Robbar

নিশ্ছিদ্র বন্ধুত্ব

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 1, 2026 3:54 pm
  • Updated:July 1, 2026 3:57 pm  

লাল-কালোর ‘রোজোনেরি’ মিলান। নীলে নীল ইতালি। সেই জুটি নেই! নেই মিলানের সেইসব দিন। নেই সেই ক্যালসিও-সম্মোহন। ২০২৬ বিশ্বকাপে নেই ইতালি। আছে বলতে পুরনো সমস্ত লেগ্যাসি, ভিডিও ক্লিপ, এখনও সান সিরোয় গ্যালারিতে কোথাও না কোথাও থেকে যাওয়া সেই উচ্ছ্বাস

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

৯.

২০১৫-র ‘ডেইলি মেল’-এ জেমি ক্যারাঘার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন এক তারকা ফুটবলারের। মন্দ্রিত হচ্ছে কণ্ঠস্বর– ‘He was a short shining guy, but so strong. He could jump do high. The way he played in the field was an example for everybody. He was not a big speaker, no, no, no. The way he played, the way he trained was an example…’ কঠস্বর একটু থামল। তারপর: ‘… For me he is the role model.’

স্বরটি মালদিনির। পাওলো সিজার মালদিনির। বলছেন, বন্ধু, সহযোদ্ধা ফ্রাঙ্কিনো, ওরফে ফ্রাঙ্কো বারেসির কথা। বারেসি-মালদিনি। এসি মিলান, ইতালি। বিতর্কিত কাতানেচিও-র কাটাছেঁড়ার পরেও পরিচ্ছন্ন নিখুঁত রক্ষণের দু’- দু’টি থাম। ইতালীয় সকার-স্থাপত্য। ২০২৬-এও ৪৮ দেশের ভিতর ইতালির বিশ্বকাপে না-থাকার অবিশ্বাস্যতার মাঝে অধিকতর অবিশ্বাস্য মনে হয় বারেসি-মালদিনির অস্তিত্ব, সাফল্যের গ্রাফ, কেরিয়ার, ফুটবল।

ফ্রাঙ্কো বারেসি-পাওলো সিজার মালদিনি: ডিফেন্সের মতোই অটুট বন্ধুত্ব

ফ্রাঙ্কো বারেসি। ১৯৬০-এর ৮ মে ইতালির ট্রাভাগলিয়াটোয় জন্ম। বছর দশেকের জন্মদিন পেরনোর পর কোনও এক মুহূর্তে টেলিভিশনে ফুটবল দেখা শুরু ফ্রাঙ্কোর। প্র্যাকটিস, প্র্যাকটিস, প্র্যাকটিস। ইন্টার মিলানের যুব দল থেকে প্রত্যাখ্যাত ফ্রাঙ্কোর এসি মিলান-ইতিহাস শুরু ’৭৭-’৭৮-এ। পরের দু’বছর টিমের রেলিগেশন। ’৮২-তে ফিরে এসে বছর বাইশেই ক্যাপ্টেন!

সুইপার বারেসি, একরোখা, ছিপছিপে শরীরের ছ’নম্বর জার্সির যুবকের গ্রাফ তখন আকাশ দেখতে পাচ্ছে। পাশাপাশি বড় হচ্ছে প্রায় আট বছরের ছোট আরেক কিশোর। ’৬৮-র ২৬ জুন মিলানে জন্ম পাওলোর। পিতা সিজার মালদিনির লেগ্যাসি। স্ট্রিট ফুটবল খেলা বছর দশেকের পাওলো ’৭৮-এ এসি মিলান যুব দলের প্র্যাকটিসে গেলেন। রাইট মিডফিল্ডার পাওলো থেকে গেলেন দলে, তবে বাকি সময়টা বদলে আরও নিচে নেমে শুরু করলেন রাইট ফুলব্যাকে। ’৮৪-’৮৫-তে অভিষেক, পরের বছর থেকে সিনিয়র দলে সুস্পষ্ট পায়ের ছাপ। ফ্রাঙ্কোর সঙ্গে সেন্ট্রাল ব্যাক জুটি হয়ে, কখনও বাঁ-দিকে নিয়মিত থাকছেন তিন নম্বর জার্সির সুদর্শন তরুণ। জুটির বাকি ইতিহাসের দুর্দম্য লেগ্যাসির সেই তো শুরু।

মালদিনি-বারেসি: মিলান রক্ষণের দুই স্তম্ভ

সিলভিও বার্লুসকোনির এসি মিলান। কোচ আরিগো সাক্কির সেই মিলানকে বলা হচ্ছিল– ‘দ্য ইমমর্টালস’। সাক্কি বা পরবর্তী কাপেলোর মিলান জুড়ে ডিফেন্সে বারেসি-মালদিনির সঙ্গে আলেকজান্দ্রো কোস্তাকুর্তা, মাউরো তাসোত্তি। চমকপ্রদ মাঝমাঠে আনসেলোত্তি, দোনাদিনি, আলবার্তিনি। সামনে গুলিট-বাস্তেন-রাইকার্ডের তিন টিউলিপ। ’৮৭-’৮৮-র সিরি-আ চ্যাম্পিয়ন মিলান গোটা লিগে খেল মাত্র ১৪ গোল। পরের বছর এল সুপারকোপা ইতালিয়ানা, ইউরোপিয়ান কাপ। পরের বছর আবার ইউরোপিয়ান কাপ, পাশাপাশি লিগের শ্রেষ্ঠ ফুটবলারের ট্রফি ফ্রাঙ্কোর হাতে। ’৮৯-এ বাস্তেন পেলেন ব্যালন ডি’অর, রানার আপ ফ্রাঙ্কো। হাসতে হাসতে দ্বিতীয় হওয়ার গৌরব ভাগ করে নিলেন অনুজ সতীর্থর সঙ্গে।

১৯৯১। আরিগো সাক্কির পর ফ্যাবিও ক্যাপেলো। সাক্কির তিনজন ব্যাক নিয়ে খেলার স্ট্র্যাটেজিতে বারেসি সেই তৃতীয়, সেই সুইপার, যাকে আমেরিকান স্টাইলে বলা হচ্ছিল– ‘কোস্ট-টু-কোস্ট’, ইতালীয় ধ্রুপদী ‘লিবেরো’ ঘরানায় ফ্রি-মুভিং ফ্রাঙ্কো বাকি দুই ব্যাকের পেছন থেকে চোরা গতিতে যখন উঠতেন, সান সিরোর সাউথ কার্ভ গ্যালারি উচ্ছ্বাসে লাফিয়ে উঠত। কোচ ক্যাপেলো এসে চার ব্যাকে খেলাতে শুরু করলেন। ফ্রাঙ্কো হয়ে গেলেন স্রেফ একজন সেন্টার ব্যাক। অবশ্য টিম মিলানের গ্রাফ একইরকম। সে-বছরই ৫৮টি ম্যাচ পরপর অপরাজিত। পরপর তিন বছর সিরি-আ চ্যাম্পিয়ন, পাশাপাশি ’৯৩-’৯৪-এ ফ্রাঙ্কো-পাওলোর জুটির ডিফেন্স লিগে খেল মাত্র ১৫টি গোল। ’৯২, ’৯৩, ’৯৪– পরপর তিনবার সুপারকাপ ইতালিয়ানা। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে ’৯২-’৯৩-এ মার্সেই এবং ’৯৪-’৯৫-এ আয়াক্সের কাছে আশ্চর্য হারে রানার্স হলেও মাঝের বছর অর্থাৎ, ’৯৩-’৯৪-এ ক্রুয়েফের ড্রিম বার্সাকে ফ্রাঙ্কো-বিহীন ফাইনালে ক্যাপেলোর মিলান হারাল ৪-০ ব্যবধানে। ২০টি সিজন খেলে টানা ১৫টি বছর মিলান-ক্যাপ্টেন থেকে ’৯৬-’৯৭ মরশুমের মাঝে যেদিন সরে যাচ্ছেন বছর ৩৭-এর ফ্রাঙ্কো, আর্মব্যান্ড দিয়ে যাচ্ছেন পাওলোকে, বলছেন– “the transition was completely painless, as I left the captain’s armband in very good hands”। মনে পড়ছে ’৯৭-এর ২৮ অক্টোবর। ফ্রাঙ্কিনো বারেসির সেলিব্রেশন ম্যাচ। গোটা সান সিরো অঝোরে কেঁদেছিল।

এসি মিলানের জার্সিতে শেষ ম্যাচে ফ্র্যাঙ্কো বারেসি

ফ্রাঙ্কো বারেসির কেরিয়ারে ২০টি সিজনে মিলানের হয়ে ৭১৯ ম্যাচ। মোট ছ’বার সিরি-আ, তিনবার করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং ইউরোপিয়ান সুপার কাপ, দু’বার ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ এবং চারবার ইতালিয়ান সুপার কাপ। তিনকাঠি আটকানোর পাশাপাশি নিজে করেছেন ৩১টি গোল!

পাওলো মালদিনির কেরিয়ার?

সতীর্থ ফ্রাঙ্কো অবসরের বছর আর্মব্যান্ড দিয়ে যান পাওলোকে। পাওলোর ক্যাপ্টেনশিপে ’৯৮-’৯৯-এর লিগ জিতল কোচ আলবার্তো জুকারোনের মিলান। নিজের ২৪ বছরের কেরিয়ারে, ৯০২ ম্যাচে মোট সাতবার সিরি-আ, পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, পাঁচবার ইতালিয়ান সুপার কাপ, দু’বার ইন্টার-কন্টিনেন্টাল কাপ। গোল করেছেন ৩৩টি। ’৮৯-এ পেয়েছিলেন প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, পঞ্চম জয় ১৮ বছর পর ২০০৭-এ। সমসাময়িক বাকি আর কেউ ফুটবল ছুঁচ্ছেন না। অথচ ৪০ ছুঁয়েও অবসরের মুহূর্তে অলৌকিক ফিটনেস পাওলোর।

২০০৭-এ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পর ট্রফি হাতে উচ্ছ্বাস পাওলো মালদিনির

মিলানের ইতিহাস ছেড়ে ইতালি। লেখক ও ক্রীড়া-ঐতিহাসিক জন ফুট তাঁর সেমিনাল গ্রন্থ ‘ক্যালসিও: আ হিস্ট্রি অফ ইতালিয়ান ফুটবল’-এ লিখছেন– ‘Writing about football sometimes felt like descending into hell.’

সোনালি সেই সময়ের কথা এমন সময়ে লিখতে হচ্ছে, যখন ইতালীয় ফুটবলে আলোহীনতা। বিশ্বাস করা যায়, ফ্যাঙ্কো-পাওলোর ইতালির আর কেউ বিশ্বমঞ্চে নিখুঁত ট্যাকলে পা ছুড়ে দিতে পারছে না? মিলানের ইতিহাসের পর জুটির দেশ কাঁপানোর দিনগুলো। ’৮২-র বিশ্বজয়ী পাওলো রোসির ইতালির টিমে থাকলেও সুযোগ পাননি ফ্রাঙ্কো। ’৮৬-তে দলেও নেই। ’৯০ ইতালিয়ার হোমগ্রাউন্ড। শেষমেশ। কোচ অ্যাজেগ্লিও ভিসিনির ইতালি টানা ৫১৮ মিনিট অপরাজিত। দুর্ভেদ্য রক্ষণে টানা পাঁচ ম্যাচ ক্লিনশিট। সেমি-তে এগিয়ে গিয়েও বিলার্দোর আর্জেন্টিনা ১-১ করল। ক্লদিও ক্যানিজিয়ার হেডার ঢুকে গেল জালে। পেনাল্টি শুট আউটে হার! তাও, গোটা টুর্নামেন্টে নিজেদের তিনকাঠিতে মাত্র দু’বার বল ঢোকার রেকর্ড টিমের।

’৯৪-এ কোচ সেই সাক্কি। বাজ্জিও-র ইতালির রক্ষণকে প্রায় একা সামলাচ্ছেন পাওলো। লিগেই নরওয়ে ম্যাচের পর হাঁটুর চোটে ছিটকে গেলেন সতীর্থ ফ্রাঙ্কো। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে তাসোত্তি এবং ফাইনালে কোস্তাকুর্তা সাসপেনশনের জন্য নেই। তবে, ফিরলেন ফ্রাঙ্কো। দল ফাইনালে, নিজে খেলবেন না! দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই। নির্ধারিত সময়ে তিনকাঠিতে বল ঢোকাতে পারল না টিম রোমারিও। অবশ্য সবকিছুতেই অন্ধকার ফেলা একটা পেনাল্টি শুট আউট থাকে। ’৯০-এর পর আবার ’৯৪-এ সেখানেই হার লাতিন আমেরিকান টিমের কাছে। বাজ্জিও-র সঙ্গে পেনাল্টি মিসে নাম ফ্রাঙ্কোরও। দেশের হয়ে পাশাপাশি খেলা শেষ ম্যাচে চোখে জল ফ্রাঙ্কো-পাওলোর।

১৯৯৪-এর বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর হতাশ রবার্তো বাজ্জিও-ফ্রাঙ্কো বারেসি

দু’জনের একসঙ্গে খেলার পরিসংখ্যানে সেই আশ্চর্য স্ট্যাট-মিলানের হয়ে ’৮৪-’৮৫ থেকে ’৯৬-’৯৭, ১৩টি মরশুম জুড়ে খেলা ৪০০ ম্যাচে ২৩টি করে গড়ে মোট ২৯৯টি গোল খাওয়ার ইতিহাস। দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই, দৌড়, নিখুঁত ট্যাকল, প্রেসিশন, পেনাল্টি বাঁচিয়ে ছুড়ে দেওয়া শরীর। ৬ ফুট ১ ইঞ্চির দীর্ঘদেহী, প্লেবয় লুকের ঝকঝকে পাওলোর পাশে কিছুটা ছিপছিপে, শান্ত, ৫ ফুট ৯ ইঞ্চির ফ্রাঙ্কো। দু’জনের প্রতিই শ্রদ্ধাশীল দু’জন। বারেসি বলছেন, “We read each other’s brain; moved as if we were one person. He could play in every defensive role – extraordinary… Playing with him was a pleasure and an honour.”

রোমারিও-কে আটকাচ্ছেন মালদিনি, সামনে আরেক ‘ওয়াল’ বারেসি

মালদিনির কথায় সেই সময়ের সার্থকতা– ‘We were more in the engine room than than taking the glory…’ কোথাও না কোথাও সম্মানে, ব্যক্তিগত পুরস্কারে, খ্যাতিতে কিছুটা হলেও নিজের এগিয়ে যাওয়ার সুখের বাইরেও এক চাপা গ্লানি তাঁর চোখেমুখে। বারবার বলেছেন, ‘He (Baresi) really deserved to receive the short of award that I have received.’

এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে ফুটবল ইতিহাসের সম্ভবত শ্রেষ্ঠ ডিফেন্সিভ জুটির জার্নি।

বারেসি-মালদিনি: ইতালির শ্রেষ্ঠ ডিফেন্সিভ জুটি

লাল-কালোর ‘রোজোনেরি’ মিলান। নীলে নীল ইতালি। সেই জুটি নেই! নেই মিলানের সেইসব দিন। নেই সেই ক্যালসিও-সম্মোহন। ২০২৬ বিশ্বকাপে নেই ইতালি। আছে বলতে পুরনো সমস্ত লেগ্যাসি, ভিডিও ক্লিপ, এখনও সান সিরোয় গ্যালারিতে কোথাও না কোথাও থেকে যাওয়া সেই উচ্ছ্বাস, এবং ‘দিস ফুটবল টাইমস’ পত্রিকায় লেখক-সাংবাদিক গ্যারি থেকারের সেই কথাগুলো:
‘In having Franco Baresi and Paolo Maldini not only present in the same back line but also have them paired at the heart of the defence, and then have one mentor the other so that the flame was kept ablaze beyond their own mortal contribution, is surely unfair to any and all opposition. The beauty and the best were truly an outstanding duo and set the standards so many other defenders have sought to emulate. So far, no-one has done so. They just might never …’

………….. পড়ুন জুটি কলামের অন্যান্য পর্ব ……………

পর্ব ৮: মিলানের তিন টিউলিপ

পর্ব ৭: দুই জোহানের যৌথ ম্যাজিক

পর্ব ৬: পেলে-গ্যারিঞ্চা, অপরাজেয় ইতিহাস

পর্ব ৫: চিরশত্রু থেকে শ্রেষ্ঠ জুটি

পর্ব ৪: বিতর্কিত, বর্ণময় আটাত্তরের আর্জেন্টিনার জোড়া ফলা

পর্ব ৩: পায়ে লেখা যৌথ-কবিতা

পর্ব ২: অমরত্বের জাল কাঁপানো এক চিরকালের বন্ধুত্ব

পর্ব ১: পাশে থাকা, পাসে থাকা