Robbar

রবীন্দ্রগায়কি, রাবীন্দ্রিক গায়কি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 15, 2026 9:45 pm
  • Updated:August 15, 2026 9:45 pm  

যদি ফিরে শুনি রবীন্দ্রনাথের নিজের রেকর্ড-করা গানগুলি, তবে দেখব রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব একটি গায়নভঙ্গি ছিল। সেই গায়নভঙ্গি থেকে জন্ম নিয়েছিল এক গায়নরীতি। ঠাকুরবাড়িতে, ব্রাহ্মসমাজে এবং প্রথম যুগের শান্তিনিকেতন আশ্রমে রবিগান গাওয়া হত সেই গায়নরীতি মেনেই, এ মীমাংসায় পৌঁছে যেতে আমাদের সে সময়ের এবং সেই রবীন্দ্রঘনিষ্ঠ পরিসরের গাইয়েদের রেকর্ড-করা গানগুলির শ্রবণই যথেষ্ট। কেমন ছিল রবীন্দ্রসংগীতের স্রষ্টার নিজের গাওয়ার ভঙ্গি?

শৈবাল বসু

২.

‘শাখাপ্রশাখা’ ছবিতে শ্রমণা গুহঠাকুরতার কণ্ঠে ‘মরি লো মরি আমায় বাঁশিতে ডেকেছে কে’ গানটি ব্যবহার করেন সত্যজিৎ রায়। গানটির প্রথম দু’টি পঙ্‌ক্তি যে সুরে ও ভঙ্গিতে গাওয়া হয়েছে তা আমাদের এ গানের পূর্বেকার শ্রবণ-অভিজ্ঞতার চেয়ে অন্যরকম। বাল্যকাল থেকে আমরা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হিরন্ময় কণ্ঠে এই গানের যে রূপ ও চলনটি দেখেছি তার চেয়ে অনেকটাই অন্যরকম সত্যজিতের ছবিতে এ গানের শ্রবণপাঠ। একান্ত সাক্ষাৎকারে শিল্পী শ্রমণা এই নিবন্ধের লেখককে জানিয়েছেন যে, গানটি তিনি শিখেছিলেন তাঁর পিতৃদেব অরূপ গুহঠাকুরতার কাছ থেকে এবং অরূপ গানটি তুলেছিলেন আচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদারের তালিমে। এই শতকের প্রথমদিকে আমাদের হাতে আসে আচার্য শৈলজারঞ্জনের কণ্ঠে রেকর্ডে ধৃত– ‘মরি লো মরি’ গানটি, আর সেই গানের সুরের চলন আর গাওয়ার ভঙ্গিটি অনেকটাই মিলে যায় সত্যজিতের ছবিতে শ্রমণার গাওয়া গানটির সঙ্গে। বিশেষত ‘বাঁশিতে’ শব্দের ‘শি’-তে ‘গমপধ’-র অলংকরণ, যা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর-কৃত স্বরলিপিতে অনুপস্থিত। তাঁর আত্মকথাময় ‘যাত্রাপথের আনন্দগান’ বইতে শৈলজারঞ্জন বলেছেন, তিনি যখন জোড়াসাঁকোতে গিয়ে অমিয়া ঠাকুরের গায়নাটি কণ্ঠে তুলে আনার জন্য অনুরোধ করেছেন অমিতা ঠাকুরকে, তা জানতে পেরে ক্ষুণ্ণ হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। শৈলজারঞ্জন লিখছেন:

‘তিনি শান্তিনিকেতনে ফিরে এসে আমাকে ডেকে খুব কড়া সুরে জানতে চাইলেন, তুমি অমিতাকে চিঠি লিখেছ “মরি লো মরি” গানটি তুলে আনবার জন্যে? তোমাকে তো এই গানটি আমি আগেই শিখিয়ে রেখেছি। তা হলে তুমি কলকাতার অলিগলিতে ঘুরছ কেন এ গানের জন্যে?
আমি চুপ করে রইলাম।
গুরুদেব আবার বললেন, সকলকে বলে দিয়ো, বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া এ গান অন্য কেউ-ই শেখাতে পারে না। আর তিনি তোমায় শিখিয়ে দিয়েছেন।’ (যাত্রাপথের আনন্দগান, শৈলজারঞ্জন মজুমদার)

বাবা অরূপ ও মা রুমার সাথে শ্রমনা গুহঠাকুরতা

গানের মধ্যে যেগুলি তাঁর অল্পবয়সের রচনা, সেগুলি কবি শেষ বয়সের রচনার তুলনায় গাইতে বেশি পছন্দ করতেন, সুরটিও রাখতেন স্মরণে, একথা আমরা আচার্য শান্তিদেব ঘোষ এবং আচার্য শৈলজারঞ্জন উভয়ের লেখাতেই পাই। শান্তিদেব জানাচ্ছেন, “…‘মরি লো মরি আমায় বাঁশিতে ডেকেছে কে’ গানটি গুরুদেবের অতি প্রিয় গান। যৌবনে এ গানটি তিনি খুব গাইতেন। বৃদ্ধ বয়সেও তাঁকে আবেগের সঙ্গে গানটি গাইতে শুনেছি।” (রবীন্দ্রসংগীত বিচিত্রা, শান্তিদেব ঘোষ)

অতএব, রবীন্দ্রনাথ এ গানের সুর বিস্মৃত হয়েছেন, এ যুক্তি খাটে না এক্ষেত্রে। অথচ শৈলজারঞ্জনের নিজের গাওয়া সুরটির সঙ্গে তাঁরই পরিচালনায় তাঁর একান্ত শিষ্যা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া এ গানের সুর ও ভঙ্গির তফাত থেকে গেল অনেকটাই।

এখানে ‘ভঙ্গি’ শব্দটিকে একটু ভেঙে বলা প্রয়োজন। শৈলজারঞ্জনের গাওয়া এ গানটিতে রয়েছে কথা বলার ছন্দ, অনেকটা কীর্তন বা কথকতার চলন, খুব মন্থর, প্রলম্বিত মীড় বা টপ্পার কারুকাজ প্রায় নেই তাতে। সংগীতবিদ ও সুগায়ক সুধীর চক্রবর্তী এই গানের গড়নে ঢপ-কীর্তনের আভাস খুঁজে পান; সুচিত্রা মিত্র এই গানটি গেয়েছেন তালে (স্বরলিপিতে উল্লিখিত ‘দাদরা’)। অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়ও তা-ই, যদিও দু’জনের গাওয়া গানের সুরের ফারাক আছে, আর সেই ফারাক আরও গভীর কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টপ্পার অলংকার-ভরা গায়নে। অথচ এই তিন যশস্বী ও মান্য শিল্পীরই রেকর্ডে বিশ্বভারতী সংগীত সমিতির সিলমোহরটি আঁকা আছে।

কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুচিত্রা মিত্র

একটি গান নিয়ে এতগুলি শব্দ লেখার একটাই কারণ, গানটির এই নানা রূপের মান্য অথচ সংশয়গর্ভ প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ ব্যতিক্রমী নয়। এরকম ভুরিভুরি উদাহরণ মেলে ধরা যেতে পারে রবীন্দ্রগানের বিশ্বভারতী অনুমোদিত ধ্বনিমুদ্রিকাগুলি ধরে ধরে। এ গানটির ক্ষেত্রে আরও একটি সংশয়-উদ্দীপক তথ্য মনে আসে এ প্রসঙ্গে। সুভাষ চৌধুরী মহাশয়কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে (ইউটিউবে পাওয়া যায়) সত্যজিৎ রায় গীতা ঘটকের কণ্ঠে ‘মরি লো মরি’ গানটির ধরতাইটা নিয়েই আপত্তি করেন, এবং এ গানের শুরুর ‘মরি’ শব্দটি অমিয়া ঠাকুর কী সুরে গাইতেন, সেটি স্বকণ্ঠে গেয়েও দেখান। আবার এদিকে গীতা ঘটক লিখেছেন–

‘আমার মা-র আপন খুড়তুতো বোন রাণুমাসী (অমিয়া ঠাকুর)। রবীন্দ্রসংগীত স্বয়ং গুরুদেবের কাছে শেখা। রাণুমাসীর গান শেখানোর পদ্ধতিও ছিল বিবিদির মতো। উনি এক লাইন গাইতেন, আমিও গাইতুম ওর পরে। দ্বিতীয় লাইন যখন ধরতেন তখন বুঝতুম যে প্রথম লাইনটি আমার তৈরী হয়ে গেছে। যখনই আমার রাণুমাসীর সাথে দেখা হত কিংবা ওঁর বাড়ি গিয়ে কিছুদিন থাকতুম, আমি ওঁর কাছে গান শিখে নিয়েছি।’ (কে তুমি হৃদয়াসনে, ঐ আসনতলে, সম্পা. আলপনা রায়)

গীতা ঘটক

নানাপথগামী এই সব সংশয়ের ভিড় থেকে সুরের শুদ্ধতা বা প্রামাণ্যতা ছাড়াও একটি বিষয়ে গভীর প্রশ্ন উঠে আসে। সেই প্রশ্নটি রবীন্দ্রসংগীতের ‘গায়কি’কে ঘিরে। এই ‘গায়কি’ শব্দটিকেও ঘিরে রয়েছে অনেক অস্পষ্টতা। ‘গায়কি’ অর্থ গায়নরীতি না গায়নভঙ্গি, না কি দুটোই, না কি কোনওটিই নয়? যদি ফিরে শুনি রবীন্দ্রনাথের নিজের রেকর্ড-করা গানগুলি, তবে দেখব রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব একটি গায়নভঙ্গি ছিল। সেই গায়নভঙ্গি থেকে জন্ম নিয়েছিল এক গায়নরীতি। ঠাকুরবাড়িতে, ব্রাহ্মসমাজে এবং প্রথম যুগের শান্তিনিকেতন আশ্রমে রবিগান গাওয়া হত সেই গায়নরীতি মেনেই, এ মীমাংসায় পৌঁছে যেতে আমাদের সে সময়ের এবং সেই রবীন্দ্রঘনিষ্ঠ পরিসরের গাইয়েদের রেকর্ড-করা গানগুলির শ্রবণই যথেষ্ট। কেমন ছিল রবীন্দ্রসংগীতের স্রষ্টার নিজের গাওয়ার ভঙ্গি? কবি গাইতেন মূলত কথা বলার ছন্দে, (রেকর্ডে কোনও গানে তিনি কোনও তালবাদ্যের সাহচর্য নেননি, এমনকী গানের ভিতরের ছন্দটি রেখে গাওয়ার সময় কণ্ঠে মাত্রার টানটান গাণিতিক বাঁধন রাখেননি), তাঁর গানে ছিল সূক্ষ্ম অলংকার, ছোট ছোট তানের পরিমিত কারুকাজ (যার অনেকটাই স্বরলিপিতে নেই) আর কাব্যগীতি গাওয়ার সহজ দেশীয় চলন। এই কথা বলার ছন্দে গান গাওয়ার ‘গায়কিপদ্ধতি’ নিয়ে আচার্য শান্তিদেব ঘোষ লিখেছেন–

‘যাঁরা গুরুদেবের সঙ্গলাভের সুযোগ পেয়েছেন তাঁরা জানেন যে, গুরুদেবের আপন মনে গান গাওয়ার সময় কখনো দ্রুত লয়ে গান গাইতেন না, সে বাংলাগানই হোক, আর অল্প বয়সেই শেখা হিন্দি গানই হোক। আগের জীবনের গান তিনি গাইতেন বেশি, কারণ শেষ জীবনের গানের চেয়ে সেগুলি তাঁর বেশি মনে থাকতো। যৌবনের গানগুলিতে বিগত দিনের নানা আনন্দবেদনার স্মৃতি তাঁর মনে যেমন জাগত শেষ জীবনের গানে তা হত না। পরবর্তীকালের বহু গান কখন রচনা করেছেন, অনেক সময় তাও তাঁর মনে পড়েনি। কিন্তু যৌবনের রচনার প্রায় প্রত্যেকটি গান তাঁর মনে ছিল এবং গেয়েও শোনাতে পারতেন। লক্ষ্য করে দেখেছি যে, তিনি সেই সব গান গাওয়ার সময় প্রায়ই বাঁধা তালে বা ছন্দে গাইতেন না, দ্রুত লয়ের গান ছাড়া। বহু নাটকের অভিনয়েও তাঁকে গান গাইতে শুনেছি, তখন দেখেছি ঢিমে লয়ের গানে বাঁধা-ছন্দের নিয়ম একেবারে রাখেননি; গান গাইতেন স্বাভাবিক কথা বলার ছন্দে, যেন গানেই কথা বলছেন। এইপ্রকার গায়কিপদ্ধতিটি খুবই মনোহর বলে মনে হত। তাতে গানের ভিতর দিয়ে ভাবটি খুবই সুন্দরভাবে প্রকাশ পেত। তবে এ বিষয়ে একটু বলবার আছে এই যে, বাঁধা ছন্দকে ভেঙে কথার ছন্দে গান গাওয়ার রীতি খুব সহজ ব্যাপার নয়, এর জন্য চাই সংগীতে ও কাব্যে অতি গভীর রসবোধ, কারণ গানের সময় কোথায় সুরে টান ছোটো বড়ো হবে, লয় দ্রুত ও ঢিমে হবে, গানের কথা একটা আর-একটার গায়ে লেগে চলবে বা ছেড়ে ছেড়ে চলবে, এ-সব ভালো করে লক্ষ্য করতে হবে। তা না হলে সুর কথা সবই ছাড়া ছাড়া শোনাবে, জোট বাঁধবে না।’ (রবীন্দ্রসংগীত, শান্তিদেব ঘোষ)

দিনেন্দ্রনাথ। সামনে বাঁ দিক থেকে প্রথম শৈলজারঞ্জন, তৃতীয় শান্তিদেব।

এইভাবে গাওয়ার সময় বাংলা কীর্তন বা কথকতার চালে তিনি আস্থায়ীতে ফিরে আসার সময় কখনও হয়তো কোনও বাড়তি শব্দ যোগ করছেন, অনেকটা যেন আখর দেওয়ার ভঙ্গিতে। আমরা যদি ওঁর কণ্ঠে ‘আমারে কে নিবি ভাই’ গানটি শুনি, দেখব প্রথম পঙ্‌ক্তিতে ফিরে আসার সময় তিনি ‘(ও) আমারে কে…’ এইভাবে গাইছেন। ‘পথের পাঁচালী’ ছবিতে চুনীবালা দেবী ‘হরি দিন তো গেল’ গানটি গেয়েছেন বাংলার কীর্তনচালের যে ভঙ্গিতে, ঠিক সেই ভঙ্গিতে গাওয়া এই গান, এভাবেই সজীব সরল স্বরে কবি গেয়েছেন ‘আমার শেষ পারানির কড়ি’, ‘তবু মনে রেখো’, ‘ফিরে এসো’, ‘বঁধু হে’ এইসব গান। এই সরল স্বরে কিন্তু নিপুণ অলংকরণ বাদ পড়েনি, কিন্তু যে অলংকরণ প্রয়োগ করেছেন তিনি কথা বলার মতো সহজ ভঙ্গিতে, তাতে না আছে কোনও কারদানি, না আছে কোনও ‘নির্মিত’, ম্যানারিজম। কণ্ঠস্বর ও ভঙ্গির সততা এমনই খাঁটি যে কোনও নাগরিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সফিসটিকেশন-এর ধার ঘেঁষতেও হয় না তাঁকে। ‘আমার শেষ পাড়ানির কড়ি’ গানে ‘একলা ঘাটে রইব না গো’ পঙ্‌ক্তির ‘গো’তে কবি ব্যবহার করলেন একটি ছোট দানার তান, কিন্তু সে অলংকারে স্বরের আকুলতা মুখ্য হয়ে উঠল, কারুকার্যের প্রদর্শন নয়। অকারণে স্বরকে প্রলম্বিত করে, লয়কে শিথিল করে, টেনে টেনে গাওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে মূলত রবীন্দ্রশতবর্ষের পর থেকে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের ‘গায়কি’তে তা একেবারেই অনুপস্থিত। বিশেষত মুক্তছন্দের গান গাইতে গিয়ে ইলাস্টিকের সুতোকে যতদূর টানা যায় তার চাইতেও বেশি শিথিল করে অক্ষর, শব্দ ও পঙ্‌ক্তিকে মন্থরভাবে উচ্চারণ করার যে বিপুল অভ্যাস রবীন্দ্রগানকে গ্রাস করে নিয়েছে, গায়ক রবীন্দ্রনাথ সেই অভ্যাসের জনক নন কোনওভাবেই। তাঁর গান গাওয়ার ভঙ্গি অনেক স্মার্ট ও ঝরঝরে। উচ্চারণ উন্মুক্ত, স্পষ্ট। সেই উচ্চারণে শব্দ বিশ্বাস্য হয়ে ওঠে। ‘আমার শেষ পারানির কড়ি’ গানে ‘যাবই, যাবই, যাব’ বলার সময় প্রতিটি হ্রস্ব-ই-কারে গাঁথা থাকে তাঁর প্রত্যয়। ‘অন্ধজনে দেহো আলো’ যখন গাইছেন ‘আলো’ শব্দের ‘ও’ স্বরের মুক্ত আকারকে আশ্রয় করে যে অলংকার প্রয়োগ করছেন গায়ক রবীন্দ্রনাথ, তাতে প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে আলোর উৎসার। এইভাবে অলংকারকে তিনি অর্থবহ করে তুলছেন। তারসপ্তকে স্বর লাগানোর সময় কণ্ঠকে কোথাও চেপে গাইছেন না ওই বয়সেও।

এস্রাজ বাজাচ্ছেন অবনীন্দ্রনাথ, গাইছেন রবীন্দ্রনাথ

তাঁর সকল গানের ভাণ্ডারী এবং রবীন্দ্রসংগীতের প্রথম ও অদ্বিতীয় শিক্ষক দিনেন্দ্রনাথের গায়নেও এই দীর্ঘসূত্রী শিথিলতা ছিল না। রবীন্দ্রনাথের মতোই দিনেন্দ্রনাথের ছিল রেওয়াজি কণ্ঠ, একমাত্রায় নিখুঁত ওজনে একাধিক স্বরকে অনায়াসে গাওয়ার ক্ষমতা, আর সর্বোপরি নিজের কথাটি বিশ্বাস নিয়ে বলার আন্তরিক সততায়, শুদ্ধতায়, উদার ছন্দে গানটি গাওয়ার অভ্যাস। আমরা যাঁরা সাতের দশক থেকে বেতারে, রেকর্ডে যশস্বী গাইয়েদের গান শুনে বড় হয়েছি, আমাদের স্মৃতিতে তাঁদের গাওয়া গানের শ্রবণ-অভিজ্ঞতাও আজ থমকে দাঁড়ায় দিনেন্দ্রনাথের কণ্ঠের ‘আমার পরান যাহা চায়’, ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’, ‘আমার মিলন লাগি তুমি’ এই গানগুলির রেকর্ড শুনে। (দিনেন্দ্রনাথের গাওয়া সব ক’টি রবীন্দ্রসংগীতই ইউটিউবের কল্যাণে আমাদের হাতের মুঠোয় আজ)। খোলা গলায়, স্পষ্ট উচ্চারণে গান গাইতেন দিনেন্দ্রনাথ। শিক্ষক দিনেন্দ্রনাথ জোর দিতেন স্বরসাধনার ওপর, কণ্ঠের স্বাভাবিক সহজ মুক্ত আওয়াজকে সুরস্থ করে প্রকাশ করার ওপর। ওঁর প্রত্যক্ষ ছাত্রী রমা চক্রবর্তী লিখেছেন–

“খোলা গলায় পরিষ্কার উচ্চারণ করে গান না করে কারুর নিস্তার ছিল না। বড় বড় চোখ আরও বড় করে ধমক দিয়ে বলতেন ‘হাঁ কর, মুখ বুজে বুজে গলা চেপে গাইবি না’। তখন কার সাধ্য ছিল গলা না ছেড়ে গাইবে। বলতেন, ‘জানিস, বিলেতে গান শেখাবার আগে, মুখ হাঁ করবে কতখানি, জিভ কখন কীভাবে নাড়বে, স্বরক্ষেপণ কীভাবে হবে, এইসব দীর্ঘদিন শিখিয়ে তারপর গান শেখানো হয়। আর তোরা!’ বলে নকল করে দেখাতেন কী করে গলা চেপে গাওয়া হয়। যতক্ষণ হাসির উচ্চরোল উঠত ঠিকই, কিন্তু যা শিক্ষণীয় তা শেখাও হত। আর চোখের সামনে বই খুলে গান গাওয়া হত নৈব নৈব চ! গুরুদেবও খোলা গলায় গান গাওয়া পছন্দ করতেন। বস্তুত তখনকার দিনে সেটাই রীতি ছিল।” (কাছের মানুষ দিনদা, রমা চক্রবর্তী, দিনেন্দ্র শতবার্ষিকী গ্রন্থ)

মেলার মাঠে নন্দলাল বসুর সঙ্গে দিনেন্দ্রনাথ

দিনেন্দ্রনাথের রেকর্ডে গাওয়া ‘আমার পরান যাহা চায়’ আমায় প্রথম বাজিয়ে শোনান অধ্যাপক মোহন সিং, তখন আমার বয়স ৩৫ প্রায়। ওই গায়ন যদি অন্য কারও কণ্ঠে শুনতাম, নির্দ্বিধায় বলে উঠতাম– ‘ভুল গাইছেন!’ প্রথমেই অবাক হয়ে গেলাম তাঁর ওই ‘তুমি তাই গো’-র ‘তাই’-এর কারুকাজটা শুনে। তারপর ‘গো’-তে চকিত এবং স্পষ্ট শুদ্ধ গান্ধার। এক বা দুই মাত্রায় চার বা তারও বেশি স্বর কথা বলার মতো অনায়াসে প্রকাশ করছেন দিনেন্দ্রনাথ। তেমনই অবাক করা কারুকাজের চরিত্র ওঁর ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’ গানে। ‘আমার মিলন লাগি’ গানে ‘আমার’ শব্দটির ওজস্বী উচ্চারণে যে অলৌকিক ব্যাপ্তি প্রকাশ করেন দিনেন্দ্রনাথ, তাতেই এ গানের ভিতরকার ‘আমি’র দর্শন সম্ভব হয়। তার সঙ্গে একথাও মনে পড়ে যে, তাঁর একান্ত শিষ্যা রমা চক্রবর্তী লিখেছেন:

‘দিনদার কী অপূর্ব কণ্ঠস্বর ছিল! এমন জলদগম্ভীর অথচ মাধুর্যে ভরা কণ্ঠস্বর তো দৈবে শোনা যায়। তিনি যখন গান গাইতেন, গান যেন মূর্ত হয়ে উঠত। তাঁর গানের রেকর্ডে আসল কণ্ঠস্বর ধরা পড়েনি।’

রবীন্দ্রশতবর্ষের সময়টি থেকে রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ডের সবচেয়ে অগ্রগণ্য প্রশিক্ষক ও মান্য গাইয়ে সন্তোষ সেনগুপ্ত তাঁর ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত বই ‘আমার সংগীত আনুষঙ্গিক জীবন’-এ লিখছেন:

‘বর্তমান যুগ রবীন্দ্রসংগীতের স্বর্ণযুগ। …[রবীন্দ্রসংগীতে] তদানীন্তন গায়কি থেকে এখনকার গায়কি অনেক প্রাণবন্ত।’

যখন রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে ‘তবু মনে রেখো’ গানটি শুনি, শুনি দিনেন্দ্রনাথের গান, অমিতা সেনের (খুকু) গান, তখন সন্তোষ সেনগুপ্ত মহাশয়ের এই উক্তিকে মেনে নিতে মন চায় না। ওঁর ব্যবহৃত ‘গায়কি’ শব্দটিকে ঘিরে গভীর প্রশ্ন ও সংশয় দানা বাঁধে।

মুজতবা আলী তাঁর ‘গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন’ বইতে লিখেছেন:

‘আমাদের রাগপ্রধান সংগীতচর্চার জন্য প্রাচীন অর্বাচীন বহু শাস্ত্র আছে, রবীন্দ্রনাথ এ যুগে সঙ্গীতের যে ভুবন সৃষ্টি করে দিলেন, তার রহস্য ভেদ করার জন্য কোন প্রামাণিক শাস্ত্র নেই। এ শাস্ত্র নির্মাণ করার অধিকার একমাত্র দিনেন্দ্রনাথেরই ছিল।
বহু অনুনয় আবেদন করার পর তিনি সে শাস্ত্র রচনা করতে সম্মত হলেন।
কয়েকটি অধ্যায় তিনি লিখেছিলেন। সেগুলি অপূর্ব। শুধু যে সেগুলিতে রবীন্দ্রসংগীতের অন্তর্নিহিত দর্শনের সন্ধান মেলে তাই নয়, সেগুলিতে ছিল ভাষার অতুলনীয় সৌন্দর্য, অমিত ঝঙ্কার। সে ভাষার সঙ্গে তুলনা দিতে পারি একমাত্র কাব্যের উপেক্ষিতার ভাষা।’

দিনেন্দ্রনাথ এই শাস্ত্রগ্রন্থ সমাপ্ত করতে পেরেছিলেন কি না, আশ্রমিক মুজতবা আলী তা জানতে পারেননি। এরকম কোনও বইয়ের প্রকাশিত রূপ যে উত্তর প্রজন্মের অধিকারে এসে পৌঁছল না, তা আমাদের রবীন্দ্রসংগীত-ভুবনের অপরিমেয় ক্ষতি।

দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

আর একটি কথা। মুক্তছন্দে গাওয়ার সব গানই যে টপ্পা নয়, সেকথা রবীন্দ্রনাথ-দিনেন্দ্রনাথের গান শুনলে বোঝা যায়। বাংলা কাব্যগীতির একটা কথকতার ঘরানা আছে। ‘গান বলার’ ঘরানা। উত্তরভারতে কাব্য (শায়ের) পড়ার সেই ঘরানা হল ‘শায়েরানা আন্দাজ’। এই লব্জটা আমি বলতে শুনেছি অধ্যাপক মোহন সিংকে, মুক্তছন্দের রবীন্দ্রগানের প্রসঙ্গেই। মুক্তছন্দে গেয় সব গান একই ছাঁচে ঢালা, এই ধারণা একঘেয়েমি এনে দিয়েছে অধিকাংশ গায়নে। যেমন, ‘সখী আঁধারে একলা ঘরে’ গানটি লখনউ অঞ্চলের ঠুংরির চলন অনুযায়ী রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন, একথা আমাদের জানাচ্ছেন শান্তিদেব ঘোষ–

“১৯২০ খ্রীষ্টাব্দের পর গুরদেব লক্ষনৌ অঞ্চলের ঠুংরিভাঙা ‘সখি আঁধারে একেলা ঘরে’, ‘যাওয়া আসারই একি খেলা’ এবং ‘খেলার সাথী, বিদায়দ্বার খোল’ গান ক’টিই মাত্র রচনা করেছিলেন।
মূলগান পণ্ডিত ভীমরাও শাস্ত্রী ও শ্রীযুক্তা সাহানা দেবীর মুখে শুনে গুরুদেব নিজের মত বাংলা কথা বসিয়েছিলেন। এঁদের দুজনকে দিয়েই বাংলা গানগুলি তিনি প্রথম গাওয়ালেন শান্তিনিকেতনের উৎসবে যা কলকাতার আয়োজিত সংগীতানুষ্ঠানে গাওয়া হয়েছিল ভাঙাছন্দের গান হিসাবে।” (রবীন্দ্রসংগীত বিচিত্রা, শান্তিদেব ঘোষ)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শান্তিদেব ঘোষ

ঠুংরি অঙ্গের চালটি রেখে এই গানটি গেয়েছিলেন সুচিত্রা মিত্র ‘শাপমোচন’ কথিকাটির রেকর্ডে ১৯৬১ সালে। ড. চিত্রলেখা চৌধুরীর কণ্ঠ আজ প্রায় অবসিত, তিনি এই গানটি ঠুংরির ভঙ্গিতে (টপ্পার প্রভূত অলংকরণ ছাড়া) রেকর্ড করেন, জানালেন (এই লেখককে) গানটি তাঁকে এভাবেই শিখিয়েছিলেন তাঁদের ‘শৈলজাদা’। এমনকী শৈলজারঞ্জনের কণ্ঠে ধৃত এই ‘সখী আঁধারে’ গানটিতেও পাই ঠুংরির বোলের রণন (বলা, কথা বলার চাল)। ‘মন মানে না’ শব্দবন্ধটুকু দ্বিতীয়বার বলার সময় তিনি সহজেই বলেন, ‘ঘরে মন মানে না’। ওঁর মতো শুদ্ধতাসাধক যখন এইভাবে ‘ঘরে মন…’ গেয়ে ঠুংরির বোলের চালটি নিয়ে আসেন গানের চলনে, আমাদের মনে পড়ে যায় ‘আমারে কে নিবি ভাই’ গানটির রেকর্ডে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ প্রথম পঙ্‌ক্তি ফিরে গাওয়ার সময় গেয়ে ওঠেন ‘ও আমারে কে নিবি ভাই’। এই বাংলায় কীর্তন, বাউল, পয়ার ও নানা আখড়াই গানের গায়নকালে এই মেটা-টেক্সট তৈরি হওয়ার পরিসর থাকে। কথা বলার ভঙ্গির গানে, পারফরম্যান্সের ভুবনে। রবীন্দ্রনাথের গানেও এই উন্মুক্তির আকুল আলোটি দেখি এ গানের প্রথম যুগের অঙ্গনে।