Robbar

তোমার রঙেরই গৌরবে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 9, 2026 3:21 pm
  • Updated:June 9, 2026 3:21 pm  

রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ গানে, পূজায় প্রেমে, উদ্দিষ্ট সত্তাটি পুরুষ– তিনি কবির বন্ধু, সখা, নাথ, প্রভু, প্রিয়। ‘ফাল্গুনী’র অন্ধ বাউলের গানে শুনি, ‘তোমার বসনগন্ধ বরণ করেছি অন্তরমন্দিরে’। ফুলের গন্ধ বন্ধুর মতো অঙ্গে জড়ায়, বন্ধুর হাত ধরে, সেই হাত ভরে দিয়ে, সেই হাতকে সাথে রেখে একলা পথের চলা ‘রমণীয়’ করে তোলা যায়। চিত্রকল্প হিসেবে থাকে কবির একান্ত আঁচল, সখার উতলা উত্তরীয়। নিভৃত নীলপদ্ম বা রাঙা রেণুভরা হৃদকমলে থাকে পদ্মযোনির ইশারা, সেই রাঙা রেণুতে প্রিয়ের উত্তরীয় রঞ্জনসম্ভব হয়ে ওঠে।

শৈবাল বসু

‘আমি আমার বুকের আঁচল ঘেরিয়া তোমারে পরানু বাস
আমি আমার ভুবন শূন্য করেছি তোমার পুরাতে আশ
মম মন প্রাণ যৌবন নব
করপুটতলে পড়ে আছে তব…’

যুবক রবীন্দ্রনাথ

এ গান লিখছেন এক ২৬ বছরের যুবক। জীবনের উপান্তে রেকর্ডেও যখন গেয়েছেন এই গান, বয়ঃভারে শ্রান্ত কন্ঠেও সঞ্চারীতে আগুনের মতো হু-হু করে উঠেছে এক তীব্র আকুলতা। যে গান তাঁর একান্ত নিজের বয়ান, তার সাজশরীরে মানবীচিহ্নের উপস্থিতি বারে বারে এসেছে। গান থেকে গানান্তরে তাঁর নিজস্ব ‘আঁচল’-এর বিপরীতে এসেছে প্রার্থিত এক পুরুষের ‘উত্তরীয়’, কখনও ‘রঙিন’, কখনও রংপিপাসু, কখনও ‘উতলা’। ‘জীবনস্মৃতি’তে যে নিভৃত নির্জন গোলাবাড়ির উল্লেখ পাই, সেই গোলাবাড়িকে ঘিরে তৈরি হয় ‘মুক্তকুন্তলা’ গল্পের কিশোরের নারীসজ্জা, আর করুণ লাঞ্ছনার ছবি। কথাকার রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, (অভিনয়ের জন্য) ‘বৌদিদির হাতে পায়ে ধরে দুটো একটা শাড়িও জোগাড় করেছিলুম। তাঁর কৌটা থেকে সিঁদুর নিয়ে সিঁথেয় পরবার সময় কোনো ভাবনা মনে আসে নি। স্কুলে যাবার সময় ভুলেছিলুম তার দাগ মুছতে। ছেলেদের মধ্যে মস্ত হাসি উঠেছিল। কিছুদিন আমার ক্লাসে মুখ দেখানোর জো রইল না..।’ এই ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ‘গিন্নি’ গল্পটিকে, যেখানে একটি ইশকুল-পড়ুয়া কিশোর পুতুলখেলার জন্য ক্লাসে সরাসরি শিক্ষকের নিষ্ঠুর বিদ্রুপের শিকার হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতায় কেমন সেই সহপাঠী ছেলেরা? কেমন শিক্ষক, কেমন প্রতিষ্ঠান? ‘জীবনস্মৃতি’র পাতায় নিজের কিশোর বয়সের প্রত্যক্ষ শারীরিক লাঞ্ছনার বয়ান লিখছেন লেখক:

‘ছেলেদের সঙ্গে যদি মিশিতে পারিতাম তবে বিদ্যাশিক্ষার দুঃখ তেমন অসহ্য বোধ হইত না। কিন্তু অধিকাংশ ছেলেরই সংশ্রব এমন অশুচি ও অপমানজনক ছিল যে ছুটির সময় আমি চাকরকে লইয়া দোতলার রাস্তার দিকের এক জানলার কাছে একলা বসিয়া কাটাইয়া দিতাম। মনে মনে হিসাব করিতাম, এক বৎসর, দুই বৎসর, তিন বৎসর আরো কত বৎসর এমন করিয়া কাটাইতে হইবে…’

এই ‘অশুচি’ শব্দটিতে আমাদের থমকে যেতে হয়। কোমলকিশোর রবিকেও তবে অসহায়ভাবে সহ্য করতে হয়েছিল অপরের শরীরী কলুষ? এই ক্ষত যে চিরস্থায়ী দাগ রেখে গিয়েছিল তাঁর ছেলেবেলার গভীর আড়ালে, সেটি আরও স্পষ্টভাবে অনুভব করতে হলে আমাদের যেতে হবে ‘জীবনস্মৃতি’র পরের অধ্যায়ের কয়েকটি বাক্যের কাছে:

‘নর্মাল ইস্কুল ত্যাগ করিয়া আমরা বেঙ্গল একাডেমি নামক এক ফিরিঙ্গি ইস্কুলে ভর্তি হইলাম … এখানকার ছেলেরা ছিল দুর্বৃত্ত কিন্তু ঘৃণ্য ছিল না, সেইটে অনুভব করিয়া খুব আরাম পাইয়াছিলাম। … আমার মনে হইল এ যেন পাঁকের থেকে উঠিয়া পাথরে পা দিলাম– তাহাতে পা কাটিযা যায় সেও ভালো, কিন্তু মলিনতা হইতে রক্ষা পাওয়া গেল।’

রবীন্দ্রনাথ যে অর্থে বালক সহপাঠীদের ‘দুর্বৃত্ত’ বলেছেন তা হল বল্‌গাহীন দুরন্তপনা, একধরনের raggingও বলা যায় তাকে (যেমন মাথায় ‘কলা থেঁতলাইয়া’ দেওয়া বা পিঠে আচমকা ‘ধাঁ করিয়া’ মারা। কিন্তু তিনি স্পষ্ট করে বলছেন, ‘এ-সকল উৎপীড়ন গায়েই লাগে, মনে ছাপ দেয় না।’ সহজেই তবে অনুমেয়, পূর্বেকার নরমাল ইস্কুলের সহপাঠীদের সংশ্রব তাঁর কাছে কেন ‘অশুচি’, কেন তারা ‘পাঁকের’ মতো, ‘মলিন’, ‘ঘৃণ্য’। হ্যাঁ, আমরা স্পষ্টতই পাচ্ছি ‘মলেস্টেশন’-এর ইঙ্গিত। আর এ-ও মনে রাখতে হবে আমাদের যে সেকালে একই ক্লাসে অসমবয়স্ক পড়ুয়ারা পড়ত। কাজেই কোমল, রূপময়, সামাজিক আখ্যায় সম্ভাব্য ‘মেয়েলি’ বালক-কিশোর রবিকে যে সমাজের উদ্ভিন্ন পৌরুষের আগ্রাসনের অসহায় শিকার হতে হয়েছিল, এই ব্যথা যেন মনে রাখি আমরা। অকরুণ পুরুষ-ভৃত্যদের প্রায় পুলিশি শাসনে বড়-হওয়া বালক-বয়সে মা-হারা রবির অন্তঃপুরে প্রবেশ ঘটে তার নতুন বৌঠানের হাতটি ধরে। বয়ঃসন্ধিতে তার কাছে উন্মুক্ত হয় মেয়েদের নিজস্ব ভুবন। বাড়ির মেয়েদের নানা ছাঁদে চুল বাঁধা, নাপতিনির আলতা পরানো, মেয়েমহলে খবর চালাচালি, ভিজে চুলে ছাদে বসে মেয়েদের টপটপ করে বড়ি দেওয়া, দাসীদের বাসী কাপড় কেচে ছাদে শুকোতে দেওয়া– এই সবকিছু ‘মেয়েলি’ অনুপুঙ্খের মাঝে শুরু হয় রবির অন্যতর বসবাস। ‘খুব মিহি করে সুপুরি কাটতে পারতুম’, সেই সময়ের কথা মনে করে লিখছেন রবীন্দ্রনাথ, ‘আমার অন্য কোনো গুণ যে ছিল বউঠান সেকথা মানতেনই না। কিন্তু আমার সুপুরি কাটা হাতের গুণ বাড়িয়ে বলতে তাঁর বাঁধত না…।’ যাঁরা রবির মধ্যে প্রবল পুরুষকে দেখতে পান কেবল, যাঁরা রবীন্দ্রনাথে কেবল একমাত্রিক নারী-পুরুষ প্রণয়কেই মুখ্য ও কেন্দ্রীয় করে তোলেন, তাঁরা কি কল্পনা করতে পারবেন সত্যেন্দ্রনাথ বা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরে বসে মেয়েদের সঙ্গে সুপুরি কাটছেন? আর প্রাতিষ্ঠানিক টিটকিরিও যে রবির ভাগ্যে আরও লেখা ছিল– সেকথা আমাদের মনে করিয়ে দেন রবীন্দ্র-জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। ১৯৩৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে আহূত হয়ে তাঁর বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কিশোর বয়সে একদিন অভিভাবকদের নির্দেশমত সসঙ্কোচে আমি প্রবেশ করেছিলুম বহিরঙ্গ ছাত্ররূপে … (প্রেসিডেন্সি কলেজে)। সেই একদিন আর দ্বিতীয় দিনে পৌঁছল না। আকারে প্রকারে সমস্ত ক্লাসের সঙ্গে আমার ছন্দের এমন কিছু ব্যত্যয় ছিল যাতে আমাকে দেখামাত্র পরিহাস উঠল উছ্বসিত হয়ে। বুঝলাম, মণ্ডলীর বাহির থেকে অসামঞ্জস্য নিয়ে এসেছি। পরের দিন থেকেই অনধিকার প্রবেশের দুঃসাহস থেকে বিরত হয়েছিলুম।’ (Presidency College Alumni Association: Tagore Centenary No,1961) আর বাড়িতে? আমাদের মনে পড়ে ‘ছিন্নপত্রাবলী’র রবীন্দ্রনাথকে, যিনি অকপট সরসতার সঙ্গে শ্লেষ মিশিয়ে লিখছেন, ‘ততক্ষণ নদিদিরা ডুলিতে চড়ে, বাড়িতে গিয়ে, শালটি মুড়ি দিয়ে, সোফায় শুয়ে বিশ্রাম করছিলেন এবং কল্পনা করছিলেন যে রবি ঠিক পুরুষ মানুষের মতো নয়।’

বাল্মীকিপ্রতিভা অভিনয়, ইন্দিরা দেবী ও রবীন্দ্রনাথ

এই লেখার শুরুতে যে গানে রচয়িতার আত্মরূপ বুকের আঁচলের সাথে মিশে আছে, সেই গানটি রচনার দু’ বছর আগে তিনি লিখছেন এই চিঠি, ১৮৮৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ গানে, পূজায় প্রেমে, উদ্দিষ্ট সত্তাটি পুরুষ– তিনি কবির বন্ধু, সখা, নাথ, প্রভু, প্রিয়। ‘ফাল্গুনী’র অন্ধ বাউলের গানে শুনি, ‘তোমার বসনগন্ধ বরণ করেছি অন্তরমন্দিরে’। ফুলের গন্ধ বন্ধুর মতো অঙ্গে জড়ায়, বন্ধুর হাত ধরে, সেই হাত ভরে দিয়ে, সেই হাতকে সাথে রেখে একলা পথের চলা ‘রমণীয়’ করে তোলা যায়। চিত্রকল্প হিসেবে থাকে কবির একান্ত আঁচল, সখার উতলা উত্তরীয়। নিভৃত নীলপদ্ম বা রাঙা রেণুভরা হৃদকমলে থাকে পদ্মযোনির ইশারা, সেই রাঙা রেণুতে প্রিয়ের উত্তরীয় রঞ্জনসম্ভব হয়ে ওঠে। ‘মুক্তধারা’ নাটকে সঞ্জয় গোপনে তার প্রিয় অভিজিতের পূজার আসনের পাশে শ্বেতপদ্ম রেখে আসে, তার মধ্যে যে ‘কত সুধাই আছে’ সেকথা সে বিদায়কালে মনে করিয়ে দেয় অভিজিৎকে। সেই গভীরের গোপন ভালোবাসা এক পুরুষের জন্য আরেক পুরুষের। সঞ্জয় অভিজিতের সঙ্গে নিজেকে লগ্ন করে এক যুগ্মসত্তার আধারে। সে বলে, ‘পৃথিবীতে কোনো একলা মানুষই এক নয়, সে অর্ধেক। আর একজনের সঙ্গে মিল হলেই তবে সে ঐক্য পায়। যুবরাজের সঙ্গে আমার সেই মিল।’ এর পাশাপাশি রাখছি হেমন্তবালা দেবীকে চিঠিতে লেখা রবীন্দ্রনাথের উচ্চারণ,

‘একটা কথা মনে রেখো, আমরা সকলেই এক হিসাবে অর্ধনারীশ্বর। কারো মধ্যে বা আধাআধি মিশোল, কারো মধ্যে বা ভাগের কমি বেশি আছে। একান্ত নারী এবং একান্ত পুরুষে যদি সংসার বিভক্ত হত তাহলে তারা মিলতেই পারত না।’ (চিঠিপত্র, নবম খণ্ড, বিশ্বভারতী, ১৩২)

শিল্পী: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এভাবেই রবীন্দ্রনাথ সমাজনির্মিত লিঙ্গের খাঁচাটিকে ভাঙতে ভাঙতে চলেন। প্রশ্ন করেন প্রণয়ের পরিসরে নারী-পুরুষ বাইনারির কেন্দ্রিকতাকে, ‘পুরুষালি’, ‘মেয়েলি’ এই একমাত্রিক সংজ্ঞাগুলির একাধিপত্যকে, তাঁর রচনাপথে জেন্ডার-এর পাঠ নিয়ে আসে নানা সন্ধানের বাতাস। ১৯৪০ সালে যখন ‘ল্যাবরেটরি’ গল্পটি লিখছেন রবীন্দ্রনাথ, নারী-পুরুষের সম্পর্কের পরীক্ষাগারে তিনি যেন আবিষ্কার করছেন যৌনতার নানা রঙের রসায়ন। উন্মোচিত করছেন লিঙ্গনির্মাণের প্রাতিষ্ঠানিক সূচকগুলিকে। রেবতীর মনে হতে থাকে ‘জাগানী সভা ওকে ছেঁকে ধরেছে, ওকে ঘোরতর পুরুষমানুষ বানিয়ে তুলেছে’। সেই রেবতী, যার ওপরে ছেলেবেলার বন্ধুদের ‘ছিল কান্নাকাটি জড়ানো সেন্টিমেন্টাল ভালোবাসা’ আর ‘ওর মুখে যে একটা দুর্বল মাধুর্য ছিল, তাতে পুরুষ বালকদের মনে মোহ আনতে পারত।’ মনে হয়, গানে এই মোহ আবরণ মুছে গিয়ে আসে মনমোহন প্রীতি, কবি গেয়ে ওঠেন, ‘ওগো কিশোর আজি তোমার দ্বারে পরান মম জাগে…’। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে প্রণয়-পরিসরে বিসমকামী একাধিপত্যের দৃঢ় গড়ন দ্রব হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ সেই অধিকার পৌঁছে দেন উত্তরপ্রজন্মের কবিদের হাতে। আমরা শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে পাই। সেই শক্তি, যিনি লেখেন:

‘এ কি আলিঙ্গন! এ কি সভ্যতার জড়ানো চণ্ডালে
আশিরগোড়ালিনখ! এ কি আলিঙ্গন মানুষের
ঘোরতর, ব্যবধান গ্রাসচ্ছলনার অন্তরালে
অনৈসর্গিক কাম, এ কি জীবনের চেয়ে ঢের
কাঙ্খিত শিল্পের কাছে? শিল্প কি বিমূঢ়
অনাসৃষ্টি আলিঙ্গন, সাংঘাতিক পুরুষে পুরুষে?’

সবার রঙে রং মিশিয়ে দেন রবীন্দ্রনাথ। আমরা গর্বিত হই তাঁর সেই রঙেরই গৌরবে।