Stella Kramrisch Influenced Art Education at Shantiniketan। Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

কলাভবনের পশ্চিমি যোগ

বিশের দশকের একেবারে গোড়াতে কলাভবনের শিল্পচর্চা দেশের অন্যান্য যে কোনও আর্টস্কুলের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে ছিল। আর কেবল ইতিহাসের আলোচনা নয়, পশ্চিমি শিল্পের উদ্দেশ্য ও আদর্শ, শিল্পীদের কাজের উৎকর্ষ এবং সীমাবদ্ধতার দিকেও ছাত্রদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন। এমনকী পাশ্চাত্য শিল্পের টেকনিকের দিকটাও সমানভাবে আলোচিত হয়েছে স্টেলার ক্লাসে।

Published by: Robbar Digital

Posted:June 19, 2026 4:13 pm | Updated:June 19, 2026 4:13 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

৮.

কলাভবন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ দেশবিদেশ থেকে শিল্পী ও শিল্প-আলোচকের সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। তাঁর প্রাণের কলাভবনকে কখনও-ই তিনি স্বদেশি আর্টের আখড়া হিসেবে গড়ে তুলতে চান না। শিল্পের পরিসরে সেখানে পূর্ব ও পশ্চিম উভয়েই সমানভাবে আন্দোলিত হবে– সেই দিকে লক্ষ্য রেখেছিলেন বরাবর। কবির আহ্বানে প্রখ্যাত ফরাসি প্রাচ্যবিদ সিলভাঁ লেভি সস্ত্রীক শান্তিনিকেতনে আতিথ্য নিয়েছিলেন কিছু আগেই। এবারে ১৯২০ সালের বিলেত সফরকালে অক্সফোর্ডের একটি আলোচনা-সভায় আলাপ হল শিল্প-ইতিহাসবিদ স্টেলা ক্রামরিশের সঙ্গে।

zoom
স্টেলা ক্রামরিশ

ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্টেলা অক্সফোর্ডে এসেছিলেন ভারতীয় শিল্প বিষয়ে বক্তৃতা দিতে। তাঁর প্রথম বক্তৃতা ছিল হিন্দু মন্দির প্রসঙ্গে। বক্তৃতার শুরুতে শ্রোতাদের সঙ্গে স্টেলার আলাপ করিয়ে দেন লন্ডনের ‘রয়্যাল কলেজ অফ আর্ট’-এর অধ্যক্ষ উইলিয়াম রোদেনস্টাইন। বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে সেই সভাতেই রবীন্দ্রনাথ যেচে তাঁকে শান্তিনিকেতনে আসার আমন্ত্রণ জানালেন। স্টেলা জানিয়েছেন– বক্তৃতার পরে অনেকে যখন এসে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, সেই সময় একটা হাত যেন পিছন থেকে স্টেলাকে ঘিরে ধরেছিল। স্টেলা ফিরে তাকিয়ে দেখেন তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। সেখানেই শান্তিনিকেতনে আসার আহ্বান এল। যদিও সেই মুহূর্তে শান্তিনিকেতন আসা খুব একটা সহজে ঘটেনি। তার অন্যতম কারণ, সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। আসলে স্টেলা ছিলেন অস্ট্রিয়ান ইহুদি, তাঁর পক্ষে ব্রিটিশ-শাসিত ভারতবর্ষে আসায় নানারকমের বিধিনিষেধ ছিল।

zoom
উইলিয়াম রোদেনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাতের আগে থেকেই স্টেলা ছিলেন ভারতশিল্পের বিশেষ অনুরাগী। সেই সূত্রে ভারতবর্ষে আসার জন্য তিনি খুবই আগ্রহী ছিলেন। দেশে থাকতেই ভারতীয় শিল্প প্রসঙ্গে বিস্তর পড়াশুনো করেছেন। তবে কাগুজে বিদ্যার বদলে প্রত্যক্ষভাবে সেই চর্চাকে গভীরতর করতে তিনি ভারতে আসা মনস্থির করেন। প্রথম দিকে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এহেন মাহেন্দ্রক্ষণে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ! স্টেলা যেন এমন একটা সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন। যদিও রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণ সত্ত্বেও ভারতে আসার ছাড়পত্র সহজে মেলেনি। অন্যদিকে স্টেলার সঙ্গে চিঠিপত্রে ‘রূপম’ পত্রিকার সম্পাদক তথা সেই পর্বের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, শিল্প-ঐতিহাসিক ও. সি. গাঙ্গুলির যোগাযোগ ছিল। ভারতে আসার সমস্যা নিয়ে ও. সি. গাঙ্গুলিকেও চিঠি দিয়েছিলেন তিনি। অবশেষে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ছাড়পত্র পাওয়া গেল, স্টেলা ভারতের মাটি স্পর্শ করলেন।

zoom
স্টেলা ক্রামরিশ

কলাভবনে স্টেলা এলেন শিল্প-সমালোচক তথা শিল্প-ঐতিহাসিক হিসেবে। তিনি যখন শান্তিনিকেতনে যোগ দিলেন, সেই সময় ভারতীয় পণ্ডিতকুলের কাছে তিনি প্রায় অপরিচিত। তবে প্রবল ব্যক্তিত্বময়ী স্টেলা সহজেই তাঁর আসনটিকে পাকা করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, কেবল হাতেকলমে ছবি আঁকা নয়, শিল্পের ইতিহাস সম্পর্কেও যথেষ্ট ওয়াকিবহাল থাকা দরকার। রবীন্দ্রনাথের নির্দেশেই শিল্প-ইতিহাসের বিষয়টি কলাভবনে আবশ্যিক করা হয়েছিল। তাঁর নির্দেশে কেবল ছাত্রছাত্রী নয়, শিক্ষকরাও উপস্থিত থাকতেন স্টেলার ক্লাসে। এমনকী কবির শাসনে নন্দলালও উপস্থিত থাকতেন সেই ক্লাসে। বিনোদবিহারীর কথায় জানতে পারি– ‘ক্রামরিশের বক্তৃতা শুরু হয় গথিক শিল্পের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে। ক্রমে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত কয়েকজন শিল্পী সম্বন্ধে তিনি আলোচনা করেন।’ এই পর্বে তিশিয়ান, ড্যুরার ও রেমব্রান্ট সম্পর্কে স্টেলা অনেকটা বিশদে আলোচনা করতেন। অর্থাৎ, রেনেসাঁ থেকে তাঁর শিল্প-ইতিহাসের বিস্তার ছিল রেমব্রান্টের সময় পর্যন্ত।

এখানেই শেষ নয়, স্টেলার ক্লাসে ইম্প্রেশনিস্ট থেকে কিউবিস্ট আর্ট পর্যন্ত বিশদ আলোচনা হত। উল্লেখ করতে হয়, এইসব আলোচনা তিনি যখন করেছেন, তখন আমাদের দেশের শিল্পী ও শিল্পরসিকরা পশ্চিমের এই আধুনিক বিষয় সম্পর্কে একেবারেই অবহিত ছিলেন না। অর্থাৎ, বিশ দশকের একেবারে গোড়াতে কলাভবনের শিল্পচর্চা দেশের অন্যান্য যে কোনও আর্টস্কুলের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে ছিল। আর কেবল ইতিহাসের আলোচনা নয়, পশ্চিমি শিল্পের উদ্দেশ্য ও আদর্শ, শিল্পীদের কাজের উৎকর্ষ এবং সীমাবদ্ধতার দিকেও ছাত্রদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন। এমনকী পাশ্চাত্য শিল্পের টেকনিকের দিকটাও সমানভাবে আলোচিত হয়েছে স্টেলার ক্লাসে। আর এইসব সম্ভব হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের জন্য। তবে কি তিনি কলাভবনের ক্লাসে কেবল পাশ্চাত্যের আর্টের দিকেই মনোযোগ দিয়েছেন? তা কখনও-ই নয়। বিনোদবিহারী জানিয়েছেন– ‘ভারতীয় শিল্পের অন্তর্নিহিত ভাব অপেক্ষা রূপকল্পনার তাৎপর্য ও আঙ্গিকগত বিচার-বিশ্লেষণ’ ছিল স্টেলার আলোচনার বিষয়। সেদিক থেকে ভারতীয় শিল্পের কথা বলতে গিয়ে তিনি অমরাবতী, অনুরাধাপুরম ইত্যাদি নানা জায়গার ভাস্কর্যের বিচার-বিশ্লেষণ করতেন, সেই আলোচনায় ছাত্র বা অধ্যাপকরাও অংশ নিতেন। অর্থাৎ, ক্লাসে এমন একটা আবহ তৈরি হয়ে উঠত– যাকে আজকের ভাষায় অনায়াসে ‘ইন্টার-অ্যাক্টিভ সেশন’ বলতে পারি।

আপাতদৃষ্টিতে ধরা না-গেলেও শিল্পের অন্দরে একটা ‘abstract’ কাঠামো থাকে। বাংলায় যাকে বিমূর্ত বিন্যাস বলতে পারি। শিল্পের সেই বিশ্লেষণের জায়গাটা ছাত্রদের চোখের সামনে তুলে ধরতেন স্টেলা। ব্যাপারটা সহজে বোধগম্য না-হলে, তিনি নানারকম করে বোঝাতেন। যেমন, সাধারণ একটি ছবিকে সামনে থেকে সোজাভাবেই দেখতে হয়। তখন সর্বাগ্রে প্রধান হয়ে ওঠে ছবির বিষয়। কিন্তু তার নির্মাণের গঠন বা কম্পোজিশনের কাঠামো বুঝতে গেলে ছবিকে ঘুরিয়ে নিতে হয়। কখনও-বা ছবির ওপরের দিকটা উল্টো করে টাঙিয়ে দেখতে হয়। তখন ছবির বিষয় সরে গিয়ে প্রধান হয়ে দাঁড়ায় ছবির আকারের বিন্যাস। ছবির বিমূর্ত ভাব তখন সহজেই নজরে পড়ে, ভেসে ওঠে ছবির আকারগত কাঠামো। ছবিকে বিশ্লেষণ স্টেলা এই পদ্ধতিই ব্যবহার করেছেন। ছাত্রেরাও এই পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে কেবল ছবির বিষয় নয়, সেখান থেকে সরে ছবির কাঠামো সম্পর্কে সহজেই সচেতন হয়ে উঠেছেন। তবে ক্রামরিশের মেজাজ একটু উচ্চগ্রামে বাঁধা থাকত বলে, তাঁর ক্লাস ছাত্রদের কাছে খুব একটা আনন্দদায়ক হয়ে উঠত না। ছাত্রেরা তাঁর কথা বুঝতে না-পারলে মাঝেমাঝেই তিনি মেজাজ হারাতেন– যা কারও কাছেই খুব সুখকর ছিল না। শিক্ষকেরাও আড়ালে তাঁকে নিয়ে রসিকতা করতে ছাড়েননি। এ-প্রসঙ্গে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন বোধ করি সুরসিক অসিতকুমার। এহেন ক্রিটিককে নিয়ে ‘ঘর করা’ যে মহা বিড়ম্বনা, সে-কথা বারেবারে স্বীকার করেছেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথ যদিও স্টেলাকে বেশ পছন্দ করতেন। আর স্টেলা কেবল আর্ট-হিস্ট্রির ক্লাস নয়, আশ্রমের ছোটদের ড্রিল শেখাতেন। ভালো ব্যালে নাচতে জানতেন বলেও জানা যায়। রবি ঠাকুর যে তাঁর শিল্পবোধের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন, তা বোঝা যায় ভাইঝি ইন্দিরাকে লেখা একটি চিঠি থেকে। লিখেছেন– ‘এঁকে (স্টেলা) তোদের ভালোই লাগবে– কেন না এ কথাবার্তা কইতে জানে এবং… প্রসন্ন স্বভাবের। অল্পেই সন্তুষ্ট।… পুরীতে গেলে সেখানকার আর্ট সম্বন্ধে নিত্য তোর সঙ্গে রাত্রি দুটো পর্যন্ত তর্ক হতে পারবে’। যদিও স্টেলার স্বভাবের প্রসন্নতা প্রসঙ্গে কবির ভুল ভাঙতে দেরি হয়নি। তবে স্বীকার করতে হবে, স্টেলার বকুনি সত্ত্বেও কলাভবনের ছাত্রদের যথেষ্ট উপকার হয়েছিল।

গোড়ার দিকে কলাভবনের শিক্ষকরা আড়ালে ক্রামরিশের ওপরে হয়তো খানিকটা বিরক্ত হয়েছেন। তবে স্টেলার দূরদর্শিতা, শিল্পীদের কাজ সম্পর্কে তাঁর সংবেদনশীল মন, তরুণ শিল্পীদের নিজস্ব ভাবনা বা মৌলিকতা আবিষ্কারের প্রসঙ্গে সাগ্রহে সাধুবাদ জানিয়েছেন। একথা বলতে কোনও বাধা নেই যে, ছাত্রদের উদ্ভাবনী শক্তিকে তিনি অনেকটা উসকে দিয়েছেন। ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের মতে– ‘তাঁর নিকটেই য়ুরোপীয় মডার্ন আর্টের যে আলোড়ন তার প্রথম পরিচয় আমরা পেয়েছিলাম।’ এছাড়াও আরেকটা জরুরি কাজ তিনি করেছিলেন, তা হল জার্মানির ‘বাউহাউস’ আর্ট মুভমেন্টের এক আধুনিক এগজিবিশন তিনি আনিয়েছিলেন কলকাতায়। যদিও এর নেপথ্যে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।

zoom
পল ক্লি

১৯২০-’২১-এর দীর্ঘ বিদেশ সফরে রবীন্দ্রনাথ তন্ন তন্ন করে ঘুরে বেরিয়েছেন। সংগ্রহ করেছেন বিপুল সংখ্যক আর্টের বই, ম্যাগাজিন ইত্যাদি। এই সংগ্রহ যেমন সদ্যপ্রতিষ্ঠিত কলাভবনের জন্য, তেমনই তাঁর নিজের ব্যক্তিগত আগ্রহের জন্যেও বটে। কারণ, এর কিছু পরেই তাঁর পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো আশ্চর্য কাটাকুটিতে ভরে উঠবে। যুদ্ধের আবহে বাউহাউসের আর্কাইভ সম্পূর্ণ নষ্ট হলেও, বাউহাউসের কর্তৃপক্ষের দৃঢ় ধারণা রবীন্দ্রনাথের আগ্রহেই ওঁদের কাজ ভারতে এসেছিল। শান্তিনিকেতনে তখন কিছুই সেভাবে গড়ে ওঠেনি, অগত্যা কলাভবনের পরিবর্তে কলকাতার ‘সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট’-এ এই প্রদর্শনীর আয়োজন।

zoom
লিওনেল ফাইনিংগার

সোসাইটির পক্ষে গগন ঠাকুর এই দায়িত্ব সামলেছেন, সঙ্গে ছিলেন স্টেলা ক্রামরিশ। আজও ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়, এখানে পল ক্লি, কান্দিনস্কি, ফাইনিংগার, সোফি কর্নার, জর্জ মুচে ইত্যাদি শিল্পীদের কাজ দেখানো হয়েছিল। কলকাতার বুকে সেই প্রথম আধুনিক পাশ্চাত্য শিল্পের প্রদর্শনী। ‘বিশ্বভারতী কোয়াটারলি’তে এই বিশেষ এগজিবিশনের রিভিউ লিখেছিলেন ও. সি. গাঙ্গুলি। সেটাই আমাদের দেশে প্রথম পশ্চিমি আধুনিক শিল্পের প্রদর্শনী এবং তার রিভিউ, যা প্রকাশ পেয়েছিল শান্তিনিকেতনের কাগজে।

……………………………………………………………………………………

পড়ুন গল্পকলা কলামের অন্যান্য পর্ব

……………………………………………………………………………………

Kala Bhavana Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shantiniketan Stella Kramrisch Viswa-Bharati

Share this article on