Robbar

তেজ ও মাধুর্যে বোনা বঙ্কিমের মেয়েরা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 26, 2026 3:53 pm
  • Updated:June 26, 2026 4:02 pm  

‘দেবী চৌধুরাণী’-তে প্রফুল্লর সতীন সাগর তার দিদি-শাশুড়ির কাছে রূপকথার গল্প শুনতে ভালোবাসত। রাজা-রানি-রাক্ষস-খোক্কসের গল্প। সেই গল্প– যেখানে রাজা যখন-তখন দূর করে দিয়েছে রানিকে। এক রানি হয়ে উঠেছে সুয়ো, অন্যজন দুয়ো। সতীন নিয়ে ঘর করতে বাধ্য করেছে রানিদের, আর রানিদের ঈর্ষাজনিত কাজের ফল হিসেবে তাদের জীবন্ত কবরও দিয়েছে। এই চরম পুরুষতান্ত্রিকতার গল্প তো বলত ব্রক্ষ্মঠাকুরাণী। এসব ছিল মেয়েলি গল্প, মৌখিক কথকতা। কিন্তু পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ঔপন্যাসিকের নভেলে বাংলাদেশের মেয়েলি অশিষ্ট সাহিত্যের আঁচ কি নারীর গৃহসর্বস্ব জীবনকেই ফিরিয়ে দেবার জন্যে ব্যবহৃত হল? না কি এই দ্বিধাই সেই পরশপাথর– যার সন্ধান ‘কপালকুণ্ডলা’র মতো স্বাধীন নারী পায়নি, কিন্তু মোতিবিবি পেয়েছিল। যার অনুসন্ধান ছিল ইন্দিরার মধ্যে, শৈবলিনীর মধ্যে? যা হয়তো প্রফুল্ল পেয়েছে, মৃণালিনী পেয়েছে, ভ্রমর, সূর্যমুখীও পেয়েছে। 

ঈশা দেব পাল

একজনের নাম কল্যাণী, অন্যজনের নাম শান্তি। প্রথমজন ছিল স্বামীর পার্শ্ববর্তিনী, সুখের মতো দুঃখের দিনেরও ভাগীদার, মা হিসেবেও নিবেদিত। সে মরতে দ্বিধা করে না। দ্বিতীয়জন চেয়েছিল স্বামীর কর্মসাফল্য তথা দেশের কাজের সাফল্য। সেও মরতে দ্বিধা করে না। কিন্তু বিষ খেয়ে নয়, লড়াই করে। 

আসলে এই দুই ধরনের নারী-প্রকৃতির মধ্যে ছিল একটা ভাবনার সংঘাতও। একটা বৈপরীত্যময় দ্বিধা। ঘর না বাহির? অন্তর্জীবন না কি বহির্জীবন? গার্হস্থ্য না সন্ন্যাস? কী চেয়েছিলেন বঙ্কিম তাঁর নারীদের জন্য? এসব প্রশ্ন ওঠে শুধু বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ পড়েই নয়, ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘বিষবৃক্ষ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ পড়েও। আর ‘আনন্দমঠ’ শুধুই ‘বন্দে মাতরম্‌’-এর পটভূমি নয়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ‘বন্দে মাতরম্‌’ গানের সংযোজনে দেশকে যেমন মাতৃজ্ঞানে পুজো করার বার্তা আছে, তেমনই আছে এই দেশসেবায় নারীর ভূমিকা ঠিক কেমন হবে– সেকথাও। এখানে কল্যাণী ছিল স্বামী আর সন্তান অন্ত প্রাণ। সন্তানের মৃত্যু হয়েছে এই আশঙ্কায় সে বিষ পান করে। জমিদার-গৃহিণী হওয়া সত্ত্বেও অনায়াসে স্বামীর সঙ্গে গৃহত্যাগ করে পথ অবলম্বন করে। আর শান্তি– জীবানন্দের সহধর্মিণী শুধু নয়, সহকর্মিনীও। কল্যাণী স্বামীর জন্যে প্রাণ দিতে পারে, কিন্তু শান্তি স্বামীর প্রাণ রক্ষা করতেও পারে। নারীর এই কল্যাণময় অথচ শক্তিরূপ ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের সম্পদ। 

উপন্যাসের শেষে দেখা যায় শান্তি এবং কল্যাণীর মিলে যাওয়াই পথ। তাদের দুইয়ের মিলনই সুন্দর। আর ১৮৮২-তে প্রকাশিত ‘আনন্দমঠ’-এর দু’-বছর পর ১৮৮৪-তে প্রকাশিত ‘দেবী চৌধুরাণী’তে একটি চরিত্রের মধ্যেই যেন মিশে গিয়েছিল শান্তি এবং কল্যাণী। প্রফুল্ল আর দেবীর সহাবস্থানই যেন শান্তি এবং কল্যাণীকে মিলিয়ে দেওয়া। যে মেয়েটি অস্ত্র ধরে, সেই মেয়েটি ঘরকন্নাও করে। যে মেয়েটি অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, সেই মেয়েটি স্বামীর ভালোবাসাও আকাঙ্ক্ষা করে। তাই তাঁর চরিত্রদের নাম কল্যাণী, শান্তি আর প্রফুল্ল। আনন্দময় অথচ আত্মসম্মানের লড়াই লড়ে তাঁরা। তেজ আর মাধুর্যকে বারবার মেলাতে চেয়েছেন বঙ্কিম তাঁর মেয়েদের মধ্যে, একাধিক উপন্যাসে। 

 ১৮৪৯-এ স্থাপিত হচ্ছে নারীশিক্ষার প্রথম ইশকুল, বেথুন স্কুল আর ১৮৮৪-তে লিখছেন বঙ্কিম ‘দেবী চৌধুরাণী’। এ সেই উপন্যাস যার চরিত্রটি ঐতিহাসিক, কিন্তু উপন্যাসের দেবীর সঙ্গে ঐতিহাসিক দেবীর মিল বড় অল্প বলে ঘোষণা করেন বঙ্কিম নিজেই। ঐতিহাসিক দেবী ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন এই-ই মাত্র মিল। উপন্যাসের দেবী পাঠকের মন কেড়েছে তাঁর শক্তি আর মাধুর্যের সমন্বয়ে।

প্রফুল্ল থেকে দেবী চৌধুরাণী হয়ে ওঠার এই নিপুণ যাত্রায় তাই দেবী, ভবানী ঠাকুরের সব কথা শুনে নিজেকে অনাসক্ত নিষ্কাম ধর্মে প্রস্তুত করে। নারী রবিনহুডের আদল পেলেও বেঁচে থাকে একাদশীতে ভবানী ঠাকুরকে লুকিয়ে তার মাছ খাওয়াটুকু। তাই ব্রজেশ্বরকে ধরেও ছেড়ে দেওয়ার পর দস্যুরানি দেবী এক লহমায় প্রফুল্ল হয়ে কান্নায় ভেসে যায়। ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, জ্যোৎস্নালোকে বসে অনিন্দ্যসুন্দর দেহ নিয়ে বীণা বাজায়। ভবানী ঠাকুর পথের অনুশীলন আয়ত্ত করেও, একাদশীতে গুরুবাক্য অমান্য করে মাছ খেয়ে নিজে স্বামীর প্রতি গোপন নিজস্ব আনুগত্য বজায় রাখে। এই দেবী প্রেমে-প্রতাপে একইরকম সামঞ্জস্যপূর্ণ। নিশার প্রশ্নের উত্তরে সে বলে, সে-সবটুকু কৃষ্ণকে দিলেও কিছু কিছু দিতে পারেনি আজও। সেই না-দিতে পারাতেই দেবী প্রফুল্ল হয়ে বেঁচে থাকে। তাই বাইরের সাফল্যের পরেও তার নারীমনকে সর্বোত্তম রূপ দিয়েছেন তিনি। বঙ্কিমচন্দ্রের অনুশীলন তত্ত্বের ব্যর্থতা এখানে তাঁকে জয়ী করেছে ঔপন্যাসিক হিসেবে। 

তবু এই প্রশ্ন থাকেই, কেন কর্মজীবনে এত সাফল্যের পর, দেবী হিসেবে এত মানুষের সেবা করার অধিকার প্রাপ্তির পর, এত অনুগামীর আনুগত্যের পরও দেবীকে প্রফুল্ল হয়ে পুকুরঘাটে বাসন মাজতে হয়? পণ্ডিতেরা এই নিয়ে অনেক তত্ত্ব উপস্থিত করবেন, উঠে আসবে বঙ্কিমের অনুশীলন তত্ত্ব, নিষ্কাম ধর্ম ইত্যাদি প্রসঙ্গ, কিন্তু বঙ্কিমের পাঠিকা, যাদের একাধিকবার সম্বোধন করেছেন তিনি– একাধিক নভেলে, তাদের নারীজীবনে কী বার্তা এসে পৌঁছয় নারীর এই ভূমিকায়? পুকুরঘাটের পিচ্ছিলতায় ক্ষার খৈল নিয়ে যিনি এক বাড়ি লোকের এঁটো বাসন মাজেন– তাঁর কাছে নিষ্কাম ধর্মতত্ত্ব পৌঁছনোর জন্য পুথির দরকার পড়ে না। গৃহকর্ম নারীর জন্য অপমানের নয়, তার আপন সংসারে নিজের হাতে কর্মসাধন সব নারীই পছন্দ করেন, কিন্তু কোনটা তার আপন সংসার? 

যে সংসার এক নারীকে বিন্দুমাত্র যাচাই না করে ‘কুলটা’ সম্বোধন করে বিতাড়ন করে, তার মাকে মরে যেতে হয় মেয়ের ওপর ঘটে যাওয়া এরকম অন্যায় হেনস্তায়– সেই নারী কেন বিশ্বজয় করে এসে তার সেই অপমানের সংসারের ব্যক্তিগত জীবনে সার্থকতা খুঁজে নেবে? অথচ এই বঙ্কিমই কিন্তু সৃষ্টি করেছিলেন ভ্রমরকে। গোবিন্দলালের আদরের ভ্রমর।

‘যতদিন তুমি শ্রদ্ধার যোগ্য, ততদিন আমার শ্রদ্ধা’– এই দৃপ্ত উচ্চারণ ছিল ভ্রমরের। ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর ভ্রমরের। নারীর আত্মসম্মানের ভাষা, অভিজাত অভিমানের ভাষা– শুধু এইসকল কারণের জন্যই নয়, পুরুষকেও যে প্রেমের যোগ্য হয়ে উঠতে হয়– এই চ্যালেঞ্জ বঙ্কিমই সেদিন ছুড়ে দিয়েছিলেন ভ্রমরের গোবিন্দলালের উদ্দেশে লেখা এই বাক্যে।

বঙ্কিমের নারীরা স্বতন্ত্র তাদের প্রেমে এবং অপ্রেমে। তারা গ্রহণ এবং বর্জন এই দুই-ই পারে দৃপ্ততায়। আজ নারীবাদের একাধিক দৃষ্টিকোণ যখন সমাজ মনস্তত্ত্বে গৃহীত হতে পারে না, বারবার সমালোচিত হয়, অনায়াসে দুই ভাগ হয়ে যায় নারী-লেখক, পুরুষ-লেখকেরা– তখন বঙ্কিম-স্মরণ অনিবার্য হয়, বঙ্কিমের মেয়েদের অভিজাত পদক্ষেপ নতুন করে পড়ে নিতে হয়।

ভ্রমরের পূর্ণ রূপ যেন দেখা যায়– ‘মৃণালিনী’র ‘মনোরমা’ চরিত্রটায়। যে ভালোবাসে, আবার শাসনও করে প্রিয় পুরুষটিকে। যে প্রেম এবং প্রতাপ দু’টিতেই সমান পরাক্রমী। তার ভালোবাসা আগুনের শিখার মতো সর্বগ্রাসী, আবার তার প্রেমিকের অন্যায়ের জন্য ভ্রুকুটিও একইরকম তীব্র। আজকে দাঁড়িয়েও এই নারী বিরল নয় কি? নারীস্বাধীনতা শব্দের সঙ্গে বঙ্কিমের ‘মনোরমা’ পরিচিত ছিল না, কিন্তু সে জেনেছিল ভালোবাসলে রক্ষা করতে হয়, দায়িত্ব নিতে হয়। নারীমুক্তি মানে শুধু পথে বেরিয়ে পড়াই নয়, প্রেম এবং বিবাহের সিদ্ধান্ত বা স্বাধীনতাই শুধু নয়, নিজ দায়িত্ব তুলে দিয়ে নীরবে ভালোবাসাই পথ নয়, আর ভালোবাসার একমাত্র উপাদান অসহায় কান্নাও নয়। তাই সে একইসঙ্গে রুদ্ররূপিণী, আবার বালিকার মতো মধুর। তার এই বিভাজিত পরস্পর-বিরোধী রূপ আসলে প্রেম এবং ঔচিত্যের দ্বিধা। 

মনোরমা অপ্রধান চরিত্র, অথচ কী অসামান্য প্রাধান্য বঙ্কিম রেখেছেন তার আভিজাত্যপূর্ণ প্রতিটি পদক্ষেপে! ঠিক প্রধান চরিত্র হয়েও যেমন হয়ে ওঠে ‘সূর্যমুখী’। ‘বিষবৃক্ষ’র নগেন্দ্রের স্ত্রী। কেমন স্ত্রী? স্বামী অন্য নারীর প্রতি আসক্ত বুঝে যে নিঃশব্দে নিজেকে সরিয়ে আনে। বিয়ের আয়োজন করে সেই কন্যার সঙ্গে। স্বামীর বিবাহের পরদিন নিঃশব্দে গৃহত্যাগ করে। কলহ নয়, অধিকার প্রয়োগ নয়, সূর্যমুখীর যাবতীয় অত্যাচার ছিল নিজের ওপর। সে নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছিল। দাম্পত্য প্রেমের প্রকাশও যে কামনা কিংবা জবরদস্তি অধিকার প্রয়োগে নয়, এই নিঃশব্দ নিঃসরণেও বঙ্কিম তা দেখান বারবার। আর সূর্যমুখীর এই ব্যক্তিত্বময় ভালোবাসার কাছেই নিজেকে নিঃশর্তে নিবেদন করেন স্বামী নগেন্দ্র, ভালোবাসার এই উচ্চতার কাছে হেরে যায় কুন্দনন্দিনীর প্রতি নগেন্দ্রের কামজাত প্রেমও।

সূর্যমুখী যে শুধু নগেন্দ্রের স্ত্রী নন, তাঁর প্রেমিকাও ছিলেন, আর তার ফলেই সূর্যমুখীকে যে যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে– ‘বিষবৃক্ষ’র মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে সেটাই। নারী সম্পর্কে যে সকল মিথ পুরুষ বিশ্বাস করেছে এবং নারীও তাকে মান্যতা দিয়েছে, তা হল ঈর্ষা। যেন ঈর্ষা একা নারীর স্বভাবজাত। যেন সতীনকে সহ্য করাই তার মূল দায়িত্ব। সতীন প্রথা গ্রহণ করাটাই তার স্বাভাবিকতা। একাধিক লোকগল্পে যা মেয়েরাই মেয়েদের শুনিয়ে এসেছে চিরকাল– তাতে বড় রানিদের ছোট রানির প্রতি, সুয়োরানিদের দুয়োরানির প্রতি ঈর্ষার মিথ ছড়িয়ে গিয়েছে সমাজের সব কেন্দ্রে। বঙ্কিম পুরুষ-লেখক হয়ে ভেঙে ফেলেছিলেন সেই মিথ, দেখালেন নারী প্রকৃত ভালোবাসলে স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিতে পারে প্রেমিক স্বামীকে, প্রিয় সংসারকে।

কিন্তু প্রেমকে জিতিয়ে দিতে গিয়ে কেন বারবার বলিদান হয় নারীর? সূর্যমুখীর দাম্পত্য-প্রেম বাঁচানোর জন্য কুন্দনন্দিনী বিষ খেয়েছিল। আর মনোরমা পশুপতির চিতায় সতীদাহের জন্য এগিয়ে আসে স্বেচ্ছায়। সহমরণে যাতে বেঁচে যায় তাদের প্রেম, দাম্পত্য। 

সতীদাহ প্রথা নিবারণী আইন প্রণয়ণ হয়েছে ১৮২৯-এ, আর ‘মৃণালিনী’ লেখা হচ্ছে ১৮৬৯-এ, তবে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট থাকলেও বঙ্কিম কি এই সতীদাহ প্রথা এড়িয়ে যেতে পারতেন না? রামমোহন, বিদ্যাসাগরদের সার্বিক লড়াইকে কিছুটা হলেও মান্যতা দিতে পারতেন না? হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন প্রচলন হয়েছিল ১৮৫৬-তে, তাই-ই কি কুন্দনন্দিনীকে বিয়ে দিয়েছেন যে বঙ্কিম, তিনি ভয় পেয়েছিলেন মনোরমাকে বিধবা হিসেবে বাঁচিয়ে রাখার? পাঠকের কল্পনায় তার পুনর্বার বিবাহ বা প্রেম হওয়ার সম্ভাবনাকে বন্ধ রাখতে চেয়েছিলেন? 

‘বিষবৃক্ষ’-তেও একাধিক প্রসঙ্গ এনেছেন ‘বিধবা-বিবাহ’ নিয়ে। সূর্যমুখী তার ননদ কমলমণিকে যে কারণে লিখছে: বিধবা-বিবাহ আবার পণ্ডিতের নিদান হতে পারে না কি?– তার সম্পূর্ণ বিপরীত কারণে নগেন্দ্র তার বন্ধুকে লিখছে সে বিধবা-বিবাহ বিশ্বাস করে। সূর্যমুখীর বক্তব্যের অন্তরালে ছিল– যে নারী তার স্বামীকে ভালোবাসে, স্বামীর মৃত্যুর পর সামাজিক শর্ত আরোপ করে তাকে বিয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু নগেন্দ্র কুন্দকে বিবাহের অছিলায় ব্যবহার করছিল এই সামাজিক আন্দোলনের সুবিধা। ঠিক যেভাবে দেবেন্দ্র নামের চরিত্রটি ব্যবহার করে চলছিল ‘নারী মুক্তি আন্দোলন’-এর সুবিধাবাদী দিকটি। মনে পড়ে যায়, অনেক পরে লেখা মানদা দেবীর ‘শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত’। আধুনিকা হতে গিয়ে মেয়েটি হারিয়ে ফেলেছিল সমাজের মূল স্রোত। স্থান হয়েছিল তার পতিতালয়ে। তার প্রেমিক ব্যবহার করেছিল মেয়েদের নিয়ে বাইরে বের হওয়ার সুবিধাটুকু। 

‘বিষবৃক্ষ’-র কুন্দকে বিষ খেতে হয়। মনোরমাকেও সহমরণে যেতে হয়। সূর্যমুখীও নিজেকে হারিয়ে ফেলে আবার ফিরে আসতে পারে নিজের সংসারে। ‘মৃণালিনী’-র মৃণালিনীও পথে পথে ঘুরে বেড়ায় মূলত প্রেমের জন্য। সকলেই তারা প্রেমের জন্য ভিখারিণী। শুধু প্রেমের জন্যই তারা ঘর থেকে নেমে এসেছে পথে, প্রেম এবং মৃত্যু এক হয়ে গিয়েছে তাদের চরিত্রে।

বাংলা ভাষার প্রথম ঔপন্যাসিকের কাছে আমরা যে যে কারণে কৃতজ্ঞ, সেটা এই ‘নারীমন’। পণ্ডিতরা আলোচনা করেন– তাঁর উপন্যাস বুনন নিয়ে, অনুশীলন তত্ত্ব নিয়ে কিংবা নারীবাদের প্রসার-অপ্রসার নিয়ে। সেই ‘বঙ্গদর্শন’ আমল থেকে অপেক্ষারত পাঠিকারা জানে– কত মাধুর্যের সঙ্গে, কত আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি কুন্দনন্দিনীর মৃত্যু আঁকেন, ইন্দিরার লড়াইকে স্পর্শ করেন, রোহিণীর যৌবন-বেদনাকে বুঝতে পারেন। ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এ বঙ্কিম বলেছিলেন রহস্য করেই, রোহিণীর একা কান্নার প্রসঙ্গে– ‘কেন কাঁদিতে বসিল তাহা আমি জানি না। আমি স্ত্রীলোকের মনের কথা কি প্রকারে বলিব? তবে আমার বড়ই সন্দেহ হয়, ঐ দুষ্ট কোকিল রোহিণীকে কাঁদাইয়াছে।’

মেয়েদের কান্নার রহস্য তাদের নিজেদের চেয়ে বঙ্কিম কম জানতেন না। তাই তত্ত্বের বাহুল্য কিংবা সামাজিক অভিঘাত তুচ্ছ হয়ে যায় তাঁর হৃদয় দিয়ে গঠিত চরিত্রদের কাছে, বিশেষ করে নারী চরিত্রদের কাছে। 

‘দুর্গেশনন্দিনী’-তে আয়েষা সাহসী উচ্চারণে জানিয়েছিল– ‘এই বন্দীই আমার প্রাণেশ্বর’। কিন্তু দেবী চৌধুরাণীর মূল যাত্রা ঠিক কী ছিল? ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, না কি গরিব প্রজার সেবা, না কি তার স্বামী-শ্বশুরঘর নতুন করে ফিরে পাওয়া? তাঁর বাইরের জীবন ছিল সাহসী এবং সফল। ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দেবীর সাহসী ভূমিকা, দরিদ্রের সেবায় তাঁর সক্রিয়তা– সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে জনমানসে অতি সাফল্যের যে ঐশ্বর্য দেখিয়েছে– তাকে হেলায় কেন হারালেন দেবী, লেখকের অঙ্গুলি হেলনে? কেন নিষ্কাম ধর্মের মহত্ত্ব বোঝাতে তাকে বিশ্বসংসার ফেলে আপন সংসারকে ক্ষেত্র করতে হল? 

দেবী তো বরাবরই সন্ন্যাসী ছিলেন। রাজভোগে স্বচ্ছন্দ হলেও অনায়াসে একবস্ত্রে একাহারে যত্রতত্র শয়নে ছিলেন অভ্যস্ত। নেত্রী বা সম্পদশালিনীর ভোগ তো তাঁকে স্পর্শ করার কথা নয়। তবে গৃহধর্ম বা প্রেমধর্মে শুদ্ধ হবার নতুন করে কী প্রয়োজন ছিল? বা হয়তো বঙ্কিম দেখাতে চেয়েছিলেন দু’ক্ষেত্রেই তাঁর পারদর্শিতা। কিন্তু তার ব্যক্তিগত অপমানের কোনও শোধ হল না কেন? কেন ব্রজেশ্বরের পিতা শুধু দেবীর শ্বশুর হওয়ার সুবাদে দেশদ্রোহিতার মতো অন্যায়েও ছাড় পেয়ে যায়? 

‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এ মৃত্যুর সময় গোবিন্দলালকে প্রণাম করে তাঁর স্বামীত্ব স্বীকার করেও স্পষ্ট বুঝিয়েছিল ভ্রমর এই স্বামীসঙ্গের দুঃখ, অনায়াসে বলেছিল– পরজন্মে যেন সুখী হই। বঙ্কিম তাঁর ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসে সাগরের মতো এক বালিকাকে সৃষ্টি করেছেন, যে স্বামী ব্রজেশ্বরের পদাঘাতের প্রতিশোধ নিতে তাকে দিয়ে পা টিপিয়ে নিতে পারে– এমন এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কাহিনিতে, যখন স্বামীই পরম ধর্ম ছিল নারী-জীবনের স্থায়ী বিশ্বাস।

বঙ্কিমের চরিত্ররাই কি তবে বঙ্কিমের চরিত্রদের বিরোধিতা করছে না? না কি এ বঙ্কিমের নিজের দ্বিধা? ঈশ্বর গুপ্ত নারীশিক্ষার প্রাক্কালে বিদ্রুপ করেছিলেন এই বলে–

যতো ছুঁড়িগুলো তুড়ি মেরে কেতাব হাতে নিচ্ছে যবে
এ বি শিখে, বিবি সেজে, বিলাতি বোল কবেই কবে;
আর কিছুদিন থাকরে ভাই! পাবেই পাবে দেখতে পাবে,
আপন হাতে হাঁকিয়ে বগি গড়ের মাঠে হাওয়া খাবে। 

আমাদের মনে পড়ে যায় ঈশ্বর গুপ্ত ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের প্রিয় কবিও।

‘দেবী চৌধুরাণী’-তে প্রফুল্লর সতীন সাগর তার দিদি-শাশুড়ির কাছে রূপকথার গল্প শুনতে ভালোবাসত। রাজা-রানি-রাক্ষস-খোক্কসের গল্প। সেই গল্প– যেখানে রাজা যখন-তখন দূর করে দিয়েছে রানিকে। এক রানি হয়ে উঠেছে সুয়ো, অন্যজন দুয়ো। সতীন নিয়ে ঘর করতে বাধ্য করেছে রানিদের, আর রানিদের ঈর্ষাজনিত কাজের ফল হিসেবে তাদের জীবন্ত কবরও দিয়েছে। এই চরম পুরুষতান্ত্রিকতার গল্প তো বলত ব্রহ্মঠাকুরাণী। এসব ছিল মেয়েলি গল্প, মৌখিক কথকতা। কিন্তু পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ঔপন্যাসিকের নভেলে বাংলাদেশের মেয়েলি অশিষ্ট সাহিত্যের আঁচ কি নারীর গৃহসর্বস্ব জীবনকেই ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হল? না কি এই দ্বিধাই সেই পরশপাথর– যার সন্ধান ‘কপালকুণ্ডলা’র মতো স্বাধীন নারী পায়নি, কিন্তু মোতিবিবি পেয়েছিল। যার অনুসন্ধান ছিল ইন্দিরার মধ্যে, শৈবলিনীর মধ্যে? যা হয়তো প্রফুল্ল পেয়েছে, মৃণালিনী পেয়েছে, ভ্রমর, সূর্যমুখীও পেয়েছে।

প্রেমিক বঙ্কিমের কাছে ঠিক এইখানেই হেরে যান না কি নীতিবাদী বঙ্কিম? হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বঙ্কিম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন: ‘তিনি সৌন্দর্যসৃষ্টিকে নীতিশিক্ষার দাসী করিয়া তুলিয়াছেন’– কিন্তু প্রেমিক বঙ্কিমকে পাঠ করলে ঠিক বিপরীতটাই মনে হয়। প্রেম রক্ষা করতে গিয়ে তিনি সামাজিক নৈতিকতা বা ব্যক্তিগত ঔচিত্যকেও অনেক সময়ই এড়িয়ে গিয়েছেন।

……………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন ঈশা দেব পাল-এর অন্যান্য লেখা

……………………….