


ডেভিড হকনি আলোকে কেবল বিষয় হিসেবে দেখেননি; তিনি আলোকে ব্যবহার করেছেন এক ধরনের ভাষা হিসেবে। তাঁর তুলির টানে আলো কখনও জলের ভেতর ভেঙে যায়, কখনও গাছের পাতায় ছড়িয়ে পড়ে, কখনও আবার মানুষের মুখের উপর এসে তৈরি করে অদ্ভুত এক অন্তরঙ্গতা। তাঁর ছবির দিকে তাকালে মনে হয়, তিনি যেন রং দিয়ে নয়, আলো দিয়ে আঁকছেন।
ক্যানভাসের উপর নীল জলের ঢেউ। আলো এসে ভেঙে পড়ছে জলের গায়ে, তৈরি করছে অদ্ভুত এক কম্পন। যেন রং নিজেই নিজের প্রতিবিম্ব দেখছে। আধুনিক শিল্পের ইতিহাসে এমন দৃশ্যের কথা উঠলেই যে নামটি অনিবার্যভাবে ফিরে আসে, তিনি ডেভিড হকনি। গত ১১ জুন ২০২৬, ৮৮ বছর বয়সে লন্ডনের নিজের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। তাঁর চলে যাওয়া শুধু একজন শিল্পীর মৃত্যু নয়; এমন এক দৃষ্টিভঙ্গির অবসান, যা গত ছয় দশক ধরে আমাদের পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে শিখিয়েছে।

হকনির শিল্পজীবন ছিল মূলত ‘দেখা’র এক দীর্ঘ অনুশীলন। তিনি কেবল ছবি আঁকতেন না, তিনি আমাদের শেখাতেন কীভাবে দেখতে হয়। তাঁর মতে, আধুনিক মানুষ ক্রমশ দেখা ভুলে যাচ্ছে; আমরা তাকাই, কিন্তু দেখি না। এই সহজ অথচ গভীর উপলব্ধিই তাঁর শিল্পদর্শনের কেন্দ্রে অবস্থান করেছে সারাজীবন।
১৯৩৭ সালে ইংল্যান্ডের ব্র্যাডফোর্ডে এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া হকনির শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প কোনও অলৌকিক ঘটনা নয়। বরং তা এক নিরলস কৌতূহলের ইতিহাস। রয়্যাল কলেজ অফ আর্টে পড়াশোনার সময় থেকেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শিল্পকে প্রথার মধ্যে আটকে রাখা যায় না। শিল্পের ভাষা বদলায়, মাধ্যম বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়; কিন্তু দেখার ক্ষমতা এবং অনুভবের গভীরতা কখনও পুরনো হয় না।

ছয়ের দশকে পপ আর্ট আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে তিনি পরিচিতি পান। কিন্তু হকনির শিল্পকে কেবল পপ আর্টের খোপে বন্দি করা অন্যায় হবে। তাঁর ছবিতে যেমন উজ্জ্বল রঙের সাহসী ব্যবহার রয়েছে, তেমনই রয়েছে নিঃসঙ্গতার নীরব ভাষা। ক্যালিফোর্নিয়ার সুইমিং পুল নিয়ে আঁকা তাঁর বিখ্যাত সিরিজগুলো প্রথম দর্শনে যেন রৌদ্রোজ্জ্বল জীবনের উদ্যাপন। অথচ একটু গভীরে তাকালেই দেখা যায়, সেই নীল জলের নিচে জমা হয়ে আছে একাকিত্ব, আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি এবং মানুষের অন্তর্জগতের অসংখ্য স্তর।

ডেভিড হকনি আলোকে কেবল বিষয় হিসেবে দেখেননি; তিনি আলোকে ব্যবহার করেছেন এক ধরনের ভাষা হিসেবে। তাঁর তুলির টানে আলো কখনও জলের ভেতর ভেঙে যায়, কখনও গাছের পাতায় ছড়িয়ে পড়ে, কখনও আবার মানুষের মুখের উপর এসে তৈরি করে অদ্ভুত এক অন্তরঙ্গতা। তাঁর ছবির দিকে তাকালে মনে হয়, তিনি যেন রং দিয়ে নয়, আলো দিয়ে আঁকছেন।

হকনির শিল্পচর্চার আরেকটি বিস্ময়কর দিক ছিল তাঁর প্রযুক্তি-প্রীতি। অনেক শিল্পী যখন ডিজিটাল মাধ্যমকে সন্দেহের চোখে দেখেছেন, তখন হকনি আইফোন ও আইপ্যাডকে নিজের স্কেচবুক বানিয়ে ফেলেছিলেন। আশির কোঠায় পৌঁছেও তিনি নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ করেছেন শিশুর মতো কৌতূহল নিয়ে। ডিজিটাল ড্রয়িংয়ের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, শিল্পের প্রাণ কখনও মাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিল্পীর দৃষ্টি এবং কল্পনাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে বসে ঋতু পরিবর্তনের যে বিশাল সিরিজ তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তা যেন প্রকৃতির সঙ্গে এক দীর্ঘ সংলাপ। সেখানে বসন্তের ফুল, গ্রীষ্মের আলো, শরতের রং এবং শীতের নির্জনতা মিলেমিশে তৈরি করেছে সময়ের এক ভিজ্যুয়াল দিনলিপি। বয়স বাড়লেও তাঁর কৌতূহল কমেনি; বরং পৃথিবীকে দেখার ক্ষুধা যেন আরও তীব্র হয়েছে।

ব্যক্তিজীবনেও হকনি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার পরেও তিনি হতাশ হননি। বরং মজা করে বলতেন, একটি ইন্দ্রিয় দুর্বল হলে অন্য ইন্দ্রিয়গুলো আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর কাছে পৃথিবী ছিল রং, আলো এবং আকারের এক অন্তহীন নাট্যমঞ্চ। শব্দের সীমাবদ্ধতা তাঁকে থামাতে পারেনি।
রাজকীয় সম্মান, আন্তর্জাতিক পুরস্কার কিংবা শিল্পবাজারে কোটি কোটি ডলারের মূল্য– এসব কখনও তাঁকে সংজ্ঞায়িত করতে পারেনি। রানির দেওয়া ‘অর্ডার অফ মেরিট’-এর মতো মর্যাদাপূর্ণ সম্মান পেয়েও তিনি ছিলেন একইরকম সহজ, রসিক এবং স্বাধীনচেতা। রঙিন পোশাক, অদ্ভুত চশমা কিংবা ক্রকস জুতো পরে তিনি যেমন রাজদরবারে যেতে পারতেন, তেমনি একই স্বাভাবিকতায় স্টুডিওতে বসে আঁকতেন গাছের ডাল বা জানলার বাইরের আলো।

আজ যখন তাঁর মৃত্যুসংবাদ পৃথিবীজুড়ে শিল্পপ্রেমীদের বিষণ্ণ করে তুলেছে, তখন মনে পড়ে তাঁর শিল্পদর্শনের সেই মৌলিক শিক্ষা– পৃথিবীকে ভালোবাসতে হলে আগে তাকে দেখতে শিখতে হবে। শিল্প কোনও অলৌকিক জাদু নয়; শিল্প হল মনোযোগের চর্চা। একটি গাছ, একটি ছায়া, একটি মুখ, একটি সকালের আলো– এসবের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অসীম সৌন্দর্য।
ডেভিড হকনি আজ শারীরিকভাবে অনুপস্থিত। কিন্তু তাঁর আঁকা সেই নীল সুইমিং পুলে এখনও আলো কাঁপে। ইয়র্কশায়ারের পাহাড়ি পথে এখনও রঙের বিস্ফোরণ ঘটে। নরম্যান্ডির গাছপালায় এখনও ঋতু বদলের গল্প লেখা থাকে। তিনি চলে যাননি; তিনি ছড়িয়ে আছেন তাঁর রঙে, তাঁর আলোয়, তাঁর দেখার ভঙ্গিতে।

আসলে কিছু শিল্পী মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকেন। তাঁরা ইতিহাসের অংশ হয়ে যান না, আমাদের দেখার অভ্যাসের অংশ হয়ে যান। ডেভিড হকনি সেই বিরল শিল্পীদের একজন। তাঁর শেষ তুলি থেমে গেছে, কিন্তু তিনি আমাদের চোখে যে নতুন দৃষ্টি এঁকে দিয়ে গেছেন, তা এখনও অমলিন, এখনও জীবন্ত।
আর তাই, ক্যালিফোর্নিয়ার সেই নীল জলের দিকে তাকালে আজও মনে হয়– রঙের নিচে কোথাও একজন চিরসবুজ জাদুকর এখনও নীরবে কাজ করে চলেছেন। তুলির ডগাখানা গনগনে রঙিন!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved