


হিটলারের নিধনযজ্ঞে গ্যাস চেম্বারে নিয়ে যাওয়ার আগে একদল ছোট ছেলেমেয়ে রবীন্দ্রনাথের এই নাটক অভিনয় করেছিল। আশ্রয় নিয়েছিল এই নাটকের জগতে। জানলা বন্ধ করে দেয়নি। যে বাস্তব তাদের মারে, সেই জানলা বন্ধ করে দিয়ে যে মনের বাস্তব তাদের রাখে, সেই জানলা খুলে দিয়েছিল তারা। খুলে দিয়েছিল অমলের দিকে। রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাটকের দিকে। তারা জানত তারা খুন হবে, তাদের খুন করা হবে এই পৃথিবীতে। এই স্বৈরাচার, এই খুনি ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার, শুদ্ধতার নামে তাদের খুন করবে। সেই নিহত হওয়ার আগে তারা মনের জানলা খুলে দিয়েছিল অমলের দিকে।
৯.
ডাকঘরের অমলকে মনে আছে? রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাটকের অমল। তার জীবন তো খুব বড় ছিল না। ছোট জীবন। ফুরিয়ে যে যাবে, সে খবর তার কাছে এসেছিল। তার অসুখের কথা সে জানত। তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল সে-কথা। বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। আরোপ করেছিলেন একজন চিকিৎসক। তিনি অবশ্য রাজ কবিরাজ নন। অন্য একজন। অসুখ হয়েছে যে ছেলেটির, সেই ছেলেটিকে তিনি ঘর থেকে বাইরে যেতে নিষেধ করেছিলেন। জানলাগুলো বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। যতটা সম্ভব সাবধানে যেন রাখা হয় ছেলেটিকে, বন্ধ করে, আটকে। এই সব করে যদি আরও খানিক আয়ু দেওয়া যায় তাকে। এই সব করে যদি তার আয়ুরেখা দীর্ঘ করা যায় আরেকটু।

অমল অবশ্য জানলা-দরজা বন্ধ করে রাখেনি। একটি জানলার পাশে বসে থাকার অধিকার সে অর্জন করেছিল। সেই জানলার পাশ দিয়ে নানা লোক যায়। সে কথা বলে। তারা বাইরে নিজেদের পৃথিবীটাকে যেভাবে দেখে, তার থেকে অন্যভাবে অমল তাদের বাইরের পৃথিবীটাকে দেখায়। জানলার বাইরে আছে তারা, অমল আছে জানলার ভিতরে। তবু অমল তাদের থেকে অন্যরকম, ভিতর থেকে সে-কেবল চোখ দিয়ে বাইরেকে দেখে না, মন দিয়েও দেখে। এই মন বাহিরকে অন্যতর করে তোলে। বাহিরের মধ্যে না-দেখা এক ভিতর খুঁজে পায় অমল। দইওয়ালাকে যখন সে তার গ্রামের বর্ণনা দেয়, তখন দইওয়ালার কাছে তার চেনা গ্রাম মনোময় হয়ে ওঠে। সে বলে এমন করে যে দই বেচতে হয়, দই বেচে যে এমন সুখ পাওয়া যায়, তা অজানা ছিল। অমলের কাছে আসে এক ফকির। ফকির তার ছদ্মবেশ। ফকির আর সে মনে মনে বানিয়ে তোলে এক আশ্চর্য দেশ। যেখানে পাহাড়, পাখি, নদী, ঝরনা, সমুদ্র মিশে আছে। ঠিক যেভাবে ছেলেবেলায় ছোটরা তাদের আঁকা ছবিতে একসঙ্গে অনেক কিছু দূরত্বহীন ভাবে সম্ভব করে তোলে এ-ও তেমন।

অমলের এই সাধনা যে মিথ্যে ছিল না, তার প্রমাণ আছে। বাইরে যা হচ্ছে হোক, কিন্তু নিজের চোখ দিয়ে, মনের আলো দিয়ে যে অন্য পৃথিবী তৈরি করা যায়, আর সেই পৃথিবীতে থাকা যায় নিজের মতো করে– তার প্রমাণ বাস্তবে মেলে। হিটলারের নিধনযজ্ঞে গ্যাস চেম্বারে নিয়ে যাওয়ার আগে একদল ছোট ছেলেমেয়ে রবীন্দ্রনাথের এই নাটক অভিনয় করেছিল। আশ্রয় নিয়েছিল এই নাটকের জগতে। জানলা বন্ধ করে দেয়নি। যে বাস্তব তাদের মারে, সেই জানলা বন্ধ করে দিয়ে যে মনের বাস্তব তাদের রাখে, সেই জানলা খুলে দিয়েছিল তারা। খুলে দিয়েছিল অমলের দিকে। রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাটকের দিকে। তারা জানত তারা খুন হবে, তাদের খুন করা হবে এই পৃথিবীতে। এই স্বৈরাচার, এই খুনি ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার, শুদ্ধতার নামে তাদের খুন করবে। সেই নিহত হওয়ার আগে তারা মনের জানলা খুলে দিয়েছিল অমলের দিকে।

রবীন্দ্রনাথের নাটকে অমল যখন মারা যাবে, তার আগে এসেছিল রাজ কবিরাজ। সেই রাজ কবিরাজের পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা। সেই পদ্ধতিতে জানলা খুলে দিতে হয়। খুলে দিতে হয় জীবন-মৃত্যুর সীমার বাইরে যে বড় সময় সেই বড় সময়ের দিকে। আকাশের তারার আলো এসে পড়ে সেই ঘরে। কবিরাজ বলে অবিশ্বাসীদের চুপ করতে। কারা অবিশ্বাসী? যারা কেবল একদিকের জানলা খুলে যা বাহ্যত ঘটছে, তাই দেখতে পাচ্ছে– তারা অবিশ্বাসী। তারা ভাবছে সময়ের এইটুকু মাত্রা। ঠিক যেমন কুয়োর ব্যাঙ কুয়োকেই সমুদ্র ভাবে, ঠিক তেমনই ছোট সময়কেই তারা সময় বলে জানে। তাদের সেই জানা মানুষের জানা নয়। রবীন্দ্রনাথ একথা কেবল অমলের নাটকে বলেননি। রবীন্দ্রনাথ এ-কথা বারবার বলেছেন। বলেছেন কাছের জিনিসের যে অনিবার্য চাহিদা তা পশুর। এইমাত্র চাই। এখনই চাই। এখনই চাই খাদ্যের সাধ। মানুষের মধ্যে যে পশু আছে, সে কেবল এখনই চায় না, সবটুকু এখনই চায়। না লাগলেও চায়। পেট ভরা থাকলেও চায়। এখানে তারা পশুর থেকেও পশু! আর যাদের মনের অভিব্যক্তি হয়েছে, যারা সময়ের ছোট কুয়ো থেকে সময়ের অন্তহীন সাগরে অবগাহন করতে পারে, তারা জানে মানুষ সুদূরকে চায়। পায় না, অনুসন্ধান করে। সেই অনুসন্ধানে সে একটার পর একটা জানলা খুলতে থাকে, মনের জানলা। তার যাত্রা শুরু হয়।

আচ্ছা, এটা কি পালিয়ে যাওয়া? একদিকের জানলার বাইরে আগুন লেগেছে বলে সেই আগুন নেভানোর চেষ্টা না করে, অন্যদিকের জানলা খুলে পালিয়ে যাওয়া? কী করে বলা যাবে তা! রবি ঠাকুরের নাটকের নন্দিনী-বিশু– এরা তো পালিয়ে যায়নি। যক্ষপুরীর বাস্তবের বিপরীতে তাদের মনের জানলা খুলে দিয়েছিল বলেই সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়েছিল। মরে যাবে জেনেও, মরতে চেয়েছিল!

অমলের চোখে ঘুম, আকাশের তারার আলো ঘরে এসে পড়ে। সেই আলোয় ঘুমন্ত অমল, তাকে ঘিরে কতজন! সুধা আসে। বলে অমলকে সে ভোলেনি। এই না ভোলাই তো বড় সময়ের কথা। ছোট সময়ের কুয়ো ডিঙিয়ে যাওয়ার কথা। ডিঙোতে ডিঙোতে যাত্রা। সন্দীপ হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসে। সেই দাঙ্গার মধ্যে গিয়ে পড়ল তার বন্ধু নিখিলেশ। সে সন্দীপের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল, সন্দীপদের আটকাতে চেয়েছিল। পারেনি, তবে না-পেরেও দাঁড়াতে পেরেছিল দাঙ্গার মাঝখানে। তার মনের জানলায় যে দেশ, সেই দেশ কাছের চাহিদা আর পাওনার দেশ নয়। সেই দেশ দরিদ্রকে স্বদেশির নামে বঞ্চিত করার দেশ নয়। সেই দেশের জানলা খুলেছিল বলেই না পালিয়ে দাঙ্গার মধ্যে সে একা। ছোট সময়ের চিৎকারকে ডিঙিয়ে যেতে পেরেছিল বলেই সন্দীপের রাজনীতির বিপরীতে মানুষের পাশে সে।

সত্যজিৎ তাঁর ‘ঘরে-বাইরে’ ছবিতে আমাদের জানিয়েছিলেন, নিখিলেশ নেই। নিখিলেশ যে দাঙ্গা থামাতে গিয়ে প্রাণ হারাল, সেই নিখিলেশ প্রাণ না হারাতেই পারত। দরকার ছিল না। নিজের ঘরের ভিতরে থাকতেই পারত। থাকেনি, জানলা যেদিকে খুলেছিল সেদিকে অন্য এক দেশ, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দেশ।
সে দেশ নেই?
চুপ কর, অবিশ্বাসী কথা বল না!
………………. রোববার.ইন-এ পড়ুন সিরিয়াসলি নেবেন না-র অন্যান্য পর্ব ………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved