Robbar

মিসিং কবিতা, গল্প ও চা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 9, 2026 9:38 pm
  • Updated:August 9, 2026 10:58 pm  

অসমিয়া ভাষায় কবিতা লেখার পাশাপাশি জীবন নরহে মিসিং লোক-কবিতা সংগ্রহ করে অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। ওঁর পরবর্তী উদ্যোগ ছিল মিসিং কথন সাহিত্যকে সারা ভারতে পোঁছে দেওয়ার। তাই মিসিং ভাষায় লেখা বিলাপগীত, ঘুমপাড়ানি ছড়া, প্রেমসংগীত, উৎসবগীত ও পুরোহিত মন্ত্রের একটি সংকলন তৈরি করেন। তারপর সে সংকলন ইংরেজিতে অনুবাদ করেন মৌসুমি কন্দলি।

রামকুমার মুখোপাধ্যায়

৮.

একবার সিকিম-লাগোয়া উত্তরবঙ্গের একটি পাহাড়ি জায়গায় গিয়েছি। দু’-দিন ওখানের মানুষজনের সঙ্গে কাটিয়েছি। ফেরার সময় একজন প্রৌঢ় মানুষ জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কি আমাদের ঝগড়ুটে লোক বলে মনে হল?’ হকচকিয়ে গেলাম! নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, ‘আপনাদের দেখে ঝগড়া করার মানুষ বলে একবারও মনে হয়নি। কিন্তু এ-প্রশ্ন করলেন কেন?’ মানুষটি বললেন, ‘আমাদের জাতির যে নাম, তা আমাদের দেওয়া নয়। দিয়েছে প্রতিবেশীরা, যার অর্থ ‘ঝগড়ুটে লোক’। তা থেকে ও-নামেই পরিচিত হয়ে গিয়েছি। আমাদের ভাষাও তাই।’

পরবর্তী সময়ে ‘মিসিং’ জনজাতির ক্ষেত্রেও এটা ব‍্যাপারটা দেখেছি। প্রতিবেশী ভিন্ন জাতির মানুষজন তাঁদের ‘মিরি’ বলতে শুরু করলেন আর তাঁরা সে নামেই চারপাশে পরিচিত হয়ে গেলেন। ব্রিটিশ ভারতের সহকারি রাজনৈতিক আধিকারিক জে. এফ. নিডহ‍্যাম ১৮৮৬ সালে ‘আউটলাইন গ্রামার অব দ‍্য সায়েং মিরি ল্যাঙ্গুয়েজ’ নামে একটি বই প্রকাশ করলেন। তাতে ‘মিরি’ নামটির ওপর সিলমোহর পড়ে গেল। অথচ ‘মিরি’ শব্দের কোনও অর্থগরিমা নেই। অন‍্যদিকে, মিসিং ভাষায় ‘মি’ মানে মানুষ আর ‘আসি’ মানে জল। নদীর তীরে বসবাসের কারণে জাতিটি এই নাম পায়। নদীর ধারে বসবাসের প্রধান কারণ, জীবিকা চাষবাস ও মাছ ধরা। মেয়েরা নানা গবাদি পশু পালন করে বাড়তি আয়ের জন‍্য। ব্রহ্মপুত্র ও তার শাখা নদীগুলোর কাছাকাছি বসবাসের কারণে চাষের জল, নদীর মাছ আর গবাদি পশুর চরার অনেকখানি জায়গা মেলে । যোরহাটে ও মাজুলি দ্বীপে নদীর ধারে মিসিংদের বাড়িঘর দেখেছি।

মিসিং জনগোষ্ঠীর আদি বাসস্থান ছিল তিব্বতে। তারপর কয়েকশো বছর ধরে একটার পর একটা দল অরুণাচলে এসে নতুন বসতি তৈরি করলেন। এক সময় মানুষজনের সংখ্যা বাড়ে। ফলে বাসস্থান ও জীবিকার সমস্যা তৈরি হয়। তখন মানুষজনের একটা বড় অংশ সেখান থেকে উত্তর অসমের ধেমাজি, ডিব্রুগড় ও তিনসুকিয়া অঞ্চলে চলে আসেন। যে অংশটি অরুণাচলে থেকে গেল, সেটি ‘আদি’ নাম পেল আর অন্যটি মিসিং। অরুণাচল ও অসম মিলে এখন মিসিং জনসংখ্যা আট লাখের মতো।

মিসিং ভাষার অভিধান

এই মিসিংদের নিয়ে প্রথম উপন্যাস লেখা হয় উনিশ শতকের শেষ দশকে। লিখেছিলেন অসমিয়া কথাকার রজনীকান্ত বরদলৈ (১৮৬৭-১৯৪০)। অভিনবই বলতে হয়, কারণ আদিবাসীদের তখন অবস্থান বেশ প্রান্তিক। রজনীকান্তের উপন্যাসটির নাম ছিল ‘মিরি জীয়রী’, যার অর্থ ‘মিরি কন‍্যা’। আর এক অসমিয়া লেখক এবং একই সঙ্গে গীতিকার ও নৃত্যশিল্পী বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা (১৯০৯-১৯৬৯) গত শতকের পাঁচের দশকের প্রথম দিকে ‘মিসিং কনেং’ নামে একটি উপন্যাস লেখেন, যেখানে দুই যুবক-যুবতী কুমুং ও পরশালীর প্রেমের কথা এসেছিল। কিন্তু প্রেমের রোম্যান্টিকতায় সে উপন্যাস শুরু হলেও তাতে শেষ হয়নি। তার কারণ দেশের চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য, শোষণ ও জীবিকার সংকট। স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রনেতারা সাধারণ মানুষের জীবনে সুখ ও শান্তি আনতে পারেননি। বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার এই উপন্যাসে মিসিং সমাজ ও সংস্কৃতির এক অন্তরঙ্গ ছবি ফুটে উঠেছিল।

মিসিংদের জীবনের কথা লেখা হচ্ছে কিন্তু তাদের নিজস্ব কথা শোনা যাচ্ছে না! এর কারণ মিসিং ভাষার লেখাপত্র প্রকাশের প্রতিষ্ঠানের অভাব। মিসিং সাহিত্য মূলত মৌখিক আর লিপিও কোনও নির্দিষ্ট রূপ পায়নি। উনিশ শতকে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারকরা রোমান লিপি ব‍্যবহার করা শুরু করেন, কিন্তু তা সবাই গ্রহণ করেননি। মিসিং জনজাতির অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষ অসমিয়া ভাষা ব্যবহার করতেন, কারণ সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যম ওটিই। তাছাড়া গ্রাম ছেড়ে বাইরে এলে কাজ-কারবারে অসমিয়া ভাষা ব্যবহার করতে হয়। ভারতের অধিকাংশ রাজ্যেই জনজাতির মানুষজন সে-রাজ্যের প্রধান ভাষাটিকে উচ্চশিক্ষা ও কাজের ভাষা হিসেবে ব‍্যবহার করেন। মিসিং ভাষার ক্ষেত্রেও এটাই ঘটে।

কবি জীবন নরহ

অসমিয়া ভাষার একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি হলেন জীবন নরহ (জন্ম ১৯৭০)। বাংলা-সহ নানা ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে এবং কলকাতা-সহ ভারতের নানা জায়গায় কবিতা পাঠের জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন। জীবনের মাতৃভাষা মিসিং কিন্তু কবিতা লেখেন অসমিয়া ভাষায়, কারণ অসমিয়া ভাষাতে পাঠক ও প্রকাশক আছে। তবে জীবন নরহের কবিতা পড়লে বোঝা যায় তাঁর স্বর অন‍্যান‍্য অসমিয়া কবিদের থেকে স্বতন্ত্র। এর কারণ তাঁর কবিতার মধ‍্যে মিসিং সংস্কৃতির নানা উপাদান মিশে থাকে। প্রকৃতি জীবন্ত হয়ে ওঠে। জলের কথা ফিরে ফিরে আসে। নদীর কথাও। উদাহরণ হিসেবে জীবনের ‘মাজরাতি জোনটো নামি আহি’ নামের একটি কবিতা বাংলায় অনুবাদ করে নিচে দিলাম —

মাঝরাতে চাঁদ নেমে এসে
বাঁশের সাঁকোর উপর বসে

আকাশের নীল রং গায়ে মেখে
বৃষ্টি ঝরায় সারা রাত

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে
চাঁদের চুল লম্বা হয়ে যায়
চৌরাসিয়ার বাঁশির সুরের মতো

সে চুলের গন্ধ বসন্ত কাল
নদীর কাছে বয়ে নিয়ে যায়

গোপনে সুগন্ধি কচুরিপানা
গুচ্ছে গুচ্ছে ফুটে ওঠে

বৃষ্টির পর সূর্য দেখা দেয় আকাশে
গান-গাওয়া টিকরা পাখি
নদীর জল পান করে
ফুটে থাকা ফুলের দিকে তাকিয়ে ।

অসমিয়া ভাষায় কবিতা লেখার পাশাপাশি জীবন মিসিং লোক-কবিতা সংগ্রহ করে অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করছিলেন। একটি সংগ্রহ ১৯৯৪ সালে ‘ও আমার ধুনিয়া কোপোও ফুল’ (ও আমার সুন্দর অর্কিড ফুল) নামে প্রকাশ করলেন। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী। এটি ছিল ‘ওই নিতম’ বা প্রেমগীতের সংগ্রহ। এর পরবর্তী সময়ে অসমিয়া অনুবাদে মিসিং গান ও আঞ্চলিক কবিতার একটি সংকলন ‘শুনো মোর ফুলকলি’ নামে প্রকাশ করেন।

প্রচ্ছদ: পূর্ণেন্দু পত্রী

জীবন নরহের পরবর্তী উদ্যোগ ছিল মিসিং কথন সাহিত্যকে সারা ভারতে পোঁছে দেওয়ার। তাই মিসিং ভাষায় লেখা বিলাপগীত, ঘুমপাড়ানি ছড়া, প্রেমসংগীত, উৎসবগীত ও পুরোহিত মন্ত্রের একটি সংকলন তৈরি করেন। তারপর সেই সংকলন ইংরেজিতে অনুবাদ করেন মৌসুমি কন্দলি। কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক মৌসুমি বর্তমানে তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচারাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক। জীবন নরহ সম্পাদিত ও মৌসুমি কন্দলি সম্পাদিত বইটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল মূল ছড়া, গান ও মন্ত্রগুলিকে উচ্চারণ-চিহ্ন সহ অনুবাদের সঙ্গে দেওয়া। পাণ্ডুলিপিটি সাহিত্য অকাদেমির শিলং শহরের ‘সেন্টার ফর ওরাল লিটারেচার’-এর মাধ্যমে কলকাতা দফতরে আসে। তারপর প্রয়োজনীয় সংস্কার করে ২০০৮ সালে সংকলনটি প্রকাশ করা হয়। নাম ‘লিসেন মাই ফ্লাওয়ারবাড।’ মিসিংদের তাঁতে বোনা চাদর, কাপড় ইত্যাদি দেখতে খুবই সুন্দর, সুতোর সূক্ষ্ম কাজ ও রঙের উজ্জ্বলতার কারণে। প্রচ্ছদ শিল্পী বিষ্ণু তামুলী তেমনই একটি তাঁতে বোনা চাদরকে প্রচ্ছদে ব্যবহার করেছিলেন ।

প্রচ্ছদ: বিষ্ণু তামুলী

জীবন নরহের সংকলনটি পড়লে বোঝা যাবে টিবেটো-বার্মান বা ভোট-চীনীয় পরিবারের এই ভাষাটি মনের নানা ভাবকে কত বিচিত্র ভঙ্গিতে তুলে ধরতে পারে! বিশেষ ভাবে মন টানে প্রেমের কবিতা। তার একটি হল–

মাছ ছাড়া পুকুরে
সারসপাখি আসে না
প্রেম ছাড়া কোনো গাঁয়ে
প্রেম খুঁজতে যেও না

কিন্তু কেমন সে প্রেম? প্রেমিকা বলছে–

আমি দড়ি হলে তোমাকে চারদিকে জড়াতাম
লতা হলে তোমার শরীর ধরে উপরে উঠতাম
আর যদি ফুল হতাম
লাল ও নীল রঙের ফুল হয়ে উঠোনে ফুটতাম।

মিসিং ভাষায় ‘ওই-নীতম’ নামে এক রকমের প্রেমের কবিতা আছে, যা অনেকটা জাপানি হাইকুর মতো। নাম ‘ওই-নীতম’ কারণ, মৌখিক সাহিত‍্যধারার এই কবিতায় ‘ওই’ শব্দটি একবার বলতেই হয়। আকারে ছোট হলেও ভাবের দিক থেকে সম্পূর্ণ। যেমন–

যে নদীর তীরে বসে আমি চোখের জল ফেলি
নদী সে জল বয়ে নিয়ে যাবে যেখানে তুমি চান কর।
ও আমার প্রাণের জন
কিছুটা জল হাতের তালুতে তুলে দেখো
আমাকে দেখতে পাবে আঙুলের ফাঁকে।

মৃত্যুর পর মিসিংদের রীতি হল কবর দেওয়া। ফলে প্রেমিক ও প্রেমিকা যখন মারা যাবে, তারা পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরে যাবে। মৃত্যুর তাদের বিচ্ছিন্ন করে দেবে। কিন্তু মিসিং-প্রেম অত সহজে মৃত্যুর কাছে হার মানে না। তাই শুনি–

তোমার কবর ওদিকে হতে পারে
আর আমার এদিকে
দেখো, কবরের ঘাস বাড়তে বাড়তে
আমাদের একদিন ঠিকই জুড়ে দেবে।

প্রেমিকার নানা রকম রূপবর্ণনা ভারতীয় সাহিত‍্যে মেলে। মিসিং কবিতায় সুন্দরী প্রেমিকাকে ছেড়ে দূরে না যাওয়ার অভিনব এক কারণ মেলে। সেটি হলো ছায়ার বিশেষ রং–

তোমার ও-দুই চোখে সত্যিই তুমি অপূর্ব সুন্দরী,
যার ছায়া পর্যন্ত এমন নীল
তাকে ছেড়ে দূরে যাই কেমন করে?

সময়ের অভিঘাত পড়ে চলমান জীবনে আর মৌখিক সাহিত‍্যেও। নতুন ভাবের সঙ্গে উপমা আসে, তরুণ প্রজন্ম নতুন পরিসর খোঁজে। পাখির জায়গা নেয় উড়োজাহাজ, কখনও আবার রকেট। লেখা হয়–

রকেট উড়লে চাঁদ আর কত দূরে থাকবে?
তুমি আমাকে ভালোবাসলে
আমার কাছ থেকে তোমার গাঁ আর কি-বা দূরে?

এই সংকলনটি প্রকাশের বছর দু’-তিন বছরের মাথায় মিসিং ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে একটি আলোচনাসভা ও গল্প ও কবিতা পাঠের আয়োজন করা হয়েছিল যোরহাটের জগন্নাথ বড়ুয়া কলেজের সঙ্গে যৌথভাবে। মিসিং গবেষক দীপককুমার দোলের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন নতুন প্রজন্মের লেখকদের সে সম্মেলনে যুক্ত করতে। যতদূর মনে পড়ে সেই সম্মেলনে সূচক ভাষণটি দিয়েছিলেন অধ্যাপক টাবুরাম টাইড। সাহিত্য অকাদেমি থেকে সেবার সঙ্গে গিয়েছিল আরুণি চক্রবর্তী। যেসব গবেষণাপত্র অনুষ্ঠানে পাঠ করা হয়েছিল আর যেসব গল্প ও কবিতা পাঠ করা হয়েছিল, তার অধিকাংশ সংগ্রহ করে কলকাতা দফতরে এনেছিল।

টাবুরাম টাইড ছিলেন দরিদ্র প্রান্তিক কৃষক পরিবারের সন্তান। ১৯৫০ সালের ১৫ আগস্ট যেশ অসম-তিব্বত ভূমিকম্প হয়, তাতে তাঁদের বাড়িঘর থেকে চাষের জমি পর্যন্ত ভেঙে-ফেটে একাকার হয়ে যায়। ৮.৮ কম্পাঙ্কের সেই ভূমিকম্পে ৪,৮০০ মানুষ মারা যান, নদীর গতিপথ বদলায়, বন‍্যা আসে, পাহাড়ে ধ্বস নামে। টাবুরাম টাইডের বয়স তখন বছর আট-নয়েক। পারিবারিক বিপর্যয়ের মধ্যেও টাবুরাম স্কুলের পড়াশোনা শেষ করেন, কিন্তু অর্থনৈতিক কারণে কলেজে ভর্তি হওয়া এবং পড়াশোনা চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন রামকৃষ্ণ মিশন এগিয়ে আসে এবং নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন আবাসিক কলেজে টাবুরামকে বিনা খরচে পড়াশোনা ও ছাত্রাবাসে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। সেখান থেকে ভালো ফল করে উত্তীর্ণ হওয়ার পর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করেন। পরে গুয়াহাটির কটন কলেজে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক পদে যোগ দেন। অসম সরকারের একটি স্কলারশিপে ইংল্যান্ডের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ে মিসিং ভাষার ধ্বনিবিজ্ঞানের ওপর গবেষণামূলক প্রবন্ধ পেশ করেন। পরবর্তী সময়ে অসমের শিক্ষা দফতরে যোগ দেন এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন।

টাবুরাম টায়েড

টাবুরাম টায়েড ২০১০ সালের মার্চ মাসে প্রকাশ করলেন একটি অসামান্য বই ‘মিসিং গমপির কুমসুং’। ৮৬০ পৃষ্ঠার সেই বইটিতে তিনি ভোট-চীনীয় ভাষার টানি শাখার মিসিং ভাষাটির ধ্বনিতত্ত্ব ও ব‍্যাকরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলেন ইংরেজিতে। মিসিং শব্দগুলি রোমান লিপিতে তুলে ধরলেন। একজন মানুষের এক-জীবনের কাজ হিসেবে ওই একটি বই-ই যথেষ্ট। সে-বছরেই সাহিত্য অকাদেমি তাঁকে ভাষা পুরস্কারে সম্মানিত করেছিল। অনুষ্ঠান হয়েছিল যোরহাটে যেখানে মিশিং জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের বাস।
এর পরবর্তী সময়ে সাহিত্য অকাদেমির আমন্ত্রণে টাবুরাম টায়েড মিসিং লোকগল্পের একটি সংকলন সম্পাদনা ও অনুবাদ করেন। তাতে মিসিং জাতির সৃষ্টিকথা থেকে লিপি হারানোর কাহিনি ইত্যাদি মিনে মোট ৬৪টি গল্প ছিল। টাবুরাম টায়েড একটি তথ্যসমৃদ্ধ ভূমিকায় সেই সব গুণীজনের কথা উল্লেখ করেন, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে মিশিং কথন সাহিত্যকে সংরক্ষণের মাধ্যমে লালন করেছেন। সাহিত্য অকাদেমি থেকে বইটি ১৯১৩ সালে প্রকাশিত হয়।

সংকলন গ্রন্থের প্রচ্ছদ

চটাবুরাম টাইডের জন্ম হয়েছিল অসমের লখিমপুরের অন্তর্গত ঘুনাসুতি আয়েঙ্গিয়া নামের এক প্রত্যন্ত গ্রামে আর ২০১৯ সালে গুয়াহাটিতে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে তাঁর জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে সমাধিস্থ করা হয়। সেই ছবি টাবুরাম টাইডের স্ত্রী বাসন্তী টাইড আমাকে পাঠিয়েছিলেন। পরে সেখানে একটি আবক্ষ মূর্তিও বসানো হয়, সে-ছবিও পাঠিয়েছিলেন। কোনও ছবিই এখন আর ডাউনলোড করা যাচ্ছে না। বাসন্তী টাইডকে ছবিগুলি যে আবার পাঠাতে বলব সেই উপায়ও এখন নেই। ২০২৩ সালের ২৩ নভেম্বর হোয়াটসঅ্যাপে তিনি শেষ একটি বার্তা পাঠান আর তারপর চিরকালের জন্যে চলে যান।

শেষ করার আগে একটি অন্য কথা উল্লেখ করি। অনেকেই হয়তো মিসিং ভাষার বিষয়ে জানেন না বা নামই শোনেননি। কিন্তু এদেশে যাঁরা চা খান, তাঁরা সবাই মিসিং জনগোষ্ঠীর এক প্রাচীন মানুষের কাছে ঋণী। ১৮২৩ সালে রবার্ট ব্রুস অসমের লখিমপুরের কাছে সাদিয়া অঞ্চলে ঘুরতে যান। সেখানে একজন মিসিং চাষির কাছে চা গাছের সন্ধান পান। গাছটির পাতা কলকাতায় এনে পরীক্ষার মাধ্যমে ওটি যে চা গাছ, সে-বিষয়ে নিশ্চিত হন। এই হিসেবে ২০২২ সাল ছিল ভারতীয় চা আবিষ্কারের দ্বিশতবর্ষ, কিন্তু তা নিয়ে আমাদের এখানে তেমন লেখাপত্র হয়নি। আমি ওই সময়ে ‘জোব মুখুজ‍্যে বাক‍্যালাপ’ নামে একটি উপন্যাস লিখছিলাম। জোব হচ্ছে জোব চার্নক আর মুখুজ‍্যে হচ্ছে বইটির কথক বা লেখক। ওরা দু’জন ২০১৮ সালে সাদিয়ার সেই চা পরিবারের খোঁজে যায় আর সন্ধানও পায়। মিসিং গ্রামে কয়েকটা দিন ভালোই কাটে। হঠাৎ কোভিড রোগ ছড়িয়ে পড়ে। ফেরার পথে মুখুজ‍্যে কোভিডে আক্রান্ত হয়। তখন এক মিসিং গুণিন মুখুজ‍্যের উড়ে যাওয়া প্রাণ গাছের ডাল থেকে নামিয়ে এনে মুখুজ‍্যেকে বাঁচিয়ে দেয়।

সেই কৃতজ্ঞতায় এবারের লেখা মিশিং মানুষজন ও সাহিত্য নিয়ে।

……………

রোববার.ইন-এ পড়ুন মুখুজ্যের লিটফেস্ট-এর অন্যান্য লেখা

……………