nature lover and observer gopal chandra bhattacharya | Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

অক্লান্ত প্রকৃতিরসিক

গোপালচন্দ্র কেবল নিজেই গবেষণা করেননি, সাধারণ মানুষের মনে বিজ্ঞানের আলো পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে মিলে তিনি ‘বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ’ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা নেন এবং বিখ্যাত ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ পত্রিকার সম্পাদনা করেন। ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ পত্রিকার সম্পাদক থাকাকালে তিনি শিশু-কিশোরদের উপযোগী প্রায় ৮০০-এর মতো নিবন্ধ লিখেছেন। বাংলায় বিজ্ঞানচর্চাকে জনপ্রিয় করতে তাঁর লেখা ‘বাংলার কীটপতঙ্গ’ (দুই খণ্ডে প্রকাশিত) বইটি আজও বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।

Published by: Robbar Digital

Posted:August 2, 2026 3:28 pm | Updated:August 2, 2026 3:28 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

বিজ্ঞানের জগৎ বলতে আমরা বুঝি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত আধুনিক সুসজ্জিত গবেষণাগার, কোটি-কোটি টাকার যন্ত্রপাতি আর বড়-বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে, এই বাংলারই এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা এক মানুষ প্রমাণ করেছিলেন যে, বিজ্ঞানের আসল শক্তি প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিতে নিহিত থাকে না– সেটি থাকে মানুষের দেখার চোখ আর তীব্র অনুসন্ধিৎসায়। আর এই অসাধারণ পর্যবেক্ষণ শক্তির জোরেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন সর্বজনস্বীকৃত প্রকৃতিবিদ। গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য। কলেজের গণ্ডি না পেরিয়েও যিনি নিজের ঘরের কোণকে বানিয়েছিলেন গবেষণাগার আর বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছিলেন তাঁর মৌলিক সব আবিষ্কার দিয়ে।

zoom
গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য

গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন স্বভাববিজ্ঞানী। প্রথাগত গবেষণাগারের দামি যন্ত্রপাতি ছাড়াই, শুধুমাত্র ঘরের বারান্দায় টবের আমগাছ আর জলঘেরা লক্ষ্মণরেখা দিয়ে তিনি কীটবিজ্ঞানের একটি বড় ধাঁধার সমাধান করেছিলেন। তিন ও চারের দশকে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিহীনতার কারণে সহকর্মীদের অবজ্ঞা আর বিশ্বযুদ্ধের রাজনৈতিক ডামাডোলের বাধা অতিক্রম করে তিনি তাঁর মৌলিক গবেষণাগুলোকে করে তুলেছিলেন বিশ্বমানের। বিশেষ করে পিঁপড়ে ও মাকড়সার সমাজজীবন নিয়ে তাঁর কাজ প্রাণীবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪১ সালের মধ্যে নালসো পিঁপড়েদের ওপর করা তাঁর পরীক্ষাটি আজও জীববিজ্ঞানের এক ঐতিহাসিক গবেষণাকৃত দলিল।

১৮৯৫ সালের ১ আগস্ট অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার লোনসিং গ্রামে এক অতি দরিদ্র পরিবারে জন্ম হয়েছিল এই মানুষটির। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়ে চরম দারিদ্রের মধ্যে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। সংসারের ভার টানতে মাত্র নয় বছর বয়সেই উপনয়নের পর বালক গোপালচন্দ্রকে নামতে হয়েছিল বাবা অম্বিকাচরণের রেখে যাওয়া যজমানি বা পুরোহিতের কাজে। পায়ে হেঁটে মাইলের পর মাইল পেরিয়ে যজমানি সেরে এসে তবেই বসতেন স্কুলের পড়া নিয়ে। এমন চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর মেধা তাঁকে ১৯১৩ সালে প্রবেশিকা বা ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ফরিদপুর জেলায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হতে সাহায্য করে। কিন্তু দারিদ্র তাঁর উচ্চশিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে কলেজে ভর্তি হয়েও শেষপর্যন্ত অর্থাভাবে আই.এ পড়া শেষ করতে পারেননি। সংসার চালাতে শুরু করলেন গ্রামের স্কুলেই শিক্ষকতা করে। শিক্ষকতা করতেন ঠিকই কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকত প্রকৃতির কোলে, গাছপালা আর ছোট ছোট পোকামাকড়ের অদ্ভুত আচরণের জগতে। ছোটবেলা থেকেই জলে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর নেশা ছিল গোপালচন্দ্রের। স্কুলে পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকেও ঘুরে বেড়াতেন বনে-জঙ্গলে। তবে গাছগাছালির থেকে তাঁকে বেশি টানত জল-জঙ্গলের পোকামাকড়। নিবিষ্ট মনে লক্ষ করতেন নানান কীটপতঙ্গের গতিবিধি। পিঁপড়ে, মাকড়সা, গুবরেপোকা– এগুলো ধরে ধরে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন তিনি।

আর্থিক সংকটের কারণেই গ্রামে বেশিদিন থাকা সম্ভব হয়নি গোপালচন্দ্রের। চাকরির খোঁজে তাঁকে চলে আসতে হয় কলকাতায়। ১৯১৯ সালের শেষভাগে কলকাতায় এসে কাশীপুরের বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সের একটি সহযোগী সংস্থায় টেলিফোন অপারেটর ও ক্লার্কের চাকরি নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর ভেতরের বিজ্ঞানী-সত্তা ম্লান হয়নি। গভীর জঙ্গলে পচে যাওয়া কাঠ বা পাতা থেকে রাতে যে আলো বের হয়, যাকে আমরা ‘জৈবদ্যুতি’ বা ‘Bioluminescence’ বলি, সেই নিয়ে তিনি এক অসাধারণ প্রবন্ধ লিখে ফেললেন। ১৯১৮ সালে তৎকালীন বিখ্যাত ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় তাঁর সেই লেখাটি প্রকাশিত হয়। লেখাটি অপ্রত্যাশিতভাবে চোখে পড়ে যায় বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর।

তিনি অবাক হয়ে ভাবলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই এই যুবকের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এত নিখুঁত! তিনি আর দেরি না করে গোপালচন্দ্রকে ডেকে পাঠালেন নিজের সদ্যপ্রতিষ্ঠিত ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ (Bose Institute)-এ।

zoom
পাশাপাশি জগদীশচন্দ্রের বাসভবন ও বসু বিজ্ঞান মন্দির

১৯২১ সালে জগদীশচন্দ্র বসু গোপালচন্দ্রকে তাঁর বসু বিজ্ঞান মন্দিরে ‘রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবে কাজের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। জগদীশচন্দ্র বসুর আগ্রহেই ১৯২১ সালে জার্মান প্রকৃতিবিজ্ঞানী হ্যানস মলিশের সহকর্মী হিসেবে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য বিজ্ঞান মন্দিরে যোগ দিলেন। শুরু হয় গোপালচন্দ্রের জীবনের এক নতুন অধ্যায়। বসু বিজ্ঞান মন্দিরে কাজ করলেও গোপালচন্দ্রের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারগুলোর বেশিরভাগই ছিল তাঁর ঘরের কোণে। তাঁর ছোট্ট বাসার চারপাশের দেয়াল, নর্দমার ধার কিংবা গাছের পাতা হয়ে উঠেছিল তাঁর মূল গবেষণাগার। ১৯৩২-’৩৩ সালের একটি ঘটনা আন্তর্জাতিক স্তরে তাঁর নাম ছড়িয়ে দেয়। তিনি লক্ষ করলেন তাঁর শোওয়ার ঘরের স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালে একদল বড় কালো পিঁপড়ে (বৈজ্ঞানিক নাম: Camponotus Compressus) মাটির লম্বা সুড়ঙ্গ বা নল তৈরি করছে। সাধারণ মানুষ যেখানে ঘর নোংরা হওয়ার ভয়ে পিঁপড়ে তাড়িয়ে দেন, গোপালচন্দ্র সেখানে দিনের পর দিন লণ্ঠন বা মৃদু আলো জ্বেলে সেই সুড়ঙ্গের ভেতর পিঁপড়েদের গতিবিধি লক্ষ করতে লাগলেন। পর্যবেক্ষণ করতে করতে তিনি এক যুগান্তকারী সত্য আবিষ্কার করলেন। তিনি দেখলেন, সুড়ঙ্গের অন্ধকূপে পিঁপড়েরা শুধু ডিম পাড়ে না, বরং এক বিশেষ ধরনের ‘রাজকীয় রস’ (Royal Jelly) খাইয়ে সাধারণ ডিম থেকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ‘শ্রমিক পিঁপড়ে’ (Workers) কিংবা বড় চোয়ালযুক্ত ‘যোদ্ধা পিঁপড়ে’ (Soldiers) তৈরি করছে! অর্থাৎ, জন্মের সময় পিঁপড়েদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত থাকে না, পিঁপড়েরা সমাজ পরিচালনার জন্য খাদ্যাভ্যাসের তারতম্য ঘটিয়ে নিজেদের কর্মী বা সৈন্যবাহিনী তৈরি করে নেয়। তৎকালীন বিজ্ঞান সমাজের ধারণা ছিল পিঁপড়েদের এই সামাজিক বিভাজন সম্পূর্ণ জিনগত (Genetic)। কিন্তু কলকাতার এক সাধারণ ঘর থেকে গোপালচন্দ্র প্রমাণ করলেন যে এটি আসলে পুষ্টি বা খাদ্যাভ্যাসের ওপরেই নির্ভর করে। ১৯৩৪ সালের মে মাসে আমেরিকার বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি’-তে তাঁর এই সচিত্র গবেষণা প্রকাশিত হওয়া মাত্রই বিশ্বজুড়ে শোরগোল পড়ে যায়। বিখ্যাত বিজ্ঞানী জে. বি. এস. হ্যালডেন স্বয়ং কলকাতার এই ল্যাবরেটরিহীন বিজ্ঞানীর গবেষণায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন প্রজাতির পিঁপড়ে, যেমন– লাল পিঁপড়ে, ক্ষুদে পিঁপড়ে, ডেঁয়ো পিঁপড়ে প্রভৃতির সমাজব্যবস্থা ও যুদ্ধনীতি পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি আবিষ্কার করেন যে ক্ষুদে পিঁপড়েরা অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে মাটির নিচে সুড়ঙ্গ তৈরি করে বড় লাল পিঁপড়েদের আক্রমণ করে। যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর তারা পরাজিত পিঁপড়েদের নিজেদের বাসায় ধরে নিয়ে আসে এবং আজীবন ক্রীতদাস হিসেবে খাটাতে বাধ্য করে।

পিঁপড়ে ছাড়াও মাকড়সা নিয়ে তাঁর কাজ ছিল আরও বিস্ময়কর। তিনি এমন কিছু শিকারী মাকড়সা আবিষ্কার করেছিলেন, যারা জাল না বুনে জলের ওপর চরে বেড়ায় এবং ছোট ছোট ব্যাঙাচি বা মাছ শিকার করে খায়। এছাড়া লার্ভা বা ব্যাঙাচির ওপর পেনিসিলিন বা থাইরয়েড হরমোনের প্রভাব নিয়ে তাঁর কাজ চিকিৎসাবিজ্ঞানেও সাড়া ফেলেছিল। তিনি পরীক্ষা করে দেখিয়েছিলেন, ব্যাঙাচির ওপর পেনিসিলিন প্রয়োগ করলে তার শরীরের প্রয়োজনীয় ব্যাকটেরিয়া মারা যায় এবং রূপান্তর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে ব্যাঙাচিটি আকারে অনেক বড় হলেও কখনওই ব্যাঙে রূপান্তরিত হতে পারে না।

এই বৈপ্লবিক পরীক্ষাটি দেখে বিখ্যাত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জুলিয়ান হাক্সলে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি এটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পত্রিকা ‘নেচার’-এ প্রকাশের পরামর্শ দিয়েছিলেন। ব্যাঙাচির ওপর পেনিসিলিনের প্রভাব নিয়ে তাঁর যুগান্তকারী গবেষণাগুলো আজ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানসমাজে ‘এথলজি’র (Animal Behaviour) অমূল্য মণিমুক্তো হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৩৪-’৩৫ সালে পিঁপড়ে-অনুকারী মাকড়সা, টিকটিকি-শিকারি মাকড়সা সম্পর্কে চারটি গবেষণাপত্র মুম্বইয়ের ‘ন্যাচরাল হিস্ট্রি সোসাইটি’, ‘আমেরিকান সায়েন্টিফিক মান্থলি’ এবং কলকাতার ‘সায়েন্স অ্যান্ড কালচার’-এ প্রকাশিত হয়।

গোপালচন্দ্র নিজের তৈরি ক্যামেরায় এই ক্ষুদ্র জীবদের হাজার হাজার নিখুঁত ছবি তুলেছিলেন, যা সেই যুগে এক অনন্য নজির ছিল। ১৯২১ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৫০ বছর তিনি বসু বিজ্ঞান মন্দিরেই কর্মরত ছিলেন।

জগদীশচন্দ্র চেয়েছিলেন গোপালবাবু ইউরোপের বড় বড় বিজ্ঞানীদের সংস্পর্শে আসুন এবং সেখানে তাঁর গবেষণা উপস্থাপন করুন। তিনি আশা করেছিলেন এর ফলে প্রথাগত ডিগ্রি না থাকার যে অপবাদ, তা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আলোয় ঢাকা পড়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাসে হিটলারের উত্থান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সেই সম্ভাবনায় চিরতরে জল ঢেলে দেয়। ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলারের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সমগ্র ইউরোপের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে। ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয় এবং বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণার চেয়ে যুদ্ধপ্রস্তুতি ও রাজনৈতিক মেরুকরণে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে ভারত থেকে একজন ডিগ্রিহীন গবেষকের সেখানে গিয়ে স্বীকৃতি পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এর ঠিক দু’বছর পর, ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক স্তরে বিজ্ঞান সাময়িকী আদান-প্রদান এবং বিজ্ঞানীদের যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ইউরোপের কোনও বৈজ্ঞানিক সংস্থা বা জার্নাল ভারতের এই অসাধারণ কাজগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার অবস্থায় ছিল না। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়, ততদিনে বসু বিজ্ঞান মন্দিরে জগদীশচন্দ্রের অনুগামী বা গোপালবাবুর হিতৈষীদের প্রভাব কমে গিয়েছিল।

প্রথাগত এম.এসসি বা পিএইচডি ডিগ্রি না থাকায় সেখানকার বহু গবেষক ও বিজ্ঞানী তাঁকে কেবল একজন ‘সহকারী’ বা ‘বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ কর্মী’ হিসেবে দেখতেন, প্রকৃত বিজ্ঞানী হিসেবে নয়। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারীদের দাপটে তিনি ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। ১৯৪৯ সালে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য বিজ্ঞান মন্দির ছেড়ে দিয়েছিলেন অনেকটা বাধ্য হয়েই। 

গোপালচন্দ্র কেবল নিজেই গবেষণা করেননি, সাধারণ মানুষের মনে বিজ্ঞানের আলো পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে মিলে তিনি ‘বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ’ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা নেন এবং বিখ্যাত ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ পত্রিকার সম্পাদনা করেন। ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ পত্রিকার সম্পাদক থাকাকালে তিনি শিশু-কিশোরদের উপযোগী প্রায় ৮০০-এর মতো নিবন্ধ লিখেছেন। বাংলায় বিজ্ঞানচর্চাকে জনপ্রিয় করতে তাঁর লেখা ‘বাংলার কীটপতঙ্গ’ (দুই খণ্ডে প্রকাশিত) বইটি আজও বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। সাহিত্যে এই অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ‘আনন্দ পুরস্কার’ (১৯৬৮) এবং পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ (১৯৭৫)-এ ভূষিত হয়েছিলেন।

জীবনের শেষপ্রান্তে এসে, ১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এই অনন্য স্বভাববিজ্ঞানীকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব সায়েন্স’ (D.Sc.) ডিগ্রিতে ভূষিত করে। যে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির অভাবে তরুণ বয়সে তাঁকে লড়তে হয়েছিল, জীবন-সায়াহ্নে এসে বিজ্ঞানসমাজ মাথা নত করে তাঁকে সেই সর্বোচ্চ সম্মান জানায়। এর ঠিক কয়েকমাস পরেই, ১৯৮১ সালের ৮ এপ্রিল এই মহান বিজ্ঞানসাধক পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যান। গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের জীবনকাহিনি আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বড় কিছু করার জন্য সবসময় প্রাচুর্য বা বড় ডিগ্রির প্রয়োজন হয় না, যা প্রয়োজন তা হল একাগ্রতা, নিষ্ঠা এবং চারপাশের প্রকৃতিকে ভালোবাসার এক সত্যান্বেষী মন। আজকের অতি-আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও ঘরের কোণে বসে বিশ্বজয় করা এই বাঙালি বিজ্ঞানীর লড়াই আমাদের চিরকাল অনুপ্রাণিত করবে।

Bose institute Gopal Chandra Bhattacharya Indian Scientist Jagadish Chandra Bose Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Scientist গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য

Share this article on