The simplicity of language of ramakrishna kathamrita | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্তরের অমৃত

ফরাসি বিপ্লবের পর তার ঘরের জানলা দিয়ে আলো বেশি ঢুকছে, না কম ঢুকছে নিত্যানন্দ ঠিক ঠাওর করতে পারছিল না। তবে আলোর যে রদবদল হয়েছে, এটা সে বেশ বুঝতে পারছিল। ঠাকুরের বইটি আজকাল বাজারে নানা মাপের পাওয়া যায়। একটা তো বেশ মোটা-সোটা। সেটাকে অখণ্ড না কী বলে! ঠাকুরের আবার খণ্ড-অখণ্ড! হাসিখুশি মানুষটিকে খণ্ডে-অখণ্ডে ধরা যায় না।

শেষ আপডেট: জুন ৫, ২০২৬, ১৭:৩১   
Facebook WhatsApp Messenger

৬.

মাঝেমাঝে নিত্যানন্দ কথামৃত পড়ে। নিত্যানন্দের দেশে সেবার ফরাসি বিপ্লব শেষ হয়েছে। নিত্যানন্দ রোগা মানুষ, একা মানুষ, তবে বোকা মানুষ নয়। কথামৃত পড়তে বসল। কথামৃত পড়ার নিত্যানন্দের নিজস্ব পদ্ধতি আছে। সেভাবেই চিরকাল কথামৃত পড়ে। ফরাসি বিপ্লবের পরেও তেমনভাবেই পড়তে বসেছিল। সে জানে কাল অতিশয় ফিচেল। অতীতের মধ্যে বর্তমান, আবার ভবিষ্যতের মধ্যে অতীত মিশে থাকে। এর ফলে কখনও কালের সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে যায় না। সেজন্যই ইশকুলে তার ইংরেজি শেখা হল না। তার কালবোধের সঙ্গে ইংরেজি গ্রামারের টেনসের মিলমিশ হয়নি। তার ইংরেজি বুঝ-বুম্ভুল ইংরেজি। সেজন্যই ঠাকুর আর কথামৃতের প্রতি তার টান খুব বেশি। ঠাকুরও ইংরেজি তেমন জানতেন না। মাঝেমাঝে ইংরেজি জানে যারা, তাদের নিয়ে মশকরা করতেন। নরেন আর গিরিশকে লড়িয়ে দিতেন। ইংরেজিতে তর্ক-ঝগড়া করতে বলতেন। আর ঠাকুর হাসতে-হাসতে তাদের কথার কুস্তি দেখতেন। কী ফিচলেমি কী ফিচলেমি! ঠাকুরের কথা নিয়ে অনেকে পত্র-পত্রিকায় টুকটাক কথা-সংকলন প্রকাশ করেছিলেন। তার মধ্যে মাস্টারমশাইয়েরটাই সবচেয়ে হিট। মাস্টারমশাই আবার ইংরেজি জানা মানুষ, শাস্ত্রে পাণ্ডিত্যের অবধি নেই। ঠাকুরের কথার আগে বিভিন্ন শাস্ত্র থেকে কোটেশন, ব্যাখ্যা এইসব দিয়েছেন। ঠাকুরের শরীরে সেগুলো সব সোনার মুকুট। নিত্যানন্দ মাঝেমাঝে মুখ ফসকে মুকুটকে ‘মুটুক’ বলে ফেলে। যাই হোক। সেইসব সোনার মুটুক-টুটুক বাদ দিয়ে যেখানে ঠাকুরের কথা আছে সে অংশ পড়তেই তার খুব আমোদ হয়।

ফরাসি বিপ্লবের পর তার ঘরের জানলা দিয়ে আলো বেশি ঢুকছে, না কম ঢুকছে নিত্যানন্দ ঠিক ঠাওর করতে পারছিল না। তবে আলোর যে রদবদল হয়েছে, এটা সে বেশ বুঝতে পারছিল। ঠাকুরের বইটি আজকাল বাজারে নানা মাপের পাওয়া যায়। একটা তো বেশ মোটা-সোটা। সেটাকে অখণ্ড না কী বলে! ঠাকুরের আবার খণ্ড-অখণ্ড! হাসিখুশি মানুষটিকে খণ্ডে-অখণ্ডে ধরা যায় না। তবে নিত্যানন্দকে তার এক পাড়াতুতো আত্মীয় একবার অখণ্ড কিনে দিয়েছিল। সেটা বড্ড মোটা-সোটা, রোগা নিত্যানন্দের পড়তে অসুবিধে হয়। পুরনো একটি কথামৃত পারিবারিক সূত্রে সে পেয়েছে। তত মোটা নয়। খণ্ড না অখণ্ড সে বুঝতেও চায় না। তার পড়তে খুব মিষ্টি লাগে। তাই সে পড়ে, পড়ে আর পড়ে। ফরাসি বিপ্লবের পর সে মোটা অখণ্ডকে ছেড়ে সেই পুরনোকে খুলে পাতা ওল্টাতে শুরু করল। তার নীতি অনুযায়ী সে মাস্টারমশাইয়ের শিশি-বোতলের মতো শক্ত অংশগুলি পড়বে না। সে পড়বে ঠাকুরের কথা। সে কথার গুণ হল তা গল্পে ভরা। ঠাকুরের লেখায় গল্প আর উপদেশ মিলেমিশে থাকে। গল্পগুলি পড়ে পড়ে তার মনে ঢুকে গিয়েছে। পাতা খুললেই নিজের মতো করে পুরোটা মনে পড়ে। তখন ঠাকুরের কথা তার কথা হয়ে যায়। সে নিজেই নিজেকে গল্প বলতে থাকে। ঠাকুরের গল্পের সঙ্গে তার বোধ-বুদ্ধি মিশে গল্পটা খানিক নিজের মতো এদিক-ওদিক হয়ে যায়। তবে মূল ভাবটি ফল্গুর মতো তলায় তলায় বইতে থাকে। আজও তাই হল। 

বাইরের আলোটি মনোহর। অন্যরকম। কম না বেশি তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে নিত্যানন্দের মনে হল, আলোটি তার জন্য মনোহর। কারণ বিপ্লবের পর যখন কলহ-কোলাহল আর নিহিত শীৎকারমূলক চিৎকারে আবহ পরিপূর্ণ হয়, তখন চাইলে ভিতরে ভিতরে নিভৃতি খুঁজে নেওয়া যায়। নিত্যানন্দের স্কুলের বাংলার শিক্ষকেরা সকলেই ভালো ছিলেন। তাই নিত্যানন্দ ইংরেজি না-জানলেও বাংলা একটু-একটু জানে। নানারকম বাংলা লিখতে-বলতেও একটু-একটু পারে। আজও এই নিভৃত ঘরে তাকে বাংলায় পেয়ে বসেছে। মনটি খুলেছে। তাই বাইরের আলোটি বেশি না কম সে ভাবনা তার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল। মনের আলোটি বাইরের আলোয় মিশে গেল। তাই আলোটি মনোহর। ঠাকুরের বইটি খুলে সে পড়তে বসেছে। ঠাকুরের গল্প আর উপদেশ তার মনের মধ্যে সেঁধিয়ে গিয়ে তার হয়ে গেল। কথামৃত মুখের থেকে নিঃসৃত অমৃত, তা পান করলে তা ভেতরে বইতে থাকে। যার ভেতরে গেল তার আধার অনুযায়ী নানা বদল হয়। স্কুলের রসায়নের ক্লাসে পরিবর্তনের নানা প্রকারের কথা বলা হত। তার ভেতরে কী বদল হল কে জানে! 

zoom
ফ্রানজ ডোরাকের আঁকা রামকৃষ্ণ

ঠাকুরের গল্পে সোনার দোকান। সেখানে সোনা কিনতে খদ্দের এসছে। সোনার ব্যবসায়ী আর কর্মচারীদের মধ্যে ঈশ্বরের নামে কথা চলছে। ‘কেশব, কেশব’(?) ‘গোপাল, গোপাল’(।) ‘হরি, হরি’ (?) ‘হর, হর’(।) 

ভেতরের কথা নামগানের থেকে ভিন্ন। খদ্দেরদের দেখে মালিককে কর্মচারী জিজ্ঞাসা করলে ‘এরা কারা? কে সব? কে সব?’ মালিক জবাব দিলেন, ‘গো পাল, গো পাল। গোরুর পাল। কিচ্ছু বোঝে না। বোকা। বোকা। বোকার বেহদ্দ।’ তখন কর্মচারী ফের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হরি, হরণ করি? ঠকাই। চুরি করি। দুর্নীতি করি।’ মালিক ফের বললে, ‘কর কর। হর হর। হরণ কর।’ নিত্যানন্দের মনে হয় ঠাকুরের বুদ্ধিটি প্রখর। পর্যবেক্ষণ শক্তি প্রবল। ব্যবহারিক জ্ঞানের অবধি নেই। জগৎ চেনাচ্ছেন। মালিক ভাবলে সে চালাক। চুরি করে গোরুর পালের মতো বোকা খদ্দেরদের ঠকাই। কে কাকে ঠকাবে? ঠাকুর বলেছেন ‘ভক্ত হবি কিন্তু বোকা হবি না।’ বলেছেন, ‘দংশন করতে নিষেধ করছি। তা বলে ফোঁস করবি না!’ ঠাকুরের গল্পের কথার ভাষা নিত্যানন্দের নিজের মতো হয়ে যায় খানিক। তবে ভাবটি একই মনে ঘাই মারছে। নিত্যানন্দ জানে কেউ বোকা নয়। সবাই সব কিছু জানে। বোঝে। একসম ঠিক ফোঁস করবে। ঠাকুর বলতেন ‘শাকের কড়ি মাছে মেশাতে নেই।’ শাকের কড়ি লোকে মাছে মেশায় কেন? দু’টি কারণে মেশায়। মানুষটি খারাপ নয়। তবে হিসেব-কঠোর হতে পারেনি। একের টাকা দিয়ে অন্য জিনিস কিনেছে, ভেবেছে পরে সামলে দেবে। কখনও সামলাতে পারে, কখনও পারে না। আরেক রকম মানুষ আছে। মাছ কেনে না, শাকও কেনে না। নিজের ভোগে অন্যের টাকা লাগায়। তাদের ধরলে বলে, ‘এই যা মাছ কিনে ফেলেছি গো, শাক কিনতে ভুলেছি।’ মাছের বাজারে খোঁজ নিলে দেখা যায় মাছও কেনেনি। শাক-মাছের টাকা নিজের ভোগে লাগালে মানুষ মানবে কেন? এই সংসারে সকলেই বাজার সরকার। বাজারটি করে কিছু মেলে। মজুরি। তাতে দিন চলে। শ্রমের টাকায় দিন গুজরান। মাছের টাকা শাকে লাগানো একরকম। তাও বাজারটি করেছে। যে বাজারটি করেনি, টাকা নিজে খেয়েছে তার কথা লোকে শেষ অবধি শুনবে না। সে যেই হোক। যতই উপরে হরি হরি বলুক, সে যে আসলে হরিভক্ত নয় হরণকারী, তা প্রকাশ পাবেই। কেউ গোরুর মতো বোকা অবলা নয়। ফোঁসটি করবেই করবে। 

নিত্যানন্দ দেখলে বইটি সম্মুখে খোলা। কথামৃতের পাতায় ঠাকুর হাসিমুখে বসে আছেন। বাইরের আলোটি মনোহর। সে কমও নয়, বেশিও নয়। সে আলোয় নিত্যানন্দের মনের আলো মিশেছে বলে মনোহর। নিত্যানন্দ আপন মনে বলল, ‘থাক এসব থাক। আজ ঠাকুরের অন্য গল্প পড়ি। নুনের পুতুলের গল্প। সাগরের গল্প। সাগরের জল মাপতে গিয়ে নুনের পুতুল জলে মিশে গেল।’

নিত্যানন্দ মাথাটি নত করলে, বইয়ের পাতায় রাখলে, তারপর ঘুমিয়ে পড়লে। নিদ্রা! সুষুপ্তি! খোলা জানলার মনোহর আলোটি নিত্যানন্দের মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেল না। স্থির হয়ে রইল।

পড়ুন সিরিয়ালসি নেবেন না-র অন্যান্য লেখা …

৫. আমরা যেন থাকি ভাতে-ভাতে

৪. গলাগলি

৩. বাবু কলকাতার উবু মানুষ

২. স্মৃতি-বিস্মৃতির কথা

১. এই বঙ্গে যা যা চাই!

Ramakrishna ramakrishna kathamrita Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar sriramakrishna

Share this article on