পথ, ভ্রমণ আশার, মুক্তির স্বপ্ন দেখায়। শোষণবাঁধনমুক্ত রাস্তার ঠিকানা ভ্রমণ দেয় বলেই হয়তো এখনও নারীদের পথে, ভ্রমণে এত আপত্তি পরিবারের, সমাজের। ভ্রমণ মানুষকে পরিবর্তন করে। চিনতে শেখায়, বুঝতে শেখায়। খোলা মাঠের মতন দিলখোলা করে মনকে। একটি ট্রিপের শুরুতে যেমন থাকে মানুষ, শেষে সে অন্যরকম এক নতুন মানুষে পরিবর্তিত হয়। উন্মুক্ত করে চিন্তার প্রাঙ্গণ। আর এই উন্মুক্ত চিন্তাকেই ভয় পেয়ে এসেছে পিতৃতন্ত্র চিরদিন। তাই নারীদের একা ভ্রমণ আজও অনেকটা সোনার পাথরবাটি।
কোলাখাম থেকে কাফেরগাওঁ-এর পথে। গাড়িতে তখন আমার ১০ বছরের কন্যা আর আমার সঙ্গী। তিনজন নারীর চোখমুখ আবিষ্ট মেঘেদের খেলায়। ঘন পাইন জঙ্গলের বুকের ভিতর থোক থোক কুয়াশা। মেঘ আর কুয়াশা একে অপরকে আগলে ধরে মুখ ঘষছে পাইন গাছে। বৃষ্টি নামছে থমকে থমকে। সেই বৃষ্টির ফোঁটা বেগুনি অর্কিডের বুকে ঝরে পরছে টুপটুপ করে। অসম্ভব সুন্দর এই দৃশ্য বুকে নিয়ে পাহাড় দাঁড়িয়ে। যেন বুক পেতে মেলে ধরেছে আদিম সমস্ত গল্প। সেই আদিম অনন্তকাল ধরে লেখা গল্পের রং নিশ্চিতভাবেই মায়াবী সবুজ কিংবা ঘন কুয়াশা কিংবা অসংখ্য ছোট ছোট পাহাড়ি ঝোরার রং যা পাহাড়ের যোনি বেয়ে নেমে প্রাণ ঢালে পাহাড়ের বুকে বাস করা নিস্তব্ধতায়। পাহাড়ের রঙের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে আমার স্বাধীনতার রং। নিস্তব্ধতার রং। যে নিস্তব্ধতায় নিজের মুক্ত মন ডানা মেলে ওড়ে। উন্মুক্ত আকাশের রং মিলে যায় নিজের উন্মুক্ত মনের স্বাধীনতার রঙে।
কালিম্পঙের গ্রাম থেকে কাফেরগাওঁ ফেরার সেই পথে অজস্র বাঁকের একটি বাঁক পেরতে গাড়িটা খানিক মোচড় দিয়ে উঠল। বোঝা গেল তার ফিরতে অনীহা আছে। আর সেই মোচড়ের রেশ কাটতে না কাটতেই মোবাইলে রিং। মায়ের ফোন। মায়ের ফোন মানেই ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করার আশা। মা সেদিন শুরুই করলেন তার স্পেসিফিক বক্তব্য দিয়ে–
‘বাচ্চার এখন বই পড়ার সময়। তুই এত ঘুরিস! তুই যে এত নষ্ট হয়ে গেলি। তো মনে রাখিস…’

‘নষ্ট’ শব্দটা শুনেই মাঝরাতে পাহাড়ের নৈঃশব্দ্য কেটে যেমন করে কোনও গবুরে পোকা আর্তনাদ করে ওঠে, তার থেকেও বেশি ডেসিবেলে ‘নষ্ট…নষ্ট…নষ্ট’ বাজতে লাগল লুপে। এতদিন আরেঠারে মেটাফরে বলা ‘নষ্ট’-র জায়গা নিল নির্দিষ্ট এই শব্দখানা। অনেকবার শোনা এই শব্দটার সেদিনের অভিঘাত যেন খান খান করে দিতে চাইল সবটুকু স্বাধীনতার নির্যাসকে।
নষ্ট নারী। কিন্তু কেন?
অপরাধটা কী?
অপরাধ হল বাড়ির পুরুষকে সঙ্গে না নিয়ে কিংবা আমার মায়ের হাঁড়ি-বাড়ি-চিতার কাঠ থুড়ি কবরের রৈখিক সমীকরণের জীবন নস্যাৎ করে দিয়ে আমি ঘুরতে বেড়িয়েছি। সঙ্গে নিয়েছি আমার মেয়েকে। যতটা না ঘুরতে বেড়ানোটা সমস্যা, তার থেকে সমস্যা হল এই যে নিয়মের বেড়া ভাঙা। যে নিয়ম পুরুষতন্ত্র তৈরি করে আর পুরুষ-নারী উভয়েই তার এজেন্ট হিসেবে সেই নিয়মের দড়ি পরাতে উদ্যোগী হয়।
না কি ফোবিয়া বা ভয়? অজানা নিয়ে ভয়? আমার মায়ের তাঁর মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্ক? তবে বাড়িতে মেয়েরা কি ভীষণ নিরাপদে থাকে? রাস্তা মানেই কি বিপদ? পরিসংখ্যান কিন্তু অন্য কথা বলে।

সদ্যপ্রয়াত গ্লোরিয়া স্টেইনেম তার আত্মজীবনী ‘অন দি রোডস’-এ লিখছেন:
ভারতের পণপ্রথাজনিত হত্যাই হোক, ইজিপ্টের অনার কিলিংই হোক অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গার্হস্থ্য হিংসা; রেকর্ড বলে যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মহিলারা বাড়িতেই প্রহৃত অথবা খুন হন– হন যে পুরুষদের চেনেন, তাদের দ্বারাই। পরিসংখ্যানের দিকে তাকিয়ে বলা যায়, রাস্তার থেকে বাড়ি মহিলাদের জন্য বেশি বিপদজনক। সম্ভবত মহিলাদের জন্য সবচেয়ে বৈপ্লবিক কাজ হল স্বেচ্ছায় ঘুরতে বেরনো– আর ফিরে এসে বাড়িতে সাদর আমন্ত্রিত হওয়া।
[‘Whether by dowry murders in India, honor killings in Egypt, or domestic violence in the United States, records show that women are most likely to be beaten or killed at home and by men they know. Statistically speaking, home is an even more dangerous place for women than the road. Perhaps the most revolutionary act for a woman will be a self-willed journey– and to be welcomed when she comes home’]
বহু বছর আগে লেখা এই কথা আজও সত্য। তাই স্লাট-শেমিং থেকে অনার কিলিং এখনও বাস্তব ভারতে। আর বাড়ি ফেরা? মহিলাদের ‘বাড়ি’ ও বাড়িতে ফেরা? বুদ্ধিমান পাঠক বোধহয় জানেন।
গ্লোরিয়াকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, এখনও আপনার আশা ও উৎসাহের উৎস কী? গ্লোরিয়া এক কথায় বলেন–
‘Because I travel…’

এই একই কথার অনুরণন সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত গানে:
পথে এবার নামো সাথী পথেই হবে পথ চেনা
জনস্রোতে নানান মতে মনোরথের ঠিকানা,
হবে চেনা, হবে জানা।
…
তখন তো আর শোষণবাঁধন মানব না
সবার এ দেশ সবার ছাড়া তো জানব না
পরোয়া নেই আকাশ বাতাস
হবে আশার পরোয়ানা।
পথ, ভ্রমণ এই আশার, মুক্তির স্বপ্ন দেখায়। শোষণবাঁধনমুক্ত রাস্তার ঠিকানা ভ্রমণ দেয় বলেই হয়তো এখনও নারীদের পথে, ভ্রমণে এত আপত্তি পরিবারের, সমাজের। ভ্রমণ মানুষকে পরিবর্তন করে। চিনতে শেখায়, বুঝতে শেখায়। খোলা মাঠের মতন দিলখোলা করে মনকে। একটি ট্রিপের শুরুতে যেমন থাকে মানুষ, শেষে সে অন্যরকম এক নতুন মানুষে পরিবর্তিত হয়। উন্মুক্ত করে চিন্তার প্রাঙ্গণ। আর এই উন্মুক্ত চিন্তাকেই ভয় পেয়ে এসেছে পিতৃতন্ত্র চিরদিন। তাই নারীদের একা ভ্রমণ আজও অনেকটা সোনার পাথরবাটি। পরিসংখ্যান বলে অবস্থা একটু বদলেছে। সোলো ট্রাভেলার নারীদের সংখ্যাও বদলেছে বহুগুণ। কিন্তু তাদের বয়সের পরিসংখ্যান বলছে বেশিরভাগই হালফিলের জেন-জি। এবং মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণি।
তাই যদি প্রশ্ন করা হয়– পথ তুমি কার? নিশ্চিতভাবেই উত্তর আসবে: পুরুষের। পথ দখলের কথা বা ভ্রমণের কথা মাথায় এলেই একা নারীকে অনেকগুলো বাধা অতিক্রম করতে হয়। শুধুই পারিবারিক বাধা নয়। আরও যে চিন্তা মাথায় ফেরে তা হল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শৌচালয় পাওয়া যাবে কি না! ভারতের মতো দেশে যা আজও অমিল। পরিসংখ্যান যাই থাকুক না কেন, আমরা জানি, মেয়েরা বাইরে বেরলে জল কম খায়, কারণ প্রকৃতির ডাক এলেই পোহাতে হয় পরিষ্কার টয়লেট পাওয়ার ঝক্কি।

তবুও সব ঝক্কি পেরিয়ে বেরতে হবে রাস্তাতেই। তাতে যতই ঝক্কি থাকুক না কেন। যেমনটি বলছেন গ্লোরিয়া:
রাস্তাকে বেছে নেওয়া– অর্থাৎ আমি বোঝাতে চাইছি রাস্তার হাতে নিজেকে ছেড়ে দেওয়া– রাস্তাই আমায় পরিবর্তন করেছে। রাস্তা– জীবনের মতোই, জীবন যেমন মসৃণ নয়, তেমন। রাস্তা আমাদের নিজেদের গ্রহণ করতে শেখায়। যা তত্ত্বে শিখেছি তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে শেখায়। সাবধানতা ঠেলে রূপায়ণ করতে শেখায়। পরিসংখ্যান থেকে বাস্তব গল্পের মুখোমুখি হতে শেখায়। সংক্ষেপে বলা যেতে পারে, আমাদের মস্তিষ্ক থেকে সরিয়ে হৃদয়ের বোধ তৈরি করে। রাস্তা বেছে নেওয়া জীবন-মরণের মতন জরুরি, যেমন বাস্তব বুঝতে জরুরি সম্মতিক্রমে শারীরিক মিলন।
[“Taking to the road– by which I mean letting the road take you– changed who I thought I was. The road is messy in the way that real life is messy. It leads us out of denial and into reality, out of theory and into practice, out of caution and into action, out of statistics and into stories– in short, out of our heads and into our hearts. It’s right up there with life-threatening emergencies and truly mutual sex as a way of being fully alive in the present.”]
নিজেদের চিনতে, নিজেদের ভাঙতে, নিজেদের গড়তে, বাস্তব বুঝতে, জেনারালাইজেশন থেকে স্পেসিফিকে পৌঁছতে (আগে যেমন মা বলত, একা ঘুরতে যাওয়া মেয়েরা খারাপ, তারা সিগারেট খায়, মদ খায়! তার এই জেনারাইলেজেশন এবার আমার একা ভ্রমণে স্পেসিফিক বা নির্দিষ্ট-তে পৌঁছেছে– ‘নষ্ট’ শব্দে) নিজেদের অবস্থান বুঝতে নারীদের নামতেই হবে পথে। সে পথ যতই ঝক্কির হোক না কেন। পথের দখল এবার নিতেই হবে। বাধ্য করতে হবে রাষ্ট্র ও পিতৃতন্ত্রকে। পথ শুধু পুরুষের নয়।
পথ আমার মতন ‘নষ্ট’ নারীদেরও।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved