Robbar

অটিজমের কিনারায় সচেতনতাই সমাধান

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 1, 2026 2:33 pm
  • Updated:July 1, 2026 2:33 pm  

‘অটিজম’ কথাটার সঙ্গে এখন কমবেশি সকলেই পরিচিত। আমরা অটিস্টিক শিশুকে দেখলেই বুঝতে পারি। তাদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণের অনেক জায়গা এখন গড়ে উঠেছে। কিন্তু ‘বর্ডারলাইন অটিজম’ কী এবং কেন, তা নিয়ে আলোচনা কোথাও দেখি না! বর্ডারলাইন অটিজমে সোশাল অ্যাংজাইটি কাজ করে। সহজে মিশতে পারে না। আর কোনও একটা বিশেষ কিছু নিয়েই সারাদিন ধরে পড়ে থাকে। আজ পিছনে তাকিয়ে বুঝি– আমাদের সন্তানের উন্নতির সবচেয়ে বড় বাধা অটিজম ছিল না, বরং দেরিতে জানতে পারা এবং না-মেনে নেওয়া ছিল। মেনে নেওয়ার অর্থ, হাল ছেড়ে দেওয়া নয়। মেনে নেওয়ার অর্থ হল, বাস্তবতাকে স্বীকার করে সন্তানের পাশে দাঁড়ানো।

দময়ন্তী দাশগুপ্ত

যেদিন প্রথম শুনলাম আমাদের সন্তানের ‘বর্ডারলাইন অটিজম’ আছে, সেদিন মেনে নিতে পারিনি।

কাউন্সেলরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল তিনি ভুল বলছেন। কারণ, আপাতদৃষ্টিতে সে আর পাঁচজন ছেলেমেয়ের মতোই। শুধু কিছু কিছু আচরণ অন্যরকম। ভাবলাম, এটা খুব বড় ব্যাপার নয়। স্বাভাবিক বলেই ভাবব ওকে।

এইসব ভাবতে ভাবতেই কিন্তু আমাদের সন্তান বড় হয়ে উঠছিল। আর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সমস্যাগুলোও বাড়ছিল। সেই বাস্তবতার আঘাতে সে নিজে এবং আমরাও চলে যাচ্ছিলাম গভীর ডিপ্রেশনে। একদিন বুঝলাম, অস্বীকার করে শুধু নিজেকেই কষ্ট দিচ্ছি না, আমাদের সন্তানকে প্রয়োজনীয় সাপোর্টও দিতে পারছি না। সেদিন নিজেকে বললাম– ‘হ্যাঁ, আমাদের সন্তানের বর্ডারলাইন অটিজম আছে। কিন্তু তার সম্ভাবনাও আছে।’ সেই দিন থেকেই আমাদের যাত্রা শুরু।

শিখলাম, জানলাম, চেষ্টা করতে শুরু করলাম। ওর ছোট ছোট অর্জনগুলোয় আনন্দিত হতে পারলাম। অনেক লড়াই করে সে বি.এ. এবং এম.এ. পাস করলে, সেগুলো উদযাপন করলাম। নিজের যোগ্যতায় সে চাকরিও পেল। খুব কষ্ট হত ঘরে বসে সারারাত জেগে কাজ করতে। কাজের চাপ পড়লে রেগে যেত, কাঁদত। কিন্তু তাও কাজ ছাড়েনি সে। কিন্তু একদিন কোম্পানির ২৫০ জন কর্মী ছাঁটাই হল! যার মধ্যে আমাদের সন্তানও একজন। তারপর থেকে কাজ খুঁজছে। এখনও পায়নি।

সূত্র: ইন্টারনেট

২৭ বছর বয়সে বিয়ে করতে চাওয়াটাও একজন মানুষের পক্ষে খুব স্বাভাবিক। কিন্তু বন্ধু তার হাতে গোনা তিনজন! ছেলে-বন্ধু তো একজনও নেই। ছোটবেলায় কো-এডুকেশন স্কুলে পড়লেও খানিক অন্যরকম হওয়ার জন্য খারাপ ব্যবহারই পেয়ে এসেছে। তারপরের স্কুল-কলেজে আর কো-এডুকেশনে পড়ার সুযোগও পায়নি। বরং ইন্টারনেটে বিভিন্ন গেম খেলতে গিয়ে বেশ কিছু বন্ধু হয়েছে তার, যারা সকলেই থাকে কোনও না কোনও দূরদেশে। তাই তার বিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও আমাদেরই। যেখানে আজকাল সুস্থ স্বাভাবিক সম্পর্কই দু’দিন বাদে ভেঙে যাচ্ছে, সেখানে জানি না, কে তাকে বিয়ে করতে রাজি হবে এবং তার পরিণতিই বা কী দাঁড়াবে! শুধু জানি, আমাদের অবর্তমানে একা থাকা ওর পক্ষে সম্ভব নয়।

‘অটিজম’ কথাটার সঙ্গে এখন কমবেশি সকলেই পরিচিত। আমরা অটিস্টিক শিশুকে দেখলেই বুঝতে পারি। তাদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণের অনেক জায়গা এখন গড়ে উঠেছে। কিন্তু ‘বর্ডারলাইন অটিজম’ কী এবং কেন, তা নিয়ে আলোচনা কোথাও দেখি না!

ছেলেবেলায় এই প্রতিবন্ধকতা বোঝা প্রায় অসম্ভব। যদিও মেয়ের নবম শ্রেণি থেকেই ডাক্তার জয়রঞ্জন রামের কাছে চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং করিয়েছি। কিন্তু এটা আমরা জানতে পারি মেয়ের গ্র‍্যাজুয়েশনের সময়। এতটা সময় নষ্ট হয়েছে! আমরা ভুল বুঝেছি ওকে এবং ওর আচরণকে।

বর্ডারলাইন অটিজমে সোশাল অ্যাংজাইটি কাজ করে। সহজে মিশতে পারে না। আর কোনও একটা বিশেষ কিছু নিয়েই সারাদিন ধরে পড়ে থাকে। যেমন আমার মেয়ের ক্ষেত্রে গেম খেলা, কে-পপ শোনা, ডিটেকটিভ বই পড়া বা সেই ধরনের সিনেমা দেখা। তবে এখন গেম খেলাটাই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছেলেবেলায় যেমন ছিল কার্টুন দেখা। আর ছোট ছোট নানা কাজ পারে না বা করতে চায় না সে। জুতোর ফিতে বা দড়িতে গিঁট দিতে শিখতে তার অনেক সময় লেগেছে। আমার অনেকদিন লেগেছে তাকে নিজে স্নান করা বা চুল আঁচড়ানো শেখাতে।

সূত্র: ইন্টারনেট

পড়াশোনা করানোটাই খুব কঠিন ছিল চিরকালই। একমাত্র ইংরেজি পড়তে ভালোবাসত। অনেকসময়েই অটিস্টিক ছেলেমেয়েদের ছবি আঁকা বা ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ের মতো বিশেষ গুণ থাকে। ওর মধ্যে সেরকম কিছু দেখিনি আমরা। আজ পিছনে তাকিয়ে বুঝি– আমাদের সন্তানের উন্নতির সবচেয়ে বড় বাধা অটিজম ছিল না, বরং দেরিতে জানতে পারা এবং না-মেনে নেওয়া ছিল।

মেনে নেওয়ার অর্থ হাল ছেড়ে দেওয়া নয়। মেনে নেওয়ার অর্থ হল, বাস্তবতাকে স্বীকার করে সন্তানের পাশে দাঁড়ানো। মেনে নেওয়ার অর্থ হল– ‘কেন আমার সন্তানের এমন হল?’ প্রশ্ন থেকে বেরিয়ে এসে– ‘এখন আমি তার জন্য কী করতে পারি?’– এই প্রশ্ন করা।

সূত্র: ইন্টারনেট

বিশেষ শিশুর উন্নয়নের প্রথম ধাপ থেরাপি নয়, স্কুল নয়, কোনও ম্যাজিক সমাধানও নয়। প্রথম ধাপ হল– মেনে নেওয়া। কারণ, যেদিন একজন অভিভাবক সন্তানের বাস্তবতাকে হৃদয় দিয়ে মেনে নেন, সেদিন থেকেই সন্তানের উন্নতির দরজা সত্যিকার অর্থে খুলতে শুরু করে। আর তাই যেদিন আমার সন্তানকে বদলানোর চেষ্টা বন্ধ করে তাকে বুঝতে শুরু করলাম, সেদিন থেকেই আমাদের জীবন কিছুটা হলেও বদলাতে শুরু করল। এখন প্রশ্ন এটাই, আমি বা আমরা মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে গেলেও এই সমাজ বা অন্য মানুষ তাকে মেনে নিতে পারবে তো? না-হলে আমাদের অবর্তমানে ঠিক কোথায় এসে দাঁড়াবে সে?

তাই এখনও অনেকটা পথ হাঁটা বাকি আমাদের।

………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন দময়ন্তী দাশগুপ্ত-র অন্যান্য লেখা

………………….