Robbar

কিম্ভুতকিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 10, 2026 7:44 pm
  • Updated:March 10, 2026 7:54 pm  

প্রচল নাম ‘কাকতাড়ুয়া’। গ্রামীণ সহজিয়া কৃষি-সহায়ক। কাক কিংবা অন্যান্য পশুপাখিকে ভয় দেখানোর জন্য কিম্ভূত-কিমাকার মানুষের প্রতিকৃতি। খেতের ফসল রক্ষা কিংবা বীজের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চাষিরা প্রায়শই ব্যবহার করেন। ফসলি জমির মধ্যে একটি লাঠি গেড়ে দিয়ে, আড়াআড়ি আরেকটি লাঠি মাঝ-বরাবর বাঁধা। তারপর খড়কুটো এবং ছেঁড়াখোঁড়া জামাকাপড় পরানো। মাথা হিসাবে লাগানো কালো হাঁড়ি। তার মধ্যে চুন দিয়ে চোখ এঁকে দিলেই হয়ে গেল ‘নকল মানুষ’ কাকতাড়ুয়া। 

স্বপনকুমার ঠাকুর

২৩.

সত্যজিৎ রায়ের ছবি ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’। বেসুরো গলায় গান শুনে ক্ষুব্ধ রাজামশাই আমলকী গাঁ থেকে গুপীকে দূর করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। গাধার পিঠে চেপে চলতে চলতে গুপীর কোমর যখন ধরে গেল, তখন সে নেমে পড়ল মাঝমাঠে।

সূর্য অস্তমিত হচ্ছে। চারদিক শুনশান। কিছুটা দূরে দেখা যাচ্ছে বিচিত্র এক মূর্তি। দু’-হাত প্রসারিত। কালো জামা। কেলে হাঁড়ি মাথা। সাদা রঙের ড্যাবড্যাব করছে দুটো গোল্লা পাকানো চোখ। ভৌতিক বাঁশবনে সংঘটিত রুদ্ধশ্বাস নাটকীয় ঘটনাবলির সাংকেতিক প্রচ্ছদ যেন রহস্যময় মূর্তিটি। চমৎকার শিল্পভাবনা।

গুপী গাইন বাঘা বাইন(১৯৬৯) ছবির সেই বিশেষ দৃশ্য

প্রচল নাম ‘কাকতাড়ুয়া’। গ্রামীণ সহজিয়া কৃষি-সহায়ক। কাক কিংবা অন্যান্য পশুপাখিকে ভয় দেখানোর জন্য কিম্ভূত-কিমাকার মানুষের প্রতিকৃতি। খেতের ফসল রক্ষা কিংবা বীজের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চাষিরা প্রায়শই ব্যবহার করেন।
ফসলি জমির মধ্যে একটি লাঠি গেড়ে দিয়ে, আড়াআড়ি আরেকটি লাঠি মাঝ-বরাবর বাঁধা। তারপর খড়কুটো এবং ছেঁড়াখোঁড়া জামাকাপড় পরানো। মাথা হিসাবে লাগানো কালো হাঁড়ি। তার মধ্যে চুন দিয়ে চোখ এঁকে দিলেই হয়ে গেল ‘নকল মানুষ’ কাকতাড়ুয়া। ধানের বীজতলায়, আলুর খেতে, বেগুনের জমিতে কাকতাড়ুয়াকে হামেশাই চোখে পড়ে।
আরেক ধরনের কাকতাড়ুয়া আছে। সেটি অবশ্য লাউ-কুমড়োর মাচানে গেঁয়ো গেরস্থরা ব্যবহার করেন। সেখানে লাঠি বা জামাকাপড়ের প্রয়োজন হয় না। শুধুমাত্র কেলে-হাঁড়ির ওপরে চোখমুখ এঁকে দিয়ে মাচানে দিলেই হয়ে গেল।

এই ধরনের মাটির বাড়ির ঈশানকোনে ঝোলানো থাকে কলসির কানা কচ্ছোপের খোল। ছবি: অপূর্ব ব্যানার্জী

এর নাম কিন্তু কাকতাড়ুয়া নয়– চুন-খোলা। খোলা বা কলসির কানা-সহ কচ্ছপের খোল, ছেঁড়া জুতো এবং মুড়ো ঝাঁটা– নতুন বাড়ি তৈরির সময় বাড়ির ঈশান কোণে টাঙিয়ে দেওয়া প্রথা। পরে বাড়িতে বসবাস করার সময় থেকে ঝাঁটা ও জুতো খুলে দেওয়া নিয়ম। স্থানিক নাম ভিন্ন হলেও এসবের মূলে রয়েছে কালা জাদুর টোটকা।

কালা জাদুতে জড়িয়ে থাকে নানা উপাচার। (প্রতীকী ছবি)

কাক নয়। তবু তার নাম কাকতাড়ুয়া। আবার কাক যে ফসলের খুবই অনিষ্টকারী পাখি– একথাও বলা যায় না। তাহলে মানুষের মতো দেখতে কিম্ভুত কিমাকার মূর্তিটিকে ‘কাকতাড়ুয়া’ বলার যৌক্তিকতা কোথায়?

আবার শুধু বাংলায় নয়, বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই ফসল রক্ষায় মানবাকৃতি পুতুলের ব্যবহার রয়েছে। এবং সেগুলিকেও কাকের সঙ্গে যুক্ত করে ‘Scarecrow’ নামকরণ করা হয়েছে। তবে কি জমির ফসল রক্ষা বা অনিষ্ট করার হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ায় কাকের কোনও প্রাচীন ভূমিকা ছিল?

কুছ তো হ্যায়!

জমির ফসল বাঁচানোর জন্য চাষিরা এখনও মরা কাক অনেক সময় জমিতে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়। এর ফলে অন্যান্য পাখি সেই মরা কাক দেখে খুব ভয় পায়। সেই কারণেই এর নাম ‘কাকতাড়ুয়া’ হয়েছে বলে মনে হয়। এভাবে ভাবলে বিষয়টা সহজ হলেও গলায় বেঁধা কাঁটার মতো প্রশ্নটা অনেকের মনে খচখচ করবে: কাকের প্রতিকৃতি না-করে মানবাকৃতি করা হল কেন?

গ্রামবাংলার মাঠেঘাটে আকচার চোখে পড়ে নানা ধরনের কাকতাড়ুয়া

এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব পাওয়া যায় না। বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতিবিদ ওয়াকিল আহমেদ তাঁর ‘বাংলার লোকসংস্কৃতি’ গ্রন্থে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন, পূর্বে জমিতে ভূমির ঊর্বরতা বৃদ্ধি ও প্রজনন শক্তির কামনায় নরবলি দেওয়ার প্রথা ছিল। সেই বলিকৃত নরটিকে জমির মধ্যে পুঁতে দেওয়া হত। (পৃ-২৪৮)

স্বাভাবিকভাবে অনুমান করা যায়, হয়তো সেই মৃতের আত্মাই জমির ফসল রক্ষা করত এমন লোকবিশ্বাস আদিম সমাজে তৈরি হয়েছিল। সম্ভবত সেই কারণেই এমন কিম্ভুত কিমাকার ভৌতিক মানবাকৃতি পুতুলের উদ্ভব হয়েছিল। তাহলেও প্রশ্ন ওঠে, এখানে কাকের ভূমিকা কোথায়?

চুন-খোলায় সাংকেতিক আঁকিবুঁকি (১)

‘কাকতাড়ুয়া’ অর্বাচীন শব্দ। সব জায়গায় প্রচলিত নেই। ওয়াকিল সাহেব কাকতাড়ুয়া-কেন্দ্রিক দু’টি শব্দের কথা তাঁর গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। বরিশাল জেলায় বিষয়টির নাম ‘ভগগা’ দেওয়া। এবং রঙপুরে বলে ‘আচাভুয়া’। ওয়াকিল সাহেবের গ্রন্থে ধৃত ড. মুহম্মদ এনামুল হক ‘ভগগা’ শব্দটির সঙ্গে স্লাবনিক বোগু, স্কটল্যান্ডের বোগগার্ড, ওয়েলেশের বোগ, ইংরেজি ‘বগি’ এবং সংস্কৃত ‘ভগ’ শব্দের মিল দেখিয়েছেন।

‘ভগ’ শব্দের অর্থ সূর্য বা ভগবান। ‘ভাগ্যে ভোগগা’ শব্দদু’টি একসঙ্গে উচ্চারিত হয় সৌভাগ্য অর্থে। আবার বাংলাভাষায় ফাঁকি বা প্রতারণা অর্থে ‘ভোগা’ শব্দের ব্যবহার আছে। অতএব, ‘ভগগা দেওয়া’ হতে পারে লক্ষ্মীর সৌভাগ্যলাভ বা ফসল অনিষ্টকারী পশুপাখিকে ধোঁকা দেওয়া।

কাকতাড়ুয়া

‘আচাভুয়া’ শব্দের নানা অর্থ রয়েছে যেমন অদ্ভুত কিম্ভুত কিমাকার আবার অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন ওঝা বা বুজরুককেও নির্দেশ করে। এই অর্থে বিজয় গুপ্ত তাঁর ‘মনসামঙ্গল কাব্য’-এ লিখেছেন,

ওঝা ধন্বন্তরি বেটা বড়ো আচাভুয়া।
হুঙ্কারে জীয়াইল বেটা যত কাটা গুয়া।।

‘আচাভুয়া’ এক ধরনের লৌকিক আভিচারিক ক্রিয়া। এর সঙ্গে আচাভুয়ার যেমন যোগ আছে তেমনই কাকেরও প্রসঙ্গ রয়েছে। আভিচারিক ক্রিয়ার অন্যতম উপাদান কাক। কালা যাদু বা আভিচারিক ক্রিয়া আসলে শত্রুনাশ করার জন্য কার্য্যানুষ্ঠান। মারণ স্তম্ভন, বিদ্বেষণ, উচাটন, বশীকরণ– ছয় প্রকার হিংসাত্মক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ক্রিয়া বামাচারী তান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়।

দেবী ধূমাবতী ও রথের মাথায় থাকা কাকের দল, প্রাচীন লিথোগ্রাফ

উচাটন ক্রিয়ার, বিশেষ করে ধূমাবতীর সাধনায় কাকের যোগ রয়েছে অনিবার্যভাবে। ‘তন্ত্রসার গ্রন্থে’ বলা হয়েছে, উচাটন করার জন্য শ্মশানে বা যজ্ঞস্থলে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে একটি কাককে আহুতি দিতে হবে। কাকের ছাই শত্রুর বাড়িতে নিক্ষেপ করলে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির সমূহ ক্ষতি হবে।

দ্বিতীয়ত, নিমপাতার সঙ্গে কাকের পালক মিশিয়ে ধূমাবতীর মন্ত্র জপ করলে শত্রুর নিধন হবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে ‘Eradicated with Blood: Text and Context of Animal Sacrifice in Tantric and Tantra-Influenced Rituals-Xenia Zeiler,’ (p-no-171) নামক প্রবন্ধে।

Xenia Zeiler এর লেখা গবেষণাপত্র। Springer-এর সৌজন্যে

হয়তো খেতের ফসল রক্ষা করার জন্য পূর্বে ওঝারা এই ধরনের আচাভুয়া বা কাকবলি দিতেন। পরবর্তীকালে কাকের অনুষঙ্গ শিথিল হয়ে লুপ্ত হয়েছে। শুধু মাত্র ‘কাকতাড়ুয়া’ নামে টিকে আছে। মঙ্গলকোট অঞ্চলে চাষিরা ফসল রক্ষায় যে কাকতাড়ুয়া দিতেন তার নাম ‘কেত দেওয়া’ বা ‘কেতে দেওয়া’। শব্দটির মূলে রয়েছে বৈদিক কৃত্যা।

‘কৃত্যা’ শব্দের অর্থ হল ক্রিয়া কার্য বা জাদু। অপর নাম ‘কালাজাদু’। অথর্ব বেদে বর্ণিত কালাজাদুর ফলে সৃষ্ট পিশাচী বা রাক্ষসী যখন ব্যক্তিগত শত্রু নিধন করার কাজে প্রেরিত হত তখন তার নামকরণ হত ‘কৃত্যা’। অথর্ব বেদের একাধিক সূক্তে কালা জাদুবিদ্যার প্রয়োগ করে অপরের ক্ষতিসাধন করার বর্ণনা আছে।

চুন খোলায় সাংকেতিক আঁকিবুঁকি (২)

যেহেতু আভিচারিক কর্মটি ছিল গতিহীন, সেই কারণে সে-যুগের মানুষ মনে করতেন, আভিচারিক কর্মে প্রথমে পিশাচী সত্তাকে সৃজন করতে হবে। তারপর তাকে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করতে হবে। সেই জাগ্রত চলমান পিশাচী সত্তার নাম ‘কৃত্যা’।

সায়নাচার্য লিখেছেন, কৃত্যা আসলে মাটি বা কাঠ দিয়ে নির্মিত এক ধরনের পুতুল। অথর্ববেদের উনিশ কাণ্ডের পঞ্চম অনুবাকের প্রথম সূক্তে লেখা হয়েছে, ৫৩টি অপরের অনিষ্ট কারক কৃত্যা ছিল। পুতুল অর্থাৎ কৃত্যাগুলি ভয়ংকর দেখতে ছিল। মাথা, নাক কান ইত্যাদি থাকলেও পায়ের সংখ্যার হেরফের দেখা যেত। যেমন কোনও পুতুলের পায়ের সংখ্যা দুই অথবা চার অথবা আটটি। কৃত্যাগুলি ভয়ংকর দর্শনধারী ছিল বলে অপর নাম ‘বিশ্বরূপা’।

সত্যজিৎ রায়ের গল্পের অলংকরণ। সৌজন্য: রায় পরিবার

সত্যজিৎ রায় ‘কাকতাড়ুয়া’ নামে একটিও গল্পও লিখেছিলেন। গল্পের অন্যতম চরিত্র অভিরাম যাকে সোনার ঘড়ি চুরি করার অপবাদ দিয়ে মৃগাঙ্কবাবুর পরিবার তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। মৃত নির্দোষী অভিরামের সত্তার আবির্ভাব হয়েছিল কাকতাড়ুয়ার মধ্যে এবং মৃগাঙ্কবাবুকে ঘড়িটি কোথায় আছে তা জানিয়েছিল। গল্পের বিষয়বস্তুর প্রেক্ষিতে কাকতাড়ুয়া নামকরণটি তার আদি অর্থকেই ইঙ্গিত করছে, সন্দেহ নেই।

…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলি অন্যান্য পর্ব ………….

পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন

পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া

পর্ব ২০: মাদারি কা খেল

পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়

পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর

পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা

পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে

পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম

পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন

পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান

পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি

পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল

পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই

পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?

পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব

পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!

পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই

পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা

পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত

পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস

পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর

পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প