠক করে হালতে লাগল। 

আজকেই পাকা সরানে ল-হাটার পেভাকরও ওই একই কথা বলছিল। 

শেষে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানাল, ‘খপরদার মধ্যম। ডাকে সাড়া দিলেই মায়ের ভোগে!’

খবর ভাইরাল হতেই গাঁয়ের মানুষের ঘুম গেল উড়ে। মাঠে পথেঘাটে চটিতে মোড়ের মাথায় তখন একটাই আলোচনা– গভীর রাতের কড়া নাড়া। আর ফেরিওয়ালার ডাক।

ভয়াবহ সব খবর আসতেও লাগল গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে। ওই নিশি-ডাকে সাড়া দিয়ে বাউরোর এক ডবকা ছুঁড়ি বেমালুম হাওয়া। নদীপাড়ের গ্রামে খড়ের পালুইয়ে লাগছে আচম্বিতে আগুন। পুকুরে মরা মাছ সব ভেসে উঠছে।

সাতের দশকের নানা রাজনৈতিক ঘটনার বিক্ষুব্ধ তরঙ্গে তখন উত্তাল বাংলা। এরই মধ্যে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো এই ভয়ংকর ঘটনা! 

গ্রাম-বাংলার নিস্তরঙ্গ জীবনে যেন আতঙ্কের সুনামি বইতে লাগল।

তবে দাওয়াই বের হতেও দেরি হয়নি। বাড়ির দরজায় দরজায় সিঁদুর দিয়ে অদ্ভুত সব সাংকেতিক চিহ্ন আঁকতে লাগল লোক। দু’পাশে বড় করে গোবরমাটি দিয়ে বানানো হল আদ্দিকালের মেয়ে-মরদের মূর্তি। 

এরাই হয়ে উঠল ‘অলৌকিক ফেরিওয়ালা’র যম। 

zoom
শিল্পী: দীপঙ্কর ভৌমিক

আটের দশকে আর এক ভয়ংকর কাণ্ড। আমাদের তখন ছেউটে বয়স। দুগ্‌গা ঠাকুরের ভাসানের রাত। ঢাকঢোল-কাঁসির সঙ্গে নাচ, পটকাবাজি, পাটকাঠির মশাল জ্বালানোর আনন্দঘন মৌতাত। সবাই একটু সিদ্ধিটিদ্ধি খেয়ে ফুরফুরে আমেজে নাচছি। 

হঠাৎ ফেলু বলতে লাগল। ওরে বাবারে! আমার সব সেঁদিয়ে যেচে ভেতর বাগু!

–বলিস কী রে!

–ঝিনঝিন করছে গা। ঝিমঝিম করছে মাথা। ওরে বাবারে! গেল-গেল রে… সব ঢুকে গেল।

মুহূর্তে খবর রটে গেল ফেলুর ‘ডিস্কো’ হয়েছে।

রোগের লক্ষণ হল শরীর ঝিনঝিন করা আর যৌনাঙ্গটি ভেতর দিয়ে সুরসুর করে ঢুকে যাওয়া। 

প্রতিকার হল জলে গিয়ে টেনে ধরে থাকা। দেরি না করে যুবকবৃন্দ চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে গিয়ে গোড়ের জলে ঝপাং। আর তারপর যা হল সে-ও এক কেলোর কীর্তি। 

বিচ্ছিরি ধরনের টানাটানি আর আর্তনাদ। শেষে যখন জল থেকে তোলা হল তখন বেচারি আধমরা।

ডিস্কো রোগও গ্রামে-গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল মড়ক লাগার মতো। মেয়েদের স্তন ঢুকে যাচ্ছিল বলে গ্রামে-গ্রামে একদল মহিলার টিমও তৈরি করে রাখা হয়েছিল। খবর হলেই তারা দ্রুত স্পটে গিয়ে কাজে লেগে যেত। 

তবে এ-ও দ্রুত চাউর হয়ে গিয়েছিল যে, বৈষ্ণবদের তিলক-মাটির মতো চুনের প্রলেপ দিয়ে হরিনাম সংকীর্তন করলে ‘শালার বে-ইমান রোগ’ টিকি ছুঁতে পারবে না। আমাদের গ্রামেও সকাল-সন্ধে-দুপুর অন্তত পাঁচ দলের বিচিত্র নামসংকীর্তন শুনেছি।

zoom
ডিস্কো রোগের চিকিৎসায় স্নান করানো হচ্ছে যুবককে। আলোকচিত্র: অর্জুন গুপ্ত

বছর পঁচিশেক আগে আরেক উৎপাত। 

সবেমাত্র বিস্ময়কর মোবাইল ফোন গ্রামে এসেছে। ইতিমধ্যে ৯/১১-র সেই ভয়ংকর বিপর্যয় ঘটে গেছে। ওসামা বিন লাদেনের নাম তখনও গাঁয়ের রাখাল-বাগালেরাও জেনে গেছে। হঠাৎ করে হুপুই উঠল ‘লাইট-ভূত’ গাঁয়ে গাঁয়ে টিকেল মারছে।

কেন?

–কেন আবার কী! লাইট-ভূত যার কাছে আসবে– সে নির্ঘাৎ রক্ত উঠে মরবে।

মুচি-বাউড়ি পাড়ায় সব থেকে আতঙ্ক বেশি। অধিকাংশ দাওয়ায় শোয়। সুতরাং আলোর ভয়ে তাদের জীবন আতঙ্কের অন্ধকারে ঢেকে গেল।

কিছুদিন পরে আরও একটা খবর রটে গেল, ওটা লাইট-ভূত নয়। জঙ্গীদের পাঠানো সিগনালিং লাইট। তারা লেজার লাইটের মাধ্যমে গ্রামে-গ্রামে ম্যাপ তৈরি করছে বিষাক্ত রাসায়নিক গ্যাস ছড়ানোর জন্য।

খবরটা ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে গ্রামের পুরুষত্বকে চাবকে দিল। লাঠি-সোঁটা নিয়ে রাত-পাহারার তোরজোর শুরু হল গ্রামে-গ্রামে। বোলানগানে ভাদুগানে লাইট-ভূত নিয়ে সেবার বিস্তর পাঁচালি-পালাগান লেখা হলেও একদিন টুক করে লাইট-ভূত কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। 

zoom
আলেয়া ভূত

তিনটি ঘটনা যে মারাত্মক গুজব ছিল অনেকে তা জানেন। 

‘গুজব’ ফারসি শব্দ। জনরব বা মুখে মুখে প্রচারিত কথা। গুজবের গ্রাম্য নাম ‘হুপো’ বা ‘হুপুই’। আদি অর্থ– হনুমানের লাফ। রটনা বা ভ্রমণ। ‘হুপুই’ নামে দ্রুত ভাইরাল হওয়ার ব্যাঞ্জনাটি লক্ষ করার মতো। 

‘গুজব’ বা ‘হুপুই’ এমন এক ধরনের যাচাইহীন রটনা যা প্রমাণের তোয়াক্কা না-করে মানুষের মুখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, গুজবের চালিকাশক্তি প্রধানত দু’টি– সঠিক তথ্যের অস্পষ্টতা এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দৈনন্দিন জীবনের ভয় বা অবদমিত আবেগের আগ্নেয়গিরি। 

গুজব কোনও সামাজিক ব্যাধি নয়। বরং সমাজ গঠনের সময় থেকেই গুজবের জন্ম। সেই কারণে লোকসংস্কৃতির ছায়াসঙ্গী। স্বাভাবিকভাবে শহরের তুলনায় গ্রামে এর বিস্তারও বেশি। নাগরিক সমাজ, আর যাই হোক ব্যক্তিকেন্দ্রিক। গ্রাম্যসমাজ আপাত সরল ও সামষ্টিক চরিত্রের। 

লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম শ্রুতি বা কানাকানি। সামাজিক ভয়, উদ্বেগ, অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস, কৌতূহল ইত্যাদির প্রেক্ষিতে শ্রুতি অনেকসময় অতিরঞ্জিত হয়ে গুজব বা মিথের জন্ম দিয়েছে। তথাকথিত ‘জনশ্রুতি’ বা ‘কিংবদন্তি’ আসলে অনেক সময় ছদ্মবেশী গুজবমাত্র। 

ফলে লোকসমাজে নানা ধরনের গুজব রটেছে আদিকাল থেকে। যেমন– ছেলেধরা, ডাইনি, গুপ্তধন লাভ, অলৌকিক নিরাময়, নতুন প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে গুজব ইত্যাদি। দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ বা অবিশ্বাস-জনিত গুজবের ফলে ইতিহাসে অনেক রক্তঝরা ঘটনার রেকর্ড আছে।

গুজব অনেকসময় ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। মহাকাব্যে দেখা যায়, কৃত্রিম গুজব তৈরি করে অনেকসময় কার্যসিদ্ধি করা হত। কিংবা গুজব ছিল যুদ্ধ-কৌশলের অঙ্গ। যেমন রামায়ণে সীতাহরণের কৌশল নির্মাণে মারীচ রামের নকল কণ্ঠস্বর ব্যবহার করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল সীতার কাছ থেকে লক্ষ্মণকে অপসারণ করে রামকুটির সম্পূর্ণ অরক্ষিত করা।

zoom
পুরাতন চিত্রে সোনার হরিণরূপী মারীচ

একইভাবে মহাভারতে যুদ্ধিষ্ঠির কথিত ‘অশ্বত্থামা হত ইতি গজ’ বাক্যটির সঙ্গে সুপরিকল্পিত শাঁখের আওয়াজ প্রয়োগ করে ‘গজ’ কথাটিকে অশ্রুত করা হয়েছিল। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের কৌরবপক্ষের অন্যতম বীরযোদ্ধা ছিলেন অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য। তাঁর প্রিয়তম পুত্র অশ্বত্থামার মৃত্যু গুজব তৈরি করাতে এই রাজনৈতিক কৌশল নেওয়া হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্রোণাচার্যকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে দেওয়া। উদ্দেশ্য যে সফল হয়েছিল তা বলাই বাহুল্য।

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল এনফিল্ড রাইফেলের টোটায় শূকর ও গোরুর চর্বি মেশানোর গুজবটি। এই কারণে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রতিটি গুজবের উৎপত্তির মূলে থাকে সমকালীন রাজনীতি বা ধর্ম ইত্যাদির অনুষঙ্গ। তবে এসব গুজব যে উদ্দেশ্য-প্রণোদিত এবং পাকা মাথার কারসাজি, সন্দেহ নেই।

সাতের দশক বাংলার ইতিহাসে রাজনৈতিক কালবৈশাখীর কালখণ্ড। নকশালদের কালাপাহাড়ি তাণ্ডব। বামপন্থী আন্দোলন। রাজনৈতিক মস্তানদের অত্যাচারের বিভীষিকা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বাংলায়। প্রকাশ্য দিবালোকে চাষির গোলা ভেঙে ধান লুঠ ছিল মামুলি ঘটনা। ধনী জোতদারদের অত্যাচার ছিল লাগামছাড়া। 

সমকালীন উত্তাল বাংলায় নকশাল ও প্রতিবাদী বামপন্থী কর্মীদের ধরতে গভীর রাতে চলত নির্মম পুলিশি অভিযান। কলকাতা বা মফস্‌সল শহর থেকে বহু নকশাল কর্মী আত্মগোপন করার জন্য অজ-পাঁড়াগাঁয়ে আশ্রয় নিতেন। পুলিশের কাছে সেসব গোপন খবরাখবর থাকত। অনেক সময় এ-ও দেখা গিয়েছে, আত্মগোপন করে থাকা নকশাল কর্মীকে ধরার জন্য গভীর রাতে পুলিশি অভিযান হচ্ছে। তাদের পায়ের ভারি বুটের আওয়াজ ও নির্দিষ্ট বাড়ির দরজায় কড়া-নাড়া গোটা গ্রামবাংলায় এক চরম ভীতিপ্রদ আতঙ্কের পরিবেশ রচনা করেছিল। 

রাতের সেই পুলিশি কড়ানাড়ার রাজনৈতিক ভয় থেকেই গ্রামের মানসিকতায় পরাবাস্তব রূপ নিয়ে ‘দই নেবে গো’ বা ‘মাছ নেবে গো’ গুজবটি আত্মপ্রকাশ করেছিল। অনেক সময়ে গুজবে পোয়াবারো হয় সমাজবিরোধীদের। সেই সুযোগে তারা চুরি, অপকর্ম অবাধে করতে থাকে। এই গুজবটি সমাজবিরোধী ও চোর-ডাকাতদের কাছে আশীর্বাদস্বরূপ ছিল। 

সমকালীন বাংলা সাহিত্যেও রাতের কড়া-নাড়ার পরাবাস্তবতার চিত্র অন্যভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘অবনী বাড়ি আছো’ কবিতার সেই নিশীথ রাতের কড়া-নাড়া এবং অস্তিত্বের সংকটের সুর যেন এই লোকগুজবের সমান্তরাল প্রেক্ষিত রচনা করে।

দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া
কেবল শুনি রাতের কড়া নাড়া।
অবনী বাড়ি আছো?

আটের দশকে ডিস্কোরোগের গুজবটি চিকিৎসাবিজ্ঞান ও লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে চাঞ্চল্যকর অধ্যায়, সন্দেহ নেই। এটি স্বাভাবিক কোনও রোগ নয়। পুরোটাই মানসিক। মনশ্চিকিৎসকদের ভাষায় ‘কালচার বাউন্ড সিন্ড্রোম’ বা সংস্কৃতি-ভিত্তিক মানসিক রোগ। পোশাকি নাম ‘কোরো’। মালয়ভাষায় ‘কোরো’ শব্দের অর্থ কচ্ছপ। কচ্ছপ যেমন ভয় পেয়ে তার অঙ্গগুলি খোলসের ভিতর ঢুকিয়ে নেয়, ডিস্কো-আক্রান্তরা মনে করতেন, তাঁদের প্রজনন অঙ্গটিও শরীরের ভিতরে ক্রমশ ঢুকে যাচ্ছে। 

এই গণ-হিস্টিরিয়ার সঙ্গে লোকমানসে যুক্ত হয়েছিল ধাতুক্ষয়ের লোকজ ভীতি। গ্রামীণ সমাজে যৌনতা বিচিত্র টাইপের। অবদমনের ফলে বহিঃপ্রকাশ ঘটে জটিল থেকে জটিলতর রূপে-রূপান্তরে। তবে মুখোশে তীব্র অনুশাসনপন্থী। প্রজনন ক্ষমতা হারানোর সংকট বা যৌন অসঙ্গত আচরণ সম্পর্কিত তীব্র অপরাধবোধ থেকে ডিস্কোরোগের উৎপত্তি হয়েছিল। 

আটের দশকে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল, দ্রুত অর্থনৈতিক পট-পরিবর্তন, বেকারত্ব, চাপা অস্থিরতা ইত্যাদির চোরাস্রোত বইছিল। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যখন একটি জনগোষ্ঠী অবদমিত মানসিক চাপ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের চরম সীমায় পৌঁছয়, তখন তাদের মধ্যে এই ধরনের কাল্পনিক রোগের উদ্ভব হয়। 

ডিস্কোরোগের সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছিলেন গবেষক ডা. অজিতা চক্রবর্তী তাঁর ‘An epidemic of Koro in West Bengal’ গ্রন্থে। আটের দশকে বাপি লাহিড়ী ও মিঠুন চক্রবর্তী যথাক্রমে ডিস্কোগান ও ‘ডিস্কো ড্যান্সার’ সিনেমার প্রভাবে সেটি ডিস্কোরোগ নামে পরিচিতি পায়। 

ডিস্কোনাচের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তীব্র গতিশীলতা। এই নাচে শরীর এমনভাবে সঞ্চালিত হত, যার মূল ভিত্তি ছিল শরীরের সংকোচন ও প্রসারণ। অর্থাৎ এক ধরনের ঝাঁকুনি মিশ্রিত কাঁপুনি নাচ। এই নাচের সঙ্গে যুক্ত ছিল নেশা ও যৌনতা। নাচের সঙ্গে রোগীর উদ্ভূত শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়ার অদ্ভুত সামঞ্জস্য থাকায় লোকভাবনায় পরিচিতি পায় ‘ডিস্কোরোগ’। 

একুশ শতকের লাইট-ভূতের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দু’টি ঘটনা লক্ষ করা যায়। প্রথমত, আলেয়া-ভূতের লৌকিক মিথ। দ্বিতীয়ত, মধ্যযুগীয় গ্রাম আক্রমণের বংশানুক্রমিক স্মৃতি। লেজার লাইটের উপস্থিতি আলেয়া ভূতের চেনা স্মৃতিকে জাগ্রত করে। কারণ নতুন প্রযুক্তির এই লাইটের সঙ্গে আলেয়া-ভূতের যথেষ্ট সাদৃশ্য দেখা যায়।

দ্বিতীয় দফায় গুজবটি যখন সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, তখন ভৌতিক অনুষঙ্গ বিশ্লিষ্ট হয়ে মধ্যযুগীয় বর্বরোচিত তুর্কি আক্রমণ কিংবা বর্গি-হাঙ্গামার বংশানুক্রমিক স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে। অতীতে যেভাবে দস্যুবাহিনী রাতের দিকে মশাল জ্বেলে গ্রামের পর গ্রাম দখল করে অত্যাচার লুণ্ঠন চালাত, গ্রামীণ মানুষের অবচেতন মন প্রাচীন ভয়ের সেই স্মৃতিকে নতুন শতকের বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের মোড়কে পুনরিজ্জীবিত করে তোলে। সুতরাং লাইট-ভূত কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলার আলেয়াভূত ও সন্ত্রাসের অভূতপূর্ব ককটেল।

আকর্ষণীয় বিষয় হল, গুজবগুলির প্রতিকার গ্রামের মানুষ নিজেরাই করেছেন। নিজেদের আদিম সাংস্কৃতিক ঝুলি থেকে রক্ষাকবচ নিয়ে নিজেরাই সমাধানে উদ্যোগী হয়েছেন। ‘দই নেবে গো’ গুজবের প্রতিকারে এসেছে দুয়ারে সাংকেতিক চিহ্ন অঙ্কন; কিংবা গোবর-মাটির প্রতিমা নির্মাণ; মূলত যাদুটোনা বা ডাইনি তাড়ানোর প্রাচীন লোকজ সংস্কার। ডিস্কোরোগ দমনে চুনের চিহ্ন এঁকে সমবেত নামসংকীর্তনের সামষ্টিক আতঙ্ক কাটানোর পেছনে রয়েছে যুগ যুগ ধরে গ্রামীণ মানুষের মহামারী দমনের অসহায় উপায়ের অনুবর্তন। লাইট-ভূতের গ্রাম-পাহাড়ার পশ্চাতে রয়েছে সমবেত প্রতিরক্ষার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অনুসরণ।

দৃশ্যত, তিনটি গুজব ভিন্ন ভিন্ন সময়ের হলেও সামাজিক মনস্তত্ত্বের দিক থেকে এক সুতোয় গাঁথা। তিনটি গুজবের অন্তর্তদন্ত করলে দেখা যায়, লোকায়ত সমাজ যখন কোনও তীব্র বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, অথচ তার কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা নিজেদের কাছে স্পষ্ট হয়নি, তখন সেই অবদমিত ভীতি আদিম লোকসংস্কৃতির চেনা ছাঁচে ফেলে নতুন গুজব রূপে ছড়িয়ে পড়েছে।

সাতের দশকের রাতের কড়া-নাড়ার রাজনৈতিক আতঙ্ক থেকে অলৌকিক ফেরিওয়ালার উদ্ভব। আটের দশকে অবদমিত যৌন অনুশাসন থেকে উদ্ভূত হয় ডিস্কোরোগ। তেমনই লেজার লাইটের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে আলেয়া-ভূত ও বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের লাইট-ভূতের মডেল। যদিও প্রতিকারের পন্থাগুলি লোকায়ত সংস্কৃতির ঐতিহ্য থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল।

[বেশ কিছু লোকশব্দের উল্লেখ আছে প্রবন্ধটিতে, সমকাল ও গ্রামীণ বাস্তবতা বোঝাতে। শব্দার্থগুলি যথাক্রমে, আলান্ত– ক্লান্ত, মধ্যম– মেজভাই, গোড়ে– ছোট পুকুর, টিকেল– উঁকি মারা, হালতে– কাঁপতে, বুকশূল– হৃদ-রোগ, বাগু– দিকে, ছেউটে– কিশোর] 

…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব ………….

পর্ব ৪৫: সর্প হয়ে দংশন করো, ওঝা হয়ে ঝাড়ো

পর্ব ৪৪: অলৌকিক জলযাত্রা

পর্ব ৪৩: হরেক রকম হুড়ুম

পর্ব ৪২: মাহেশের রথের সারথি

পর্ব ৪১: জগন্নাথের শবরযোগ

পর্ব ৪০: ভিটের ভাস্কর্য

পর্ব ৩৯: হারানো নদীপথ, হারানো জলরেখা

পর্ব ৩৮: বর্ষামঙ্গল

পর্ব ৩৭: তরুর ঠাকুরঘর

পর্ব ৩৬: জাল রাজার রাজনীতি

পর্ব ৩৫: ঢেঁকি মোটেই অকম্মার নয়

পর্ব ৩৪: বহুরূপে সম্মুখে তোমার

পর্ব ৩৩: আলকাপ: বিরল মায়ার স্মৃতিচিহ্ন

পর্ব ৩২: তালবাহার

পর্ব ৩১: পোড়ামাটির শিল্পকে জনপ্রিয় করেছে কাঁঠালিয়ার শিল্পীরা

পর্ব ৩০: মৎস্য দেবতা মৎস্য ভোগ

পর্ব ২৯: কুবের পুজোর আচার থেকেই সোনা কেনা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়

পর্ব ২৮: বৈশাখ বিষ্ণুর প্রিয়, পুরাণের শ্রেষ্ঠ মাস?

পর্ব ২৭: গর্জন থেকেই গাজন

পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?

পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের

পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল

পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?

পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন

পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া

পর্ব ২০: মাদারি কা খেল

পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়

পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর

পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা

পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে

পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম

পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন

পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান

পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি

পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল

পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই

পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?

পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব

পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!

পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই

পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা

পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত

পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস

পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর

পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প

Disco disease Light-ghost Naxalite Movement rumor Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on