fusion of sanskrit origin words in bengali language | Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

বাংলা ভাষার সহজ-পাঠ

জটিল সংস্কৃত-প্রধান শব্দে লেখা দীর্ঘ বাংলা বাক্য বঙ্কিমের অপছন্দ। উদাহরণ দিয়েছেন: ‘দিন দিন পল্লীগ্রাম সকলের যেরূপ শোচনীয় অবস্থা দাঁড়াইতেছে, তাহাতে অল্পকাল মধ্যে পল্লীগ্রাম যে জলহীন হইবে, এবং তদ্ধেতুক যে কৃষিকার্যের বিশেষ ব্যাঘাত ঘটিবে, এরূপ অনুমান করিয়াও অনেক দেশহিতৈষী ব্যক্তি তাহার প্রতিবিধানে যত্ন করেন না, দেখিয়া আমরা বড় দুঃখিত হইয়াছি।’ এই বাক্যটিকে কতগুলি সহজ-সরল বাক্যে ভেঙে দেওয়ার তিনি পক্ষপাতী।

Published by: Robbar Digital

Posted:June 16, 2026 9:22 pm | Updated:June 16, 2026 10:17 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

৭.

সংস্কৃত। সে কি চাট্টিখানি ভাষা! পুরাতন ভাষাটির নানা রূপ, অপরূপ মহিমা। বেদের সংস্কৃত, পুরাণের সংস্কৃত, কালিদাসের নাটকের সংস্কৃত– একটা ভাষা বদলাতে বদলাতে নানাভাবে এগিয়েছে। এই ভাষার শব্দ-ভাণ্ডার থেকে শব্দ নিয়েছে কত কম-বয়সের ভাষা! বাংলা, হিন্দি। তাই বলে সংস্কৃতের মধ্যে আটকে থাকতে হবে কেন? বঙ্কিমচন্দ্রের কথাই ভাবুন না কেন! বন্দেমাতরম্‌ গানটি তো সংস্কৃত আর বাংলা ভাষার মিশেলে লেখা। তাই বলে কি তিনি সংস্কৃতে আটকে ছিলেন? মোটেই না।

অনেকেই হয়তো খেয়াল করেন না বঙ্কিমচন্দ্র একটি ‘প্রাইমার’ লিখেছিলেন। প্রাইমারটির নাম ‘সহজ রচনা শিক্ষা’। বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ কিংবা রবীন্দ্রনাথের ‘সহজ পাঠ’ যত জনপ্রিয়, বঙ্কিমের ‘সহজ রচনা শিক্ষা’ তত জনপ্রিয় নয়। বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষার কথা উঠলেই সকলে বঙ্কিমি উপন্যাসের কথা তোলেন। বঙ্কিমি উপন্যাসের সহজ বাংলা রূপান্তর করার উদ্যোগও অনেকে নিয়েছিলেন। যেমন ‘নো ফিয়ার শেক্সপিয়র’ নামের সিরিজ আছে সহজ ইংরেজিতে মহাকবির নাটক পড়ার জন্য– তেমনই আর কী! তবে বঙ্কিম কিন্তু সহজ বাংলা লেখার পক্ষেই ছিলেন।

তাঁর রচনাশিক্ষার বইতে অহেতুক সংস্কৃতপনার ঘোরতর বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। তাঁর লেখা থেকে কিছু উদ্ধার করা যাক।

তাঁর মতে, ‘প্রাঞ্জলতা’ লেখার খুব বড় গুণ। বাংলা ভাষার প্রাঞ্জলতা বজায় রাখার জন্য কতগুলি নিয়ম মানলেই হয়। কী সেই নিয়মাবলি? একটি বস্তুর অনেক নাম থাকতে পারে। যেমন আগুনের সমার্থক শব্দ: অগ্নি, হুতাশন অথবা হুতভুক্, অনল, বৈশ্বানর, বায়ুসখা ইত্যাদি। এই শব্দগুলির মধ্যে কোনটি বাংলায় ব্যবহার করা উচিত? যা সবাই জানে অর্থাৎ আগুন বা অগ্নি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় আছে ‘চির প্রণম্য অগ্নি’। জনপ্রিয় সিনেমা ‘বসন্ত বিলাপ’-এর গান ‘লেগেছে লেগেছে আগুন’। অন্য সংস্কৃত প্রতিশব্দ যদি কেউ সহসা প্রয়োগ করেন তাহলে বিপত্তি অনিবার্য। বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, ‘যদি বলি, “হুতভুক্ সাহায্যে বাষ্পীয় যন্ত্র সঞ্চালিত হয়,” তবে অধিকাংশ বাঙ্গালী আমার কথা বুঝিবে না। যদি বলি যে, “অগ্নির সাহায্যে বাষ্পীয় যন্ত্র চলে” সকলেই বুঝিবে।’ খাঁটি কথা সন্দেহ নেই।

সন্ধি-সমাস নিয়ে সংস্কৃত মত-পথের বিরোধী ছিলেন বঙ্কিম।

বঙ্কিম উবাচ, ‘অনর্থক কতকগুলা সংস্কৃত শব্দ লইয়া সন্ধি সমাসের আড়ম্বর করিও না– অনেকে বুঝিতে পারে না। যদি বলি, “মীনক্ষোভাকুল কুবলয়” তোমরা কেহ কি সহজে বুঝিবে? আর যদি বলি, “মাছের তাড়নে যে পদ্ম কাঁপিতেছে,” তবে কে না বুঝিবে?’ বঙ্কিমের এই কথার সমর্থন স্বামী বিবেকানন্দের লেখাতেও পাওয়া যাবে। গুরুভাইকে লেখা চিঠিতে জানিয়েছিলেন সংস্কৃতের মতো লম্বা লম্বা সন্ধি-সমাস বাংলায় চলবে না। স্বামী বিবেকানন্দের সেই চিঠি উদ্বোধন পত্রিকায় ‘বাঙ্গালা ভাষা’ নামে প্রকাশ পেয়েছিল। বঙ্কিম তখন প্রয়াত। বিবেকানন্দ বাংলায় সংস্কৃতের গদাইলস্করি চাল ত্যাগ করতে বলেছিলেন। দশপাতা লম্বা লম্বা বিশেষণের পর রাজা আসীৎ, এমন লেখার চাল বিবেকানন্দের দু’-চোখের বিষ।

জটিল সংস্কৃত-প্রধান শব্দে লেখা দীর্ঘ বাংলা বাক্য বঙ্কিমের অপছন্দ। উদাহরণ দিয়েছেন: ‘দিন দিন পল্লীগ্রাম সকলের যেরূপ শোচনীয় অবস্থা দাঁড়াইতেছে, তাহাতে অল্পকাল মধ্যে পল্লীগ্রাম যে জলহীন হইবে, এবং তদ্ধেতুক যে কৃষিকার্যের বিশেষ ব্যাঘাত ঘটিবে, এরূপ অনুমান করিয়াও অনেক দেশহিতৈষী ব্যক্তি তাহার প্রতিবিধানে যত্ন করেন না, দেখিয়া আমরা বড় দুঃখিত হইয়াছি।’ এই বাক্যটিকে কতগুলি সহজ-সরল বাক্যে ভেঙে দেওয়ার তিনি পক্ষপাতী।

এই যে সহজ বাংলা শেখানোর বই লিখেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, তার আগে তিনি পাঠক হিসেবে প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসের গুণ গেয়েছিলেন। তাঁর মতে, প্যারীচাঁদ বাংলা ভাষার খুবই উপকার করেছিলেন।

বঙ্কিমের অভিমত: ‘এইরূপ সংস্কৃতপ্রিয়তা এবং সংস্কৃতানুকারিতা হেতু বাঙ্গালা সাহিত্য অত্যন্ত নীরস, শ্রীহীন, দুর্ব্বল, এবং বাঙ্গালা সমাজে অপরিচিত হইয়া রহিল। টেকচাঁদ ঠাকুর প্রথমে এই বিষবৃক্ষের মূলে কুঠারাঘাত করিলেন। তিনি ইংরেজিতে সুশিক্ষিত। ইংরেজিতে প্রচলিত ভাষার মহিমা দেখিয়াছিলেন এবং বুঝিয়াছিলেন। তিনি ভাবিলেন, বাঙ্গালার প্রচলিত ভাষাতেই বা কেন গদ্যগ্রন্থ রচিত হইবে না? যে ভাষায় সকলে কথোপকথন করে, তিনি সেই ভাষায় “আলালের ঘরের দুলাল” প্রণয়ন করিলেন। সেই দিন হইতে বাঙ্গালা ভাষার শ্রীবৃদ্ধি। সেই দিন হইতে শুষ্ক তরুর মূলে জীবনবারি নিষিক্ত হইল।’

প্রশ্ন হল তাহলে বাঙালি কী করবে?

বঙ্কিমের অভিমত মেনে নিলে, অহেতুক সংস্কৃত-সজ্জা বাংলা ভাষাকে নীরস, শ্রীহীন, দুর্বল করে তুলবে। তাই বাড়ির বেড়ালের নাম, ‘মার্জার শিরোমণি’ রাখবেন না। ‘মিউপুসি’ বলে ডাকলে সে খুশি হবে। বাঙালি বাড়ির বেড়াল সংস্কৃত টোলে পড়ে না, পাড়ার বাংলা মিডিয়াম স্কুলেই পড়ে। বঙ্কিম লিখেছিলেন, ‘সাধুভাষা, এবং অপর ভাষা, দুই প্রকার ভাষাতেই বাঙ্গালা গ্রন্থ প্রণয়ন হইতে লাগিল, ইহা দেখিয়া সংস্কৃতব্যবসায়ীরা জ্বালাতন হইয়া উঠিলেন; অপর ভাষা, তাঁহাদিগের বড় ঘৃণ্য। মদ্য, মুরগী, এবং টেকচাঁদী বাঙ্গালা এককালে প্রচলিত হইয়া ভট্টাচার্য্যগোষ্ঠীকে আকুল করিয়া তুলিল।’

সেই ভট্টাচার্য্যগোষ্ঠী, সংস্কৃতব্যবসায়ীদের আবার আগমন হয়েছে। তাঁরা সংস্কৃত শব্দকে বাংলা ভাষার শরীরে স্বাভাবিকভাবে মিশিয়ে দিতে নারাজ। তৎসম শব্দের প্রতি তাঁদের বিশেষ টান। বিশেষ করে রাষ্ট্র-বিষয়ে, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তাঁরা সংস্কৃতকে বিশেষভাবে লালন-পালন করতে চান। ‘অগ্নি-নির্বাপক’ তো যথেষ্ট সংস্কৃত। পারলে তাঁরা ‘পাবক-নির্বাপক’ লিখে কাব্য করবেন। আরবি-ফারসি-ইংরেজি নানা সূত্র থেকে প্রয়োজনে শব্দ ধার করার কথা বঙ্কিম বলেছিলেন। তাতে কী? বঙ্কিম লিখেছেন ‘বলিবার কথাগুলি পরিস্ফুট করিয়া বলিতে হইবে– যতটুকু বলিবার আছে সবটুকু বলিবে– তজ্জন্য ইংরেজি, ফার্সি, আর্‌বি, সংস্কৃত, গ্রাম্য, বন্য যে ভাষার শব্দ প্রয়োজন তাহা গ্রহণ করিবে…।’ এঁরা বাংলায় আরবি, ফারসি, ইংরেজি ফেলে কেবল সংস্কৃত মেশাতে চান। সেই নির্জলা সংস্কৃতের নেশায় ছুটন্ত দো-আঁশলা পাড়ার বেচারি কুকুরের রাস্তার ধারের থাকার জায়গার নাম দেওয়া যেতে পারে ‘পল্লীস্থ মার্গ-সারমেয় নিবাস’। পল্লীস্থ মার্গ-সারমেয় নিবাস অবৈধ। সেগুলি ধ্বংস করার বিধানগ্রন্থের নাম দেওয়া যেতে পারে ‘পল্লীস্থ মার্গ-সারমেয় নিবাস ধ্বংস-সাধনকামী সংহিতা’।

ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির অবশ্য মহাপ্রস্থানের পথে পথকুকুরটিকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। স্বর্গের বিনিময়ে সেই সরমাপুত্রকে ত্যাগ করেননি। বৌদ্ধ করুণার এ মহাভারতীয় রূপ। যুধিষ্ঠির অবশ্য এই করুণা ধর্মে ক্রমে উপনীত হয়েছিলেন। বারণাবতে কৌরবদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য মা আর ভাইদের নিয়ে গোপন সুড়ঙ্গপথে পলায়ন করলেন। পুড়ে মারা গেলেন নিষাদ জননী আর তাঁর পাঁচ সন্তান। পাণ্ডবরা কুন্তী-সহ মারা গিয়েছেন ভেবে কিছুদিন তাঁদের খোঁজ বন্ধ রইল। কুরুক্ষেত্র-পূর্ব ও কুরুক্ষেত্রকালীন রাজনীতি করুণাশূন্য। শেষযাত্রায় পথের কুকুরটিকে সঙ্গে নিতে অসুবিধে নেই। চলুক। এই একাকী পথযাত্রায় চলুক।

পড়ুন সিরিয়ালসি নেবেন না-র অন্যান্য লেখা …

৬. অন্তরের অমৃত

৫. আমরা যেন থাকি ভাতে-ভাতে

৪. গলাগলি

৩. বাবু কলকাতার উবু মানুষ

২. স্মৃতি-বিস্মৃতির কথা

১. এই বঙ্গে যা যা চাই!

Bankim Chandra Chattopadhyay Barnaparichoy bengali language Ishwar Chandra Vidyasagar Rabindranath Tagore Sahaj Path Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar sanskrit language

Share this article on