throat voice and perspective of voice in a political way | Robbar
Robbar
  • ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গলাগলি

‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ ছবিটির সেই দৃশ্য। মগনলাল মেঘরাজ দেশের অমূল্য সম্পদ বিদেশে চালান করে দিচ্ছেন। সেই মূর্তি পাচারকারী ঘোষাল বাড়ি থেকে একটি গণেশ চুরি করতে চায়। ফেলুদা অন্তরায়। গোয়েন্দা প্রদোষচন্দ্র মিত্রকে টাকা দিয়ে সে কিনতে চায়। সেই টাকা ফেলুদা ফিরিয়ে দেয়। যে-ভাষায় ফেলুদা টাকা ফেরায়, তাতে মগনলাল ফেলুদার ‘বজ্রের মতো দৃঢ় কণ্ঠ’-এর পরিচয় পেয়েছিল। ফেলুদা যখন বলে ‘আমারই তো মাইন্ড’ কিংবা ‘পরিশ্রম না করে আমি পারিশ্রমিক নিই না মগনবাবু’ তখন সে-গলায় গর্জন ছিল না, দৃঢ়তা ছিল। ফেলু মিত্তিরকে টাকা দিয়ে কেনা যায় না এই দৃঢ়তা, মধ্যবিত্ত বাঙালির মূল্যবোধের দৃঢ়তা সেই স্বরে ছিল।

শেষ আপডেট: মে ২৮, ২০২৬, ১৯:৫৩   
Facebook WhatsApp Messenger

৪.

গলা অতি বিষম বস্তু। গলা বললে কেন জানি না, আমাদের শরীরের ‘গলা’ নামক প্রত্যঙ্গটির বাহ্যরূপ চোখে ভাসে না। মানুষের কণ্ঠস্বরের সরু-মোটা, মিষ্টি-কর্কশ, উঁচু-নিচু স্বর কানে বাজতে থাকে। যদিও কোনও কোনও মাংসসেবী বাঙালি গলা বলতে মুরগির গলা বোঝেন, পাতে রামপাখির নরম নাতি-মাংসল কিছু-কেঠো অঙ্গখানির উপস্থিতি অনুভব করেন। যারা রামপক্ষী বিক্রয় করেন, তাঁরা গলাকে গিলে বলেন। জিজ্ঞাসা করেন, ‘গিলে আর মেটে দেব?’ তবে পক্ষীসেবীদের কথা থাক, গলা বলতে যে কণ্ঠস্বর বোঝায় তার সূত্রেই কিছু কথা কানে বাজুক।

বাঙালি পুরুষের গলা মোটা দাগের দু’-ভাগের। সরু গলা আর মোটা গলা। ‘মোটা’ শব্দটিকে ভালো তৎসম শব্দে প্রতিস্থাপিত করলে আমরা ‘বজ্রকণ্ঠ’ শব্দটি ব্যবহার করতে পারি। বজ্রকণ্ঠ সমাসবদ্ধ পদ। নানাভাবে নানা বাক্যে এটিকে বিস্তার দিতে পারেন। বজ্রের মতো গম্ভীর কণ্ঠস্বর। চালু বাংলায় ‘বাজখাঁই গলা’ যাকে বলে। গর্জন করলে বহুদূর অবধি শোনা যায়।

গর্জন গানেরও হতে পারে। সুকুমার রায়ের ‘গানের গুঁতো’ কবিতাটির কথা মনে আছে? ভীষ্মলোচন শর্মা গ্রীষ্মকালে গান জুড়েছিলেন। আওয়াজখানা দিল্লি থেকে বর্মা পর্যন্ত হানা দিচ্ছিল। সেই গানের গুঁতোয় সবার মাথা ভন্‌ভন্‌। জন্তুরা চার-পা তুলে মূর্ছা যাচ্ছে। ভীষ্মলোচনের থামার ইচ্ছে নেই। শেষে থামল। সুকুমারের কবিতায় দাওয়াইটি চমৎকার। ‘এক যে ছিল পাগলা ছাগল, এমনি সেটা ওস্তাদ,/ গানের তালে শিং বাগিয়ে মারলে গুঁতো পশ্চাৎ।’ সেই গুঁতো খেয়ে ‘বাপ রে’ বলে ভীষ্মলোচন এক্কেবারে ঠান্ডা। সুতরাং, বাজখাঁই গলা মন্দ নয়, তবে ভালোর মাত্রা যদি গলার ক্ষেত্রে আওয়াজের হানাদারি হয়, তাহলে কখন কী ঘটে যায়– কিচ্ছু বলা যায় না। সেই হানাদারি গানেরই হোক আর কথারই হোক, একটা সময়ের পর সুকুমার রায়ের তত্ত্ব অনুযায়ী তা পাগলা ছাগলের পক্ষে অসহ্য হয়ে ওঠে। তখনই বিপদ!

zoom

আবার যদি কেউ বলেন– বজ্রের মতো দৃঢ় কণ্ঠস্বর, তাহলে কিন্তু ঠিক বহুদূর শোনা যায় এমন গর্জমান কণ্ঠস্বরকে বোঝানো হচ্ছে না। ঝোঁক তখন গাম্ভীর্য ও শব্দবাহুল্যের ওপর পড়ছে না। দৃঢ়তা এই গুণটির ওপর পড়ছে। সুকুমার ছেড়ে সত্যজিতের গল্পে ঢুকি। ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ ছবিটির সেই দৃশ্য। মগনলাল মেঘরাজ দেশের অমূল্য সম্পদ বিদেশে চালান করে দিচ্ছেন। সেই মূর্তি পাচারকারী ঘোষাল বাড়ি থেকে একটি গণেশ চুরি করতে চায়। ফেলুদা অন্তরায়। গোয়েন্দা প্রদোষচন্দ্র মিত্রকে টাকা দিয়ে সে কিনতে চায়। সেই টাকা ফেলুদা ফিরিয়ে দেয়। যে-ভাষায় ফেলুদা টাকা ফেরায়, তাতে মগনলাল ফেলুদার ‘বজ্রের মতো দৃঢ় কণ্ঠ’-এর পরিচয় পেয়েছিল। ফেলুদা যখন বলে ‘আমারই তো মাইন্ড’ কিংবা ‘পরিশ্রম না করে আমি পারিশ্রমিক নিই না মগনবাবু’ তখন সে-গলায় গর্জন ছিল না, দৃঢ়তা ছিল। ফেলু মিত্তিরকে টাকা দিয়ে কেনা যায় না এই দৃঢ়তা, মধ্যবিত্ত বাঙালির মূল্যবোধের দৃঢ়তা সেই স্বরে ছিল। তা ভীষ্মলোচনের গলা নয়, তা নাটকীয় চিৎকার নয়, সততার ঢাক পেটানো নয়, তা দৃঢ়। নিশ্চিত। নির্দ্বিধ। সত্যজিতের যে গলা বাঙালি শুনতেন ইন্টারভিউতে, তা দৃঢ়, নিশ্চিত, নির্দ্বিধ, প্রত্যয়ী।

zoom

মোটা গলা পুরুষের উলটো দিকে থাকা বাঙালি পুরুষের গলা সরু। সরু গলা পুরুষদের জীবনে বিপত্তির শেষ নেই। তাদের নিয়ে কত রসিকতা। ন্যাকা-মিনমিনে-মেয়েলি। বেচারিদের আত্মপ্রত্যয় ভেঙে দেওয়ার জন্য সমাজের উৎসাহের অবধি নেই। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ মেয়েদের গলা তুলতে দেয় না। আর পুরুষের সরু গলা হলে তাদের ‘মেয়েলি’ বলে ঠাট্টা করে। এই সরু-গলা পুরুষেরা মাঝেমাঝে কমপ্লেক্স-কাতর হয়ে পড়ে। তখন তারা গলাটিকে যথাসম্ভব গম্ভীর করার চেষ্টা করে। তাতে বিচিত্র বিপত্তি হয়, বহুবর্ণ রামধনু-মার্কা গলার স্বর জেগে ওঠে। তাকে কেউ কেউ ফাটা বাঁশের আওয়াজ বলে মনে করেন।

তার মানে এই নয়, মোটা-গলার বাঙালি পুরুষেরা কমপ্লেক্স-কাতর হয় না। খুবই হয়। তাদের গলায় বজ্র-নির্ঘোষ থাকে বলে তারা মনে করে– গলা তুললেই তাদের কথা সবাই মেনে নেবে। আদতে তা হয় না। গম্ভীর কণ্ঠস্বরওয়ালা তখন বিপন্ন হন। বিশেষ করে যখন কোনও সরু-গলা, মোটা-গলার মতামতকে অবজ্ঞা করে তখন নাকালের একশেষ। রাগে আগুন, তেলে বেগুন। নিরুপায় হয়ে মোটা-গলা গলায় তানকারি করে। গলা তোলে। তোলে আর তোলে। কিংবা আরও গম্ভীর, হে গম্ভীর। গলায় যেন ‘অ্যাংরি ইয়াংম্যান’ অমিতাভ বচ্চন! অথচ তাতেও কাজ হচ্ছে না। তখন মনে মনে সেই বাজখাঁই ভেঙে পড়ে। তার গলা ধরে যায়।

zoom

সরু গলা আর মোটা গলার এই সাধারণ গল্পে এবার একটু ‘অসাধারণের কারি’ পাউডার মেশাই। চৈতন্যদেবের গলার স্বর কেমন ছিল? বিচার করার উপায় নেই। তাঁর কণ্ঠস্বরের রেকর্ডিং নেই যে! রবীন্দ্রনাথের আছে। যা শোনা যায়, তাতে বোঝা যায় গলা গম্ভীর নয়, সরুর দিকে। তা নিয়ে অবশ্য রবি ঠাকুরের কমপ্লেক্স ছিল না। কেনই বা থাকবে? বরং তিনি জানতেন নিষ্কর্মা আর আত্মতৃপ্তিকামী মতলববাজরাই লোক-দেখানো গর্জনে বিশ্বাসী। পদ্যে লিখেছিলেন,

‘কে বলিতে চায় মোরা নহি বীর,
প্রমাণ যে তার রয়েছে গভীর,
পূর্বপুরুষ ছুঁড়িতেন তীর
সাক্ষী বেদব্যাস।
আর-কিছু তবে নাহি প্রয়োজন,
সভাতলে মিলে বারো-তেরো জন
শুধু তরজন আর গরজন
এই করো অভ্যাস।’

রবীন্দ্রনাথের কবিতাটির নাম ছিল ‘বঙ্গবীর’। গলা তোলাই কি বীরত্ব? মোটেই না। বীরেরা স্থির, ধীর, সাহসী। দেখনদারিত্ব বীরের স্বভাব নয়। প্রতিকূলতা অতিক্রম করার জন্য তাঁদের উৎসাহের অবধি নেই। তাঁরা লেগে থাকতে জানেন। এমনকী শত বিরুদ্ধতার মধ্যেও নিজের উপলব্ধ সত্যটি ধরে রাখেন। রামকৃষ্ণদেব বলতেন, সত্যে আঁট থাকা চাই। তাঁরই বা কণ্ঠস্বর কেমন ছিল? চিৎকার করে নিজের কথা প্রতিষ্ঠিত করার মানুষ ছিলেন না। বলতেন, ফুল ফুটলে ভ্রমর আপনি জুটে। দক্ষিণেশ্বরে তাঁকে ঘিরে কথার তরঙ্গ ওঠে, কথা অমৃত সমান। নরেন্দ্রনাথ আসেন, পরে তিনি বিবেকানন্দ। বিবেকানন্দকে কেউ কেউ ‘সাইক্লনিক মঙ্ক’ বলতেন। তাঁর বক্তৃতার খুব খ্যাতি। তাঁর লেখা পদ্যের বইয়ের নাম ‘বীরবাণী’। সে বীরত্ব কি গর্জে ওঠার মধ্যে প্রকাশিত? নয়, তা তো নয়। বিবেকানন্দ লিখেছিলেন, ‘ভিক্ষুকের কবে বল সুখ? কৃপাপাত্র হয়ে কিবা ফল?/ দাও আর ফিরে নাহি চাও, থাকে যদি হৃদয়ে সম্বল।’ ভিখিরিই তো চিৎকার করে, গলা তোলে। ‘দাও দাও’ বলে চায়। এমনকী যারা নিজেদের বড় করে দেখায়, তারাও কি ভিখিরি নয়! ভিখিরিই তো। ভিখিরি বলেই যা নয় তা বলে, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া। নিজেকে বড় করে দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে সমীহ ভিক্ষে করা।

zoom

তাই বলি গলা অতি বিষম বস্তু। যারা গলা তোলে, আর তাদের বিরুদ্ধে যারা গলা তোলে, দু’-পক্ষেরই বাইরে থেকে আড়ি কিন্তু ভিতর থেকে গলাগলি ভাব। কারণ তাদের একই পন্থা, গলা তুলে জগৎ উদ্ধারকারী বলে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার পন্থা। এদেরকে চলিত বাংলায় বলে মুখে-মারির দল।

… পড়ুন সিরিয়ালসি নেবেন না-র অন্যান্য লেখা …

৩. বাবু কলকাতার উবু মানুষ

২. স্মৃতি-বিস্মৃতির কথা

১. এই বঙ্গে যা যা চাই!

Felu Da Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Satyajit Ray SriRamkrishna Sukumar Ray Swami Vivekananda Voice জয় বাবা ফেলুনাথ

Share this article on