স্যাফো, তাঁর জন্ম যিশুর আবির্ভাবের ৬৩০ বছর আগে। এই বছর তাঁর বয়স হল– ২,৬৫৬ বছর। তাঁর অনেক কবিতাই পুরোপুরি লুপ্ত। তাঁর উভকামী প্রেম, নারী ও পুরুষের সঙ্গে প্রেমের অনুভূতি ফুটে উঠেছে স্যাফোর কবিত্বে, ভাবনায়। উভকামী কবির সেই যৌনদর্শন, জীবনের অন্তর উচ্চারণকে অনুবাদ করেছেন নোবেলজয়ী অ্যান কারসন, ‘ইফ নট উইন্টার: ফ্র্যাগমেন্টস অফ স্যাফো’ বইতে।
১১২.
ঋতু, মাঝ-বসন্ত। সময়, খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৫৯৬। অভিজাত ধনী পরিবারের মেয়ে স্যাফো (Sappho) ৩৪ বছরের জন্মদিন উদযাপন করেছে ক’দিন আগে। সে উথলে পড়া সুন্দরী। পুরুষ তার দিকে তাকালে চোখ ফেরাতে পারে না। সে বিবাহিত। মা হওয়ার পরে তার শরীরে এসেছে নতুন ঢেউ। পুরুষের চোখের আয়নায় সে নিজেকে দেখে এবং বুঝতে পারে– পুরুষ কী চায়! সে পছন্দের পুরুষকে ‘না’ বলে না। বলতে চায় না। তার বাড়ি শ্বেতপাথরের প্রাসাদ। আড়ালের অভাব নেই। যেমন অভাব নেই প্রার্থী পুরুষের। সবার চাহিদা সে মেটায় না। সে তৃষ্ণা চেনে। তৃষ্ণা জানে। তৃষ্ণা বাছে। তৃষ্ণা মেটায়। তার সুযোগের অভাব নেই। বর সারসিলাস (Cercylas) সব সময় জাহাজে ভাসছে, বাণিজ্যের টানে। খুদে-কন্যা ক্লেসিস (Clesis) বড় হচ্ছে দাসীর কোলে, বুকে। আর স্যাফোর কোল, বুক তো পাতা আছে প্রণয়ে।

এবার স্যাফোর স্বীকারোক্তি শুনুন, তার নিজের মন, শরীর, সেক্সুয়ালিটি সম্বন্ধে: আমি সমুদ্রের মতো। ঢেউ ছাড়া থাকতে পারি না। তার কারণ, আমি নিজেকে ভাবি সমুদ্রের মেয়ে। গ্রিস বলতে আপনারা যে ভূখণ্ড বা দেশ ভাবেন, আমি কিন্তু সেখানে জন্মাইনি। আমি জন্মেছি এক ছোট্ট গ্রিক আইল্যান্ডে। দ্বীপের নাম লেসবস (Lesbos)। চারধারে ইজিয়ান সমুদ্রের তোলপাড়। সেই তোলপাড়, সেই ঢেউ, ফেনা ঝড়, আমার শরীরে মনে ঢুকে পড়েছে।
আমার বর জন্মেছে গ্রিসের আর একটা দ্বীপে। নাম অ্যানড্রস (Andros)। তাই হয়তো সারাক্ষণ সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে। সে-ও অ্যানড্রস দ্বীপের বিত্তবান সম্ভ্রান্ত সুজাত সুদর্শন বলিষ্ঠদের একজন। সুতরাং, তার দ্বীপের নিভৃত আড়ালে, জীবনে কচি মেয়েদের অভাব নেই। আমি তো ৩৪। ওর শয্যায় বুড়ি। অথচ আমার প্রেমিকদের চোখে আমার ভরাট ৩৪ তাদের সমুদ্র। ঢেউ ফেনা সৈকত সাঁতার– সব দিতে পারি আমি। কারও কারও ভালো লাগে আমার লম্বা পা। আমার পায়ের সুদীর্ঘ নগ্নতা না কি আমার প্রেমিকদের কারও কারও চোখে শেষহীন। সমুদ্রের মতো। আমার উন্মুক্ত পিঠে আদর ছড়িয়ে কেউ কেউ বলে, সফেন সৈকত। আমার ভরাট নিতম্ব ভোগ করতে করতে বলে, সমুদ্রের মহোর্মি! আমার বুকের বর্ণনায় এক কিশোর বলে, সমুদ্রে ভাসমান দু’টি অন্তরীপ। আমার ঊরু সঙ্গমের সময় না কি হয়ে ওঠে– সমুদ্র মেহনের দণ্ড! রজনীশয্যায় আমার তলপেটের আগুন সমুদ্রের ফসফরাস। আমার গভীর নাভি সমুদ্রের মৃত্যুময় আবর্ত। কত জাহাজ যে তলিয়েছে! এসব স্তুতি আমাকে জাগাতে শোনায় আমার থেকে বয়সে ছোট কিশোর আর তাজা যুবকরা। কিন্তু এখানেই আমার ‘আমি’র শেষ নয়, আরও আছে। আমাকে বুঝতে, মন দিয়ে শোনো।

আমার সেক্সলাইফ বুঝতে একটি খুব জরুরি কথা মনে রাখতে হবে– আমি একজন ‘থিয়াসস’ (thiasos)। আমি সেই সম্প্রদায়ের মানুষ, যারা আফ্রোদিতি (Aphrodite) এবং ইরস (Eros)-এর ধ্যানে, আরাধনায়, ভাবনায়, চর্চায় সম্পূর্ণ সমর্পিত। আফ্রোদিতি গ্রিকদের প্রণয়ের দেবী, যৌনতার দেবী, শরীরী কামনার দেবী, সৌন্দর্যের দেবী, এবং উর্বরতার দেবী। নারীর যোনি ও জরায়ুর সঙ্গে আফ্রোদিতির গভীর সম্পর্ক।
রোমানরা ভিনাসকে করেছে তাদের আফ্রোদিতি। আমার কিন্তু মোটে বিশ্বাস নেই ভিনাসে। কেন নেই বলছি। একদিন বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে নগ্ন নাচ নাচলাম সারারাত কয়েকজন কিশোর আর যুবকের সঙ্গে আকণ্ঠ মদ গিলে, আফ্রোদিতির মন্দিরে। আমার বর যে কাজ পারেনি, আফ্রোদিতি করে দিল সেই মিরাকেল। পেটে বাচ্চা এসে গেল! সকালে ভুলে গেলাম, রাতে কী হয়েছে!

ইরস আমাদের আরও এক দেবতা, সাংঘাতিক ক্ষমতা। দেবী নয়। দেবতা। পুরুষ। যৌন আনন্দ, সেক্সুয়াল প্লেজার, তার গোড়ায় বসে আছে ইরস। যা কিছু ইরটিক, তাই ইরসের দান। আর ইরোটিক আনন্দ, উত্তেজনা, উপভোগ এইসব ঠিকমতো পাওয়ার জন্য ইরসের চর্চা করতে হবেই। আমরা অর্থাৎ, ‘থিয়াসস’রা সেটাই করে থাকি। এবং আমাদের জীবনে সেক্সের ভূমিকা খুব বেশি।

এবার আমার সম্বন্ধে সব থেকে জরুরি কথাটা বলি। যৌনজীবনে আমি উভচর। আমি ডাঙায় আছি, জলেও আছি। আমি পুরুষে আছি, নারীতেও আছি। নারী আমার প্রেমিকা কিংবা প্রেমিক। আমিও কখনও নারীর পুরুষ, কখনও নারী। কিন্তু যে আমি কবি, তার কাছে নারী বেশি গুরুত্ব পায়। আমার অধিকাংশ প্রেমের কবিতায় নারীর সঙ্গে আমার প্রেম। এই প্রেমে মন এবং শরীর জড়াজড়ি করে আছে।
অনেকে আবার সমপ্রেমের কবিতাকে ‘লেসবিয়ান পোয়েট্রি’ বলছে। কেন জানেন? যেহেতু আমি লেসবসে জন্মেছি। আমার কবিতা তাই লেসবিয়ান কবিতা! এবং যেহেতু আমার অধিকাংশ কবিতা সমকামের, সমকাম ক্রমশ হয়ে উঠেছে ‘লেসবিয়ান লাভ’। সমকামী পুরুষ হোমোসেক্সুয়াল। সমকামী নারী লেসবিয়ান। আবার এখন তো সমকামী নারীকে ‘স্যাফিক’ (Sapphic) বলছে। আর নারী যদি অন্য নারীর প্রতি প্রেমের কবিতা লেখে, তাহলে সে লিখেছে– ‘স্যাফিক পোয়েট্রি’। ব্যাপারটা চোখের সামনে কোথায় গড়াচ্ছে বুঝছেন? আরও একটা জরুরি কথা হল, আমি যে গ্রিক ভাষায় কবিতা লিখেছি, সেটা কিন্তু ক্লাসিক গ্রিক নয়। আমার ভাষা– এওলিক (Aeolic) ডায়ালেক্ট।

এতক্ষণ আমরা শুনলাম সরাসরি এক মহিলা উভকামী কবির কথা, তার যৌনদর্শন ও জীবনের অন্তর উচ্চারণ। এবার আসি সদ্য কলকাতায় আসা একটি গ্রন্থে। নাম: ‘If Not Winter: Fragments of Sappho’। এটি কবিতার বই। স্যাফোর কবিতা। অনুবাদ করেছেন অ্যান কারসন (Anne Carson)। যিনি সমসময়ের বিখ্যাত কানাডিয়ান কবি। থাকেন আইসল্যান্ডে। এই বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ‘ইফ নট উইন্টার’ কারসনের অনুবাদে স্যাফোর লেসবিয়ান বা স্যাফিক প্রেমের কবিতা।

স্যাফোর জন্ম যিশুর আবির্ভাবের ৬৩০ বছর আগে। এই বছর তাঁর বয়স হল– ২,৬৫৬ বছর। তিনি কাগজে লিখতেন না। মানুষ তখনও কাগজ আবিষ্কার করেনি। তিনি লিখতেন প্যাপিরাসের ওপরে। অনেক কবিতাই পুরোপুরি লুপ্ত। তবে অনেক কবিতা বেঁচেও আছে টুকরো-টুকরো অবস্থায়। কারসন সমস্ত অনুবাদ করেছেন। বইটা আমি হন্যে হয়ে খুঁজেছি। কলকাতাকে আমরা না কি লন্ডন করেছি! কিন্তু লন্ডনে যেসব বইয়ের দোকানে জীবন সার্থক হয়েছে, তার ধারে কাছে যেতে পারে এমন দোকান কলকাতায় নেই। এবং কারসনের অনুবাদে সমগ্র স্যাফো পেলাম পানশালার মায়াময় ছায়ায়, আমার সেই পুরনো বইবন্ধু তরুণের হাত থেকেই। আর প্রথমেই চোখে পড়ল– আফ্রোদিতির কাছে স্যাফোর আর্ত প্রার্থনা।

যৌনতা, উর্বরতা, রতির দেবী আফ্রোদিতিকে নিজের জীবনগহনে আহ্বান করেছেন অ্যান কারসন। সেই আহ্বান শুনেছিলেন আফ্রোদিতি। সম্ভবত নিজেই এলেন যৌনতার দেবী স্যাফোর প্রান্তজীবনে ফেয়ন (Phaon) নামের এক রূপবান রোম্যান্টিক যুবক নাবিকের রূপ-ধরে। বাইসেক্সুয়াল স্যাফো প্রবল প্রেমে পড়লেন এই শরীরতৃষিত রূপবান নাবিকের। জীবনপ্রান্তে এসেও শরীরের তলানি নিংড়ে দিলেন স্যাফো। কিন্তু ফেয়নকে ধরে রাখতে পারলেন না!

এই জীবন এই শরীর রেখে কি লাভ, যে শরীরের যৌনখিদে কিছুতেই যাচ্ছে না? অথচ চলে যাচ্ছে সম্ভোগ! সমস্ত পোশাক দেহ থেকে নামিয়ে দিলেন কবি স্যাফো। উঠে গেলেন। লিউকেডিয়ান ক্লিফ-এর চূড়ায়। তারপর নিজের অপারগ অথচ ক্ষুধার্ত দেহটাকে ছুঁড়ে দিলেন অপরিমেয় অতলে, খ্রিস্টপূর্ব ৫৭০-এ, ২,৫৯৬ বছর আগে! একবুক যৌনতৃষ্ণার মরুভূমি নিয়ে– Come to me now: loose me from hard care and all my heart longs…
……………………
পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য পর্ব
……………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved