Robbar

ফ্লাশ-ব্যাক

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 7, 2026 5:58 pm
  • Updated:June 7, 2026 6:33 pm  

আজকাল মহাকাশ স্টেশনে টয়লেট আছে। মহাকাশ স্টেশনে টয়লেটের ব্যবস্থা থাকলেও সেটা খুব আরামের এবং খুব স্বচ্ছন্দে ব্যবহারের মতো নয়, কারণ মহাকাশে সব কিছুই বেঁধে রাখতে হয় নইলে ভেসে যায়। আসল টয়লেটটি ২০০০ সালে পুরুষদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল এবং মহিলাদের জন্য তা ব্যবহার করা কঠিন ছিল। প্রস্রাব করার সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হত। মলত্যাগের জন্য, মহাকাশচারীরা, ছোট টয়লেটটিতে বসার জন্য উরুতে ফিতে ব্যবহার করতেন– যাতে তাঁদের পশ্চাৎদেশ এবং টয়লেট সিটের মধ্যে একটি আঁটসাঁট বন্ধন তৈরি হয়। তবে তা খুব একটা কার্যকর ছিল না এবং পরিষ্কার রাখাও কঠিন ছিল। 

সমীর মণ্ডল

৩৩.

‘ল্যাট্রিন’, শব্দটা প্রথম শুনি হাইস্কুলে পড়াকালীন এনসিসি ক্যাম্পে গিয়ে। সেই প্রথম বিশেষভাবে টয়লেটের ব্যবহার। জীবনে সেইবার অনেক কিছুই প্রথম ছিল। প্রথম বাড়ির বাইরে বেরলাম একা-একা আত্মীয়স্বজন ছাড়া। প্রথম রেলগাড়ি চড়ে কোথাও গেলাম। বসিরহাট থেকে বাণীপুর। প্রথম এনসিসি ক্যাম্প থেকে মাকে পোস্টকার্ডে চিঠি লিখেছিলাম বাড়িতে। তারিখটাও মনে আছে– ৬.৬.৬৬।

স্কুলে গরমের ছুটিতে এনসিসি ক্যাম্প। বারাসাত-বনগাঁ লাইনে বাণীপুরের একটা স্কুলে আমাদের রাখা হয়েছিল। অনেকগুলো ক্লাসরুমে থাকার ব্যবস্থা। বসিরহাট হাইস্কুল ছাড়াও, একেবারে টাকি, হাসনাবাদ থেকে বারাসাত পর্যন্ত, অনেক স্কুলের ছেলেদের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল সেই ক্যাম্পে। একটা অন্যরকম আনন্দ। তবে যে ক’দিন ছিলাম, আমাদের চলাফেরার সবটাই ছিল বড্ড নিয়ন্ত্রিত। সকালে ওঠার পর থেকে রাতে ঘুমনো পর্যন্ত সবকিছুই একটা বাঁধা রুটিনে। 

সাধারণ টয়লেট

কখনও কখনও বাইরে কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়েছে, হয়তো রাইফেল শুটিং কিংবা সত্যিকারের রাইফেল নিয়ে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা ইত্যাদির জন্য। তাছাড়া আর সবকিছুই প্রায় ক্যাম্পাসের মধ্যেই, স্কুলের মাঠে। নিজের ইচ্ছেমতো স্কুল চৌহদ্দির বাইরে যাওয়া ভীষণভাবে নিষিদ্ধ। নিয়ম ভাঙলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা। স্কুলটাও বেশ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। গেটের বাইরে বড় রাস্তায় না-বেরলে তেমন কিছু নেই। অদ্ভুতভাবে স্কুলের এক পাশে ছিল ঘন জঙ্গল। সেই জঙ্গলের পাশ ঘেঁষে তৈরি হয়েছিল বেশ কিছু টেম্পোরারি টয়লেট, মানে ল্যাট্রিন। মাটিতে গর্ত খুঁড়ে, তার উপরে বাসের পাটাতন আর চারদিকে চট দিয়ে ঘেরা ছোট্ট ঘরের মতো।

ওই ল্যাট্রিনের দিকে আমাদের আসল নজর। কারণ ল্যাট্রিনে যাওয়ার কোনও বারণ ছিল না, আর সেই ল্যাট্রিনের আশপাশ দিয়ে বেড়া গলে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে যাওয়া যেত। জঙ্গলের মধ্যে বেশ কিছু আম, জাম, জামরুলের গাছও ছিল। আর ছিল একটা মস্ত বড় আঁশফলের গাছ। খানিকটা ছোট লিচুর মতো সেই আঁশফলের বড় বড় থোকা আমরা জঙ্গলে ঢুকে নিয়ে আসতাম গামছার মধ্যে লুকিয়ে। জঙ্গলের ভেতরে ছিল আর একটা গরমে শুকিয়ে যাওয়া কম জলের পুকুর। সেই পুকুরের জলে নেমে কেউ দাপাদাপি করতেই দু’-চারটে বড় মাছ ভয় পেয়ে লাফিয়ে ডাঙায় উঠে পড়েছে একদিন। কিন্তু সেটা স্কুলের মধ্যে আনব কী করে! জঙ্গলে নানা পাখির ডাক আর পাশের পাড়ায় কোনও এক অনুষ্ঠানের মাইকের গান ভেসে আসছে জঙ্গল ভেদ করে আমাদের দিকে– ‘নিঝুম সন্ধ্যায়, পান্থ পাখিরা, বুঝিবা পথ ভুলে যায়’। 

ল্যাট্রিনের বিষয়ে আর একটু বলি। যদিও এটা যতটা পাঠ্য বিষয়, ততটা এর ব্যবহারিক দিক নিয়ে সন্দেহ বা ঘাটতি অছে। মানব সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধির গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাচ্ছে। তাই টয়লেট বা শৌচাগার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। আজকের আধুনিক সমাজে শৌচাগার শুধু একটি প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নয়, বরং জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং মর্যাদার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

মুম্বইয়ের বস্তি অঞ্চলের শৌচাগার

গ্রাম্য জীবনে আমাদের এই টয়লেট-বিহীন জীবন কীভাবে কাটত তার পরিষ্কার ব্যাপারটা এখন আর মাথায় নেই। প্রাকৃতিক পরিবেশে যে যেমন খুশি চালিয়ে নিত আর কী! ঘন জনবসতি ছিল না, তাই মাঠঘাট, ছোটখাটো জঙ্গল এবং ঝোপঝাড় ইত্যাদির অভাব ছিল না। রাতবিরেতে, কনকনে শীতে বা বর্ষায় অসুবিধা হত। তাছাড়া ঝোপে-ঝাড়ে সাপখোপের উপদ্রব ছিল। গ্রামে পাকা বাড়ি খুব কম ছিল। যাদের ছিল, তাদের হয়তো টয়লেটের ব্যবস্থা ছিল, তবে বাড়ির ভেতরে নিশ্চয়ই ছিল না। তখন এই ব্যাপারটা বাড়ি থেকে আলাদা করেই রাখা হত। তাই গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীতে, দিনে-রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর একটা ছোট ঘরের মধ্যে তাদের যাতায়াত করতে হত, সেটা আমরা আন্দাজ করতে পারতাম।

দেশের গ্রামেগঞ্জে সরকারিভাবে আজকাল অনেক টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে বটে, তবে সেখানকার মানুষরা সেগুলো ঠিকমতো ব্যবহার করে না। তার একটা কারণ না কি মেয়েরা বদ্ধ অন্ধকার ঘরে ছোট্ট জায়গায় যেতে পছন্দ করছে না। অন্ধকার, দমবন্ধ, দুর্গন্ধ। দ্বিতীয়ত সব জায়গায় জলের ব্যবস্থা ভালো নেই। জলের ব্যবস্থা থাকলেও সেটা ভেতরে। বাইরে জল নিষ্কাশনের যথাযথ ব্যবস্থা নেই, তাই স্বাস্থ্যসম্মতভাবে এই টয়লেটগুলো ব্যবহার করছে না। গ্রামই বা বলি কেন, আমাদের বড় বড় শহরে, এমনকী এই মুম্বইয়ে, যেখানে প্রচুর জনসমাগম, অর্থাৎ বাজার এলাকা ইত্যাদি– সে সমস্ত জায়গাতেও প্রয়োজনে চট করে একটা পাবলিক টয়লেটের দেখা পাওয়া যাবে না। স্কুলকলেজ এবং অফিস কাছারিতে, বিশেষ করে মেয়েদের জন্য টয়লেটের সুব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। অথচ পৃথিবীর শৌচাগারের ইতিহাস বলছে, এর শুরু পাঁচ হাজার বছরেরও আগে। 

মেসোপটেমীয় গর্তের শৌচাগার

প্রাচীন মেসোপটেমীয় গর্তের শৌচাগার আনুমানিক ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং স্কটল্যান্ডের নব্যপ্রস্তর যুগের পাথরে নির্মিত শৌচাগার আনুমানিক ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে বিবর্তিত হয়ে আধুনিক স্যানিটারি সিস্টেমে পরিণত হয়েছে। একই সময়ে, মেসোপটেমিয়া ও ভারতে মাটির পাইপ, নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং ফ্লাশিং সিস্টেম-সহ প্রাচীনতম পরিচিত শৌচাগারগুলো উরুক এবং সিন্ধু উপত্যকায় আবির্ভূত হয়েছিল, যেখানে শৌচাগারগুলো আবার নর্দমার সঙ্গেও সংযুক্ত ছিল। 

বর্তমানে শৌচাগারের ব্যবহার, প্রযুক্তি এবং পরিবেশগত দিক থেকে প্রধান কয়েকটি ধরন হল: ‘ফ্লাশ টয়লেট’– সবচেয়ে প্রচলিত ধরন, যেখানে জল ব্যবহার করে বর্জ্য নিষ্কাশন করা হয়; শহরাঞ্চলে বেশি দেখা যায় এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকে; ‘পিট ল্যাট্রিন’ বা গর্ত শৌচাগার– গ্রামাঞ্চল বা উন্নয়নশীল এলাকায় এর ব্যবহার বেশি; মাটিতে গর্ত করে তার উপর কাঠামো তৈরি করা হয়, যেখানে বর্জ্য জমা হয়; ‘কম্পোস্টিং টয়লেট’– পরিবেশবান্ধব এক ধরনের শৌচাগার, যেখানে মানব বর্জ্যকে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সারে পরিণত করা হয়, জল প্রায় লাগে না বললেই চলে; ‘পোর্টেবল টয়লেট’– অস্থায়ী ব্যবহারের জন্য; মেলা, বাড়ি-ঘর তৈরির কাজের জায়গা, উৎসব, সিনেমার শুটিং ইত্যাদিতে এই ধরনের শৌচাগারের ব্যবহার হয়; তাছাড়া আছে ‘বায়োগ্যাস টয়লেট’– যেখানে বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপন্ন হয়, যা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

পোর্টেবল টয়লেট

টয়লেটের এতই যেখানে অভাব, সেখানে যাদের আছে তাদের আবার বিলাসিতার অন্ত নেই। আমার নিজেরই জানা বেশ কয়েকজন দেশি-বিদেশি বন্ধুর বাড়িতে তাদের বিলাসবহুল টয়লেট দেখেছি আর ব্যবহারও করেছি। সেগুলোর কোনও-কোনওটা ঘরের ইন্টেরিয়র এবং আসবাবপত্রের ব্যাপারে চোখ-ধাঁধানো। কোনওটা আবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে, স্বাচ্ছন্দ্য চেয়ে, বিজ্ঞানসম্মত কারিগরির দিকে সাংঘাতিক নজর। 

ফিল্মস্টার আমির খানের সঙ্গে সিনেমার কাজ করতে গিয়ে প্রয়োজনে ওঁর বাড়িতেই ছিলাম কয়েকদিন। পাঁচগনির সেই বাড়িতে একটি বিলাসবহুল টয়লেট আমার থাকার ঘরের লাগোয়া ছিল। সেখানে স্নানঘরের যাবতীয় কিছুর সঙ্গে, কমোডের ডাইনে-বাঁয়ে দেওয়ালের গায়ে পছন্দমতো ছোট্ট লাইব্রেরি ছিল। ছিল বসে বই পড়া এবং নোট লেখার ব্যবস্থা। চিত্রাভিনেতা অশোক কুমার ছবি আঁকতেন, সেই সুবাদে ওঁর মেয়ের সঙ্গে আমাদের আলাপ ছিল। শুনেছিলাম, অশোক কুমারেরও এরকম একটি লাইব্রেরি-ওয়ালা মস্ত বড় স্নানঘর ছিল।

সুসজ্জিত বিলাসবহুল শৌচাগার

নানা দেশে নানান টয়লেট দেখলাম। টয়লেট, ল্যাট্রিন, ল্যাভাটরি, বাথরুম, আউটহাউস, রেস্টরুম, ওয়াসরুম। ‘ডব্লিউসি’, ‘পটি’, ‘লু’ ইত্যাদি নানা নামে তাদের পরিচয়। শুধু তাই নয় দরজায় সাইন, সিম্বলগুলো অদ্ভুত অদ্ভুত। ‘হি-সী’, ‘হিজ-হার’, ‘ডাব্লিউ-এম’, ‘এফ-এম’ এবং সোজাসুজি ‘লেডিস-জেন্টস’। ছবিতে নারী-পুরুষের মুখ বা পুরো শরীর, গ্রাফিক ডিজাইনে ইমোজির মতো মুখ, তাসের রাজা-রানী, সাহেব-মেম ইত্যাদি ছাড়াও নারী-পুরুষের সাংকেতিক চিহ্ন, এমনকী ছোট হোটেলে মোরগ-মুরগির ছবিও দেখেছি। তবে বেশি আধুনিক এবং দুর্বল, দুর্বোধ্য গ্রাফিকে বিপত্তি আছে। দরজা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। 

শৌচাগারের বিবিধ প্রতীক

ধনী দেশগুলোর বড় বড় শহরে টয়লেটের ডিজাইন এবং তার ব্যবহারের দিকগুলো তাদের নিজস্ব। গত শতকের আটের দশকে আমার প্রথম বিদেশ যাওয়া। টয়লেটের নানা রকমের অভিজ্ঞতা হয়েছে সেই থেকেই। দু’-একটা বলি। প্রথম জার্মানিতে। নানাভাবে তাদের ব্যবহৃত কলকব্জাগুলো আলাদা লেগেছিল। বাথরুমের নল-কল-জল, শাওয়ার, ফ্লাশ সবই অচেনা লাগছিল। কোনটা কোনদিকে ঘোরাতে হবে, টানতে-টিপতে হবে বুঝতে পারছিলাম না। এমনই অসুবিধা হচ্ছিল যে রিসেপশনিস্টকে ডেকে এনে বাথরুমে ঢুকিয়েছিলাম বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য।

চিনের বড় শহর সাংহাইতে ঘরের মধ্যে বাথরুমটা বেশ বড়সড়, কিন্তু আধা স্বচ্ছ কাচের দেওয়ালে ঘেরা। তাই ঘরের মধ্যে অন্যান্য লোক থাকলে বড়ই অস্বস্তিকর সেই বাথরুম ব্যবহার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গরম জল আর ঠান্ডা জলের নবগুলো খুব গোলমাল ঘটায়। ঠিক নব না-টিপলে হুস করে প্রচণ্ড গরম জল মাথায় অথবা ঠান্ডা জল গায়ে পড়তে পারে। 

জাপানের বড় হোটেলে বিলাসবহুল টয়লেটে কমোডের গায়ে অদ্ভুতভাবে অসংখ্য বাটন। সীট গরম, কমোডের ভেতরে জলের নল সামনে-পেছনে, উপর-নিচে, জলের উষ্ণতা কম-বেশি করা, স্পিড কমানো-বাড়ানো, এমনকী কমোডের ঢাকনা বন্ধ থেকে ফ্লাশ করা পর্যন্ত সবই ওই বাটনগুলোর কোনও না কোনও একটায়।

হোটেলের লাক্সারি টয়লেট

প্যারিসে আমার বন্ধুর বাড়িতে ছিলাম দীর্ঘদিন। ব্যবস্থা দারুণ। নরম লোমশ কেতাদুরস্ত কার্পেট ছিল সারা ঘরে। বসার ঘর, শোওয়ার ঘর, রান্নাঘর থেকে শুরু করে টয়লেটের মধ্যেও একই কার্পেট। হালকা কাপড়ের জুতো পরে ঘরে চলাচল কার্পেট বাঁচিয়ে। ওই অবস্থাতেই টয়লেটের সমস্ত কাজগুলো করার ব্যবস্থাও রয়েছে ঠিকমতো। স্নানের ঘরের ভিজে মেঝে এবং অন্য অংশে শুকনো মেঝের যে বিভাজন সেটির ঠিকমতো পরিকল্পনা করা হয় না আমাদের এখানে।

কোনও কোনও দেশে জঙ্গল-প্রধান অঞ্চলে জঙ্গলের মধ্যেও আছে পাবলিক টয়লেট। বিশাল কৃষিভূমিতে কিংবা মরুভূমির দেশে কোনও কোনও জায়গায় পেট্রোল পাম্প সংলগ্ন টয়লেট। এছাড়াও দূরপাল্লার কোনও কোনও জায়গায় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য আর পিকনিক স্পটে রয়েছে টয়লেট। এখন আবার আধুনিককালে প্রয়োজনে সেগুলো ইন্টারনেটে সার্চ করেও দেখতে পাওয়া যায়, কাছাকাছি টয়লেট কোথায়। 

পাবলিক টয়লেটগুলোর আবার কম্পিটিশন নানা দেশে। কে কত সুন্দর সুন্দর পাবলিক টয়লেট বানাতে পারে– তা দেখানোর আয়োজন। কিছু কিছু অবশ্য দ্রষ্টব্য। শিল্পকর্মের উদাহরণ এক-একটি। বাঘা বাঘা আর্কিটেক্ট দিয়ে বানানো স্থাপত্যের নানারকম খেলা। তাছাড়া সুন্দর আকারের স্থাপত্যের দেওয়ালে নানারকম ম্যুরাল বা গ্রাফিক্স। আশেপাশের অঞ্চল, পরিবেশ বা সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থপূর্ণ কনসেপচুয়াল আর্ট যেন! তারপর আছে তাদের মেটেরিয়াল ব্যবহারের ধরন। পেইন্টিং কোথাও, কোথাও স্কাল্পচার। ধাতু, পাথর, প্লাস্টিক, অথবা নানারকম আধুনিক সরঞ্জাম।

সুদৃশ্য ও নান্দনিক পাবলিক টয়লেট

এবারে আসি নদীতে, সমুদ্রে আর মহাকাশের উড়ন্ত টয়লেটের ব্যাপারে। জলযানের মধ্যেও শৌচালয় আছে, তবে সেগুলো আলাদা করে বলার মতো না। লঞ্চ, স্টিমার, প্রমোদতরী, ছোট জাহাজ, বড় জাহাজ– এগুলোর মধ্যে যেহেতু থাকার ব্যবস্থাটা সাধারণত স্থলের ঘরবাড়ির মতো, তাই ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায় না যে জলে আছি না ডাঙায়। ঘরবাড়ির ভিতরের সঙ্গে মিলিয়ে টয়লেটের ডিজাইন। তবে ছোট নৌকো কিংবা ছইওলা মাঝারি নৌকো করে পরিবারের অনেকে মিলে দীর্ঘ জলযাত্রা করেছি আমরা গ্রাম্য জীবনে। সেটাই ছিল তখনকার একমাত্র পরিবহন ব্যবস্থা। দু’ ধারে জঙ্গল, কখনও বিশাল জলাভূমির মাঝখান দিয়ে দীর্ঘ জলযাত্রা। সেইখানে কিন্তু কোনও টয়লেটের ব্যবস্থা ছিল না। সে গল্পটা বরং অনেক বেশি মুখরোচক। এখানে বলার জায়গা কম।

জলে হোক কিংবা অন্তরীক্ষে, এখানে একটা জিনিস গুরুত্ব দিয়ে বলতে চাই, আজকাল পয়ঃবর্জ্য কিন্তু বাইরে ফেলে দেওয়ার বদ অভ্যাস চলে গিয়েছে। সমস্ত বর্জ্য পাইপের মাধ্যমে টয়লেটের বাইরে অন্য কোথাও রাখা ধারণ-ট্যাঙ্কে চলে যায়। জলযান তীরে ফেরা এবং প্লেন অবতরণ না-করা পর্যন্ত বর্জ্য ভেতরেই থেকে যায়। পরে সুষ্ঠু, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে অপসারণের ব্যবস্থা করা হয়।

মহাকাশে না-হলেও আকাশে আমাদের বিমানে যাতায়াত আজকাল অনেক সহজ হয়েছে। প্রথম বিমানযাত্রায় যে ক’টা জিনিসে অবাক হয়েছিলাম অথবা বিচিত্র লেগেছিল– সেগুলো সম্পর্কে আপনারাও একমত হবেন। সিটবেল্ট বাঁধা এবং খোলা, কিছুক্ষণের মধ্যেই প্লেনের স্পিড বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পিঠে-সিটে চাপ বেড়ে যাওয়া; আরও কিছু পরে যখন প্লেনটা মাথা উঁচু করে আরও উপরের স্তরে উঠতে চাইছে, তখন সামনে রাখা জলের গ্লাসটা সোজা মনে হলেও জলের লেভেলটা কিন্তু কাত। আর নামার সময় শব্দ আস্তে আস্তে কম শোনা বা কানে তালা লেগে যাওয়ায় কথাও নিশ্চয়ই মনে পড়ছে আপনার।

বিমানের অন্তঃস্থ শৌচালয়

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিমানের খুব ছোট মাপের একটি টয়লেট। ছোট্ট ভাঁজ করা দরজা, ভেতরের ছিটকিনি বন্ধ করলেই আপনা থেকেই আলোর জোর বেড়ে ওঠে। প্রয়োজনের জিনিসপত্র ঠিকমতো সাজানো আছে সব। 

তবে টয়লেট ফ্লাশ করার সময় যে একটা বিকট ‘শুষে নেওয়ার মতো’ শব্দ শোনা যায়, সেটা কিন্তু একদমই চমকে দেওয়ার মতো। প্রথম দিন হঠাৎ মনে হয়েছিল, আমাকে শুদ্ধ টেনে নিয়ে বাইরে না বের করে দেয়। বিমানের টয়লেটগুলো বেশ চতুর একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে। তারা এমন একটি বিষয়কে কাজে লাগায়, যা উঁচু আকাশে থাকা অবস্থায় বিমানের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই আছে। আর তা হল– বিমানের কেবিন বা ভেতরের অংশ এবং বাইরের পরিবেশের মধ্যকার বিশাল বায়ুচাপের পার্থক্য। তার মানে, বিমানে আমরা যখনই টয়লেট ফ্লাশ করি, তখন মূলত পদার্থবিজ্ঞানই সেই নোংরা কাজটা বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বটা পালন করছে।

জানেন তো, বিমান চলাচলের একদম শুরুর দিনগুলোতে, বিমানে বাথরুমের কোনও ব্যবস্থাই ছিল না। আরও মজার ব্যাপার হল, ১৯৬০-এর দশকে ‘অ্যাপোলো’ অভিযানের মহাকাশচারীরা সাদাসিধে পদ্ধতিতেই তাদের প্রাকৃতিক কাজ সারতেন। আমাদের কল্যাণের বিশাল দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কিছু অসহায়তার কথা আমাদের মাথাতেই আসে না। চাঁদে কোনও বিলাসবহুল বাথরুমের ব্যবস্থা থাকার কথা নয়। নীল আর্মস্ট্রং-এর মতো মহাকাশচারীরাও তখন একটি ব্যাগের মধ্যেই প্রস্রাব ও মলত্যাগ করতেন। আমাদের মহাকাশচারী সুনীতা উইলিয়ামসের ২৮৬ দিনের যে মহাকাশ সফর তাতে অনেকদিন তাঁর কান্না পেয়ে যেত; এবং জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম কাজটা ছিল টয়লেটের ব্যবহার।

মহাকাশে থাকাকালীন সুনীতা উইলিয়ামস

সৌভাগ্যবশত, আজকাল মহাকাশ স্টেশনে টয়লেট আছে। মহাকাশ স্টেশনে টয়লেটের ব্যবস্থা থাকলেও সেটা খুব আরামের এবং খুব স্বচ্ছন্দে ব্যবহারের মতো নয়, কারণ মহাকাশে সব কিছুই বেঁধে রাখতে হয় নইলে ভেসে যায়। আসল টয়লেটটি ২০০০ সালে পুরুষদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল এবং মহিলাদের জন্য তা ব্যবহার করা কঠিন ছিল। প্রস্রাব করার সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হত। মলত্যাগের জন্য, মহাকাশচারীরা, ছোট টয়লেটটিতে বসার জন্য উরুতে ফিতে ব্যবহার করতেন– যাতে তাঁদের পশ্চাৎদেশ এবং টয়লেট সিটের মধ্যে একটি আঁটসাঁট বন্ধন তৈরি হয়। তবে তা খুব একটা কার্যকর ছিল না এবং পরিষ্কার রাখাও কঠিন ছিল।

২০১৮ সালে, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের মহাকাশচারীদের জন্য একটি নতুন ও উন্নত টয়লেটের পেছনে ২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছিল নাসা। সে টয়লেটের ঢাকনা তুলে সিটের উপর বসা যায় ঠিক পৃথিবীর মতোই। তবে এই টয়লেটটি ঢাকনা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই সাকশন শুরু করে দেয়, যাতে কোনও কিছু ভেসে না যায় এবং দুর্গন্ধও নিয়ন্ত্রণে থাকে। শূন্য মাধ্যাকর্ষণে শৌচাগার ব্যবহারের সমস্যাগুলো এড়ানোর জন্য, নতুন টয়লেটটি একটি বিশেষভাবে ডিজাইন করা ভ্যাকুয়াম টয়লেট। এর দুটি অংশ রয়েছে, প্রস্রাব করার জন্য ফানেলযুক্ত একটি নল এবং মলত্যাগের জন্য একটি ছোট উঁচু টয়লেট সিট।

নাসা-র ২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের স্পেস টয়লেট

প্রসঙ্গত, মহাকাশ স্টেশনে দীর্ঘদিন একাধিক মানুষ থাকার ফলে তাদের প্রস্রাবকে পরিশোধিত করে আবার পানীয় জলে পরিণত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রস্রাবে থাকে বেশিরভাগই জল, তাই পৃথিবী থেকে অনেক জল বয়ে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। মহাকাশচারীরা কৌতুক করে বলেন, আজকের কফিই আবার কালকের কফি।

আর এক বিপত্তির ঘটনা বলে এবারের পর্ব শেষ করি। ১৯৬১ সালে আমেরিকার অ্যালান শেপার্ড মহাকাশে যান। তাঁর এই যাত্রা সংক্ষিপ্ত হওয়ার কথা ছিল, তাই প্রস্রাব করার কোনও পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু শেপার্ড রকেটে ওঠার পর উৎক্ষেপণ তিন ঘণ্টারও বেশি সময় বিলম্বিত হয়। অবশেষে, তিনি প্রস্রাব করার জন্য রকেট থেকে বের হতে পারবেন কি না জানতে চান। আরও সময় নষ্ট না করে মিশন কন্ট্রোল নির্দেশ দেয়, শেপার্ড তার স্পেসস্যুটের ভেতরেই নিরাপদে প্রস্রাব করতে পারেন। শেষমেষ প্রথম আমেরিকান মহাকাশচারী ভেজা অন্তর্বাস পরেই গেলেন মহাকাশে।

…পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য পর্ব…

পর্ব ৩২: চেনাসোনা, জানাসোনা

পর্ব ৩১: ঠান্ডা আনন্দের ইতিহাস

পর্ব ৩০: সংস্কৃতির গুরুচণ্ডালী

পর্ব ২৯: চুরি হোক শিল্পসম্মত

পর্ব ২৮: মশা নিয়ে মশকরা

পর্ব ২৭: কাণ্ডজ্ঞানগম্যি

পর্ব ২৬: আয় ঘুম যায় ঘুম

পর্ব ২৫: ধুলোবালির পর বালিধুলো

পর্ব ২৪: তালাচাবির বন্ধুত্ব

পর্ব ২৩: বেঁধে থাকা বেঁধে রাখা

পর্ব ২২: এই দুনিয়া ঘোরে বনবন বনবন

পর্ব ২১: শরীরের ক্যানভাসে আঁকা শিল্প

পর্ব ২০: বিজ্ঞান পরিবেশনা ও মিউজিয়ামের অজানা গল্প

পর্ব ১৯: মরণের পরেও, এই পৃথিবীর জন্য আপনি রইলেন

পর্ব ১৮: মন রে কৃষিকাজ জানো না

পর্ব ১৭: গুপ্তধন কিম্বা লুপ্তধন

পর্ব ১৬: ছবির শরীর, শরীরের ছবি

পর্ব ১৫: মাপ করুন, সৃষ্টিশীলভাবে!

পর্ব ১৪: মাপের ভুলভাল, পাগলের মাপজোখ

পর্ব ১৩: শব্দ কল্প দ্রুম

পর্ব ১২: হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?

পর্ব ১১: ‘শব্দ’ শুধুই আওয়াজ নয়

পর্ব ১০: শিল্পকলায় বিষ্ঠা মানে ব‍্যঙ্গ, বিদ্রুপ অথবা প্রতিবাদ

পর্ব ৯: বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাইব্রিড আর্ট প্রশ্ন করতে শেখায়– শিল্প কী?

পর্ব ৮: মগজে না ঢুকলে শিল্পও আবর্জনা

পর্ব ৭: ছবির অসুখ-বিসুখ, ছবির ডাক্তার

পর্ব ৬: বিসর্জনের মতোই একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রং ও রূপ

পর্ব ৫: জীবন আসলে ক্যালাইডোস্কোপ, সামান্য ঘোরালেই বদলে যায় একঘেয়ে নকশা

পর্ব ৪: কুকুরেরই জাত ভাই, অথচ শিয়াল সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?

পর্ব ৩: অন্ধকারে অল্প আলোর মায়া, ফুরয় না কোনওদিন!

পর্ব ২: বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের চিরকালের নায়ক হয়ে আছেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন

পর্ব ১: বস্তু নাকি ভাবনা, শিল্পকলায় কী খোঁজেন?