


সান্দ্রো পেন্নাকেও আমরা তাঁর কবিতার আয়নায় দেখি। পাঠক দেখেন, বারবার তিনি বেছে নিয়েছেন প্রেম, আলো, সৌন্দর্য এবং সর্বোপরি জীবনকে। তাঁর কবিতায় বারবার এসেছে সমুদ্র এবং সূর্যালোক। সমুদ্রের ঢেউয়ের ওঠা-নামা পেন্নার জীবনের স্থিতিশীলতার তারতম্যের প্রতীক। দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সমকামী হিসেবে সামাজিক স্বীকৃতি না-পাওয়া– এই সবরকম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি সবসময় চোখ রেখেছেন সূর্যের দিকে, জীবনের রৌদ্রকরোজ্জ্বল মুহূর্তগুলি তাঁর কাছে এসেছে আশীর্বাদ হয়ে।
‘Perhaps youth is only this:
to love the senses forever and never repent’
কবিমনের স্বাধীন চলাচলের পথ যদি পাঠক অনুসরণ করতে করতে এগন, তবে তিনি নির্বিঘ্নে পৌঁছে যেতে পারেন এমন সব চিন্তার কাছে, যার সামনে দাড়িয়ে তিনি তাঁর নিজের জীবনের দিকে আরেকবার ফিরে তাকাতে চাইবেন। কোনও কোনও কবি পাঠকমনকে ছুড়ে দেয় এক তীব্র ঘূর্ণির মাঝখানে। সেই চিন্তাঝড়ের ভিতর পাক খেতে খেতে পাঠক পৌঁছে যান অলৌকিক, আশ্চর্য এক বহুমাত্রিক বাস্তবতায়– যা তাঁকে একরকম স্বর্গ অথবা নরকদর্শন করায়। সেই দেখার দৃষ্টি থেকে পাঠক তৈরি করেন তাঁর নিজস্ব জীবনদর্শন। আবার কিছু ক্ষেত্রে পাঠককে ঝকঝকে নীল বসন্ত-আকাশে মেঘের ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে চলে কবিমন। পাঠক স্পর্শ করেন নরম সূর্যালোক, সমুদ্রের হাওয়া, পাখির উড়ালের মতো প্রেম! তিনি পান স্পর্শকাতর অনুভূতি ও উপলব্ধির প্রত্যক্ষ পাঠ-অভিজ্ঞতা। সৌন্দর্য বিচিত্র রূপে ধরা দেয় তাঁর চোখে। ইতালীয় কবি সান্দ্রো পেন্না এই সহজ সূর্যালোকের কবি। তাঁর কবিতায় ঘুরে-ফিরে বেড়ায় তাঁর কিশোর প্রেমিকেরা। সীমাহীন সমুদ্রের মতো স্বাধীন এবং তরঙ্গমুখর পেন্নার অন্তর্জগত! ‘নবীন কিশোর’-দের প্রতি পেন্নার শারীরিক আকর্ষণ, সপ্রেম মুগ্ধতার এক কামতীব্র আগ্নেয়োদ্ভাসকে আমরা স্পর্শ করতে পারি তাঁর কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে।

সান্দ্রো পেন্নার জন্ম ১৯০৬ সালের ১২ জুন, ইতালির ঐতিহাসিক পেরুজিয়া শহরে। পেন্না বড় হয়েছেন একটানা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে। তবে তাঁর শৈশবের দিনগুলো পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল আশপাশের প্রাকৃতিক প্রাচুর্যে। তিনি বেড়ে ওঠেন উমব্রিয়া এলাকায় পাহাড়, ঝকঝকে রৌদ্রস্নাত খেত, নদী ও গাছপালার সান্নিধ্যে। শৈশবে দেখা ইতালির গ্রামীণ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পরবর্তীকালে তাঁর কবিতায় বারবার ঘুরে ঘুরে এসেছে। ছোটবেলা থেকেই পেন্না ছিলেন অন্তর্মুখী। তাঁর সংবেদনশীল মন ছোট থেকেই ঝুঁকে পড়েছিল সাহিত্য এবং চিত্রকলার দিকে। প্রচুর বই পড়তেন পেন্না। ১৯২০-র দশকের শেষের দিকে তিনি রোমে চলে যান এবং জীবনের অধিকাংশ সময় কাটান সেখানেই। তাঁর যৌবনকাল কেটেছে দারিদ্র্যের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই করে। তাঁর আয় ছিল অনিয়মিত, কিন্তু পেন্না ছিলেন একজন একনিষ্ঠ পর্যবেক্ষক। রোমের সাধারণ মানুষের জীবনকে খুব মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। রোমের পথঘাট, মানুষ, ট্রেন স্টেশন, নদীর ধার– সমস্ত কিছু অপরূপ প্রতীকচিহ্ন হয়ে ফিরে এসেছে তাঁর অপূর্ব সুরময় গীতিকবিতায়।
পেন্না কবিতা লিখতে শুরু করেন অল্পবয়সেই এবং ইতালির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি Umberto Saba তাঁর প্রতিভা সহজেই বুঝতে পারেন। তাঁর গোটা সাহিত্যজীবনে সাবার সান্নিধ্যের প্রভাব বজায় ছিল। পেন্নার কবিতার সবথেকে সুন্দর দিক হল– তাঁর নিজের অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি কোনওরকম অন্তরালের আশ্রয় নেননি কখনওই। যে সময়ে সমকামিতা সমাজে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল, তখনও তিনি সমকামী প্রেমকে স্বাভাবিক এক মানবিক অভিজ্ঞতা এবং আকাঙ্ক্ষা হিসেবেই দেখেছেন। অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সততার সঙ্গে তিনি প্রকাশ করেছেন নিজের প্রেমভাব, কোমল রোমাঞ্চ, স্নিগ্ধ সুখানুভূতি এবং বিষণ্ণতা। অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং সাবলীল স্বরে তিনি তাঁর কবিতায় লিখেছেন–
‘Always boys in my poems!
But I know not how to speak of other things.’

পেন্না খুব সহজ কথায় স্বীকার করছেন যে, তাঁর কবিতার মধ্যে সর্বক্ষণ রয়েছে কিশোরদের অবাধ আনাগোনা এবং তিনি একথাও বলেছেন যে এই কিশোরদের বাদ দিয়ে অন্য কোনও কিছুর কথা কীভাবে প্রকাশ করতে হয়, তা তিনি জানেন না। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে যদিও আমাদের সেকথা মনে হবে না। তাঁর কবিতার ভিতরে যেমন কিশোরদের অনায়াস যাতায়াত, তেমনই অবলীলায় সেখানে চলে আসে সমুদ্রের নীল, দিনের আলো, ট্রেনের স্টেশন ছেড়ে যাওয়া, গ্রীষ্ম-সন্ধের হাওয়া, শহরে হাজার হাজার মুখের ভিড়, প্রেমের মায়াবী মুহূর্তেরা, ভালোবাসা নিভে যাওয়ার বিষণ্ণতা। তবে একথা ঠিক– জীবনের টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে যে এক আশ্চর্য ক্যালেইডোস্কোপ তৈরি করতে করতে এগিয়েছেন এই কবি, তাতে বারবারই অতি অনায়াসে এসে প্রবেশ করেছে বালক এবং কিশোরেরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কবিতায় অনেককিছুই তিনি সাংকেতিক রাখলেও, স্পষ্টভাবে বলেছেন এই বালকদের কথা। এখানে মনে পড়তে পারে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটি কবিতা–
‘দাও, বক্ষ দাও, দুগ্ধ পান করি, বালক তোমার
আমি ছাড়া কেহ নাই।’
এই বালকের প্রতি কবি তাঁর কবিতায় প্রায় স্পষ্টভাবেই নিয়ে এসেছেন কামভাব। বালকের কোমল শরীরের প্রতি তীব্র মোহাচ্ছন্নতা।

পেন্নার অধিকাংশ কবিতাই আকারে ছোট, কারণ তাঁর কবিতায় ছোট ছোট শব্দ গভীর অর্থ বহন করে, অথচ তাঁর অনেক কবিতাতেই আমরা দেখি– ‘boy’ বা ‘young boy’ কথাটি বারবার স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, কেন বারবার তিনি বালক বা কিশোরদের কথা কবিতায় আলাদা করে উল্লেখ করছেন? এমনটা হতেই পারে যে, তিনি কিছুতেই চাননি তাঁর প্রেমের বা যৌন অভিমুখ বিষয়ে পাঠকের মনে কোনওরকম সন্দেহ বা দ্বিধা তৈরি হোক। পেন্না যে সময়ে লিখছেন, তখন সমকামী প্রেম একেবারেই সমাজ-স্বীকৃত নয়। তাই কবি-সাহিত্যিকরা এই বিষয়ে লিখলেও এত স্পষ্টভাবে নিজের আকর্ষণের অভিমুখ বোঝানোর ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই পিছপা হয়েছেন। পেন্নার কবিতায় আবার দেখা যাচ্ছে ঠিক উল্টোটা। তিনি যেন পাঠককে বোঝাতে চাইছেন যে তাঁর মুগ্ধতা, ভালোবাসা, যৌনতা, অবসাদ, বিষণ্ণতা সবই বালক-কিশোর-পুরুষদের ঘিরেই।
এই কবির কবিতায় সর্বক্ষণ কাজ করে চলে একরকমের ভয়েরিজম। ভয়েরিজম বলতে বোঝায় অন্যের ব্যক্তিগত মুহূর্তদের গোপনে চাক্ষুষ করে আনন্দ পাওয়ার অভ্যাস। এখানে কিন্তু ভয়েরিজম বলতে যৌনতার বা আত্মরতির মুহূর্তের কথা বলা হচ্ছে না। পেন্নার কবিতায় ভয়েরিজম আসছে একজন মানুষকে তাঁর অন্যমনষ্কতা, নিজের মধ্যে মজে থাকা বা আত্মনিমগ্ন অবস্থায় দেখার মাধ্যমে। একটি কবিতায় পেন্না লিখছেন–
“Here’s the young boy aquatic and happy
Here’s the young boy pregnant with light
More limpid than the verse he recites
Sweet season of silence and sun
And this festival of words within me”

এখানে উনি একজন কিশোরের কথা লিখছেন যে কবিতা পড়ছে। কবির মনে হচ্ছে, কিশোরটি যেসব কবিতা পড়ছে– তার থেকেও বেশি নির্মল সৌন্দর্য ধারণ করে আছে সে, তাই তাকে মনে হচ্ছে জলের মতো তরল, স্বচ্ছ, আনন্দিত। বালক যিশুর মতন আলোকদ্যুতিময় এই কিশোর। তাকে চোখের সামনে দেখেই কবিমনে এক অপার্থিব সুখের সঞ্চার ঘটছে; এবং তিনি বুঝতে পারছেন তাঁর ভিতরে শুরু হচ্ছে শব্দের অর্থাৎ কবিতার এক উৎসব! তার মানে কিশোরটির কোমল নিষ্পাপ রূপের প্রতি মুগ্ধতাই হয়ে উঠছে তাঁর শিল্পসৃষ্টির প্রেরণা। এই কবিতায় ‘pregnant’ কথাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি সমকামী সম্পর্কে গর্ভধারণের বিষয়টি কোথাও আসে না। গর্ভধারণ মানে কী? দু’টি মানুষের শারীরিক মিলন থেকে এক নতুন প্রাণের সৃষ্টি। কিন্তু গর্ভধারণ বা গর্ভবতী কথাগুলির একমুখিতা থেকে বেরিয়ে এলেই দেখা যাবে, যে কোনও মনই গর্ভধারণে সক্ষম। গর্ভে কাকে ধারণ করা হয়? নতুন এক সৃষ্টিকে, নতুন সম্ভাবনাকে। এখানে এই কিশোর যে কবিতা পড়ছে, বলা হচ্ছে সে গর্ভে ধারণ করে আছে আলো। এই আলো কবি দেখতে পাচ্ছেন। এই আলো নতুন জন্ম নেওয়া এক মুগ্ধতার আলো, এই আলো সম্ভাবনাময় এক প্রেমের আলোও তো হতে পারে! এখানে কিন্তু কবির ওই ভয়েরিস্টিক মনকে আমরা দেখতে পাচ্ছি। তিনি দেখছেন আত্মমগ্ন হয়ে পাঠরত এক কিশোরকে, এবং সেই দৃশ্যসুখ যে তাঁর মনে কী ধরনের স্পন্দন তৈরি করছে তাও তিনি কবিতায় বলছেন অকপটে।
কিছু কবিতায় কিশোরদের প্রতি এই মুগ্ধতা আরও সাহসী রূপ নিয়েছে। যেমন–
“O still skies. And naked bodies
But the boy’s lively back-and-forth
Won’t stop beneath the sun…”
এই কবিতায় পেন্না এর আগের লাইনগুলিতে একজন ঘুমন্ত পুরুষের কথা লিখেছেন, যিনি উন্মুক্ত শরীরে শুয়ে আছেন। তার দু’লাইন পরই তিনি বলছেন ওই পুরুষের ক্লান্ত ঘুমন্ত শরীরটি দেখে তাঁর মনে জন্ম নিয়েছে এক কিশোরের ছবি, যে সজীব এবং প্রাণচঞ্চল। এখানে ‘back-and-forth’ কথাটি একটি যৌনদৃশ্যের দিকে ইঙ্গিত করছে স্পষ্টভাবেই। পেন্না বলছেন, এই কিশোরটির শরীর ঘুমন্ত পুরুষটির মতো অবসন্ন দেখাবে না কখনও, সে থাকবে চিরসতেজ, চির-উজ্জ্বল, সূর্যের মতো।

পেন্নার কবিতার কিশোরদের সঙ্গে আমরা সাদৃশ্য খুঁজে পাব C. P. Cavafy-র কবিতায় ঘুরে ঘুরে আসা তরুণদের সৌন্দর্যের।
“He is dozing
on the sofa. He is fully devoted to books
but he is twenty-three years old, and he’s very handsome;
and this afternoon love passed
through his ideal flesh, his lips.
Through his flesh which is full of beauty
the heat of love passed;
without any silly shame for the form of the enjoyment…”
Cavafy-র এই কবিতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি কবির একইরকম মুগ্ধতা এই ২৩ বছরের যুবকের প্রতি। তিনি স্পষ্ট কথায় এই যুবকের শরীরের প্রতি তাঁর আকর্ষণের কথা ব্যক্ত করেছেন, উঠে আসছে ‘ideal flesh, lips’-এর মতো শব্দেরা। সবথেকে আশ্চর্যের শেষ লাইনটি– যেখানে কবি বলছেন যে, ঐ সুপুরুষ যুবকের সঙ্গে যে শরীরী অন্তরঙ্গতার দুপুর তিনি কাটিয়েছেন তার, মধ্যে ছিল না কোনও ‘silly’ অর্থাৎ বোকা বোকা সমাজারোপিত লজ্জা। এই সূত্র ধরে মনে পড়ছে পেন্নার আর একটি কবিতা–
‘When the light weeps across the streets
I long to squeeze a young boy, in silence, to me’

এই কবিতায় কবির কিশোর শরীরের প্রতি কামাকাঙ্ক্ষা তীব্র ও সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। চূড়ান্ত বিষাদের মুহূর্তে যখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে তিনি নীরবে চোখের জল ফেলছেন, ঝাপসা চোখে রাস্তার সমস্ত আলোর দিকে তাকিয়ে কবির মনে হচ্ছে আলোগুলিও নিঃশব্দে কেঁদে চলেছে। সেই অসহায় মুহূর্তে তাঁর মধ্যে ইচ্ছে জাগছে একটি কিশোর শরীরকে জাপটে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নেওয়ার। একইভাবে তাঁর অন্য একটি কবিতাতেও হতাশা, বিষণ্ণতা ও কামনার এক অনন্য কাব্যিক প্রকাশ আমরা দেখতে পাই–
“The river is deserted. And you know
That yesterday’s sunny surrenders are gone
I kiss your armpits, humid, proud
Smells of a summer going wrong”
এই কবিতাটিতেও রয়েছে শরীরী প্রেমের প্রকাশ। একইসঙ্গে এই কবিতায় রয়েছে এক নীরব বিষণ্ণতা। কবিতাটির প্রথম লাইনে আমরা একটি নিঃসঙ্গ নদীর কথা পাই। এরপর আসছে বিরামচিহ্ন। যেহেতু নদীটি সঙ্গীহীন তাই এই লাইনটিকে বাকি কবিতার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। আবার একথাও ঠিক এই নদীর ধারে যখন মানুষ ফিরে আসবে, তখনও এই নদী বইবে ঠিকই কিন্তু তাঁর অন্তরের নিঃসঙ্গতা কাটবে না। এই নদী কি তবে কবিমন? এরপর টের পাওয়া যাচ্ছে যে, কবিমন ডুবে রয়েছে এক গভীর বিষাদে। প্রেমের স্বতঃস্ফূর্ত আত্মনিবেদনের আলো নিভে গিয়েছে। কবি তাঁর প্রেমিকের ভেজা বাহুমূলে চুম্বন করতে গিয়ে টের পাচ্ছেন– আগেকার মতো সম্মোহন ও আত্মসমর্পণ সেই গন্ধে আর নেই, বরং রয়েছে এক অদ্ভুত ঔদ্ধত্য যা নির্দেশ করছে একত্রে কাটানো এক ভুল বসন্তের (ইউরোপে ‘summer’ বলতে বসন্তকাল বোঝায়) দিকে। এখানে প্রেমিকের সঙ্গে মনোমালিন্যের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা কবির মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে দীর্ঘ একাকিত্বের বিষাদ। সেই বিষাদ নিয়ে বয়ে চলেছে কবিমন, যেন এক নিঃসঙ্গ নদী, তাই শুরুর লাইনে একটি ছাড়া পরের তিন লাইনে কোনও বিরাম নেই। মাঝে দু’জায়গায় সামান্য থেমেছে কবিমন। কোথায়? প্রেমিকের ভেজা বাহুমূলে। সেখানে হোঁচট খেতেই হত, স্মৃতি এবং সত্যের তুলনা করতে গিয়ে কে না হোঁচট খায়? এরপর লাইন আবার বয়ে গিয়েছে বিরামহীন।

পেন্নার কবিতায় বিষাদের মতোই রয়েছে উল্লাস, তৃপ্তি ও আনন্দের নীরব বিস্ফোরণ। সেই আনন্দ বারবার এসেছে বিষণ্ণতাকে পাশে রেখেই। কবি সমাধিস্থলের আলোর কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন জীবনের আনন্দময় সময়ের দিকে নজর ফেরাতে। আসলে তিনি নিজেকেই সবসময় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, জীবনের আলোকোজ্জ্বল পর্বগুলোর কথা স্মরণ করে সবরকম প্রতিকূলতাকে পার করে যাওয়ার।
“Cemetery lights, calm fingers
Count slow evenings. Don’t tell me
The summer night’s not beautiful”
এই কবিতায় কবি সমাধিক্ষেত্রের আলোগুলিকে ধীরে ধীরে গুনতে বলছেন। যে আলো সর্বক্ষণ মৃত্যু ও মৃতদেহ দেখে, তাদের কবি বলছেন, বসন্ত-সন্ধের যে অপরূপ সৌন্দর্য সেদিকে নজর ফেরাতে। তিনি জানেন রোজ এত এত মৃত্যু-দেখা এই আলোগুলোও বসন্তের অনাবিল সৌন্দর্যকে অস্বীকার করতে পারবে না। ঠিক যেমন অধিকাংশ মানুষই শত সংকটের মধ্যে থেকেও বারবার মৃত্যুকে পাশ কাটিয়ে জীবনকে বেছে নেয়। বিশ্বাস করে– জীবন সুন্দর।
সান্দ্রো পেন্নাকেও আমরা তাঁর কবিতার আয়নায় দেখি। পাঠক দেখেন, বারবার তিনি বেছে নিয়েছেন প্রেম, আলো, সৌন্দর্য এবং সর্বোপরি জীবনকে। তাঁর কবিতায় বারবার এসেছে সমুদ্র এবং সূর্যালোক। সমুদ্রের ঢেউয়ের ওঠা-নামা পেন্নার জীবনের স্থিতিশীলতার তারতম্যের প্রতীক। দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সমকামী হিসেবে সামাজিক স্বীকৃতি না-পাওয়া– এই সবরকম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি সবসময় চোখ রেখেছেন সূর্যের দিকে, জীবনের রৌদ্রকরোজ্জ্বল মুহূর্তগুলি তাঁর কাছে এসেছে আশীর্বাদ হয়ে।
‘The sea is completely blue
The sea is completely calm
Inside the heart almost a scream
Of joy.’

এই কবিতায় সমুদ্রের শান্ত, স্থিত রূপ কবিমনে এনেছে এমন এক প্রশান্তি, যা একরকম হর্ষধ্বনি দেওয়ার মতন স্বতঃস্ফূর্ত অথচ নির্বাক আনন্দ। আবার অন্য একটি কবিতায় এই সমুদ্রই কবিকে করেছে দুঃখভারাক্রান্ত।
“Hadn’t the sea, the clear sea turned me away
With its light? Was only unhappiness left?”
এখানে সমুদ্র এবং আলো, কোনওটাই আর কবিকে আনন্দ দিতে পারছে না। আরেকটি কবিতায় পেন্না লিখছেন–
‘In the soft October sun
Happy and harsh it was beautiful
To dream’
এই কবিতায় আবার ফিরে আসছে কবির জীবনমুখী স্বর। হেমন্ত-সূর্যের পেলব আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। পেন্না ওই আলোর মধ্যে পাশাপাশি রেখেছেন আনন্দ এবং জীবনের রূঢ়তাকে। কিন্তু হর্ষ-বিমর্ষতার মধ্যেও কবি জানাচ্ছেন যে তিনি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন। অর্থাৎ জীবনের প্রতি তিনি আশাবাদী।
আজ সান্দ্রো পেন্নার জন্মদিনে পাঠক তাঁকে স্মরণ করছেন শ্রদ্ধায়, মুগ্ধতায়। তাঁর কবিতার শান্ত, স্বকীয় ও প্রগাঢ় স্বর কবিতাপ্রেমী পাঠকদের কাছে এক অমোঘ সম্মোহনী জাদুমন্ত্র ছাড়া আর কী! জীবনের অভিমুখে পেন্নার নিরন্তর এই অন্তর্ভ্রমণও তাই কবিতা হয়ে উঠেছে তাঁর আশ্চর্য কলমে–
“Lullabied I’d like to live
Within the sweet noise of life.”
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved