


‘গীতাপাঠের চাইতে ফুটবল খেলা ভালো’– এই বাণী অবশ্য স্বামী বিবেকানন্দের মুখে মানায়। কারণ, নরেন্দ্রনাথ দত্ত বেশ ডাকাবুকো। খেলাধুলোয় পারঙ্গম। স্বভাব আমুদে। গবেষক শঙ্করীপ্রসাদ বসু নরেন্দ্রনাথ ও পরে বিবেকানন্দ দুই পর্বেই তাঁর ক্রীড়া-কুশলতার কথা লিখেছেন। সাহেবদের দেশে সন্ন্যাসী বিবেকানন্দের কর্মকাণ্ডে কখনও কখনও ক্রীড়া-মনোযোগ উঁকি দিয়েছে।
১৩.
ফুটবল সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ কী বলেছিলেন? আপাতত এই চর্মগোলকটি নিয়ে বাঙালির আগ্রহ প্রবল নয়। কিছুদিন আগে ছিল, তখন বিশ্বকাপ চলছিল।
ভারতীয় ফুটবল দল বিশ্বকাপ খেলবে এ-স্বপ্ন খুব একটা কেউ দেখে না। যদিও ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সঙ্গে এই খেলাটির যোগ প্রবল। খালি পায়ে খেলে সবুট-সাহেবদের হারিয়ে দিয়ে বাঙালির মোহনবাগান সেকালে অসাধ্য সাধন করেছিল। তারপর গোরা-বিজয়ের ফলে এর বিশেষ জনপ্রিয়তা। বিবেকানন্দের যে-বাক্যটি খুবই জনপ্রিয় এবং ‘বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা’র মধ্যে কোথায় আছে, দেখাতে বললে অতি গভীর বিবেকানন্দ গবেষকেরও কালঘাম ছুটবে, সেটি ফুটবল সংক্রান্ত। মোহনবাগানের ফুটবল-বিজয়ের পূর্ববর্তী।

বিবেকানন্দের প্রয়াণ ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে। তখন কোথায় আর মোহনবাগানের ফুটবল-কুরুক্ষেত্র! ‘গীতা পাঠের চাইতে ফুটবল খেলা ভালো’– এই বাণী অবশ্য স্বামী বিবেকানন্দের মুখে মানায়। কারণ, নরেন্দ্রনাথ দত্ত বেশ ডাকাবুকো। খেলাধুলোয় পারঙ্গম। স্বভাব আমুদে। গবেষক শঙ্করীপ্রসাদ বসু নরেন্দ্রনাথ ও পরে বিবেকানন্দ দুই পর্বেই তাঁর ক্রীড়া-কুশলতার কথা লিখেছেন। সাহেবদের দেশে সন্ন্যাসী বিবেকানন্দের কর্মকাণ্ডে কখনও কখনও ক্রীড়া-মনোযোগ উঁকি দিয়েছে।
তাছাড়া তিনি বাঙালির তামসিকতার একেবারে বিরোধী ছিলেন। সন্ন্যাসের নামে মটকা মেরে থাকা, আধ্যাত্মিকতার নামে আলস্য তাঁর দু’-চোখে বিষ। দেশটা যে এ-জন্যই ডুবেছে, তা নানাভাবে বলেছেন। গীতা পড়ার নাম করে ঘুম আর ফাঁকিবাজি চলবে না। তার থেকে মাঠে গিয়ে ফুটবল পিটিয়ে আসা ভালো। শরীরটা তো তাতে মজবুত হবে। শরীর না গঠন করলে আবার ধর্ম কর্ম কী!

সন্ন্যাসী গুরুভাইদের তিনি বিদেশ থেকে ফিরে এসে নানা সেবামূলক কাজে নিয়োগ করলেন। সরলা দেবীর স্মৃতিকথা ‘জীবনের ঝরাপাতা’-য় সে-বৃত্তান্ত আছে। গুরুভাইরা বলছেন, নরেন বিলেত থেকে এসে শুধু কাজ কাজ কাজ বলে হাঁক দিচ্ছে। নিশ্চিন্তে জপ-ধ্যান করার উপায় নেই। কর্মযোগ, ধ্যানযোগ, জ্ঞানযোগ আর ভক্তিযোগ এই চারের সামঞ্জস্য চাই। না-হলে বিবেকানন্দের মতে সংকট দেখা দেবে। এই ভাবনার সূত্রে দেখলে বোঝা যাবে, গীতাপাঠের চেয়ে চর্মগোলকটি কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এমনিতে এই খেলাটি সহজ, উপকরণ-বাহুল্য নেই। যেহেতু ক্রিকেটে ভারতীয় দলের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাফল্য বেশি, সেহেতু ক্রিকেট বহুক্ষেত্রে ফুটবলের চাইতে জনপ্রিয়। তবে ক্রিকেট খেলতে নানা উপকরণ লাগে। নিয়ম-কানুনও ফুটবলের চাইতে কঠিন। তুলনায় ফুটবলের নিয়ম সহজ। আর মাঠ পেলেই হল। পায়ে পায়ে চলল খেলা। বিবেকানন্দের ফুটবল প্রীতির এটাও একটা কারণ। সাহেবদের দৌলতেই ক্রিকেট আর ফুটবল খেলা দুটো এদেশে আসে। সামরিক বাহিনীর বিনোদন ও স্বাস্থ্যচর্চা দুয়ের জন্য খেলা। ভারতীয়রা সাহেবদের খেলা ক্রমে রপ্ত করেছিল। সাহেবদের হাতফেরতা খেলায় সাহেবদের হারিয়ে দেওয়া তাই ভারতীয়দের পক্ষে বিজয়ানন্দের কারণ, স্বাধীনতার স্বাদ প্রাপ্তি।
রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দের মতো খেলা-পারঙ্গম ছিলেন না। কুস্তি তাঁকে শিখতে হয়েছিল। শরীরের কাঠামোও চমৎকার। তাঁর ব্রহ্মচর্যাশ্রমে খেলাধুলোর বিশেষ গুরুত্ব ছিল। মেয়েদের শরীর-মনের বিকাশের জন্য খেলাধুলোর ব্যবস্থা ছিল। আশ্রমের ফুটবল দলের বিশেষ খ্যাতি ছিল। গুরুদেব বর্ষায় ফুটবল খেলা দেখতে আশ্রম মাঠে হাজির, এমন ঘটনা খুব বিরল ছিল না। রবীন্দ্রনাথ ফুটবলের সামাজিক ইতিহাসও খেয়াল করেছিলেন। বঙ্গসমাজে ফুটবলপূর্ব জগৎ ও ফুটবল-পরবর্তী জগতের ছবি আছে তাঁর লেখায়। তা একইসঙ্গে কৌতুককর ও মেয়েদের পক্ষে অস্বস্তিদায়ক।
জীবনের শেষের দিকে তিনি লিখেছিলেন স্মৃতিকথা– ‘ছেলেবেলা’। সে-লেখায় সেকাল আর একালের কলকাতার তুলনা আছে। সেকালের কলকাতা মানে উনিশ শতকের, একালের কলকাতা মানে বিশ শতকের। রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্মৃতিকথা ‘ছেলেবেলা’-য় লিখেছিলেন উনিশ শতকের কথা, ‘তখন খেলা ছিল সামান্য কয়েক রকমের। ছিল মার্বেল, ছিল যাকে বলে ব্যাটবল – ক্রিকেটের অত্যন্ত দূর কুটুম্ব। আর ছিল লাঠিম-ঘোরানো, ঘুড়ি-ওড়ানো। শহরে ছেলেদের খেলা সবই ছিল এমনি কম্জোরি। মাঠজোড়া ফুটবল-খেলার লম্ফঝম্ফ তখনো ছিল সমুদ্রপারে।’ তারপর সাহেবদের হাত ধরে পা-বেয়ে এলো মাঠজোড়া খেলা। শুরু হল ফুটবল খেলার লম্ফঝম্ফ। তাতে কিন্তু মেয়েদের কপাল-মন একটু বিষাদগ্রস্ত হল। কলেজ আর অফিস থেকে সোজাসুজি পুরুষেরা বাড়ি ফেরে না। মেয়েদের বিকেলবেলার সাজ হল ব্যর্থ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিত্রময় ভাষায় লিখেছিলেন, ‘বসন্তকালের সেই মালীদের ফুলের ঝুড়ির খবর আজ নেই, কেন জানি নে। তখন বাড়িতে মেয়েদের খোঁপা থেকে বেলফুলের গোড়ে মালার গন্ধ ছড়িয়ে যেত বাতাসে। গা ধুতে যাবার আগে ঘরের সামনে বসে সমুখে হাত-আয়না রেখে মেয়েরা চুল বাঁধত। বিনুনি-করা চুলের দড়ি দিয়ে খোঁপা তৈরি হত নানা কারিগরিতে। তাদের পরনে ছিল ফরাসডাঙার কালাপেড়ে শাড়ি, পাক দিয়ে কুঁচকিয়ে তোলা। নাপতিনি আসত, ঝামা দিয়ে পা ঘসে আলতা পরাত। মেয়েমহলে তারাই লাগত খবর-চালাচালির কাজে। ট্রামের পায়দানের উপড় ভিড় করে কলেজ আর আপিস ফেরার দল ফুটবল খেলার ময়দানে ছুটত না।’

চর্মগোলকটি এসে মেয়েদের সাজ-সজ্জাকে দেখার বৈকালিক-বাসন্তিক মন চুরি করে নিয়ে চলে গেল। ছেলেরা হল মাঠমুখো। খেলার উত্তেজনার চোটে সাজ-দেখার নান্দনিকতা গেল হারিয়ে। বিকেল-সন্ধে বেলার অন্দরযাপন আর জমল না। তার মানে এই নয় যে ফুটবলার ছেলেরা মেয়েদের দেখত না। অনেক সময় মেয়েদের শাড়ি আর ছেলেদের ফুটবল প্যান্ট একই সঙ্গে সূচিত করত দু’-পক্ষের নবযৌবন। সে-কথাও আছে রবীন্দ্রনাথের কবিতায়।
ইতিমধ্যে আমাদের জীবননাট্যে
সাজ হয়েছে বদল।
ও পরেছে শাড়ি,
আঁচলে বিঁধিয়েছে ব্রোচ,
বেণী জড়িয়েছে হাল ফেশানের খোঁপায়।
আমি ধরেছি খাকি রঙের খাটো প্যান্ট্
আর খেলোয়াড়ের জামা
ফুটবল– বলরামের নকলে।
ভিতরের দিকে ভাবের হাওয়ারও
বদল হল শুরু,
কিছু তার পাওয়া যায় পরিচয়।
‘শ্যামলী’ কাব্যগ্রন্থের কাহিনিঘেরা ‘কনি’ কবিতাটিতে সাজের এই চরিত্র দেখে বেশ বাংলা সিনেমার কথা মনে হয়। হর্ষ জাগে। বিবেকানন্দ অবশ্য মাঝখানে এসে দাঁড়াবেন। সন্ন্যাসী মানুষ। তিনি তো ফুটবলের রাজসিকতায় তামসিকতাকে দূর করতে চেয়েছিলেন। শেষে কি না ফুটবলের সাজ প্রেমের উপকরণ হয়ে উঠল। এই প্রেম যদি অবিদ্যামায়া হয় তাহলে তো গেল!
কী তবে করণীয়? এই বর্ষার মাঠে আসুন একটা মিক্সড ফুটবলের আয়োজন করা যাক। একদিকে নারী-বাহিনী অপরদিকে পুরুষ-বাহিনী। চর্মগোলক নিয়ে দু’-পক্ষ প্রবল খেলবেন। একবার এ-পক্ষের জয়, আরেকবার অন্যপক্ষের। উভয়পক্ষ রাজসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তামসিক প্রেমের ফাঁদ থেকে মুক্ত হবে। গতিময় খেলা, ঘোরতর বর্ষা, কেবল মেঘদূত নয়, লেখা হবে ফুটবল-বিজয় কাব্য। সেখানে চর্মগোলকটি দূত নয়, ইনিয়ে-বিনিয়ে কথা বলে না। গোলার মতো ধেয়ে যায়। ধে ধে ধে লঙ্গ রঙ্গ ভঙ্গ, ফুটবল মাঠে ওঠে শক্তি-তরঙ্গ।
…………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন সিরিয়াসলি নেবেন না-র অন্যান্য লেখা
…………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved