Robbar

আন্দোলনের কথকঠাকুর

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 9, 2026 8:28 pm
  • Updated:August 9, 2026 8:46 pm  

জলহীন শুকনো জমির ধুলোয় ভরে উঠেছিল কুয়ো। ফুরিয়ে এসেছিল গাছপালা, ঝোপঝাড়। ইংরেজ আমলে জুটেছিল তকমা একদা সবুজে-ভরা নেমির কপালে– নেমি ডেজার্ট! মরুভূমি! সেই মরুভূমির বুক এখন আবার সবুজে ভরপুর! কোন জাদুবলে? নির্জল দুঃখদশা থেকে এই সজলতা সম্ভব করেছেন নেমির সাধারণ খাটিয়ে মানুষজন, নগর যাঁদের সহজেই বলে ‘অশিক্ষিত’! তাঁদের জহড় তালাব বানানোর উৎসব গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে দিয়েছেন এক অশীতিপর বৃদ্ধ– চরণদাস বাবা। মানুষের স্বপ্ন আর পরিশ্রমের রূপকথার কথকঠাকুর।

জয়া মিত্র

১৭.

একটা বড় বদল যখন হয়, কত জায়গা থেকে কত মানুষ যে তাতে এসে মিলে যান, তার আর হিসেব থাকে না! আবার সেই অন্য মানুষদের যোগদানের দরুন সেই সব নতুন স্রোতের অনেক পথও খুলে যায়। প্রায়ই সেই মানুষদের সঙ্গে হয়তো সেই বিশেষ জাগরণের কোনও যোগ আছে বলে বোঝাও যায় না, বোঝা যায় পরে কখনও। কিংবা যাঁরা দূর থেকে দেখেন, তাঁরা বুঝতে পারেন। সেরকম অনেক মানুষের কথা মনে পড়ে।

রাজস্থানের নেমিতে গিয়েছি বেশ কিছু লোক মিলে। দলসুদ্ধ জন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেখছেন এধার-ওধার। সরকারি ম্যাপে এই জায়গাটিকে এখনও লেখা আছে ‘নেমি মরুভূমি’ (Nemi Desert)। চোখের সামনে কিন্তু দেখছি সামনের পাহাড় ঘন সবুজ গাছপালায় ভরা! আমাদের পায়ের ঠিক সামনে সমতল জমির শেষে একটা উঁচু লম্বা পাথরের পাঁচিল যেন পাহাড়ের পায়ের পাতার ওপরে গাঁথা। তার পিছনে নিচু মাটিতে প্রচুর গাছপালা, একটু দূরে ছোট ছোট ঘরবাড়ি। একটি ছোট জলের ধারা বয়ে যাচ্ছে। কোথা থেকে আসছে এই জল? যদি এত গাছপালা তবে কেন সরকারি নথিতে এই জায়গা মরুভূমি বলে চিহ্নিত?

স্থানীয় যে লোকেরা আমাদের ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন, তাঁদের একজন এক গল্প শোনালেন– একসময়ে রাজা মানসিংহের মহারানি পালকি করে যাচ্ছিলেন এপথ দিয়ে। তখন এখানে ঘন জঙ্গল ছিল। দুপুর রোদে বেহারারা এইখানে পালকি নামিয়ে দেয়। মহারানি বিশ্রাম করেন। বেহারারা জল খায়, একটু জিরোয়। সঙ্গের রক্ষীদলও। পার হয়ে যাওয়ার সময় কোনও রাজপুরুষের মনে হয়– এই এতবড় জঙ্গল থাকতে রাজবাড়ির রসুইয়ের জন্য কাঠের ভাবনা কী? সেই কর্তার হুকুমে শুরু হল গাছকাটা! রাজা বদলালেন, রাজ্য বদলাল। কিন্তু বদলাল না নেমির ভাগ্য! গাছকাটা চলতেই লাগল। কেউ দেখল না যে গাছ ফুরিয়ে আসছে নেমিতে, কমে যাচ্ছে ঝোপঝাড়। নতুন গাছ গজাচ্ছে না। বৃষ্টিকালের জলের সঙ্গে ন্যাড়া হয়ে যাওয়া পাহাড়ের মাটি খসে পড়ছে নিচে। গ্রামের লোকেদের দুর্দশার শেষ নেই। মহারানি বিশ্রাম করেছিলেন বলে সেই জায়গায় যে বিশাল বাঁধানো কুয়ো বানিয়ে দিয়েছিলেন মহারাজা জয়সিংহ, কালে কালে তার জল শুকচ্ছে। শুকনো জমির ধুলোয় ভরে উঠছে কুয়ো। পাড় ভেঙে পড়ছে। শেষ পর্যন্ত ইংরেজ আমলে সেই লজ্জালাঞ্ছন লেখা হল নেমির কপালে– নেমি ডেজার্ট! মরুভূমি! তার আর কাউকে দেওয়ার কিছু নেই, পালন করার কোনও ক্ষমতা নেই!

সেইখান থেকে তাহলে কী করে দেখা দিল আজকের এই নেমি? যাকে ভারতের নানা প্রান্ত থেকে আমরা দেখতে এসেছি জলরক্ষার অপূর্ব উদাহরণ বলে? নির্জল দুঃখদশা থেকে এই সজলতা সম্ভব করেছেন নেমির সাধারণ খাটিয়ে মানুষজন, নগর যাঁদের সহজেই বলে ‘অশিক্ষিত’!

দিল্লির অনুপম মিশ্র ছিলেন সঙ্গে। বা বলা ভালো যে, তিনিই আমাদের নিয়ে এসেছেন এই জায়গা দেখাতে। দেখলাম তাঁকে এখানে সকলেই চেনেন। আপনলোকের মতো, আত্মীয়ের মতো সবাই কথা বলছিলেন এগিয়ে এসে। অনুপমজি জিগ্গেস করলেন, ‘বাবাজি হ্যায় না?’ অনেকেই একসঙ্গে বলে উঠলেন, ‘আছেনই তো। এখুনি আসবেন।’ তাঁদের বলা শেষ হওয়ার আগেই দেখা দিলেন সেই মানুষটি, যাঁকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন অনুপম।

অতি শীর্ণ, কালো, প্রায় ন্যুব্জদেহ। পরনে সাদা ধুতি চাদর। মাথার বিশাল রাজস্থানী পাগড়ির নিচে সাদা চুল। বড় একটি গাছের ছায়ায় ‘দরি’ মানে শতরঞ্জির ওপরে বসলে হাতে হাতে এল মাখন তুলে নেওয়া দুধের ঘোল ভরা গ্লাস যাকে এখানে বলে মাঠা। এখানে যেকোনও জ্ঞানী মানুষকেই বলা হয় ‘বাবা’। কিন্তু এঁর নাম ‘চরণদাস বাবা’ কেন?

শিল্পী: শান্তনু দে

নিজেই বললেন হেসে হেসে, এখান থেকে জয়পুর হল ন’টা পাহাড় পার হওয়া পথ। আট থেকে ১২ দিন লাগে পায়ে হেঁটে যেতে। চলে চলে, মানে হেঁটে যান বলে নাম হয়ে গিয়েছে চরণদাস বাবা। কিন্তু কেন হাঁটেন এখন? এখন তো জয়পুর-নেমি বাস হয়ে গিয়েছে, তিন ঘণ্টায় পৌঁছে দেয়। সে তো জয়পুর শহরে পৌঁছায়। কিন্তু বাবা তো আসেন জয়পুর শহর নয়, আশপাশের সব ছোট ছোট পাহাড়ি গ্রাম ঘুরে ঘুরে। অনেক কাল আগে, নিজের কিশোরপ্রায় বয়সে, সেইসব গ্রামে ঘুরে ঘুরে সামান্য সব গৃহস্থালি জিনিস বিক্রি করতেন আজকের এই বৃদ্ধ। গ্রামগুলির মধ্যে এ-গাঁয়ের মেয়ের ও-গাঁয়ে বিয়ে হয়ে যায়। তারপর কবে বা বাড়ি ফেরে সেই ছোট ছোট মেয়েরা? মা বাবার জন্য, ঘরবাড়ি গাছপালার জন্য,  বাবার বাড়ির ভেড়া ছাগলদের জন্যও, তাদের মন কেমন করে। কান্না পায়। ফেরি করতে করতে সেই কাজও হত, মা-বাপের কাছে মেয়েদের ভালোমন্দ খবর দিয়ে আসা, আবার মেয়েদের সসুরালে গিয়েও দিয়ে আসা তাদের মা-বাপের খবর। সে মানুষের বাপ-মায়ের দেওয়া ‘মোহনিয়া’ নাম কবে ভুলে গেল লোকে, কখন থেকে তিনি হয়ে গেলেন সেইসব দূরগ্রামের ছোটবড় গৃহস্থালির আপন গুরুজন, চরণদাস বাবা– সে-কথা তাঁর নিজেরও মনে নেই!

এইসব গ্রামে পাহাড়ে তো আর রোজ নতুন কিছু ঘটে না শহরের মতো। অমনি করেই পার হয়ে গিয়েছে বছরের পর বছর। যে মেয়েরা কাঁদতে কাঁদতে সসুরাল এসেছিল, তাদের মেয়েদেরও বিয়ে হয়ে গেল। ছেলেরা ‘সয়ানা’ হল। চরণদাসজিরও বয়স বাড়ল অনেক। মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছে। ঝুঁকে গিয়েছে শরীরও। তারই মধ্যে আবার নতুন করে গ্রাম থেকে গ্রামে খবর পৌঁছনোর উৎসাহ পেয়েছেন তিনি। গত ১২-১৫ বছর ধরে অদ্ভুত কাজ হচ্ছে এধারে-ওধারে। ভাঁবতা-কোলিয়ালা গাঁয়ে জলের কষ্ট ছিল খুব। সে গাঁয়ের আশপাশে ছোট ছোট নদী আছে। কী সুন্দর তাদের নাম– ‘অরাবরী’ আর ‘রূপারেল’। কিন্তু জল থাকে না তাতে। একসময়ে হয়তো থাকত, এখন সেই বর্ষারদিনে ৫০-৬০ দিন জল, বাকি বছর সুখা। লোকেদের কষ্টের শেষ থাকত না। নিজেদের স্নান কাপড়লত্তা ধোয়া বাদ দাও, রান্না খাওয়ারও তো জল লাগে। ভেড়াছাগলের জল লাগে। বছরভরের খাবার– যব-বাজরা মকাই– যত কমই হোক, সেচ লাগে তারও। দূর কুয়ো থেকে মাথায় কাঁখে করে কত জল বওয়া যায়! তো গাঁয়ের জোয়ানরা বসল বুড়া-বুজুর্গদের সঙ্গে। মনে করার চেষ্টা শুরু হল পুরনো কথা– কী করে জল আসত গাঁয়ের পুকুর-তালাওয়ে? শহর থেকে কিছু ছেলেরা এসেছে, তারাও জানতে চায় সেই সব কথা। কথায় বলে পাঁচজনের চেষ্টার মধ্যে ভগবান বসেন। ক্রমশ মনে পড়ল জোহড়-তালাওয়ের কথা।

ঢালু জায়গা দিয়ে যখন বৃষ্টির জল গড়িয়ে আসে, সঙ্গে চলে আসে পাহাড়ধোয়া মাটি। সমস্ত নরম মাটি বছরে বছরে ধুয়ে গিয়ে বাকি থাকে শুধু কাঁকুরে পাথরের ঢাল। জলও চলে যায় আর বয়ে নামা মাটিতে নদীগুলো আরও ভরে ওঠে। শুরু হল ভুলে যাওয়া পুরনো কাজ নতুন করে করা। উঁচুনিচু জমির যেখান দিয়ে জল গড়িয়ে আসে, ঠিক সেই জায়গাগুলোকে খুঁজে বার করা। সেই কাজের ওস্তাদ লোকেরা সমাজেই ছিলেন। যে-কোনও মাঠের কিংবা ঢালের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে ঠিকঠাক বলে দিতে পারেন কোনখানে ঢাল বেশি। পাথর জড়ো করে, তার সঙ্গে কাদা মিশিয়ে সেইখানে পাঁচিল দেওয়া শুরু হল। নিচু করে, দু’আড়াই হাত মাত্র উঁচু, কিন্তু ধনুকের মতো বাঁকা করে। যতটুকু জল পড়ল বারিষের সময়, তা আটকালো না বটে, কিন্তু জলের সঙ্গে আসা মাটি আটকে গেল সেই ছোট ছোট ধনুকাকৃতি দেওয়ালের পিছনে।

শিল্পী: শান্তনু দে

তিন বছর ধরে এই কাজ করেছে ওখানকার লোক, দিনরাত মেহন্নত করেছে পালিয়ে যাওয়া নরম মাটিকে জমিতে ধরে রাখার জন্য। তিন বছরের পর থেকে তার ফল দেখা যাচ্ছে। এই তিন-চার বছরে দেওয়ালগুলো আরও বড় করেছে লোকে। তৈরি করেছে আরও বেশি জায়গায়। তার পিছনে আটক হওয়া মাটিতে ঘাস বেরিয়েছে, অনেকখানি জায়গা জুড়ে। বেরিয়েছে গাছের চারা। যতটুকু জল আটকা পড়ে, তা চলে যায় মাটির নিচে। যে জল ঢাল থেকে নামে, তাও নদীতে যায়। নিচু জায়গা দেখে ছোট ছোট কয়েকটা তালাব বানানো হয়েছে। বর্ষার পরও কিছুদিন জল থাকে সেগুলোতে। রোদে শুকোয় ঠিকই, মাটির নিচেও শুষে যায় কিছুটা।

এরপর কাছাকাছি গ্রামগুলোয় যেন ওই জহড় তালাব বানানোর উৎসব পড়ে গেল। মায়েরা, মেয়েরা, এমনকী ভেড়াচরানো ছেলের দলও যেখানে যেমন পারে, পাথর জড়ো করে দেওয়াল বানাচ্ছে আর মাটি ধরে রাখছে। এই খবর জানার পর, চোখে দেখার পর কি সকলের কাছে সে আশ্চর্য কথা না বলে থাকা যায়? বাবাজি তাই এখন আবার চরণদাস হয়েছেন। ভাঁবতা-কোলিয়ালার খবর গ্রামে গ্রামে পৌঁছে চলেছেন আজ প্রায় সাত-আট বছর ধরে। কম বৃষ্টির পাথুরে দেশে নানা গ্রামে গ্রামে যেন উৎসবের মতো ছড়িয়ে পড়েছে এই জল আর মাটি ধরে রাখার আন্দোলন।

তারই এক চেহারা, এক অকল্পনীয় চেষ্টা আর পরিশ্রমের ফল আমরা দেখছি এই নেমিতে– ওই পাহাড়ের জঙ্গলে ঢাকা মাথার নিচে আছে পাথরকাদার লম্বা পাঁচিল। সাত বছর ধরে ওইখানে আটকানো জল আর মাটি ওখানে অত গাছ তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গে মাটির গা বেয়ে যে জল আর আর্দ্রতা, ওঁদের ভাষায় ‘নমী’, দেখা দিয়েছে তার দান আমাদের পায়ের সামনে পাহাড়ের পায়ের পাতার ওপরে গাঁথা ধনুকাকৃতি পাঁচিলের পিছনে বসা গ্রাম। খেত। মাটির শ্যামল আঁচল। এত মানুষের স্বপ্ন আর পরিশ্রম এক রূপকথার মতো বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে বয়ে নিয়ে গিয়েছেন ওই শ্যামলবাহক মানুষটি– বাবা চরণদাস।

……………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন ধুলোমাটির মুখ-এর অন্যান্য লেখা

……………………..