perpective of death in rabindranath tagore's drama | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তুঁহু মম শ্যাম সমান?

রবিঠাকুর মৃত্যুকে কোনও একটা নির্দিষ্ট ফ্রেমে বাঁধেননি। তাঁর কাছে মৃত্যু কেবল ভানুসিংহের সেই রোমান্টিক ‘শ্যাম’ নয়। তাঁর বিশাল নাট্যসম্ভারে মৃত্যু হল একটা দশরঙা ক্যানভাস। সেখানে অমলের প্রশান্তি যেমন আছে, জয়সিংহের রক্তমাখা আত্মত্যাগও আছে। শীতের বুড়োর খোলস ভাঙা নববসন্ত যেমন আছে, তেমনই মালিনী বা রাজা ও রানির ওই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিও আছে।

শেষ আপডেট: আগস্ট ৭, ২০২৬, ১৯:৪২   
Facebook WhatsApp Messenger

রবি ঠাকুর আর মৃত্যু– এই দুটো শব্দ এক জায়গায় করলেই আমাদের মাথায় সবার আগে কী ঘোরে বলুন তো? ওই যে, ভানুসিংহের সেই অমর লাইন, ‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান।’ কিংবা ধরুন সেই গানটা, ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে… তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’ আমাদের মনে একটা পাকাপাকি ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছে যে, রবীন্দ্রনাথ মানেই বোধহয় মৃত্যুকে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক চোখে দেখা। একটা ভীষণ রোমান্টিক, শান্ত, স্নিগ্ধ ব্যাপার। যেন মৃত্যু কোনও শোকের জিনিস নয়, স্রেফ পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের একটা রাস্তা। কিন্তু সত্যি করে বলুন তো, ব্যাপারটা কি এতটাই সোজা? আমরা যদি তাঁর গান আর কবিতার মায়াবী জগৎ থেকে একটু বেরিয়ে এসে তাঁর লেখা নাটকগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে কিন্তু একেবারে পিলে চমকে যাওয়ার মতো অবস্থা হবে। নাটকের মঞ্চে রবি ঠাকুর মৃত্যুকে যে কতগুলো আলাদা আলাদা চোখে দেখেছেন, আর মানুষের মনের কত সব অন্ধকার, জটিল দিক ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন– তা নিয়ে আড্ডা জুড়ে বসলে রাত কাবার হয়ে যাবে।

আসুন না, আজ একটু অন্যভাবে রবি ঠাকুরকে পড়ি। ওই অ্যাকাডেমিক থিসিস বা গুরুগম্ভীর আলোচনার বাইরে গিয়ে, নিছক নিজেদের মতো করে একটু বোঝার চেষ্টা করি, তাঁর নাটকে মৃত্যু ঠিক কতরকম রূপে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়।

zoom
রবীন্দ্রচিত্রে মৃত্যুদৃশ্য

শুরু করা যাক একেবারে গোড়ার দিকের একটা লেখা দিয়ে। ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’। নামটা শুনেছেন নিশ্চয়ই? এখানে মৃত্যুর একটা অদ্ভুত রূপ আছে। একে আমরা বলতে পারি অহংকার ভাঙার মৃত্যু। গল্পটা কী? এক সন্ন্যাসী, যিনি দুনিয়ার সমস্ত মায়া-মমতা, হাসি-কান্নাকে স্রেফ ‘ভ্রম’ বা ‘মায়া’ বলে উড়িয়ে দিয়ে এক গুহায় গিয়ে বসে আছেন। তাঁর ভারি অহংকার যে তিনি জগৎকে জয় করে ফেলেছেন। কিন্তু গোল বাধল যখন রঘু চণ্ডালের একটা ছোট্ট অনাথ মেয়ে এসে জুটল তাঁর কাছে। মেয়েটার তো কেউ নেই, সে ওই সন্ন্যাসীকেই আঁকড়ে ধরেছে। সন্ন্যাসী বেচারার তো ভারি বিপদ! তিনি যতই মায়া কাটাতে চান, মেয়েটার কচি মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর মনের ভেতরে কোথায় যেন একটা অদ্ভুত টান তৈরি হয়। এই স্নেহকে তিনি নিজের দুর্বলতা ভেবে আবার একদিন পালিয়ে গেলেন অনেক দূরে। ভাবলেন, যাক বাঁচা গেল! কিন্তু ওই যে মনের ভেতরে একটা বীজ পোঁতা হয়ে গেছে, সে কি আর সহজে মরে? অনেকদিন পর যখন তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে, এই পৃথিবীর মায়ার কাছে আত্মসমর্পণ করতে ফিরে এলেন, তখন দেখলেন বড্ড দেরি হয়ে গেছে। সেই ছোট্ট মেয়েটি আর বেঁচে নেই। আপনারা একটু ভেবে দেখুন তো দৃশ্যটা! একটা মানুষের সারাজীবনের শুষ্ক বৈরাগ্যের অহংকার ধুলোয় মিশে গেল একটা বাচ্চার মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে। এই মৃত্যু কিন্তু এখানে শোকের চেয়েও অনেক বড় কিছু। এই মৃত্যু সন্ন্যাসীকে একটা চরম শিক্ষা দিয়ে গেল যে, এই ধুলোমাটির পৃথিবীর মানুষকে অবজ্ঞা করে, ভালোবাসা থেকে মুখ ফিরিয়ে অসীমকে পাওয়া যায় না। মেয়েটির মৃত্যুই আসলে সন্ন্যাসীর নবজন্ম ঘটাল।

এই যে মানুষের মনের ভুল ধারণা বা অহংকার, এর থেকে কিন্তু আরেকটা ভয়ংকর জিনিসের জন্ম হয়– সেটা হল অন্ধ মোহ বা প্যাশন। শেক্সপিয়রের ট্র্যাজেডিগুলো পড়লে যেমন আমাদের বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করে ওঠে, রবি ঠাকুরের ‘রাজা ও রানী’ (বা ধরুন এর পরের ভার্সন ‘তপতী’) পড়লেও ঠিক তেমনই একটা দমবন্ধ করা অনুভূতি হয়। এখানে মৃত্যুটা এসেছে এক নিদারুণ হাহাকার আর শূন্যতা হয়ে। বিক্রমদেব তো রীতিমতো পাগল তাঁর রানি সুমিত্রার জন্য। তাঁর এই প্রেমটা কোনও সুস্থ-স্বাভাবিক প্রেম নয়, এটা একটা উগ্র আসক্তি। এই আসক্তির চোটে তিনি রাজ্যের দিকে, প্রজার দিকে কোনও খেয়ালই রাখছেন না। সুমিত্রা কিন্তু ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি দেখলেন, রাজার এই অন্ধ মোহ দেশটাকে ধ্বংস করে দেবে। তাই তিনি বাধ্য হয়ে রাজ্য ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। এরপর শুরু হল যুদ্ধ, সংঘাত আর রাজার একরোখা পাগলামি। শেষে কী হল? এত কিছুর পর যখন রাজা সুমিত্রার কাছে পৌঁছলেন, তখন সুমিত্রা মারা গেছেন। বিক্রমদেবের ওই অন্ধ মোহ এক ঝটকায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল সুমিত্রার প্রাণহীন দেহের সামনে দাঁড়িয়ে। এখানে মৃত্যু কিন্তু কোনও শান্তি বা সান্ত্বনা নিয়ে আসেনি। বরং মানুষের অন্ধ আসক্তি যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে এবং তার পরিণাম যে কেবলই ধ্বংস আর শূন্যতা– এই মৃত্যু সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল।

zoom
শিল্পী: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্যাশন বা অন্ধ আসক্তির কথা যখন উঠলই, তখন আরেকটু ভেতরের দিকে ঢোকা যাক। এই আসক্তি যখন নৈতিকতার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন কী হয়? ধরুন ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্যের কথা। চণ্ডালকন্যা প্রকৃতি তো বুদ্ধের শিষ্য আনন্দকে দেখে একেবারে পাগল। সে যে কোনও মূল্যে আনন্দকে নিজের কাছে পেতে চায়। কিন্তু আনন্দ তো সন্ন্যাসী, তাঁর জগৎ আলাদা। প্রকৃতি তখন কী করল? সে সোজা গিয়ে ধরল তার মাকে। মা জানত মারণ-মন্ত্র বা কালো জাদু। মেয়ের অন্ধ কামনার বশে মা সেই জাদুমন্ত্র প্রয়োগ করল আনন্দের ওপর। ভেবে দেখুন, একটা মানুষের পবিত্রতাকে জোর করে নষ্ট করার এই যে অপচেষ্টা, এটা তো প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যাওয়া। আনন্দের উজ্জ্বল, পবিত্র রূপটা যখন জাদুর প্রভাবে একটু একটু করে মলিন হতে শুরু করল, প্রকৃতির তখন মোহভঙ্গ হল। সে বুঝতে পারল, সে কী মারাত্মক পাপ করে ফেলেছে। বুদ্ধের আশীর্বাদে আনন্দ হয়তো শেষমেশ রক্ষা পেলেন, কিন্তু প্রকৃতির মায়ের কী হল? ওই যে সে একটা অনৈতিক কাজ করেছিল, তার তো একটা চরম মূল্য চোকাতে হবে! সেই পাপ-মন্ত্রের উল্টো আঘাতে মায়েরই মর্মান্তিক মৃত্যু হল। প্রকৃতির মা নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেল যে, অনুচিত আকাঙ্ক্ষা আর অনৈতিক উপায়ের মূল্য হিসেবে মৃত্যুই হল চূড়ান্ত প্রায়শ্চিত্ত। রবি ঠাকুরের নাটকে মৃত্যুর এমন ভয়ংকর রূপ সত্যিই গায়ে কাঁটা দেয়।

আবার দেখুন, এই যে প্রেম বা ভালোবাসার জন্য নিজের জীবন দিয়ে দেওয়া, এটা সবসময় যে খুব মহৎ বা যুক্তিসঙ্গত কারণে হয়, তা কিন্তু নয়। অনেক সময় এটা নিছকই একতরফা আবেগের বশে ঘটে যায়, আর পেছনে রেখে যায় এক পাহাড়প্রমাণ অপরাধবোধ। ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যটার কথা ভাবুন। শ্যামা ভালোবাসে বজ্রসেনকে। কিন্তু বজ্রসেনের ওপর চুরির মিথ্যে অপবাদ পড়েছে, আর তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শ্যামা তাকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া। এদিকে উত্তীয় বলে একটা ছেলে আবার শ্যামাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। সে জানে শ্যামা তাকে ভালোবাসে না, তবু শ্যামার মুখে একটু হাসি ফোটাতে, শ্যামার প্রেমিককে বাঁচাতে সে সোজা গিয়ে কোতোয়ালের কাছে মিথ্যে স্বীকারোক্তি করে এল যে চুরিটা সে-ই করেছে। উত্তীয়ের ফাঁসি হয়ে গেল। আচ্ছা, উত্তীয়ের এই মৃত্যুটা নিয়ে একটু ভাবুন তো। সে কার জন্য প্রাণ দিল? দেশের জন্য? ধর্মের জন্য? না। সে স্রেফ একতরফা, অন্ধ প্রেমের আবেগে নিজের জীবনটা ভাসিয়ে দিল। এই মৃত্যুর মধ্যে কোনও মহান আদর্শ নেই, আছে শুধু একটা জটিল নৈতিক সংকট। উত্তীয়ের এই মৃত্যু শ্যামা আর বজ্রসেনের প্রেমকে চিরকালের মতো একটা কালির দাগ পরিয়ে দিল। বজ্রসেন যখন আসল সত্যিটা জানতে পারল, তখন সে আর শ্যামাকে মেনে নিতে পারল না। উত্তীয়ের এই আত্মদান তাদের দু’জনের মাঝখানে একটা বিশাল দেওয়াল তুলে দিল।

zoom
শিল্পী: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তবে হ্যাঁ, নিজের প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার সবটাই যে উত্তীয়ের মতো অন্ধ আবেগের বশে হয়, তা কিন্তু নয়। রবি ঠাকুর বেশ কয়েকটা নাটকে মৃত্যুকে এক দারুণ শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এই মৃত্যু হল আত্মোৎসর্গের মৃত্যু। যখন সমাজের বুকে কোনও অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার বা যান্ত্রিকতার শৃঙ্খল জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে, তখন কেবল কথার কথায় তো আর কাজ হয় না। তখন কাউকে না কাউকে তো নিজের বুকের রক্ত ঢেলে দিতেই হয়। ‘বিসর্জন’ নাটকের জয়সিংহকে মনে পড়ে? রঘুপতি তো জেদ ধরে বসেছেন যে দেবী কালীর চরণে রক্ত চাই, জীববলি চাই। তাঁর এই ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে জয়সিংহ অনেক তর্ক করেছে, কিন্তু রঘুপতি কিচ্ছু শুনবেন না। শেষে রঘুপতি যখন সরাসরি রাজরক্ত দাবি করে বসলেন, তখন জয়সিংহ নিজেই নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে দিল। বলল, ‘মা, আমি রক্ত এনেছি… এ রক্ত কার? আমার।’ ভাবা যায়? একটা গোটা সমাজের বছরের পর বছর ধরে চলে আসা রক্তপিপাসু অন্ধ প্রথাকে রুখতে একটা মানুষ হাসিমুখে নিজের প্রাণ দিয়ে দিল। এই মৃত্যু রঘুপতির সেই পাথরের মতো অহংকারকে এক মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিল।

ঠিক একইরকম একটা শিহরণ জাগানো মৃত্যু আমরা দেখি ‘মুক্তাধারা’ নাটকে। যুবরাজ অভিজিৎ। সে দেখল, যন্ত্ররাজ বিভূতি একটা পেল্লায় বাঁধ তৈরি করে শিবতরাইয়ের সাধারণ মানুষের জলের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। জল তো মানুষের জন্মগত অধিকার, সেটা কেউ আটকে রাখবে কেন? অভিজিৎ নিজের প্রাণ দিয়ে সেই ভয়ংকর বাঁধটাকে ভেঙে চুরমার করে দিল। তার এই মৃত্যু কোনও সাধারণ মৃত্যু নয়, এটা হল রাষ্ট্রযন্ত্রের শোষণের বিরুদ্ধে প্রাণের এক চূড়ান্ত জয়ধ্বনি। আবার ‘নটীর পূজা’য় দেখুন, শ্রীমতী। রাজার হুকুম অমান্য করে সে বুদ্ধের স্তূপে নাচতে শুরু করল। সে জানে এর পরিণতি মৃত্যু, তবুও সে থামল না। নাচতে নাচতেই রক্ষীর তলোয়ারের ঘায়ে সে লুটিয়ে পড়ল। এটা কোনও রাজনৈতিক বিদ্রোহ নয়, এটা হল পরম ভক্তি আর বিশ্বাসের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়া।

zoom
শিল্পী: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এই যে সমাজ বা রাষ্ট্রের শোষণের কথা বলছিলাম, এটা ‘রক্তকরবী’তে এসে যেন একটা অন্য মাত্রা পেয়ে গেল। যক্ষপুরীর রাজা মকররাজ তো মাটির তলা থেকে খালি সোনা তুলে চলেছেন। মানুষের প্রাণের কোনও দাম নেই সেখানে, সবটাই যন্ত্রের মতো চলছে। রঞ্জন হল সেই প্রাণশক্তির প্রতীক, যৌবনের প্রতীক। রাজা নিজের তৈরি করা সেই যান্ত্রিক নিয়মের জালে নিজেই এতটাই বন্দি যে, তিনি না-জেনে রঞ্জনকে হত্যা করে ফেললেন। কিন্তু রঞ্জনের ওই নিথর দেহটা যেন একটা বিস্ফোরণ ঘটাল। রাজা হঠাৎ করে বুঝতে পারলেন, তিনি এতকাল ধরে যে ধনরত্ন জমিয়েছেন, এই একটা তাজা প্রাণের কাছে তা কত তুচ্ছ! রঞ্জনের মৃত্যু রাজাকে ভেতর থেকে পুরোপুরি বদলে দিল। তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর আসল শত্রু কে! শেষে তিনি নিজেই নন্দিনীর সাথে হাত মিলিয়ে নিজেরই তৈরি করা ওই শোষণ-যন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। রঞ্জনের মৃত্যুটা আমাদের মন খারাপ করে দেয় ঠিকই, কিন্তু এটা একটা বন্ধ্যা, ঘুমন্ত সমাজকে সজাগ করে তোলার একটা মারাত্মক অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

আবার ধরুন, সমাজ বা মতাদর্শের সংঘাত যখন চরম জায়গায় পৌঁছয়, তখন মানুষের সম্পর্কগুলো কীভাবে বিষিয়ে যায় আর তার পরিণতি কতটা মর্মান্তিক হতে পারে, তা আমরা দেখি ‘মালিনী’ নাটকে। এখানে আমরা একটা আদর্শগত সংঘাতের মৃত্যু দেখতে পাই। একদিকে ক্ষেমঙ্কর, যে সনাতন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের একেবারে কট্টর রক্ষক। অন্যদিকে রাজকন্যা মালিনী, যে নতুন অহিংস বৌদ্ধধর্মের বাণী প্রচার করছে। ক্ষেমঙ্করের পরম বন্ধু হলো সুপ্রিয়। কিন্তু সুপ্রিয় একসময় মালিনীর মানবতার দর্শনে মুগ্ধ হয়ে তার পক্ষ নিল। ক্ষেমঙ্কর তো রেগে আগুন! তার কাছে এটা শুধু ধর্মত্যাগ নয়, এটা হল বন্ধুত্বের চরম বিশ্বাসঘাতকতা। বন্দিদশায় থাকা অবস্থাতেই ক্ষেমঙ্কর তার একসময়ের সেই প্রাণের বন্ধু সুপ্রিয়কে লোহার শিকল দিয়ে আঘাত করে মেরে ফেলল। ভেবে দেখুন অবস্থাটা! যে মানুষটা তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল, স্রেফ মতাদর্শের অমিলের কারণে তাকে সে নিজের হাতে খুন করল। এখানে মৃত্যু একটা নিদারুণ মানসিক ট্র্যাজেডির জন্ম দিল, যেখানে মানবতার চেয়ে ধর্মান্ধতা আর রাগ জয়ী হল।

এতক্ষণ ধরে আমরা মৃত্যুর কত সব ভারী ভারী, ট্র্যাজিক আর সিরিয়াস দিক নিয়ে আলোচনা করলাম। এবার একটু অন্য জগতে যাওয়া যাক। আচ্ছা, মৃত্যু কি সত্যিই একটা শেষ? উপনিষদের দর্শনে বিশ্বাসী রবিঠাকুর কিন্তু তা মনে করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীতে প্রাণের কোনও বিনাশ নেই, কেবল রূপান্তর আছে। মৃত্যু হল সেই রূপান্তরের একটা প্রসেস। ‘ফাল্গুনী’ নাটকের কথা ভাবলে ব্যাপারটা খুব পরিষ্কার হয়ে যায়। এখানে মৃত্যুর একটা অদ্ভুত সুন্দর প্রতীকী রূপ আছে। নাটকের মূল সুরটাই হল জরা আর মৃত্যুর সঙ্গে তারুণ্যের লড়াই। যুবকের দল তাড়া করেছে শীতের বুড়োকে। এই শীতের বুড়োই হল জরা আর মৃত্যুর প্রতীক। কিন্তু শেষে গিয়ে তারা কী আবিষ্কার করল জানেন? ওই জরাজীর্ণ বুড়োর খোলসটা খসিয়ে ফেলতেই দেখা গেল, তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে নবীন বসন্ত! অর্থাৎ, মৃত্যুর যে ভয়ঙ্কর চেহারাটা আমরা দেখে ভয় পাই, ওটা আসলে একটা মুখোশ। ওটা সরালেই দেখা যায় অনন্ত যৌবন। মৃত্যু এখানে শেষ কথা বলছে না, বরং মৃত্যু হল নতুন করে বাঁচার, পুরনো পাতা ঝরিয়ে দিয়ে নতুন পাতা গজানোর একটা দারুণ ঋতুচক্র।

আর এই রূপান্তরের, এই মুক্তির সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে মন-কেমন-করা রূপটা আমরা কোথায় পাই? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, ‘ডাকঘর’ নাটকে। অমল। ওই রুগ্ন, ছোট্ট বাচ্চা ছেলেটা, যাকে কবিরাজ ঘরের চার দেওয়ালের মাঝে আটকে রেখেছে। কিন্তু ওর মনটা তো আটকে নেই। ও বাইরের পৃথিবীর খোলা হাওয়া, পাহাড়, ঝরনা, রাস্তার দইওয়ালা, পাহারাদার– সবার সঙ্গে মিশতে চায়। ও অপেক্ষা করে আছে রাজার চিঠির জন্য। রাতের বেলা যখন সত্যিই রাজার চিঠি নিয়ে ডাকহরকরা এল, তখন অমল আস্তে আস্তে বলে উঠল, ‘আমার বড়ো ঘুম পাচ্ছে… আমি ঘুমোব।’ এই ঘুমটাই তো মৃত্যু। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, অমলের মৃত্যুতে আমাদের চোখে হয়তো জল আসে, কিন্তু বুকের ভেতরে কোনও হাহাকার তৈরি হয় না। বরং একটা অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করে। মনে হয়, আহারে বাচ্চাটা এতদিনে বাঁচল! এই জাগতিক জরাজীর্ণ শরীরটা যে আত্মাকে বেঁধে রেখেছিল, মৃত্যু এসে তাকে সেই বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে দিল। অমল রাজার ডাকে সাড়া দিয়ে সোজা অসীমে গিয়ে লীন হয়ে গেল। এখানে মৃত্যু কোনও শোকের বিষয় নয়, মৃত্যু এখানে মুক্তির চরম ও পরম বার্তাবাহক।

zoom
ডাকঘর নাটকের অভিনয়ে রবীন্দ্রনাথ

এবার আড্ডার শেষ পর্যায়ে এসে আপনাদের একটা মজার কথা বলি। এতক্ষণ ধরে রবিঠাকুরের নাটকে মৃত্যুর এই যে নানা দিকের কথা আমরা বললাম, তার সবটাই ভীষণ গভীর, মনস্তাত্ত্বিক আর দার্শনিক। কিন্তু আপনারা কি খেয়াল করেছেন, এই মানুষটাই আবার মৃত্যুকে নিয়ে রীতিমতো হাসি-ঠাট্টাও করেছেন? হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন! তাঁর যে প্রহসন বা হাস্যকৌতুকগুলো আছে, যেমন ধরুন ‘গোড়ায় গলদ’ বা ‘চিরকুমার সভা’– সেখানেও কিন্তু মৃত্যুর কথা ঘুরেফিরে এসেছে। কিন্তু সেখানে মৃত্যুচেতনার কোনও গভীরতা নেই। সেখানে চরিত্ররা কথায় কথায় আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছে। প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়েছে?– গলায় দড়ি দেব! পরীক্ষায় ফেল করেছে?– বিষ খাব! একটু মান-অভিমান হয়েছে?– চললাম আমি মরতে! এই যে কথায় কথায় মরতে চাওয়ার হুমকি, এগুলো পুরোটাই ফাঁকা আওয়াজ। ফরাসি দার্শনিক বার্গসঁ একটা দারুণ কথা বলেছিলেন, হাসির উদ্রেক করতে গেলে না কি পাঠকের হৃদয়ে একটা সাময়িক অনুভূতিহীনতার প্রয়োজন হয়। রবিঠাকুর ঠিক এই কাজটাই করেছেন। তিনি তাঁর প্রহসনগুলোতে মৃত্যুকে তার সমস্ত গাম্ভীর্য থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন। তৎকালীন বাবু-সমাজের ওই অগভীর আবেগ, মেকি আধুনিকতা আর ভণ্ডামিকে ব্যঙ্গ করার জন্যই তিনি মৃত্যুকে স্রেফ হাসির খোরাক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এই মৃত্যুভাবনাহীনতাই হল তাঁর প্রহসনগুলোর আসল প্রাণ।

তো, এই এতক্ষণের লম্বা আড্ডা থেকে আমরা কী বুঝলাম? আমরা বুঝলাম যে, রবিঠাকুর মৃত্যুকে কোনও একটা নির্দিষ্ট ফ্রেমে বাঁধেননি। তাঁর কাছে মৃত্যু কেবল ভানুসিংহের সেই রোমান্টিক ‘শ্যাম’ নয়। তাঁর বিশাল নাট্যসম্ভারে মৃত্যু হল একটা দশরঙা ক্যানভাস। সেখানে অমলের প্রশান্তি যেমন আছে, জয়সিংহের রক্তমাখা আত্মত্যাগও আছে। শীতের বুড়োর খোলস ভাঙা নববসন্ত যেমন আছে, তেমনই মালিনী বা রাজা ও রানির ওই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিও আছে। সন্ন্যাসীর অহংকার চূর্ণ হওয়া থেকে শুরু করে চণ্ডালিকার মায়ের চরম পাপের শাস্তি, আবার উত্তীয়ের ওই অন্ধ আত্মদান– সব মিলিয়ে মানুষ যতটা বিচিত্র, রবিঠাকুরের নাটকে মৃত্যুও ঠিক ততটাই বহুরূপী। আর সবশেষে ওই প্রহসনের ফাঁকা হুমকিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের লঘু দিকগুলো নিয়েও তিনি সমান মজায় মশকরা করতে পারতেন। মৃত্যু ছাড়া রবীন্দ্রনাট্যের জীবনবোধ অসম্পূর্ণ, ঠিক যেমন অন্ধকার না থাকলে আমরা আলোর কোনও মর্মই বুঝতাম না।

চা-টা তো জুড়িয়ে গেল, আজ তাহলে আড্ডাটা এখানেই শেষ করা যাক, কী বলেন?

dakghar Drama Malini Muktodhara Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shyama Tagore Drama

Share this article on