A Satirical Take on BJP in West Bengal।Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এই বঙ্গে যা যা চাই!

আমাদের এই রাষ্ট্রে যাদের বহিরাগত বলে মনে হবে, তাদেরকেই আমরা প্রথমে এই সৎ-সন্তান উৎপাদন ব্যবস্থায় কাজে লাগাব। তাদের সদ্যোজাত শিশুদের আমরা সততা-জ্বালানি উৎপাদনশীল নিভৃত ক্যাম্পে নিয়ে যাব। এই হল আশ্চর্য ব্যবস্থা, বহিরাগত বলে মনে হচ্ছে যাদের, তাদের আমরা বের করে দিচ্ছি না। উদারভাবে গ্রহণ করছি। তাদের ক্যাম্পের নিভৃতিতে রেখে পুণ্য করার সুযোগ দিচ্ছি। দেশের জন্য পুণ্য, দশের জন্য পুণ্য। শুরু হল সিরিয়াসলি নেবেন না। আজ প্রথম পর্ব

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ২০:২৮   
Facebook WhatsApp Messenger

১.

নতুন বাংলা বছরে আমাদের গতি চাই, সে-জন্যই সৎ ও সতী চাই। সনাতন ধর্মে মতি চাই। পুরাতন ভারতমাতার প্রতি সাষ্টাঙ্গ প্রণতি চাই। আমরা ‘নব্যবঙ্গীয় সনাতনবাদী বিজ্ঞানপন্থী দলচারী সংগোষ্ঠী’-তে এই বেদ-বৈজ্ঞানিক ইস্তাহারটি পড়তে চাই। পত্রে-পুষ্পে বৃক্ষে-বৃক্ষে এই ইস্তাহারের নানা বাক্য বাণীরূপে ঝোলাতে চাই। আমরা পরিশুদ্ধ বাঙালি। আমাদের রক্ত অমিশ্র। আমাদের চিত্ত খাঁটি। আমাদের দলের নাম ‘নব্যবঙ্গীয় সনাতনবাদী পার্টি’। এনএসপি। আমাদের দলের প্রতীক সেই আশ্চর্য পক্ষী, যিনি হংসদের মধ্যে পরম। দুধে-জলে মেশানো থাকলে যিনি খাঁটি দুধটুকু গ্রহণে সমর্থ, তিনিই পরমহংস।

zoom
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস

বিশেষ দ্রষ্টব্য: দক্ষিণেশ্বরে একজন কালীসাধককে এককালে কেউ কেউ ‘পরমহংস’ বলত। তাঁর সঙ্গে আমাদের কোনও সংযোগ নেই। কারণ, তাঁর প্রধান শিষ্য শ্বেতাঙ্গিনীদের সঙ্গে নিবিড় সংস্রব রাখতেন। তাঁর স্ত্রী বলেছিলেন, ‘তিনি সতেরও মা অসতেরও মা।’ কালীসাধক আবার খাঁটি তৎসম শব্দে দেবীর আরাধনা করতেন না। বেড়ালকে মাঝে মাঝে দেবীর ভোগ খাইয়ে দিতেন। তার ওপরে কেওটদের সংসর্গ করেছিলেন। তাই আমরা তাঁকে খাঁটি দুগ্ধসেবী পরমহংস বলে মনে করি না। এনএসপি সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক দল। আমাদের দলের ইস্তাহারে একটিই বাক্য জ্বলন্ত: ‘নতুন বাংলা বছরে আমাদের গতি চাই, সে জন্যই সৎ ও সতী চাই।’

কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারেন, গতির সঙ্গে সৎ ও সতীর কী যোগ? এর উত্তর জানার জন্য খুব মন দিয়ে মহাভারত পড়া চাই। সেখানে সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরের কথা আছে। যুধিষ্ঠির যতদিন সত্যবাদী ছিলেন, ততদিন তাঁর রথ ভূমির ওপর দিয়ে যেত। এর থেকে বোঝা যায়, সততা একপ্রকার জ্বালানী-বিশেষ। তা সৎ মানুষের শরীরে উৎপন্ন হয়। সেই জ্বালানী যে-কোনও যানকে গতি প্রদান করে। সৎ মানুষের মস্তক শীর্ষ যে অভিমুখে থাকে, সেই অভিমুখে যানটি গতিপ্রাপ্ত হয়। এই মহাভারতীয় সূত্র থেকে আমরা কতগুলি নব্য সূত্র অনুমান করেছি। একজন সৎ মানুষকে যানে স্থাপন করলে আর তার মস্তক শীর্ষ আকাশের পানে থাকলে, তা মাটি থেকে ওপরের দিকে উঠবে। এবার যদি কয়েকজন সৎ মানুষকে আনুভূমিকভাবে চারচক্রযানে শুয়ে রাখা যায়, তাহলে সেটি সম্মুখ পানে অগ্রসর হবে। এই মহা-বৈজ্ঞানিক সূত্রটি চিত্র-সহযোগে বুঝিয়ে দেওয়া উচিত।

একইভাবে আকাশযানে গতি আনা সম্ভব। সে-ক্ষেত্রে মানুষগুলিকে শুইয়ে রাখার পরিবর্তে, খাড়াভাবে দাঁড় করিয়ে দিতে হবে। এই সূত্রটিকে বাস্তবে রূপান্তরিত করার জন্য শুধু কতগুলি পরীক্ষার প্রয়োজন। এই পরীক্ষার জন্য আমাদের চাই নিভৃত পরীক্ষাগার। খুব বেশি খরচ হবে না। সৎ ও সতী নির্মাণের জন্য চাই সনাতন রাষ্ট্রীয় শৈশব নির্ধারণ প্রকল্প। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জন্মমাত্র শিশুদের সমাজ থেকে পৃথক করে দেওয়া হবে। শিশুর মা কেবল প্রথম ছ’-মাস দুগ্ধদানের জন্য শিশুর নিকটে আসবেন। শিশুর মুখ দেখার দরকার নেই। কঠোর ত্যাগই দেশের ভবিষ্যৎ দৃঢ় করে। একটি কালো দৃষ্টিরোধক পর্দা থাকবে। সেই পর্দার একদিকে মা, অন্যদিকে শিশু। শিশুটিকে একজন ব্রহ্মচারিণী সেবিকা তুলে ধরবে। মায়ের স্তনবৃন্ত কালোপর্দার ওপরে থাকা ছিদ্রপথে স্থাপন করা হবে। ব্রহ্মচারিণী এদিক থেকে সেই স্তনবৃন্তে শিশুর মুখ প্রবেশ করালেই যথেষ্ট। এই মাতৃদর্শনবিহনে স্তন্যপানের মাধ্যমে শিশুমন মাতৃমায়াহীন হবে। তার মনে এক মায়ের ছবিই ক্রমে বড় হয়ে উঠবে। দেশমাতা! দেশমাতার জন্যই যে এই কঠোর সততা-সাধনপন্থা, সে ক্রমে তা উপলব্ধি করবে।

রাষ্ট্রীয় শৈশব নির্ধারণ প্রকল্পে দেশের কথা ভেবে যাঁরা শিশুদের অর্পণ করবেন, সেই পরিবারগুলিকে অক্ষয় রাষ্ট্রীয় পুণ্য-পদক প্রদান করা হবে ও মাসে মাসে প্রণামীর ব্যবস্থা থাকবে। রাষ্ট্রীয় প্রণামী ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে নীরবে প্রবেশ করবে। ছ’-মাসের পর যখন মা তাঁর স্তন দিয়েও শিশুকে আর স্পর্শ করতে আসবেন না, তখন থেকে প্রণামীর পরিমাণ দ্বিগুণ হবে। আর শিশুকে রাখা হবে সাড়ে তিনহাত আরামদায়ক খাঁচায়। শিশু ক্রমে বাল্য, কৈশোর ও যৌবনপ্রাপ্ত হবে। তার দৈর্ঘ্য অনুযায়ী, খাঁচার আয়তন নির্দিষ্ট করা হবে। শিশু কারও সঙ্গে কথা বলতে যাতে না-পারে ও কথা শুনতেও যাতে না-পায়, তার ব্যবস্থা থাকবে। কথা বলা ও শোনার ব্যবস্থা না-থাকায় শিশু ক্রমে যখন যৌবনে প্রবেশ করবে, তখন সে মনুষ্য– ভাষাবিহীন মনুষ্য। কথা বলে বলেই মানুষ মিথ্যে কথা বলে! কথা বলাই যুধিষ্ঠিরের রথের পতনের কারণ। ‘অশ্বত্থমা হত ইতি গজ’– এই কথা না-বললে যুধিষ্ঠিরের রথ মাটি স্পর্শ করত না। অশ্বত্থমা মারা গিয়েছে– এই কথা যুদ্ধের মাঠে দ্রোণাচার্য যুধিষ্ঠিরের কাছ থেকে শুনতে পেয়েছিল। ইতি গজ শুনতে পায়নি। অশ্বত্থমা যে হাতি, সে-কথা দ্রোণাচার্যের কাছে প্রকাশ পেল না। অশ্বত্থমা নামের হাতি মারা গিয়েছে, তাঁর পুত্র অশ্বত্থমার মৃত্যু হয়নি– এই সত্য দ্রোণের কাছ অবধি পৌঁছয়নি। তাই উদ্দেশ্য ছিল। যুধিষ্ঠির তাই গলা নামিয়ে ‘ইতি গজ’ বলেছিল। এ মিথ্যাচার! ফলে যুধিষ্ঠিরের শরীর থেকে সততার জ্বালানি নিঃশেষ হয়ে গেল। রথ মাটিতে নামল। আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলে, কথাহীন সৎ মানুষের মিথ্যা কথা বলার অবকাশই থাকবে না।

এছাড়াও আরও কয়েকটি বিষয়ে খেয়াল রাখা দরকার।

আমাদের নিভৃত সৎ-সতী উৎপাদক ক্যাম্পে পরবর্তীকালে আর সামাজিক মা-বাবার প্রয়োজনই হবে না। পরবর্তী পর্যায়ে উৎপাদনের খরচ কম হবে। প্রথমে সমাজ থেকে শিশুদের নেওয়া হবে বলে পরিবারকে প্রণামী দিতে হচ্ছিল। ক্যাম্পে বাক্যহারা সৎ যুবক-যুবতী থাকলে বাইরের বাবা-মায়ের কী দরকার। দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রোডাকশন কস্ট কম। সৎ যুবক ও সৎ যুবতীদের মধ্যে মিলনের ফলে পরবর্তীকালের সৎ শিশুদের জন্ম হবে। তবে এই সৎ-শিশুরা সৎ যুবক-যুবতীদের প্রত্যক্ষ শারীরিক মিলনে তৈরি হবে না। শরীর অপবিত্র করার মানে হয় না। স্পার্ম ব্যাঙ্ক তৈরি করা হবে। বীর্য সংরক্ষণ কেন্দ্র থেকে বীর্য নিয়ে কৃত্রিম উপায়ে সৎ যুবতীর গর্ভে ভবিষ্যতের সৎ দেশজ সন্তানকুল উৎপাদন করা হবে।

সৎ সন্তানকুলের সংখ্যা যত বেশি হবে, তত দেশের গতি। বাইরে থেকে তেল আনতে হবে না। মূক ও বধিরবৎ সৎ যুবক-যুবতীদের হাত-পা যত্ন করে বেঁধে, শুইয়ে বা দাঁড় করিয়ে রাখলেই গাড়ি সামনে এগবে অথবা আকাশে উড়বে। এদের নাম দেওয়া হবে– রাষ্ট্রীয় গতি-সেবক সংঘী। গতির জন্য বলিপ্রদত্ত সততা-নামক জ্বালানির অধিকারী এই বিশেষ মনুষ্য শ্রেণি নিভৃত সততা উৎপাদনকারী ক্যাম্পে, ক্রম উৎপাদনের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার গতিময় পরিকল্পনা করেছি আমরা, ‘নব্য বঙ্গীয় সনাতনবাদী পার্টি’। এই পার্টিই দেশের ভবিষ্যৎ।

This may contain: many people are holding orange and green flags with the image of a flower on them

ভেবে দেখুন, জ্বালানির জন্য আমরা অন্যদেশের কিংবা প্রকৃতি-গর্ভের ওপর নির্ভরশীল হব না। দেহ ভাণ্ডই জ্বালানির আধার। আমরা জন্ম নিরোধক ব্যবহার করব না। শারীরিক মিলনের মতো গ্লানিময় প্রক্রিয়ায় যাব না। কথা বলা মানুষের মতো মিথ্যাবাদীদের শরণ নেব না। যান্ত্রিক ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় দেশকে গতি দেব। অমোঘ অনিবার্য মহাভারতীয় গতি। এই অদ্ভুত আদ্যন্ত ভারতবর্ষীয় মহাকাব্যিক পরিকল্পনা আর কে দেবে? কেউ দেবে না। কোনও বহিরাগতের পক্ষে এই পরিকল্পনা প্রদান সম্ভব ছিল না। আমাদের এই রাষ্ট্রে যাদের বহিরাগত বলে মনে হবে, তাদেরকেই আমরা প্রথমে এই সৎ-সন্তান উৎপাদন ব্যবস্থায় কাজে লাগাব। তাদের সদ্যোজাত শিশুদের আমরা সততা-জ্বালানি উৎপাদনশীল নিভৃত ক্যাম্পে নিয়ে যাব। এই হল আশ্চর্য ব্যবস্থা, বহিরাগত বলে মনে হচ্ছে যাদের, তাদের আমরা বের করে দিচ্ছি না। উদারভাবে গ্রহণ করছি। তাদের ক্যাম্পের নিভৃতিতে রেখে পুণ্য করার সুযোগ দিচ্ছি। দেশের জন্য পুণ্য, দশের জন্য পুণ্য। সততা-জ্বালানি উৎপাদনের প্রথম পর্যায়ের ব্রতী পরিবার তারাই। আহা, কী অপূর্ব উপায়! কী অপূর্ব এক আত্মত্যাগে আমরা তাদের গ্রহণ করছি। মিলিয়ে দিচ্ছি এই কাজে।

আর কী! আমাদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবেই। বহিরাগতের উদার অধিগ্রহণের মাধ্যমে দেশের গতিবৃদ্ধির এই দেশজ প্রকল্প জয়লাভ বিস্তার লাভ করুক।

এনএসপি জিন্দাবাদ! ‘নব্যবঙ্গীয় সনাতনবাদী পার্টি’ অমর রহে!

Bengal Politics Hindu terrorism Hinduism Indian Politics nationalism Political Satire Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on