about the aesthetics of presenting rabindra sangeet | Robbar
Robbar
  • ৬ কার্তিক ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ২৪ অক্টোবর ২০২৬

রবীন্দ্রগানের সমৃদ্ধি ও শ্রী

‘সম্পত্তি’ আর ‘শ্রী’, রবীন্দ্রনাথের চোখে এক নয়। আর সঙ্গতযন্ত্রের সংখ্যা বাড়লেই যে গানের শ্রী বাড়ে না, সেটা হালফিলের বিশ্বভারতীর (এবং অনেক শহুরে অনুষ্ঠানের) রবীন্দ্রগানের বা নাচের আসরের দু’-জোড়া তবলা, চারটি এসরাজ দেখে ও শুনে বিলক্ষণ টের পাওয়া যায়। রবীন্দ্র-উত্তর শান্তিনিকেতন এবং শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সঙ্গতঘরানা তানপুরা এসরাজ তবলা খোল মন্দিরা সমন্বিত একটি ‘খাঁটি রাবীন্দ্রিক’ সঙ্গতচিত্র এঁকে দিয়েছে আমাদের মনে। কিন্তু তা কতটা খাঁটি?

শেষ আপডেট: অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ১৫:৫৫   
Facebook WhatsApp Messenger

অখিল: না কাকি, ঠাট্টা না– আমি ভাবছি ওঁকে যদি একটা হারমোনিয়ম পাঠিয়ে দিই তাতে কি তোমাদের–
মাসি: কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু ও তো হারমোনিয়ম ভালোবাসে না।
অখিল: গানের সঙ্গে?
মাসি: গানের সঙ্গে এসরাজ বাজায়।
অখিল: তাহলে এসরাজই না হয়…
মাসি: ওর তো আছে এসরাজ।
অখিল: না হয় আরেকটা হল। সম্পত্তি বাড়িয়ে তোলাকেই তো বলে শ্রীবৃদ্ধি।

‘গৃহপ্রবেশ’ গল্পে এক আসন্ন মৃত্যু আর দাম্পত্য অপ্রেমের আবহে রবীন্দ্রনাথ রাখছেন এই সংলাপ। সংলাপের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গান-গাওয়া মেয়ে। গল্পে তার নাম হিমি। মনে হতে পারে এই উদ্ধারটুকু হয়তো এক কথামুখ, রবীন্দ্রনাথের গানের আঙিনায় ‘কলটেপা সুরের’ যন্ত্র হারমোনিয়াম না শ্রুতিবাহী এসরাজ, এই প্রাচীন বিরোধের পুনরালোচনা। সে বিষয়ে বিশদে লিখেছেন অনেকেই, শান্তিদেব ঘোষ থেকে সুভাষ চৌধুরী। আমাদের দেশে শ্রুতিবিদ্যা এবং গুরুমুখী বিদ্যা, তাই স্বর কণ্ঠকে সুসঙ্গ দিলে স্বরসঙ্গত বা রেফারেন্স হিসেবে গাইয়ে কোন যন্ত্রকে আশ্রয় করে গান কণ্ঠে নেবেন, সেটা খুব জরুরি থাকে না দরদি গায়নে। বরং এই লেখার কেন্দ্রে আসুক একটি গহীন রাবীন্দ্রিক ইশারা, যে ইশারা রয়ে গিয়েছে উপরের টেক্সট-উদ্ধারে। মাসিমা বলছেন, হিমির তো এসরাজ আছে। প্রণয়ী অখিল বলছে, আরেকটি হলে সম্পত্তি বাড়ে এবং তাতে শ্রীবৃদ্ধি হয়। ‘সম্পত্তি’ আর ‘শ্রী’, রবীন্দ্রনাথের চোখে এক নয়। আর সঙ্গতযন্ত্রের সংখ্যা বাড়লেই যে গানের শ্রী বাড়ে না, সেটা হালফিলের বিশ্বভারতীর (এবং অনেক শহুরে অনুষ্ঠানের) রবীন্দ্রগানের বা নাচের আসরের দু’-জোড়া তবলা, চারটি এসরাজ দেখে ও শুনে বিলক্ষণ টের পাওয়া যায়। রবীন্দ্র-উত্তর শান্তিনিকেতন এবং শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সঙ্গতঘরানা তানপুরা এসরাজ তবলা খোল মন্দিরা সমন্বিত একটি ‘খাঁটি রাবীন্দ্রিক’ সঙ্গতচিত্র এঁকে দিয়েছে আমাদের মনে। তানপুরা প্রসঙ্গে শান্তিদেব ঘোষ জানাচ্ছেন, ‘গুরুদেবের তিরোধানের পূর্ব পর্যন্ত গুরুদেব পরিচালিত সঙ্গীতানুষ্ঠানে বা নাট্যানুষ্ঠানের গানের সঙ্গে কখনও তানপুরা বাজে নি।’ (জীবনের ধ্রুবতারা)

zoom
রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিদেব ঘোষ

এই প্রসঙ্গে এই একই অধ্যায়ে তিনি লিখছেন, ‘গুরুদেবের গানের সঙ্গে কোন যন্ত্র বাজানো উচিত বা অনুচিত, এই বিষয়ে গুরুদেব নিজে কোনও নির্দেশ লিখিতভাবে বা মৌখিক কাউকেই কখনও দিয়ে যান নি। আকাশবাণীতে হারমোনিয়াম যন্ত্র বাজানো বন্ধ করবার আন্দোলনের সমর্থনে যে চিঠি দিয়েছিলেন, তাতে কিন্তু পরিবর্তে আর কোন যন্ত্র বাজবে তার কোনো নির্দেশ নেই। এসরাজ ও তানপুরা তো নয়ই। গুরুদেব যেমন এ বিষয়ে কিছু বললেন না, দিনেন্দ্রনাথ, ইন্দিরা দেবীও কেবল তানপুরা ও এসরাজ বিষয়ে একটি কথাও বলেন নি।’ আর একটি রীতি রবীন্দ্রসংগীতের তালসংগতের ক্ষেত্রে প্রায় নিত্যসিদ্ধ হয়ে গিয়েছে যে, রবীন্দ্রনাথের যে কোনও লোকজ সুরের গানে খোল বাজবে। সে বাউল ভাবের গানই হোক বা জারিগানের সুরে লেখা ‘এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে’ গানেই হোক। শ্রীখোল যে কীর্তনের তালযন্ত্র এবং বাউলের গানের তালযন্ত্র যে খমক বা ডুগি, সেই কথাটি প্রায় ভুলিয়ে দিয়ে রবীন্দ্রনাথের বাউল-অঙ্গের গানে খোল বাজানো একটি বিশেষ সমাজনির্মিত একটি আগমার্কা ‘রাবীন্দ্রিক’ রীতিতে পরিণত হয়েছে। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্র-তিরোধানের ঠিক কতদিন পর থেকে– নাচের বা বিনা নাচের গানে, শুধুমাত্র সঞ্চারীতে খোল বেজে ওঠার একদা-চমকটি কবে থেকে যে একটি অমোঘ আচারে পরিণত হল– সেটা খুঁজে বের করা কঠিন। নাচ ও তালে সিদ্ধ শান্তিদেব মনে করতেন, ভালো তালবাদক যে কোনও যন্ত্র নিয়েই যে কোনও গানকে সার্থক সঙ্গ দিতে পারেন। তিনি যেমন অনাদিবাবুর খোলের সঙ্গে একটানা গেয়েছেন নানা আঙ্গিকের গান, তেমনই শুধু বাঁয়া-তবলা নিয়েও বাউল ও নানা লোকসুরের গান গেয়ে আসর জমিয়ে দিয়েছেন। সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠে ‘আগুনের পরশমণি’ গানের রেকর্ডে শ্রীখোলের বোলবাণীর সঙ্গত গানটিকে নিয়ে গিয়েছে এক অপ্রত্যাশিত আধ্যাত্মিক উচ্চতায়। তেমনই কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেকর্ডে ‘দে লো সখী দে’ গানটিতে পিয়ানো ও শ্রীখোলের যুগ্মবাদন এক অনুপম তালচিত্র তৈরি করেছে। নয়ের দশকে বাউল গড়নের ‘আমার প্রাণের মাঝে সুধা আছে চাও কী’ গানে খমক ব্যবহার করে অপূর্ব ব্যঞ্জনা রচনা করেছিলেন পল্লব কীর্তনীয়া। আবার ‘আগন্তুক’ ছবিতে শ্রমণা গুহ ঠাকুরতার প্লে-ব্যাকে জোয়ারিময় তানপুরার আওয়াজ মিশে যায় ছবিতে হাতে তানপুরা নিয়ে ডিভান এ বসে গাইতে থাকা মমতাশঙ্করের শাড়ির ছড়িয়ে পড়া কুচির ভাঁজে। এই লেখাটির শুরুতে সম্পত্তি আর শ্রী-এর যে উল্লেখ, একটি সম্পদশালী পরিবারে সাধারণ তাঁতের শাড়িতে ওই তানপুরার জোয়ারি যেন সেই বাইনারিটিকে উজ্জ্বল করে তোলে। তেমনই সত্যজিৎ রায়ের সংগীতভাবনায় ‘চারুলতা’ এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পরিকল্পনায় ‘কুহেলি’ ও ‘দাদার কীর্তি’ ছবিতে রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গতযন্ত্র হিসেবে পিয়ানো হয়ে ওঠে ‘চরিত্র’, চোখ বন্ধ করে রেকর্ড শুনলেও পিয়ানোর সেই চারিত্র ধরা পড়ে আমাদের কানে।

zoom
‘দাদার কীর্তি’ ছবিতে পিয়ানোর সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করছেন দেবশ্রী রায় ও মহুয়া রায়চৌধুরী

‘শৈবাল, একটা জিনিস দ্যাখো’, নিজের রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ডে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আয়োজনহীন যন্ত্রসঙ্গত প্রসঙ্গে আমার প্রশ্নের উত্তরে বলতে থাকেন শ্রীকান্ত আচার্য, ‘আমি অভিজিৎকাকা (বন্দ্যোপাধ্যায়) ও আরও অনেকের মুখে শুনেছি খুব বিস্তারিত অ্যারেঞ্জমেন্টের পক্ষে ছিলেন না হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। মুখে না কি বলতেন– আমাকে দিয়ে ওসব হবে না। আসলে কী জানো, হেমন্তবাবু নিজের গলার ব্যাপারে এতটাই কনফিডেন্ট ছিলেন যে, জানতেন কোথায় কীভাবে গলাটা ফেললে গান উতরে যাবে। গানে মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট জিনিসটা তো বিলিতি। এবং বাংলা গানে সেটা প্রকৃত অর্থে নিয়ে আসেন সলিল চৌধুরী। হেমন্তবাবু নিজে কিন্তু অতটা এলাবোরেট অ্যারেঞ্জমেন্ট করেননি কখনও নিজের গানের পরিসরে।’ শ্রীকান্তদার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই দু’টি প্রশ্ন উঁকি দেয় ভিতরে। এক, সলিল চৌধুরী কেন রবীন্দ্রসংগীতের জন্য কোনও বিশেষ যন্ত্রায়োজন করলেন না? অথচ একজন কালজয়ী কম্পোজার হিসেবে প্রথা ভাঙার অনেকটা প্রাণনা তিনি তো নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে! দুই, ‘এই রাত তোমার আমার আমার’ গানের গায়ে পুলক লাগা শিস ব্যবহার করা পথ-ভাঙা সুরকল্পক হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কাছাকাছি সময়ে রেকর্ড করা নিজের রবীন্দ্রসংগীতগুলিতে কোনওরকম ইন্টারলিউড প্রিলিউড ব্যবহার করলেন না কেন? তাঁকে কেন কেউ জিজ্ঞেস করলেন না এই প্রশ্ন? না কি সলিল বা হেমন্ত নিজেরা খুব বড় কম্পোজার হিসেবে রবীন্দ্রনাথের সুরের কম্পোজিশনের মাঝে কোনও সুরস্বাক্ষর রাখা থেকে দূরে রেখেছেন নিজেদের? যা রাখেননি উত্তরকালে কবীর সুমনের মতো অত্যন্ত দক্ষ সংগীতসৃজক? আবার এ-ও তো ভুলে গেলে চলবে না– আমাদের সময়কালে আব্রাহাম মজুমদারের বিপুল আয়োজনে (টেগোর সিম্ফনি) রবীন্দ্রনাথের গানের এক অভূতপূর্ব উন্মোচন আমাদের আবিষ্ট করেছে, নতুন করে ভেঙে দিয়েছে এসরাজ তানপুরা খোল মন্দিরার পুরাণটিকে? আবার এই কথাটিও বা কেমন করে ভুলি যে, দেবব্রত বিশ্বাসের রেকর্ড বলতেই আমাদের মনে আসে প্রথা ভাঙা নানা যন্ত্রের ঐকতান, ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমল গান্ধার’ ছবিতে সেই দেবব্রত বিশ্বাসের ‘আকাশভরা সূর্য তারা’ গানটিকে শুরু থেকে গাঢ় সখ্যে জড়িয়ে থাকে এক আশ্চর্য তানপুরা?

zoom
‘কোমল গান্ধার’ ছবিতে দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে অনিল চ্যাটার্জির লিপে ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’-র দৃশ্যায়ন

যে গল্পের উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু হয়েছিল এই লেখা, সেই গল্পের গান-গাওয়া মেয়ে হিমির কণ্ঠে গল্পের খুব গভীর সন্ধিক্ষণে একটি গান রাখেন রবীন্দ্রনাথ। যে মেয়েকে একটি বাড়তি এসরাজ উপহার দিলে সম্পদ ও শ্রী দুই-ই বৃদ্ধি পাবে বলে তার প্রণয়প্রার্থী বিশ্বাস করে, সেই মেয়ে গায়:

‘পুরানো ভাঙা দিনের ঢেলা
তাই দিয়ে ঘর গড়ি।
যে আমার নিত্যখেলার ধন
তারি এই খেলার সিংহাসন…’

রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে সুরের খেলা বড় দূরের খেলা হয়তো। তবুও সে এক আশ্চর্য খেলাঘর।

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন ঠাকুরঘরানা-র অন্যান্য পর্ব

………………………

Debabrata Biswas Kabir suman Rabindranath Tagore rabindrasangeet Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shailaja Ranjan Shantideb Ghosh Shrikanta Acharya

Share this article on