Raghu Rai’s Calcutta: A Timeless Portrait of the City’s Soul
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রঘু রাইয়ের কলকাতা

যেটুকু রাস্তাঘাটে ঘুরেছি, দেখেছি রঘু রাই সদাসতর্ক। ক্যামেরা নিয়ে দৃশ্য খুঁজছেন। ক্যামেরা সবসময় খোলা থাকত। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে, বাবরি মসজিদের গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর, রঘু রাই কলকাতায় এসেছিলেন। আমি ও রঘু রাই হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম খিদিরপুরে। খিদিরপুরের রিভলভিং ব্রিজের কথা তিনি জানতেন না। তিনি হঠাৎ গাড়ি দাঁড় করিয়ে প্রায় লাফিয়ে নামলেন। দেখি, ব্রিজটা ঘুরছে আর উনি ছবি তুলছেন। বললেন, ‘আজকা পিকচার মিল গ্যায়া!’ আমি তখন একেবারের নভিশ। হাঁ করে দেখছিলাম। কী কাণ্ডটাই করছেন। ওরকম একজন প্রবাদপ্রতিম ফোটোগ্রাফারের ছবির মুহূর্ত এক্কেবারে চোখের সামনে, লাইভ!

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১৭:৪৯   
Facebook WhatsApp Messenger
Raghu Rai’s Calcutta: A Timeless Portrait of the City’s Soul

তখন ২২-২৩ বছর বয়স আমার। টুকরোটাকরা ছবি তুলি। ছবি দেখারও চেষ্টা করি। একটা কাগজের অফিসে চাকরিও জুটে গিয়েছে। রঘু রাইয়ের ছবি দেখি। কাগজেই। কথাও শুনি হয়তো এর-ওর থেকে। তখন গুগল নেই। সার্চ করামাত্র হাতেনাতে ফল পাওয়া যায় না। হঠাৎ শুনলাম, কলকাতার ওপর রঘু রাইয়ের একটা বই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু বড্ড দাম! তবে? উপায় অফিস লাইব্রেরি। গেলাম, দেখলাম। বলা চলে আত্মসাৎ করলাম। একটা সময়, প্রায় প্রতিদিন, সেই বইয়ের কাছে গিয়ে পড়েছি। রঘু রাইয়ের কলকাতার কাছে। আমার প্রথম জীবনে, রঘু রাই নামক এক ফোটোগ্রাফার আমার কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিলেন, দেখতে শেখালেন। তখন আমাদের অফিসের লাইব্রেরিয়ান, শক্তিদা, একদিন বলেছিলেন, ‘রোজ এই বইটায় কী দেখো?’ আমি বলি, ‘আমি তো কলকাতা নিয়ে কাজ করি।’ মজা করে বলেছিলেন, ‘তাই বলে রোজ দেখতে হবে?’ বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ, রোজ।’ এ ঘটনার অনেকটা পরে অবশ্য সত্যিই রঘু রাইয়ের সঙ্গে আমার আলাপ, দ্বিরালাপ।

আমার অফিসে, দিল্লিতে বারবার দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে ওঁর সঙ্গে। একবার ১৯৯০ সালে আমার ওই কলকাতার কাগজের অফিসে এলেন। উনি তখন কাজ করতেন ‘সানডে’ ম্যাগাজিনে। স্বাভাবিকভাবেই ফোটোগ্রাফি বিভাগে এসে বসলেন। সক্কলের সঙ্গে খোশগল্প হল। ডেকার্স লেনে লাঞ্চ করেছিলাম একসঙ্গে। কলকাতা নিয়ে ওঁর আলাদা একটা আবেগ ছিল, সে তো ওঁর বই দেখেই বুঝেছিলাম। কিন্তু এই ছোট্ট দোকান থেকে খাওয়া, রাস্তার ধারে বসা, এগুলো বুঝিয়ে দেয়, তিনি কলকাতা শুধু রাস্তাঘাটে খুঁজে পাননি। পেয়েছিলেন মানুষের হাবভাবের মধ্যেও, অস্তিত্বের অংশে। আমাদের বলতেন, ‘তোমরা কত ভাগ্যবান, কলকাতায় কাজ করতে পারছ!’ তবে সব ক্ষেত্রে যে কলকাতা ভাগ্যবান নয়, তা রঘু রাই বুঝতেই পেরেছিলেন। কী করে?

একদিন বললেন, ‌‘তোমরা কত স্যালারি পাও এখানে?’ আমরা উত্তর দিতে তিনি বেশ হতাশ হলেন। বললেন, ‘এত কম!’ একবার তো সক্কলের পে-স্লিপ চেয়েছিলেন। আমার, অলোক মিত্র, তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আমরা নিয়েও গিয়েছিলাম। উনি দেখে-টেখে বললেন, ‘দিল্লি চলে আও!’ আসলে ফোটোগ্রাফারদের স্যালারি কেন এত কম হবে, কেন তারা সবসময় এতটা ব্রাত্য হয়ে থাকবে– এ নিয়ে অভিযোগ ছিল তাঁর। যা এই কলকাতায় আজকেরও বড় সমস্যা বলেই মনে হয়।

অলোক মিত্র, তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়– দু’জনেই খুব সিনিয়র ফোটোগ্রাফার হলেও আমাদের ঘর একই ছিল। সেখানেই আরেকদিন উপস্থিত হয়েছেন রঘু রাই। বললেন, ‘লাঞ্চ কাহা মিলেগা? মাছ-ভাত?’ অলোকদা বললেন, ‘রঘু, আমার বাড়িতে চলো, মাছ-ভাত খাবে।’ অলোকদার বাড়ি ছিল কাছেই, বউবাজারে। এয়ার ইন্ডিয়া অফিসের ঠিক উল্টোদিকে। ডাল-ভাত-সবজি-মাছ ছিল সেদিনের মেনুতে। রঘু রাই বেশ জমিয়ে খেয়েছিলেন সেদিন। একেবারেই হালকা খাবার, কিন্তু তৃপ্তি ওই মুখে ফুটে উঠেছিল স্পষ্টই।

zoom
আলোকচিত্র: রঘু রাই

যেটুকু রাস্তাঘাটে ঘুরেছি, দেখেছি রঘু রাই সদাসতর্ক। ক্যামেরা নিয়ে দৃশ্য খুঁজছেন। ক্যামেরা সবসময় খোলা থাকত। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে, বাবরি মসজিদের গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর, রঘু রাই কলকাতায় এসেছিলেন। আমি ও রঘু রাই হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম খিদিরপুরে। খিদিরপুরের রিভলভিং ব্রিজের কথা তিনি জানতেন না। তিনি হঠাৎ গাড়ি দাঁড় করিয়ে প্রায় লাফিয়ে নামলেন। দেখি, ব্রিজটা ঘুরছে আর উনি ছবি তুলছেন। বললেন, ‘আজকা পিকচার মিল গ্যায়া!’ আমি তখন একেবারের নভিশ। হাঁ করে দেখছিলাম। কী কাণ্ডটাই করছেন। ওরকম একজন প্রবাদপ্রতিম ফোটোগ্রাফারের ছবির মুহূর্ত এক্কেবারে চোখের সামনে, লাইভ!

খানিক বন্ধুত্ব হয়ে গেল ওঁর সঙ্গে সেবার থেকেই। বারবার বলতেন, ‘দিল্লি এলে, আমার বাড়িতে এসো।’ আমার বোন থাকত দিল্লিতেই। একবার দিল্লি গিয়েছি, রঘু রাইকে ফোন করলাম সেই সুযোগে। ‘মিস্টার রাই, আমি দিল্লিতে, আমি কি যাব আজকে?’ বললেন, ‘প্লিজ কাম‌’। ওঁর বাড়ি ছিল দিল্লির রবীন্দ্রনগরে। সারাদিন অনেক গপ্পো। ধারেকাছে ওঁর প্রদর্শনী হওয়ার কথা ছিল, তাই অনেক ছবির টাটকা প্রিন্ট দেখতে পেয়েছিলাম। আর নতুন একটা ‘খবর’ দিয়েছিলেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক থেকে একটা অ্যাসাইনমেন্ট পেয়েছেন। ওয়াইল্ড লাইফের ওপর কিছু ছবি তুলতে হবে। খুবই উত্তেজিত দেখাচ্ছিল রঘু রাইকে সেকথা বলতে বলতে।

zoom
কলকাতা যখন ট্রামযোগ্য ছিল। আলোকচিত্র: রঘু রাই

অলক মিত্র, তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাও তুলেছিলেন রঘু রাই। এখনও মনে আছে, তিনি সেদিনই বলেছিলেন, ‘তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়: মোস্ট ট্যালেন্টেড ইন ইন্ডিয়া!’ আর ‘অলোক মিত্র: মাস্টার অফ নিউজ ফোটোগ্রাফি। তবে টেম্পারমেন্ট ঠিক করতে পারত।’ জানতে চেয়েছিলেন, আমি কী করতে চাই। আমি পুরনো রেকর্ড বাজাই: ‘আমি কলকাতায় থাকতে চাই। দিল্লিতে আসতে চাই না।’ তখন ‘আউটলুক’ থেকে অফার পেয়েছিলেন উনি, আমাকে বলেছিলেন, ‘যদি চাও, আসতে পারো।’ কিন্তু আমি যাইনি। কলকাতায় থেকে গিয়েছি।

অফিস বদল হল আমার। আরেকটি সংবাদপত্রের অফিসে গিয়ে পড়লাম। আরও একবার দিল্লি যেতে হল ‘ইউনেস্কো’র একটি প্রাইজ নিতে। প্রাইজ নিলাম কার হাতে? সেই রঘু রাই! চমকে উঠলেন দেখে! ‘আরে রাজীব, তুম স্টেটসম্যান চলা গয়া!’ প্রসঙ্গত বলে রাখি, রঘু রাই কেরিয়ার শুরু করেছিলেন ‘দ্য স্টেটসম্যান’ থেকেই।

কখনও শেখানোর চেষ্টা করতেন না। উপদেশও দিতেন না। খালি বলতেন, ছবি তুলে যাও, ছবি তুলে যাও। আজ রঘু রাই চলে গেলেন। কলকাতার প্রতি অপূর্ব প্রেম নিয়ে চলে গেলেন। ওঁর কলকাতা সিরিজ থেকে গেল। সে বইয়ের পাতা ওল্টালে, রঘু রাইকে ঠিকই খুঁজে পাওয়া যাবে।

calcutta CalcuttaChronicles KolkataDiaries LensCulture MagnumPhotos RaghuRai Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar TimelessFrames

Share this article on