Robbar

গল্পের গুগলি ও বলরাম বসাক

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 29, 2026 8:17 pm
  • Updated:June 29, 2026 8:17 pm  

১৯৬৮-তে রেবন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘অন্তর্বাহ’ পত্রিকা বার করলেন। তাতে প্রথম দেখেছিলাম বলরাম বসাকের গল্প। রেবন্তদা ওই সংখ্যায় আমাকেও গল্প লেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ফলে একই সংখ্যায় লেখার সূত্রে বলরাম বসাকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়ে গেল। সে কি আজকের কথা! নয় নয় করে ৫৮ বছর তো হয়ে গেল। মনে আছে কত সাহিত্যসভায় আমরা একসঙ্গে গিয়েছি। গল্পপাঠ করেছি। বইমেলার মাঠে ঘুরে বেড়িয়েছি। কফিহাউসে আড্ডা দিয়েছি।

বাণীব্রত চক্রবর্তী

সেটা কোন সাল? যতদূর মনে পড়ে ১৯৬৮ হবে। আমরা তার বছর দুয়েক আগে লিটিল ম্যাগাজিনে গল্প লিখতে শুরু করেছি। তখনও কলেজের গণ্ডি অতিক্রম করিনি। ঠিক আমাদের আগে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন লেখক। তাঁরা বয়সে আমাদের চেয়ে সাত-আট বছরের বড়। গল্প নিয়ে তাঁরা একটি আন্দোলন করছেন। সেই বিশেষ আন্দোলনের নাম দিয়েছেন ‘শাস্ত্রবিরোধী’। স্পষ্ট করে বললে দাঁড়ায় শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন। কোন শাস্ত্র বিরোধী? ব্যাপারটা আমাদের কাছে তাঁরাই পরিষ্কার করে দিচ্ছেন। এতকাল যে শাস্ত্র মেনে গল্প লেখা হচ্ছিল তা তাঁরা মানছেন না। বর্তুল গল্পের দিন ফুরিয়েছে। এখন গল্প হবে তথাকথিত বক্তব্যহীন। এই বিশ্বাসে স্থিত থেকে তাঁরা প্রকাশ করলেন ‘এই দশক’ পত্রিকা। এঁদের মধ্যমণি বলতে আলাদা কেউ নেই। সকলের প্রাধান্য সমান। এঁদের কয়েকজন ক্রমশ আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। অমল চন্দ, রমানাথ রায়, শেখর বসু, সুব্রত সেনগুপ্ত, আশিস ঘোষ এবং অবশ্যই বলরাম বসাক। এঁদের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ হল ১৯৬৮-তে। এঁদের এমন সব বন্ধু ছিলেন যাঁরা কবিতা লিখতেন এবং তথাকথিত শাস্ত্রবিরোধী ছিলেন না। তাঁদের সঙ্গেও আলাপ হয়ে গেল। এই প্রসঙ্গে রত্নেশ্বর হাজরার কথা বিশেষ করে মনে পড়ে। তিনিও আজ নেই। ততদিনে আমরা কলেজের পড়াশোনা শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সবে পড়তে ঢুকেছি।

বাংলা ছোটগল্প নিয়ে এই আন্দোলন যেন এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল– এমন কথা বললে অনৃত কথা বলা হবে। শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের বেশ কয়েক বছর আগে বাংলা ছোটগল্প নিয়ে একটি বিশেষ আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই আন্দোলনের স্বরূপ হয়তো রাউন্ড স্টোরির বিরুদ্ধেই ছিল কিন্তু গল্পে বক্তব্যহীনতার স্বপক্ষে একেবারেই নয়। 

‘এই দশক’ পত্রিকার জন্মলাভের সাত-আট বছর আগে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিমল কর। একদল নতুন গল্পলেখক তাঁর প্রেরণায় নতুন ধরনের গল্প নিয়ে সমুপস্থিত হলেন। তাঁরাও তরুণ। তাঁদের গল্প নিয়ে বিমল করের সম্পাদনায় প্রকাশিত হল একটি গল্প সংকলন। সেই সংকলনের নাম রাখা হল ‘এই দশকের গল্প’। লেখক তালিকা ছিল এইরকম–

অজয় দাশগুপ্ত, অমলেন্দু চক্রবর্তী, দিব্যেন্দু পালিত, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবেশ রায়, প্রবোধবন্ধু অধিকারী, বরেন গঙ্গোপাধ্যায়, মতি নন্দী, যশোদাজীবন ভট্টাচার্য, রতন ভট্টাচার্য, শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, সোমনাথ ভট্টাচার্য, স্মরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়।

এই গল্প সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬০-এর ডিসেম্বরে।

কিন্তু শাস্ত্রবিরোধী গল্পের আন্দোলন একেবারে অন্যরকম। এর আগে নতুন গল্প নতুন রীতির আন্দোলন, যার নেতৃত্বে ছিলেন বিমল কর, যে-কথা এক্ষুনি বললাম, তারই পাশাপাশি হাংরি জেনারেশন নামক একটি দলের ভূমিকা আছে একথা ভুলে গেলে চলবে না। রমানাথ রায়, বলরাম বসাক, আশিস ঘোষ, অমল চন্দ এমনকী এই ঘরানার সুব্রত সেনগুপ্ত, লেখক অতীন্দ্রিয় পাঠকও নেই। আন্দোলন অনেকটাই যেন ফিকে হয়েই গেল। কিংবা আর রইল না বললে ভুল বলা হয় না। তবে বিলীয়মান আন্দোলন কিন্তু জন্ম দিয়ে গেল একটি নতুন ধারা। তাকে অস্বীকার করা যায় না।

বিমল কর

পরবর্তীকালে তরুণ লেখকদের ওপর তার প্রভাব একেবারেই পড়েনি এমন বলা ঠিক নয়। যুগে যুগে নতুন নতুন লেখক আসেন এবং নতুন নতুন পথের অন্বেষণ করেন। কেউ সফল হন। কেউ হন না।

আমার আজকের প্রসঙ্গ সদ্যপ্রয়াত বলরাম বসাককে নিয়ে। ধীরস্থির এবং অত্যন্ত শান্ত মানুষ ছিলেন। আর সবচেয়ে বড় কথা হল, এমন নিরহং মানুষ সচরাচর দেখা যায় না। মিতবাক ছিলেন। আমি তাঁকে বলরামদা বলে সম্বোধন করতাম।

পাঁচের দশকের কবি, গল্পকার, ‘নহবত’ পত্রিকার সম্পাদক, অধ্যাপক ফণিভূষণ আচার্য, মানে ফণীদা, আমাকে একদিন বলেছিলেন, ‘বলরাম বসাক আমার ছাত্র ছিল’।

একবার ঢাকুরিয়ার দিকে একটি ঘরোয়া সাহিত্য সভায় নিজেদের লেখা পড়তে গেছি, ওই সভায় এক তরুণী, যিনি আমাদের লেখা শুনতে এসেছেন, আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনারা ওঁকে আনতে পারলেন না?’

অবাক হয়েছিলাম, ‘কার কথা বলছেন?’ তরুণী বলেছিলেন, ‘বলরাম বসাককে। আমার ওঁর লেখা ভারী ভালো লাগে। আপনার সঙ্গে ওঁর আলাপ আছে?’ বলেছিলাম, ‘আছে।’

বলরাম বসাক

তখন বড়দের গল্পই বেশি লিখতেন বলরাম বসাক। আমাদের বলরামদা। নতুন ধরনের গল্প লিখে লেখকদের চমকে দিচ্ছেন আর পাঠকদের মুগ্ধ করছেন। বিস্কুটের টিন না কি বিস্কুটের কৌটো? এমন নামের গল্পটি মনে পড়ছে? কোনও এক রবিবারে আনন্দবাজার পত্রিকায় বেরিয়েছিল।

১৯৬৮-তে রেবন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘অন্তর্বাহ’ পত্রিকা বার করলেন। প্রায় প্রমাদরিক্ত বানান, সুচারু মুদ্রণ, অ্যান্টিক পেপারে ছাপা। বিশ্বরঞ্জন দে প্রচ্ছদ করেছিলেন। তাতে প্রথম দেখেছিলাম বলরাম বসাকের গল্প। রেবন্তদা ওই সংখ্যায় আমাকেও গল্প লেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

ফলে একই সংখ্যায় লেখার সূত্রে বলরাম বসাকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়ে গেল। সে কি আজকের কথা! নয় নয় করে ৫৮ বছর তো হয়ে গেল। মনে আছে কত সাহিত্যসভায় আমরা একসঙ্গে গিয়েছি। গল্পপাঠ করেছি। বইমেলার মাঠে ঘুরে বেড়িয়েছি। কফিহাউসে আড্ডা দিয়েছি। ওঁদের বন্ধুবৃত্তে যাঁরা ছিলেন তাঁরা আমার অগ্রজের ভূমিকা নিয়ে নিয়েছেন।

একবার শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য কোনও একটি শিশুসাহিত্য পত্রিকা আমাকে বিশেষ পুরস্কার প্রদান করে। সবচেয়ে আনন্দের কথা হল, ওই পত্রিকার তরফ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আমার হাতে পুরস্কারটি তুলে দেবেন সাহিত্যিক বলরাম বসাক। 

সেদিন কী যে আনন্দ হয়েছিল– তা ভাষায় বোঝাতে পারব না!

ক্রমশ বড়দের লেখা থেকে সরে যাচ্ছিলেন তিনি। সমস্ত মনোযোগ, সময়, শ্রম এবং উৎসাহ একটি লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হয়ে চলেছে। ছোটদের জন্য লেখা। যা সহজ নয়। সেই পথটাই যেন তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। ছোটদের গল্পেরও প্রকারভেদ আছে।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছোটদের জন্য যে ধরনের কাহিনি লিখতেন, তাঁর জামাতা মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় তো তেমন লিখতেন না। শৈলেন ঘোষের লেখার সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখার তুলনা করব কেন? লীলা মজুমদারের লেখার সঙ্গে কি বুদ্ধদেব বসুর কিশোরকাহিনি তুলনীয়? প্রত্যেকের পথ আলাদা মত আলাদা এবং লক্ষ্যও আলাদা। স্বাতন্ত্র‍্য একটা বড় ব্যাপার। ছোটদের জন্য লেখা মানে এক বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়া। বলরাম বসাক সেই স্বাতন্ত্র‍্য অর্জন করতে পেরেছিলেন। বড় পরীক্ষা সাফল্যের সঙ্গে জয় করতে পেরেছিলেন।

আমার সঙ্গে বলরামদার দেখা হত কম। বরং বেশি দেখা হত এবং কথাবার্তা হত রমানাথ রায়ের সঙ্গে। রমানাথদা আমার পাড়ার কাছে থাকতেন। মাঝখানে কেবল একটি ট্রামলাইনের ব্যবধান। শেখর বসু এবং সুব্রত সেনগুপ্তের সঙ্গেও দেখা হত। সুব্রত সেনগুপ্ত যে কাগজের আপিসে কাজ করতেন সেটিও ছিল আমাদের পাড়ার কাছে। আশিস ঘোষের সঙ্গেও দেখা হত। তবে বলরামদার সঙ্গে দেখা হত কম। কম দেখা হত বলে টানটা ছিল তীব্র। এটা একটা কারণ হতে পারে। কিংবা আর একটা কারণও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ছোটদের লেখার প্রতি আমার ঝোঁক প্রতিদিন বেড়েই চলছিল।

রমানাথ রায়

তাছাড়া বলরামদার লেখার বিষয়, আঙ্গিক, রূপকথার মোড়ক, জাদুবাস্তবের নির্মোক এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল। ছোটদের লেখা লিখতে হলে মন ছোটদের মতো তৈরি করে নিতে হবে। দিন দিন ছোটদের কল্পনার আকাশ ছোট হয়ে যাচ্ছে। সেই আকাশকে বড় করে তুলতে হবে। এই বিশ্বাস বলরাম বসাককে ছোটদের প্রিয় সাহিত্যিক করে তুলেছে।

এবার তাঁর ছোটদের জন্য লেখা থেকে উজ্জ্বল উদ্ধারের অবকাশ এসেছে–

“দিপ্‌পুকে খুউব ছোটটো বেলায় জেম্মা ‘ছোটো খোকা’ বলে ডাকত। তখন নাকি দিপ্‌পু হামাগুড়ি দিত। মাঝে মাঝে দুই নড়বড়ে পায়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করত। তাই দেখামাত্র জেম্মা ছুট্টে এসে কী আনন্দে হা-হা করে জোরে জোরে ‘অই অই ধর ধর’ শব্দ ছুড়ে হেসে হেসে দিপ্‌পুকে কোলে নিত, বলত–
‘ছোটো খোকা, আমাদের ছোটো খোকা, বলে অ আ, শেখেনি-গো কথা কওয়া–।’
দিপ্‌পু তো এখন অনেক বড়ো হয়েছে।
কত্ত বড়ো?
চার বচ্ছর একমাস। কম হল? তবু ক্লাসের ছেলেরা বলে– এই যে ছোটো খোকা বলে অ আ শেখেনি সে কথা কওয়া…। এইসব বলে খ্যাপায় আর কী। মিষ্টি করে হাসে দিপ্‌পু। যাক্ গে, খ্যাপাক গে। দিপ্‌পু খ্যাপে না। জিব বের করে সামান্য একটুখানি ভেংচি কেটে দেয়। ওতেই যথেষ্ট। কারণ দিপ্‌পু এখন তো নাকে তুলোর গোঁফ লাগানো কানাই মাস্টার। পোড়ো মোর বেড়ালছানাটি…।
একটা বেত হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় দিপ্‌পু।
কোথায় সেই বিড়ালছানা?
ভীষণ দুষ্টু হয়েছে। দিপ্‌পুদের ফ্ল্যাট থেকে কখনো এদিক ছুটে, কখনো ওদিক ছুটে, শম্পিদের ফ্ল্যাটে চলে যায়।
শম্পি আরও ছোটো।”

[অ-এ অজগর, বলরাম বসাক]

বলরাম বসাক ছোটদের জন্য এইরকম গল্প লিখতেন। তাঁর আর একটি গল্প এই প্রসঙ্গে ইতি টানার আগে স্মরণ করে নিতে পারি–

“পরির নাম ‘মিষ্টি’। তাই বলে রাজার নাম দুষ্টু নয়। রাজাটা সত্যি সত্যি দুষ্টু। কোথাকার রাজা? জলঢিবির রাজা।
চারদিকে থৈ-থৈ জল। জলের ঢেউগুলো নাচে তা-তা থৈ-থৈ তা-তা থৈ-থৈ। চারদিক ঘিরে নাচে। মাঝখানে একটা উঁচু ঢিবি। খাড়া কেল্লার মতো উঠে গেছে সেই ঢিবির ছুঁচোল চুড়ো রাজার রাজপ্রাসাদের। চারতলা রথ দেখতে যেমন হয়। তবে চুড়োর তলায় গোম্বুজ। গোম্বুজের গায়ে সাইনবোর্ড। তাতে লেখা: ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ’।”

[দুষ্টু রাজা মিষ্টি পরি, বলরাম বসাক]