
পলাশির যুদ্ধের বিজয় উৎসব না কি পালিত হয়েছিল শোভাবাজার রাজবাড়িতে। সেই উপলক্ষে তৎকালীন বঙ্গের বিখ্যাত কৃষ্ণবিগ্রহগুলি আনা হয়েছিল। খড়দহের শ্যামসুন্দর, বল্লভপুরের রাধাবল্লভ, সাইবানার নন্দদুলাল, বিষ্ণুপুরের মদনমোহন এবং অগ্রদ্বীপের গোপীনাথজিকে। উৎসব সমাপ্তিতে অন্যান্য বিগ্রহগুলি যথাযোগ্য মর্যাদায় ফিরিয়ে দিয়ে এলেও অগ্রদ্বীপের গোপীনাথকে শোভাবাজারেই রেখে দেওয়া হয়। রাজা নবকৃষ্ণ নাকি স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন, গোপীনাথ আর অগ্রদ্বীপে ফিরে যেতে চান না!
২৪.
পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া থানার ছোট্ট জনপদ গঙ্গা-তীরবর্তী অগ্রদ্বীপ। অগ্রদ্বীপ এবং তার অধীশ্বর গোপীনাথ কৃষ্ণবিগ্রহ নিয়ে বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে বহু বর্ণময় ঘটনাবলি রয়েছে।
প্রথমত, অগ্রদ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান বদল ঘটেছে বারবার। ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে ভান ডেন ব্রুকের ম্যাপে দেখা যায় গঙ্গার পশ্চিম তীরে গ্যাসিয়া আর্থাৎ গাজিপুর আর পূর্ব তীরে হগদিয়া অর্থাৎ অগ্রদ্বীপ। ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে জেমসের রেনেলের ম্যাপেও অগ্রদ্বীপের অবস্থান একই জায়গায়। ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে হেনরি মার্টিন অগ্রদ্বীপকে গঙ্গার বাম তীরে দেখলেও ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে জেমস লঙ দেখেছেন গঙ্গার ডান তীরে।
দ্বিতীয়ত, টলেমির মানচিত্রে চিহ্নিত অগনগরকে ম্যাক্রিন্ডল, সেন্ট মার্টিন উইলফোর্ড প্রমুখ ইউরোপীয় গবেষকেরা অগ্রদ্বীপ বা আগনগর রূপে দেখেছেন। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে রচিত গঙ্গারামের মহারাষ্ট্র পুরাণে অগ্রদ্বীপ– আগদীয়া রূপে উল্লেখিত।
তৃতীয়ত, অবস্থান বদলের সঙ্গে সঙ্গে অগ্রদ্বীপের জেলা বদলও হয়েছে। একসময় অগ্রদ্বীপ নদীয়া জেলার শুধুমাত্র একটি গ্রাম নয়; থানার মর্যাদা পেয়েছিল। উনিশ শতকের শেষের দিকে অগ্রদ্বীপ পুনরায় বর্ধমান জেলাভুক্ত হয়।

প্রাচীনকাল থেকেই অগ্রদ্বীপ সর্বভারতীয় তীর্থক্ষেত্রর মর্যাদা পেয়েছিল। এখানে বারুণী স্নানের জন্য অসংখ্য পুণ্যার্থীর আগমন ঘটত। বহু দূরদূরান্ত থেকে সন্তানহীনা রমণীরা আসতেন, মা গঙ্গার কাছে সন্তানলাভের জন্য মানত করতে। কিংবা মানত পূরণের জন্য গঙ্গায় সন্তান বিসর্জন দিতে। কাটোয়ার মিশনারি উইলিয়ম কেরি দ্য জুনিয়ার বাবা ড. উইলিয়ম কেরিকে ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের ৪ এপ্রিল লিখিত চিঠিতে জানিয়েছেন, গঙ্গায় সন্তান বিসর্জনের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা।
চৈতন্য সমকালীন যুগে কেতুগ্রাম থানার কুলাই গ্রামের বল্লভ ঘোষের ৯ ছেলের অন্যতম গোবিন্দ ঘোষের ভজনস্থল হয়ে ওঠে অগ্রদ্বীপ। মহাপ্রভু নিত্যানন্দের অন্তরঙ্গ পার্ষদ হিসাবে তিন ভাই বাসু-গোবিন্দ-মাধবের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। পুরীতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সময় এই তিন ভাইয়ের মধুর কণ্ঠে কীর্তনগান শুনে ও শ্রীখোলের দক্ষ বাজনার তালে বিভোর হয়ে তাঁরা নৃত্য করতেন। পরন্তু বাসু ঘোষের মতো গোবিন্দ ছিলেন চৈতন্য সমকালীন বৈষ্ণব পদকর্তা। তাঁর পদে চৈতন্য-জায়া লক্ষ্মীপ্রিয়ার কথা উঠে এসেছে।
বাসু ঘোষ প্রথমে কুলাই পরে তমলুকে শ্রীপাট স্থাপন করেন। মাধবের সাধনক্ষেত্র হয়ে ওঠে ইন্দ্রাণী-দাঁইহাট। আর গোবিন্দ ঘোষের শ্রীপাট অগ্রদ্বীপ। কথিত আছে, সঞ্চয় অপরাধের জন্য গোবিন্দ মহাপ্রভু কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়ে অগ্রদ্বীপে বসত করার অনুমতি পেয়েছিলেন। মহাপ্রভু-নিত্যানন্দের আদেশে তথায় গোপীনাথ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে সাধন ভজনে মগ্ন হন গোবিন্দ। দেহান্ত হলে মন্দির সন্নিকটে তাঁর নশ্বর দেহটি সমাধিস্থ করে পারলৌকিক ক্রিয়াটি সম্পাদিত হয় তাঁর আরাধ্য গোপীনাথের মধ্যস্থতায়। এমন ঘটনা বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতিতে বিরল বলা যেতে পারে।

চৈত্র একাদশী তিথিতে গোবিন্দ ঘোষের শ্রাদ্ধবাসরে গোপীনাথ বিগ্রহটিকে কাছা পরিয়ে ও কুশাঙ্গরীয় ধারণ করিয়ে তাঁর মাধ্যমে শ্রাদ্ধক্রিয়া নিষ্পন্ন হয়। ব্রজের গোপী কলাবতী, চৌষট্টি মহান্তের অন্যতম গোবিন্দ ঘোষের জন্মতিথি জানা না গেলেও, তাঁর তিরোভাব তিথি চৈত্র কৃষ্ণ একাদশীতে। এ এক আশ্চর্য সমাপতন। বারুণী উৎসব ধীরে ধীরে রুপান্তরিত হয় ঘোষঠাকুরের তিরোভাব উৎসব ও বর্ণাঢ্য মেলায়।
গোবিন্দের আরাধ্য গোপীনাথ; সোয়া দু’ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট কষ্টিপাথরের তৈরি অপূর্ব কৃষ্ণবিগ্রহ। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে খ্রিস্টীয় দশম-একাদশ শতাব্দী থেকে বিষ্ণু ও কৃষ্ণের সম্মিলিত রূপ ‘গোপীনাথ’ উড়িষ্যায় ক্রমশ জনপ্রিয় হতে থাকে। প্রাক-চৈতন্যযুগে কৃষ্ণের এই রূপের মূর্তি বাংলাদেশের অভিজাত সম্প্রদায়দের অন্যতম আরাধ্য বিগ্রহতে পরিণত হয়েছিল। যেমন শ্রীখণ্ডের নরহরি সরকারদের গৃহদেবতা ছিলেন গোপীনাথ। আদিতে গোপীনাথ একক কৃষ্ণবিগ্রহ হলেও রাধার সংযোজন পরবর্তীকালের ঘটনা।
অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ শুধু ভক্তের ভগবানই নন; নিরুপম ভাস্কর্য শিল্পের দৃষ্টান্ত স্বরূপ হবার কারণে যুগে যুগে অনেকেই গোপীনাথের প্রতি প্রলুব্ধ হয়েছিলেন। ইন্দ্রাণীর কবি মহাভারত রচয়িতা কাশীরাম দাসের অনুজ গদাধর দাস ‘জগৎমঙ্গল’ বা জগন্নাথমঙ্গলকাব্যে আত্মপরিচয় প্রসঙ্গে লিখেছেন,
অগ্রদ্বীপ গোপীনাথ রাই পদতলে
আমার নিবাস সেই চরণ-কমলে।।
অগ্রদ্বীপের গোপীনাথের সঙ্গে বাংলার তিনটি বড় জমিদার বংশের যোগ রয়েছে– পাটুলি, কৃষ্ণনগর এবং কলকাতার শোভাবাজার। বাঁশবেড়িয়া-পাটুলির রাজকাহিনি থেকে জানা যায়, প্রাক-চৈতন্যযুগে অগ্রদ্বীপের শাসক ছিলেন দত্তবড়টিয়া (সালার মুর্শিদাবাদ) গ্রামের উত্তর রাঢ়ীয় কায়স্থকুলের বিষ্ণু দত্ত। এই বংশের দ্বারকানাথের পৌত্র সহস্রাক্ষ এক আদর্শ জমিদার হিসাবে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। তাঁর অধীনে ছিল অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ।

গোপীনাথের প্রভাবে সহস্রাক্ষ অগ্রদ্বীপে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কুলদেবতা কৃষ্ণদেব। ইনিও গোপীনাথ সদৃশ বংশীধারী শ্রীকৃষ্ণ। সহস্রাক্ষের মৃত্যুর পর অগ্রদ্বীপকে গঙ্গা গ্রাস করলে, তাঁর পুত্র উদয় পাটুলিতে রাজ্যপাট স্থাপন করেন।
দেওয়ান কার্তিকেয় রায়ের লেখা ‘ক্ষিতীশবংশাবলীচরিত’ থেকে জানা যায়, রাজা মানসিংহ অগ্রদ্বীপে গোপীনাথ দর্শন করে প্রভূত ভূসম্পত্তি প্রদান করেছিলেন। গোবিন্দ ঘোষের প্রয়াণের পর গোপীনাথের অধিকার নিয়ে তাঁর বংশধরদের মধ্যে শুরু হয় তীব্র প্রতিযোগিতা।পূর্ববঙ্গস্থিত বংশধরেরা একসময় জোর করে গোপীনাথ হরণ করে নিয়ে যান।
পাটুলির তৎকালীন রাজা সৈন্যসামন্ত নিয়ে গিয়ে পূর্ববঙ্গ থেকে গোপীনাথ ছিনিয়ে নিয়ে আসেন। তবে অগ্রদ্বীপে গোপীনাথকে না রেখে পাটুলির মন্দিরে কৃষ্ণদেবের পাশে রেখে পুজোর ব্যবস্থা করেন। শুধুমাত্র চৈত্রমাসের বারুণী উৎসবে গোপীনাথ যেতেন অগ্রদ্বীপে।
নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-র আমলে অগ্রদ্বীপের মেলায় একবার ভয়ংকর দাঙ্গা বাঁধে। কয়েকজন লোক মারাও যায়। প্রচুর লোক আহত হয়। ক্রুদ্ধ নবাব এর কারণ জানতে তলব করেন বর্ধমান, নদিয়া, পাটুলির জমিদারদের। উত্তেজিত ও বিরক্ত নবাব জিজ্ঞাসা করেন: অগ্রদ্বীপ কার অধীনে? বর্ধমান ও পাটুলির উকিলদ্বয় মৌন থাকেন। কিন্তু কৃষ্ণনগরের চতুর উকিল উপস্থিত বুদ্ধির সঙ্গে সবিনয়ে জানান, অগ্রদ্বীপ কৃষ্ণনগরের রাজার শাসনাধীন গ্রাম। মেলায় যা জনসংখ্যা হয়েছিল, তাঁর প্রভু অধিকতর সতর্ক থাকায় সেই তুলনায় প্রাণহানি কম হয়েছিল ।

বাজি জিতলেন কৃষ্ণনগরের উকিল। গোপীনাথ এবার থেকে কৃষ্ণনগরের রাজা রঘুরামের সম্পত্তি হয়ে উঠলেন। রঘুর পুত্র রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় গোপীনাথের জন্য এক অপূর্ব মন্দির নির্মাণ করেন আঠেরো শতকের প্রথমার্ধে। সেই মন্দিরের কথা আছে কবি বিজয়রাম সেনের তীর্থমঙ্গলকাব্যে। ভূ কৈলাশের রাজা জয়নারায়ণ ঘোষালের বাবা কৃষ্ণচন্দ্র ১১৭১ বঙ্গাব্দে ত্রিস্থলী করে গঙ্গানদীতে ফেরার পথে অগ্রদ্বীপে নেমে সেই অপূর্ব মন্দির দেখেছিলেন:
অগ্রদ্বীপে আসি নৌকা হৈল উপস্থিত।
সেই স্থানে গোপীনাথ ঠাকুরের ঘর।
অপূর্ব নির্মাণ বাটী দেখিতে সুন্দর।।
মন্দিরটির সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি মেলে ১৮১৫ সালে প্রকাশিত খ্রিস্টান মিশনারি ওয়ার্ড সাহেবের লেখা ‘দি হিন্দু’ গ্রন্থে। মূল মন্দির ছাড়াও আরও পাঁচটি কক্ষ ছিল। যেমন ভোগঘর, বাসনপত্র রাখার ঘর ও ভাণ্ডারঘর। মন্দির সংলগ্ন দু’টি বৃহৎ কক্ষ ছিল দূরের যাত্রীদের থাকার জন্য। ওয়ার্ড সাহেব লিখেছিলেন, ‘At Ugra-deepa the temple of Gopinatha has different houses attached to it; One for cooking another for utensils used in worship; another is a store house for the offerings and two others are open rooms for the accommodation of visitors and devotees’। (পৃ. ১২৩)

কৃষ্ণচন্দ্র নির্মিত এই মন্দিরের দু’টি চিত্রের সন্ধানও পেয়েছি। প্রথম ছবিটি আঁকেন মুর্শিদাবাদ ঘরানার বিস্মৃত বাঙালি চিত্রকর সীতারাম। ছবিটি আঁকা হয়েছিল ১৮১৪-১৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে গঙ্গার ধার ঘেঁষে মন্দিরগুচ্ছের বিপজ্জনক অবস্থান। প্রথমেই নজরে পড়ে মন্দিরের প্রবেশতোরণ। তারপর সুবৃহৎ একচালা মন্দির। সম্ভবত এটিই গোপীনাথের মূল মন্দির। গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবনচন্দ্র বা কাঁচরাপাড়ার কৃষ্ণরাইয়ের মন্দিরের মতো বৃহৎ ও চাকচিক্যময়। পাশেই রয়েছে একতালা দালানবাটি। এটিই মনে হয় ওয়ার্ডসাহেব উল্লেখিত যাত্রীনিবাস। লাগোয়া দ্বিতল দালানটি নাটমন্দির।
সীতারামের সমসাময়িক ব্রিটিশ চিত্রকর ডয়লি (D’Oylys) সাহেব প্রবল বন্যায় বিদ্ধস্ত গোপীনাথ মন্দিরের ছবি এঁকেছিলেন ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে। ছবিটির পরিচিতি প্রসঙ্গে লিখেছিলেন: ‘Aghadeep was then in the Burdwan district on the west bank of the river with large fair’। (আগস্ট, ১৮২০)
রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, গোপীনাথের মন্দির থেকে বাৎসরিক ২০ হাজার টাকা আয় করতেন। এখান থেকে জানা যায়, গোপীনাথ নিয়ে তৎকালীন জমিদারদের মধ্যে কেন এত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। সেটা যতখানি না ভক্তির বিষয় তার থেকেও বড় ছিল আর্থিক বা মানসম্মানের। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পড়তি সময়ে গোপীনাথ হরণ করেন কলকাতার উঠতি রাজা নবকৃষ্ণদেব।

পূর্বোক্ত তীর্থমঙ্গলকাব্য থেকে জানা গেছে, জয়নারায়ণ ঘোষালের বাবা অগ্রদ্বীপের মন্দির দেখলেও গোপীনাথ দর্শন করতে না পেরে হতাশ হয়েছিলেন। কেননা–
রাজা নবকৃষ্ণের বাড়ী আছেন গোপীনাথ।
দর্শন না প্যায়া যাত্রী মাথে মারে ঘাত।।
বিশিষ্ট ঐতিহাসিক নগেন্দ্রনাথ বসুর মতে রাজা নবকৃষ্ণ তাঁর মাতৃশ্রাদ্ধে অথবা গৃহদেবতা গোবিন্দজি প্রতিষ্ঠার উপলক্ষে অগ্রদ্বীপের গোপীনাথকে একরকম জোর করে হরণ করে নিয়ে আসেন কলকাতার শোভাবাজারে ১১৭৫ বঙ্গাব্দে। এর ঠিক দু’ বছর পর মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র মামলায় জিতে গোপীনাথ বিগ্রহ ফেরত পান।
অন্য আরেকটি মতে, পলাশির যুদ্ধের বিজয় উৎসব না কি পালিত হয়েছিল শোভাবাজার রাজবাড়িতে। সেই উপলক্ষে তৎকালীন বঙ্গের বিখ্যাত কৃষ্ণবিগ্রহগুলি আনা হয়েছিল। খড়দহের শ্যামসুন্দর, বল্লভপুরের রাধাবল্লভ, সাইবানার নন্দদুলাল, বিষ্ণুপুরের মদনমোহন এবং অগ্রদ্বীপের গোপীনাথজিকে। উৎসব সমাপ্তিতে অন্যান্য বিগ্রহগুলি যথাযোগ্য মর্যাদায় ফিরিয়ে দিয়ে এলেও অগ্রদ্বীপের গোপীনাথকে শোভাবাজারেই রেখে দেওয়া হয়। রাজা নবকৃষ্ণ নাকি স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন, গোপীনাথ আর অগ্রদ্বীপে ফিরে যেতে চান না!

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র, নবকৃষ্ণের কাছে একবার তিন লাখ টাকা ধার করেছিলেন। নবকৃষ্ণ জানালেন, উক্ত টাকা তাঁকে আর শোধ করতে হবে না। বিনিময়ে গোপীনাথ শোভাবাজারেই থাকবেন। বলাবাহুল্য রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়ে লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে এ নিয়ে মামলা দায়ের করেন। সে মামলার রায় হল রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে গোপীনাথ ফেরত দিতে হবে।
নবকৃষ্ণ এবার মোক্ষম চাল দিলেন। অতি গোপনে একই রকমের দেখতে আর একটি গোপীনাথমূর্তি বানিয়ে নিয়ে আসল-নকল একাকার করে দিলেন। ঘোষণা করলেন– যেটি অগ্রদ্বীপের সেটি আপনারা নিয়ে যান। শোভাবাজারের তরফ থেকে দাবি করা হয় অরিজিনাল গোপীনাথই তাঁদের বাড়িতে রয়েছে। ২০১২ সালের ৩ মে টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে শোভাবাজারের রাজবাড়ির অলোককৃষ্ণ দেব বলেছিলেন– ‘There is no record of which idol was taken back, we assume Nabakrishna was clever enough to have retained the original.’

অগ্রদ্বীপের বারুণীমেলায় লক্ষাধিক জনসমাগম হত। কাটোয়ায় ১৮০৪ সালে ব্যাপটিস্ট মিশনারি স্টেশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কাটোয়া থেকে মিশনারিরা খ্রিস্টান ধর্মের প্রচার করতে আসতেন– জেশুয়া মার্শম্যান, উইলিয়ম ওয়ার্ড সাহেব, জুনিয়র দ্য কেরি, রেভারেন্ড চেম্বারলিন প্রমুখরা। তাঁদের রচনা থেকে জানা যায় অগ্রদ্বীপের মেলা সম্পর্কে বিচিত্র তথ্য। যেমন মেলায় দেহপসারিণীদের ভিড়, নানা বৈষ্ণব গোষ্ঠী-উপগোষ্ঠীদের আখড়া ও বিচিত্র কার্যকলাপ। আরও জানা যায়, বাংলায় সন্ন্যাস বিদ্রোহীদের ঘাঁটি ছিল অগ্রদ্বীপের মেলা।
…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব ………….
পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?
পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন
পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া
পর্ব ২০: মাদারি কা খেল
পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়
পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর
পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা
পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে
পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম
পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন
পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান
পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি
পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল
পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই
পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?
পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব
পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!
পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই
পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা
পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত
পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস
পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর
পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved