From Cave Art to Fauvism: The Evolution of Art and Artists | Robbar
Robbar
  • ২০ কার্তিক ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৭ নভেম্বর ২০২৬

শিল্পের রং, শিল্পীর রংবাজি

রং পৃথিবীকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, অথবা একটি সম্পূর্ণ নতুন জগৎ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, রঙেরই সেখানে নিজস্ব রংবাজি। প্রতিটি যুগ রঙের একটি নতুন সম্ভাবনা আবিষ্কার করেছে। কিন্তু কোনও যুগই রঙের সমস্ত সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করতে পারেনি। রং শুধু ছবির ফাঁকা স্থান পূরণ করে না, সে ছবির আবহ নির্মাণ করে, তার আবেগের তাপমাত্রা নির্ধারণ করে, তার ছন্দ তৈরি করে এবং কখনও ছবিটির অস্তিত্বের প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।

শেষ আপডেট: নভেম্বর ৭, ২০২৬, ২০:৫৫   
Facebook WhatsApp Messenger

‘রংবাজি’ শব্দটার তরজমা অন্য কোনও ভাষায় হয় না। যদি হয়ও, আমি নেই। কী দরকার তরজমায়! এটা শুধু বাংলার আর বাঙালির জন্যই থাক। রংবাজরা একাই একশো! সাবেকি বাঙালির রংবাজি আবার অন্যরকম। বিশাল বপুর দরকার নেই। এমনকী, তর্জনী উঠিয়ে কথা বলারও প্রয়োজন হয় না। মেজাজটাই আসল আর সবই যেন নিঃশব্দে। রংবাজদের ছিল আবার নিজস্ব আলাদা রং।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কথা মনে পড়ছে। আপনাদের নিশ্চয়ই ইঙ্গিত বুঝতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না? সেই ট্রেন জার্নির কথা মনে আসছে নিশ্চয়ই, যেখানে সাহেবের জুতোজোড়া রেলগাড়ির বাইরে বাংলার বাঘের কোট খুঁজতে গিয়েছিল!

সেকালে এই রংবাজের কাছে গিয়েছিলেন আমার চেনা আর একজন রংবাজ। শান্তশিষ্ট। তিনি শিল্পী অতুল বসু, কলেজের বাইরের আমার আর এক মাস্টারমশাই। এখানে যে রঙের কথা আসছে, সেটা কিন্তু সত্যিকারের রং। মানে ছবি আঁকার সরঞ্জাম। হরেকরকম রং ছাড়াই শুধু চারকোলে, কালো রঙেই এঁকেছিলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি, যে-ছবিটি কি না সবার মনে ধরা আছে ‘বাংলার বাঘ’ হিসেবে।

zoom
আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি; শিল্পী: অতুল বসু

অতুলবাবুর মুখে যেমন শুনেছিলাম, “ওঁর বাড়িতে যখন পৌঁছলাম, তখন উনি স্নানের আগে গায়ে তেল মাখছিলেন। ইচ্ছে জানতে চাইলেন। বললাম, ‘আপনার একটা পোর্ট্রেট আঁকতে চাই। আপনার সময়মতো একদিন আসব।’ উনি বললেন, ‘এখনই আঁকো, এখন হয় না? এই আমি বসে আছি।’ আমার সঙ্গে রংতুলি আর অন্য সরঞ্জাম ছিল না কিছুই। পরে কখন কী হবে, এখনকার এই সুযোগটা নষ্ট করতে চাই না। স্কেচবুকে কাঠকয়লার পেনসিলে এঁকেছিলাম সেদিনের আশুতোষ মুখার্জী। পেনসিলে প্রয়োজনমতো কখনও মোটা কখনও সরু স্ট্রোক। কখনও বা আঙুলের ডগা দিয়ে সামান্য ঘষে, কোথাও কোথাও একটু টোন তৈরি। রাবারের কোণ দিয়ে কোথাও একটু-আধটু হাইলাইট। বুকের লোমের আভাসমাত্র। বাঁ কাঁধ থেকে শুরু হয়ে বুকের ওপর দিয়ে ওঁর ডান পাশে যাওয়ার পথে আবছা হয়ে যাওয়া পৈতে। নগ্ন গায়ের আচ্ছাদনের আয়োজন ঐ পৈতেটুকুই।’’

‘দ্যাখো তো বাংলার বাঘ লাগছে কি না’– সাদাকালো, বলিষ্ঠ শরীর, পুষ্ট গোঁফের ছবিখানা দেখিয়ে বলেছিলেন অতুলবাবু। তবে ওঁর রংবাজিটা অন্য জায়গায়। সেই গল্পটা শোনানোর জন্যই এই ভূমিকাটা করলাম আর কী। ‘বাংলার বাঘ’ এঁকে সাহস বাড়ল অতুল বসুর। উনি এবার গেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি আঁকতে।

zoom
রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি আঁকছেন শিল্পী অতুল বসু (১৯৫৮); দ্য স্টেটসম্যানে প্রকাশিত ছবি

গুরুদেবের প্রতিকৃতি আঁকার ইচ্ছে প্রকাশ করায় তিনি বললেন, ‘গুরুদক্ষিণা চাই।’ দক্ষিণা কী? না, নন্দলাল বসুর একখানা মুখ এঁকে এনে দিতে হবে আগে। অগত্যা তিনি গেলেন নন্দবাবুর কাছে। শুনে নন্দলাল বললেন, ‘এক কাজ করো, খানিকটা আইভরি ব্ল্যাক ক্যানভাসে গোল করে ঘষে দাও। সেই হবে আমার মুখ, গুরুদেবের দক্ষিণা!’ নন্দবাবু ছিলেন কালো মানুষ। রং বিষয়ে জ্ঞানী শিক্ষক। দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল অতুল বসুর মাথায়। আইভরি ব্ল্যাকের টিউবটা নন্দবাবুর পায়ের কাছে রেখে, ওঁকেও দিলেন গুরুদক্ষিণা। তারপর আইভরি ব্ল্যাক ছাড়াও ওঁকে কত কালো করে আঁকা যায়, তার পরীক্ষা দিতে ক্রিমসন রেড, ভিরিডিয়ান গ্রিন, প্রাশিয়ান ব্লু ইত্যাদিতে সম্পন্ন করলেন নন্দলাল বসুর প্রতিকৃতি! এ-ও আর এক সাবেকি রংবাজি।

শিল্প শিক্ষায়তনের অন্দরে, অন্তরের কোনও রংবাজ গুরু কি পাইনি আমরা? অবশ্যই পেয়েছি। তিনি হচ্ছেন এক এবং অদ্বিতীয় গোপাল ঘোষ। আমাদের শিক্ষায়তনের মাস্টারমশাই। শান্তশিষ্ট ভদ্র বিনয়ী এই মানুষটিকে কেন যেন ‘গুরু’ নয়, একজন সত্যিকারের ‘রংবাজ’ বলে মনে হয়েছে চিরকাল! প্রিয় পাঠক, একটু ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে পড়েছি। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, এই মানুষটির সঙ্গে যদি আমার দেখা না হত, তাহলে জলরঙে, শুধু রঙের কারবারি হয়ে সারাজীবনের ভাতকাপড়ের ব্যবস্থা বোধহয় আর করতেই পারতাম না! এ আমার সত্যিকারের কৃতজ্ঞতা স্বীকার।

zoom
গোপাল ঘোষ; ছবি সৌজন্য: জাহাঙ্গীর আর্ট ফাউন্ডেশন

শিল্প এবং রঙের আঙিনায় যখন ঢুকেই পড়েছি, তখন শুধুমাত্র আমাদের দেশওয়ালি রংবাজদের কথা বললে মন ভরবে না জানি। তাই একটু দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যাই। তারপরে ফিরে আসব আবার দেশওয়ালি রংবাজদের কথায়।

অন্য দেশ বা বিদেশ বললেই আমরা আবার পশ্চিমের দিকে চলে যাই। আশ্চর্য, তবে তফাত আছে। পশ্চিমের মানুষরা যতটা কাজ করে, ততটাই জাহির করে। পুবের তেমন ব্যাপার নেই। অনেকটাই রয়ে-সয়ে– নিজেদের সমাজের মধ্যে, মনের মধ্যে, আধ্যাত্মিকতায় থাকার চেষ্টা। পশ্চিমে যখনই কোনও কাজ হয়েছে তখনই তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ চাই। যথারীতি রেকর্ড করাও হয়েছিল। তাই তো আমরা শিল্প আলোচনার সুযোগ পাই। শিল্প আলোচনাও যে একটা বিষয় হতে পারে, সে ব্যাপারে বুঝতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম আমরা।

পশ্চিমের শিল্প-আন্দোলনের কথায় আসি এইখানে। না, আন্দোলন বলতে মারামারি, দাবি-দাওয়া, রাগ, হিংসা, প্রতিবাদ নয়। পরিভাষায়, ‘আর্ট মুভমেন্ট’। তবে হ্যাঁ, এই আন্দোলনের সঙ্গে মতবাদে বিশ্বাসী দলগঠন বা সংগঠন আর বিপ্লব ইত্যাদি শব্দ জুড়ে দেওয়া যেতে পারে। শিল্পকর্মের সময়ের ভাগ, একটা যুগ থেকে আর একটা যুগের চারিত্রিক পরিবর্তন।

একাল-সেকাল মিলিয়ে শিল্পকলায়, বিশেষ করে চিত্রকলার ইতিহাসে রঙের মাহাত্ম্য, গুরুত্ব, দাদাগিরি, দাপট– এককথায়, রঙের শক্তি প্রদর্শনের বিশেষ উদাহরণ পেতে, পাশ্চাত্যের শিল্প আন্দোলনের দিকে একটু নজর ঘোরাই। রং পৃথিবীকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, অথবা একটি সম্পূর্ণ নতুন জগৎ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, রঙেরই সেখানে নিজস্ব রংবাজি। 

zoom
আলতামিরার গুহাচিত্র

প্রকৃতির অন্যতম অসাধারণ এক উপহার– রং। একজন শিল্পীর হাতে এ শুধু হাতিয়ার নয়, এমন এক শক্তিতে পরিণত হয়, যা আমাদের দেখার, অনুভব করার এবং বিশ্বকে বোঝার পদ্ধতি বদলে দিতে পারে। রং যেন এক অভিজ্ঞতা, আবেগ, সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং কখনও কখনও এক বৈপ্লবিক ঘোষণা। প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্র থেকে আধুনিক বিমূর্ত শিল্প– রঙের বিবর্তনের এ এক ঐতিহাসিক ও দার্শনিক পাঠ। চিত্রকলায় রঙের প্রকৃত শক্তি কোথায়? রং কি শুধুই ছবিকে সুন্দর করে, নাকি একটি ছবির অর্থ, আবেগ এবং অস্তিত্ব নির্মাণেও তার ভূমিকা রয়েছে? রং তো মানুষের দেখার, ভাবার এবং অনুভব করার ইতিহাসও। 

প্রাচীন মিশরের চিত্রকলায় যেমন, রং ধর্মীয় বিশ্বাস, দেবদেবীর উপস্থাপনা এবং পরলোকচিন্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নীল আকাশও ঐশ্বরিক জগতের ইঙ্গিত বহন করত। সবুজের সঙ্গে যুক্ত ছিল পুনর্জন্ম ও নবজীবনের ধারণা। এখানে রং শুধু শরীরকে দৃশ্যমান করে না, চরিত্রের অন্তর্গত অনুভূতিকেও প্রকাশ করে। একই রং এক সংস্কৃতিতে পবিত্রতার প্রতীক, অন্য সংস্কৃতিতে তার অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।

রেনেসাঁস আমাদের শেখাতে চেয়েছে, রংকে রূপের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রয়োজন হয় না। এটি রূপকে তার সারবস্তু এবং আবহকে প্রাণ দিতে পারে। তবে এইখানে এমন একটি প্রশ্নের উসকানি রয়েছে, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। রং কি কেবল রূপের সেবক, নাকি এটি একটি চিত্রকর্মের প্রধান চালিকাশক্তিও হয়ে উঠতে পারে?

zoom
বারোক পর্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি; শিল্পী: কারাভাজ্জিও

বারোক শিল্পের শিক্ষা হল, রঙের শক্তি সবসময় রঙের প্রাচুর্যে থাকে না। কখনও একটি ক্ষুদ্র আলোকিত অংশ, তার চারপাশের বিস্তৃত অন্ধকারের তুলনায়, অনেক বেশি আবেগ সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ রঙের ক্ষমতা তার একক উপস্থিতিতে নয়, অন্য রং ও অন্ধকারের সঙ্গে তার সম্পর্কে নিহিত। রোমান্টিসিজম সেখানে প্রকৃতিকে অনুকরণ করার সীমা অতিক্রম করে, মানুষের মানসিক অবস্থাকে প্রকাশ করতে শুরু করে। একটি দৃশ্য আর কেবল দৃশ্য থাকে না, হয়ে ওঠে মানুষের অন্তর্জগতের প্রতিচ্ছবি।

ইমপ্রেশনিজমের বিপ্লব শুধু উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারে নয়। তাঁরা দেখিয়েছিলেন, আমরা বস্তুকে একা দেখি না। আলো, পরিবেশ ও দৃষ্টির পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই দেখি। রং তাই হয়ে ওঠে একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের অভিজ্ঞতার রেকর্ড। ইমপ্রেশনিস্টরা যেখানে বাইরের জগতের পরিবর্তনশীল আলোকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্টরা সেখানে রঙের মাধ্যমে ব্যক্তিগত অনুভূতি ও চিন্তাকে প্রকাশ করতে চাইলেন। বিশ শতকের গোড়ায় শিল্পীরা প্রশ্ন তুললেন, ছবির রং কি প্রকৃতির রঙের অনুগত থাকতে বাধ্য?

zoom
পোস্ট-ইমপ্রেশনিজম পর্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি, ‘দ্য স্ক্রিম’

শিল্পবিপ্লবের সবচেয়ে কম সময়ের ফভিজমের শিল্পীদের যে-দল, তাঁদের উপস্থিতিটাই প্রথা ভাঙার সাংঘাতিক উদাহরণ। ওঁদের মাস্তানি এবং সত্যিকারে রংবাজি উল্লেখযোগ্য। ফভিজমের শিল্পীরা রঙকে প্রকৃতির অনুকরণের দায় থেকে মুক্ত করেছিলেন। রং হয়ে উঠেছিল ছবির নিজস্ব ছন্দ ও আবেগের উৎস। রঙের এই মুক্তি আধুনিক ও বিমূর্ত শিল্পের রাস্তা খুলে দিয়েছিল।

‘ফভিজম’ ও ‘এক্সপ্রেশনিজম’ মানে রং হবে লাগামছাড়া। বাঁধনমুক্ত। বিশ শতকের শুরুতে, শিল্পীরা পাশ্চাত্য চিত্রকলার অন্যতম প্রাচীন এক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করলেন। আমার ব্যক্তিগত পছন্দের দল। মাঠে নামলেন শিল্প ইতিহাসের আসল রংবাজরা। বাঘের বাচ্চা। ‘ফোভ’। ফরাসি ভাষায় যার অর্থ, বুনো (শিকারি) জানোয়ার। প্রধান ব্যক্তিত্বরা– অঁরি মাতিস, অঁদ্রে দেরাঁ, ভ্লামিঙ্ক, রুয়োঁ, জর্জ ব্রাকের মতো চিত্রকর। কঠোর সমালোচনা শুরু হলেও দর্শকদের কিন্তু নতুন কিছু পাওয়ার খোরাক জুগিয়েছে। জমিয়ে মাঠে নেমে পড়া আর কী! একটি ছবির রং নির্বাচন করেন খেলুড়ে শিল্পী, কিন্তু গোল কীভাবে হবে, তা সম্পূর্ণ হয় দর্শকের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।

প্রতিটি যুগ রঙের একটি নতুন সম্ভাবনা আবিষ্কার করেছে। কিন্তু কোনও যুগই রঙের সমস্ত সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করতে পারেনি। রং শুধু ছবির ফাঁকা স্থান পূরণ করে না, সে ছবির আবহ নির্মাণ করে, তার আবেগের তাপমাত্রা নির্ধারণ করে, তার ছন্দ তৈরি করে এবং কখনও ছবিটির অস্তিত্বের প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। মোনে, মানে, পল ক্লে, দেগা, ভ্যান গঘ, পল গগ্যাঁ, সালভাদর দালি, পিকাসোর মতো রংবাজিতে জনপ্রিয় শিল্পীদের কথা কী আর বলব! সবাই তো চেনেন।

zoom
জর্জ ব্রাকের আঁকা ছবি

দেশওয়ালি রংবাজদের এরিনায় আর একবার প্রবেশ করি। ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকায় আছেন সৈয়দ হায়দার রাজা। তিনি আধুনিক ভারতীয় শিল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রঙের কল্পনাবিলাসী। তাঁর চিত্রকলায় জ্যামিতিক প্যাটার্ন এবং আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধন ঘটেছে এক গভীর প্রয়োগে। আছেন, তায়েব মেহতা। মেহতার ছবিতে এক অদ্ভুত মিনিমালিস্টিক কিন্তু তীব্র রঙের ব্যবহার থাকে। তিনি রঙের সমতল প্রলেপ ও ধারালো রেখার মাধ্যমে তীব্র নাটকীয়তা তৈরি করতেন। একেবারে হাল আমলে, বিশ শতকের শেষের দিকে ভারতীয় শিল্পকর্মে যাঁরা রংবাজি করছিলেন, তাঁদের সঙ্গে শিং ভেঙে বাছুরের দলে, শুধুমাত্র আমাদের লোককলার ওপর ভর করে, সমানে পাল্লা দিয়ে দাদাগিরি করে গেলেন আর একজন বর্ষীয়ান রংবাজ– যামিনী রায়।

আমার ছবিতে গল্প থাকে না। মূলত রঙের পূজারি। পুব-পশ্চিম মিলিয়ে শর্টলিস্ট করলে আমার ব্যক্তিগত তালিকায় থাকে মাত্র দু’জন রংবাজ। আমি তাঁদের লুকিয়ে চেলা-চামচা। মানে ধার করা রংবাজি আর কী! তাঁরা হলেন, ওদিককার অঁরি মাতিস আর এদিককার, গোপাল ঘোষ– যাঁদের কাছে চিরঋণী থাকলাম।

zoom
শিল্পী: অঁরি মাতিস

ফভিজম আন্দোলনে মাতিসের নেতৃত্ব নিয়ে কারও মনে কোনও দ্বিমত নেই। বিশ শতকের আধুনিক শিল্পের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত অঁরি মাতিসের চিত্রকলার মূল বিশেষত্ব হল, তিনি রঙকে আপাত অবাস্তব এবং প্রকৃতির অনুকরণে ব্যবহার করার পরিবর্তে, সরাসরি মেজাজ এবং অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। একটি অভিব্যক্তিপূর্ণ শক্তি হিসেবে বৈপ্লবিকভাবে প্রয়োগ করেছেন। কলা সমালোচকরা যতই তাকে ‘বন্য পশু’ উপাধি দিয়ে থাকুন, চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে তাঁর ছবি একান্তই কবিতা হয়ে দাঁড়ায়, হয়ে ওঠে সংগীত।

গোপালবাবুর বেলায় দেখি সেই একই রঙের মাস্তানি। কাগজের বুকে কয়েকটা লাইন কিংবা যা-খুশি রঙের দাপট। সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়ে ওঠে মনোরম, সুরেলা ছবি। প্রিয় পাঠক লক্ষ করেছেন আশা করি, বিষয়বস্তু যা হোক, তার সারবত্তা যাই হোক, রঙের ব্যপারে সারা পৃথিবীতে সেই পুরনো প্রবাদ, ‘জোর যার মুলুক তার’, যেন এখনও চালু আছে। সোজাসাপটা বললে, রংবাজি চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে।

Ashutosh Mukhopadhyay Atul Basu claude monet Fauvism Gopal Ghosh Henri Matisse Impressionism Nandalal Bose Pablo Picasso Salvador Dalí Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Tyeb Mehta

Share this article on