Shakti chattopadhyay and his poems in his own voice | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শ্রবণ-শক্তি

সেই ডিলান টমাসের ফরমুলা। তাঁর সেই ‘ডু নট গো জেন্টল ইন্টু দ্যাট গুড নাইট’ যে এক নিপুণ ভিলানেল, তা তাঁর শ্রোতার বোঝার দরকার নেই। কারণ কবিতার জন্ম লিখিত সাহিত্যের ঢের আগে। তার সমস্ত ব্যাকরণের জন্ম লিপি আসার বহু আগে তৈরি। সে শ্রুতি। সে জন্ম থেকে শ্রুত। এই একবার শোনা থেকে পদ্যসমগ্রের তিন নম্বর খণ্ডের ২৫১ পাতায় (সূচিপত্রের ভুল কি পরে শোধরানো হয়েছিল?) যতবার ফিরেছি, আমি আসলে খুঁজেছি সেই স্বর। আদি, আদিম স্বর যা আসলে কবিতার প্রথম স্বর।

শেষ আপডেট: মার্চ ১৯, ২০২৬, ২১:২৪   
Facebook WhatsApp Messenger

শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে একটি শব্দ লিখলেও মনে হয় ‘জনপ্রিয়’ নামক বিশেষণটি ব্যবহার করি। পর মুহূর্তেই মনে হয় কবির তথা সমস্ত সাহিত্যিকের জনপ্রিয়তা নির্ভর করে তাঁকে নিয়ে তৈরি গালগল্পের ওপর। তারপর মনে পড়ে ,আরেকটা বিশেষ দিক। অনেক সময় কোনও বিশেষ লেখা তাঁর সময়ের তানে বেজে ওঠে। সে লেখা জনপ্রিয় হয়। কিন্তু সে লেখার প্রজন্মান্তর হয় না।

১৯৬২ সালে রবার্ট বারলি ‘সাংক উইদাউট ট্রেস’ বলে একটি প্রবন্ধের বই লেখেন। সেখানে মার্কিন দেশের অজস্র ক্লাসিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেইসব বই যারা একদা মধ্যবিত্তের বইয়ের তাকে শোভা বাড়াত। পরবর্তীকালে সম্পূর্ণ লুপ্ত। চিহ্ন না রেখে ডুবে গিয়েছে। প্রাক্তন মার্কিন পোয়েট লরিয়েট তথা ‘প্যারিস রিভিউ’ পত্রিকার বিখ্যাত সাক্ষাৎকারমালা যাঁর হাতে তৈরি, সেই কবি ডোনাল্ড হল লিখেছেন সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হওয়া ও দীর্ঘ সময় কাটানো কবিদের নিয়ে। সেখানে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন মার্কিন মানসে এলিয়টের উত্থান ও পতন। বলেছেন ডিলান টমাসের মৃত্যুর কিছুদিন পরেই কেমনভাবে তাঁর বই ব্রিটেনের পুরনো বইয়ের দোকানে পাওয়া যেত। তার পরেই তিনি বলছেন উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের কথা, কীভাবে তাঁর কবিতা মার্কিন তরুণ কবিদের হাত ধরে টিকে গেছে বেশ কিছু বছর। সেখানেই তিনি বলছেন কী করে ডিলান টমাস নামক কবির পুরাণ নির্মাণ করেছিল তাঁর প্রকাশনা। সেই নির্মাণের কথা পড়তে গিয়ে মনে এল শক্তি চট্টোপাধ্যায়। যা এই লেখার কারণ।

ডিলান টমাসের নির্মাণের নেপথ্যে ছিল বিদ্যায়তনের নীলনয়ন বালক, দক্ষিণপন্থী খ্রিস্টান টি এস এলিয়টের বিপরীতে এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত নিরীশ্বরবাদী তীব্র মাতাল, ছন্দ-নিপুণ, সুগভীর কণ্ঠের অধিকারী কবিকে দাঁড় করানো। যাঁরাই তাঁকে কবিতা পড়তে শুনেছেন কিনেছেন তাঁর বই। এখানেই কি মনে পড়ে যাচ্ছে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কথা? আমার তো যাচ্ছে। সঙ্গে জুড়ছে এক তীব্র ট্র্যাজিক বোধ। আমার সামনে বসে থাকছেন এক অভিমানী বালক যে, এই পৃথিবীকে মেনে নিতে পারছে না।

অবসাদকে এই সেদিনও লোকে অসুখ বলে জানত না। ১৯৫০-এর দশকে তো ভাবাই যেত না হয়তো। নেশা যে অবসাদের ফল, সেটা আমাদের সমাজে এসেছে এই সেদিন। ডিলান টমাস বা শক্তি চট্টোপাধ্যায়– কেউই সেটা জানতেন না। আমার বাবার এক বন্ধু তাঁর বাঙালি সুলভ নাকচ করে দেওয়ার মন নিয়ে (এই যে দুনিয়া জোড়া ‘ক্যানসেল কালচার’ তা বোধহয় বাংলাতেই জন্মেছে!) ঘোষণা করেছিলেন শক্তি কোনও কবিই নন । আমার কিশোর মনে বেশ ধরেছিল কথাটা। আমি তখন সুনীলে মগ্ন। তাঁর স্মার্ট ভাষা কিশোর খাদক। ‘নবীন কিশোর’ হতে কেই বা চায়নি!

zoom
শক্তি চট্টোপাধ্যায়

কিন্তু যেই জীবনে দ্বিতীয় দশক এল, কানে গেল শক্তির স্বকণ্ঠে কবিতা পাঠ। ‘দুঃখ কি সহজে যায়? তাকে ধুতে নদী-ভরা জল/ লাগে ও বাতাস লাগে সেই ভেজা অঞ্চল শুকাতে।’ এইচএমভি-র লাল মলাটের ক্যাসেট। ব্যাস হয়ে গেল নেশা!

সেই ডিলান টমাসের ফরমুলা। তাঁর সেই ‘ডু নট গো জেন্টল ইন্টু দ্যাট গুড নাইট’ যে এক নিপুণ ভিলানেল, তা তাঁর শ্রোতার বোঝার দরকার নেই। কারণ কবিতার জন্ম লিখিত সাহিত্যের ঢের আগে। তার সমস্ত ব্যাকরণের জন্মলিপি আসার বহু আগে তৈরি। সে শ্রুতি। সে জন্ম থেকে শ্রুত। এই একবার শোনা থেকে পদ্যসমগ্রের তিন নম্বর খণ্ডের ২৫১ পাতায় (সূচিপত্রের ভুল কি পরে শোধরানো হয়েছিল?) যতবার ফিরেছি, আমি আসলে খুঁজেছি সেই স্বর। আদি, আদিম স্বর যা আসলে কবিতার প্রথম স্বর।

zoom
সস্ত্রীক শক্তি চট্টোপাধ্যায়

বিদ্যায়তনে শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে কীভাবে পড়া হবে, কে তাঁকে নাকচ করবে, কে নাচবে মাথায় তুলে, এসব প্রশ্ন আজ অবান্তর। ২৩ মার্চ, ১৯৯৫ থেকে কেটে গিয়েছে ৩১ বছর। আমাদের প্রজন্ম তাঁকে চোখে দেখেনি। কেবল তাঁকে পড়েছে। আর শুনেছে। যারা পড়েছে তারা তাঁর প্রথম বই, বড়জোর চতুর্দশপদী নিয়ে মেতেছে। কিন্তু তাঁকে শোনা মানে হেমন্তের অরণ্যের পোস্টম্যানকে দেখতে পাওয়া। আর কয়েক বছরের মধ্যেই মুছে যাবে তাঁর জৈবনিক পুরাণ। আমরা তাঁকে দেখতে পাব অকস্মাৎ বাগানে ঢোকা শিশু হিসেবে, যে কিছু ফুল-লোভে (কবির পাঠে ‘ফুলো-লোভে’) ঢুকে এসেছে।

Bengali Poetry Indian poet Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shakti Chattopadhyay শক্তি চট্টোপাধ্যায়

Share this article on