


সোনামুখী বলতেই যে পুতুলটির কথা সবার আগে মনে আসে, সেটি হল ভাগ্যমণি পুতুল। স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা এই পুতুলকে ‘ভাগ্যি মানি’ বলে অভিহিত করে থাকেন। পুতুলটির যে-বৈশিষ্ট্য সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে, তা হল, পুতুলটির মাথার পিছনে চালির মতো নান্দনিক কেশরাজি। ঠিক মাথার পিছনে চালি দিলে যেমন দেখতে হয়, ঠিক তেমন। বাঁশ-কাঠি দিয়ে শরীর-জুড়ে নকশা করা।
আষাঢ়ের সকালগুলোর মধ্যে অসম্ভব এক মায়া আছে। সেই মায়াই এই বাংলাকে আরও মরমি করে তোলে। বৃষ্টির পূর্বাভাসের হাত ধরে হালকা হাওয়া স্পর্শ করে যায়। রাস্তার পাশে ইতস্তত মুলিবাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা টালির নাম না জানা গ্রামীণ চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে ছুটে চলে যাচ্ছে বাস। আর তার মধ্যেই আমি বসে ভাবছি যে, এ-বছর দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবারের বোরিয়ার অধীর চিত্রকর বার্ধক্যজনিত ব্যাধির কারণে রথযাত্রা উপলক্ষে পুতুল বানাতে পারেননি! চাহিদা তলানিতে ঠেকে যাওয়ায় চুঁচুড়ার উজ্জ্বল পালও পুতুল তৈরি করেননি। তাহলে কি বাঁকুড়ার সোনামুখীর কুমোরপাড়া থেকেও আমায় খালি হাতে ফিরতে হবে?

অনিশ্চয়তার দোলাচলে ড্রাইভারের সিটের পাশে থাকা রেকর্ডার থেকে গেয়ে চলেছেন লতা মঙ্গেশকর– ‘হাজার তারার আলোয় ভরা’। গানটা মেঘাচ্ছন্ন সকালে স্মৃতিমেদুর করে তোলে।
বাংলা এবং বাঙালির কাছে রথযাত্রা কেবলমাত্র আধ্যাত্মিক সাধনা নয়। আবহমান বঙ্গজীবনের সত্তায়, রথযাত্রার মধ্যে বাঙালি লালন করে এসেছে তার লোকজ শিল্পীসত্তার পূর্ণ বিকাশ। জিলিপি গজার স্বাদ ছাড়াও বাঙালির রথের মেলা আগে আলো করে থাকত মাটির পুতুল। কাদাঘন মাঠ-প্রান্তরে অস্থায়ী মেলাগুলোয় চাটাই পেতে বিক্রি হত সেই পুতুল। শহুরে কৌলিন্যের স্বীকৃতির কথা না ভেবে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটা জেলায় রথের মেলাতে বিরাজ করত মাটির পুতুল। সঙ্গে অবশ্যই থাকত কাঠের পুতুল, খেলনা গাড়ি ও তালপাতার সেপাই। আর বিকেলে পুতুলনাচের আসর। সেই রথের মেলা থেকে পুতুল কিনেই গ্রামীণ বঙ্গজীবন ঝুলন সাজিয়ে তুলত। কিন্তু বিশ্বায়নের ফলে বাংলার মাটির পুতুলের সেই ধারা কার্যত তলানিতে এসে ঠেকেছে! তা সত্ত্বেও বিক্ষিপ্তভাবে সে আজও নিজের অস্তিত্বের কথা জানান দিয়ে চলেছে। রথযাত্রা আজ বাংলার মাটির পুতুলের জীবিত থাকার মঞ্চ।

সকাল ১১টা নাগাদ বাস সোনামুখী বাজার স্টপেজে এসে পৌঁছল। বাস থেকে নেমেই কুমোরপাড়ার খোঁজ শুরু করলাম। শেষমেশ অপ্রশস্ত গলিপথ পেরিয়ে পৌঁছলাম সেই গন্তব্যে।
ঘরের দাওয়ায় গলা-উঁচু পোড়ামাটির ঘোড়া রং করার মাঝে কার্তিক খাঁ জানালেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে রথযাত্রা উপলক্ষে মাটির পুতুল তৈরি করেন তিনি। রঙিন ছাঁচের কাঁচামাটির ‘ঘাড়নাড়া দাদু বুড়ো পুতুল’ থেকে শুরু করে পোড়ামাটির ‘বর-বউ পুতুল’, ‘সেপাই-ঘোড়া পুতুল’, ‘টেপা পুতুল’ এবং সোনামুখীর ঐতিহ্যশালী ‘ভাগ্যমণি পুতুল’ রথযাত্রা উপলক্ষে তিনি গড়েন। তাঁর কথায়, গ্রামীণ বাঁকুড়ায় রথের মেলায় আজও শিশুমনকে আকৃষ্ট করে মাটির পুতুল। এ-বছর রথযাত্রা উপলক্ষে তিন থেকে চার রকমের প্রায় ২০০-র বেশি পুতুল তৈরি করেছেন। আর্থিকভাবে প্রান্তিক শ্রেণিতে থাকা শিশুদের কথা মাথায় রেখে পুতুলের দাম মাত্র পাঁচ টাকা থেকে শুরু। ‘ঘাড়নাড়া দাদু বুড়ো পুতুল’ বাদ দিয়ে বাকি সব পুতুলই পোড়ামাটির। পুতুলগুলোকে পোড়ানোর পর তার ওপর রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়।

পুতুলগুলোকে গ্রামীণ সমাজের কাছে আরও বেশি আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন করে তোলার জন্য চড়া রং ব্যবহার করা হয়। তার এই বিপুল কর্মযজ্ঞে সহযোগী হিসেবে পাশে পান সহধর্মিণী নমিতা খাঁ-কে। পিতা পরেশ খাঁয়ের কাছে পুতুল তৈরির হাতেখড়ি হয়েছিল কার্তিক খাঁ-র। তারপর থেকে পারিবারিক শিল্পের সেই পরম্পরাকে তিনি এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। রথযাত্রা উপলক্ষে রঙিন মাটির কলসি, হাঁড়ি তৈরি করে থাকেন তিনি। এই কলসি, হাঁড়ির ওপর তুলি দিয়ে নকশা করা হয়। যা এগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। বছরের বাকি সময়টা সোনামুখীর নিজস্ব শৈলীর হাতি, ঘোড়া ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত মৃৎসামগ্রী তৈরি করেই সংসার চলে।
মৃৎশিল্পী সুকুমার খাঁ-র কথায়, গোটা বৈশাখ মাস কুম্ভকারদের মৃৎসামগ্রী তৈরির চাকা বন্ধ থাকে। জ্যৈষ্ঠ মাসের বিজোড় সংখ্যার তারিখ থেকে আবার চাকা চলা শুরু করে। আর সেই সময় থেকেই রথযাত্রার মাটির পুতুলের কাজ শুরু হয়। এ-বছর প্রায় চার থেকে পাঁচ রকমের প্রায় ৪০০ পুতুল তৈরি হয়েছে। পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে শিল্পের এই ধারাকে ছড়িয়ে দিতে বদ্ধপরিকর সুকুমারবাবু। ছেলে রুদ্রনীলও ইতিমধ্যে মাটির পুতুল তৈরি করতে শিখেছে। নবম শ্রেণিতে পাঠরত রুদ্রনীলের কথায়, বিদ্যালয়ের কর্মশিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক ছাড়া আর কেউ তার এই শিল্পসত্তায় উৎসাহী নয়। পাশে বসা বর্ষীয়ান মৃৎশিল্পী মদন খাঁ-র কথা, ‘কী হবে এই কাজ শিখে!’ আক্ষেপের সুরে তিনি বলে চলেন, ‘সমাজ আমাদের শিল্পী হিসেবে কোনওদিন মেনে নেয়নি। বরং জুটেছে কারিগরের তকমা। মৃৎশিল্পটাও যে শিল্প, সেই অনুভব আজও সমাজের নেই। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের উচিত লেখাপড়া শিখে পেশা পরিবর্তন করে নেওয়া।’

সুকুমার খাঁ-র তৈরি পুতুলের মধ্যে রঙিন কাঁচা-মাটির ছাঁচের পুতুল যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনই রয়েছে পোড়ামাটির পুতুলও। রঙিন ছাঁচের কাঁচা-মাটির পুতুলের মধ্যে রয়েছে ঘাড়নাড়া বুড়ো দাদু পুতুল। শারীরিক অভিব্যক্তির একাধিক ভাব প্রস্ফুটিত হয়েছে এই পুতুলের মধ্যে। কখনও পুতুলটি দাঁড়িয়ে, আবার কখনও সেটি মাটিতে বসে রয়েছে। বৃদ্ধ ঘাড়নাড়া বুড়ো দাদু পুতুলের পাশে তাকে জড়িয়ে রয়েছে এক বৃদ্ধা পুতুল। শিল্পীকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন– এর নাম ‘বুড়োবুড়ি পুতুল’। বাংলার খুব কম মৃৎশিল্পী বুড়োবুড়ি পুতুল একযোগে তৈরি করেন। শিল্পী আরও জানান, রথযাত্রার দুই দিন আগে পুতুলের রঙের প্রলেপ দেওয়ার কাজ শুরু হয়। মাটি দিয়ে পুতুল তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়ে গেলে সেগুলোকে রোদে শুকিয়ে নিয়ে চুল্লি বা পোয়ান বা পোনে পোড়ানো হয়। তারপর এর ওপর রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়। সুকুমারবাবু পোয়ানকে ‘শাল’ হিসেবে অভিহিত করেন। এ-প্রসঙ্গে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানান যে, সোনামুখীর কুম্ভকারেরা পোয়ানকে ‘শাল’ বলে থাকে। শিল্পীর তৈরি সর্বোচ্চ মাটির পুতুলটির উচ্চতা– দুই ফুট। তার তৈরি মাঝারি মাপের যে-সব পুতুল রয়েছে, সেগুলির উচ্চতা এক ফুট। আর সর্বনিম্ন পুতুলের উচ্চতা চার ইঞ্চি।

সোনামুখী কুম্ভকার-পাড়ার একাধিক মৃৎশিল্পীরা একই ধরনের মাটির পুতুল তৈরি করে থাকেন রথযাত্রা উপলক্ষে। মূলত তিন থেকে চার রকমের পুতুল বিপুল পরিমাণে তারা তৈরি করে থাকেন। এর মধ্যে বর-বউ পুতুলটির মধ্যে লোকজ সাবেকি-ধারা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
পুতুলটির তলার অংশটি চাকে বা চাকায় ঘুরিয়ে তৈরি করা। পুতুলের কোনও প্রকার পা নেই। হাতের গঠন বিমূর্ত। কিন্তু মুখের গঠনে বাস্তবধর্মিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পুতুলগুলির গোটা শরীর জুড়ে মাটি এবং বাঁশকাঠি দিয়ে নান্দনিক অলংকরণ করা হয়েছে। এই অলংকরণের শৈলী পুতুলগুলিকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। কেশবিন্যাসের প্রতিটা ভাঁজ সুস্পষ্ট ভাবে লক্ষ করা যায়। বউ পুতুলের কানের দুল, নাকের নথ, চুলের সিঁথিতে বিরাজ করে থাকা টিকলি এবং মোটা গলার তলায় একাধিক মালায় শিল্পীর সুষমা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মুখমণ্ডলে এক রাজকীয় ভাব লক্ষ করা যায়।

অন্যদিকে, বর পুতুলের শারীরিক গঠন নির্মেদ। তার ঊর্ধ্বাঙ্গ এবং নিম্নাঙ্গে সুন্দরভাবে অলংকরণ করা হয়েছে। এই অলংকরণের মধ্যে শিল্পীর নিজস্ব চেতনা পূর্ণমাত্রায় ফুটে উঠেছে। বাস্তবধর্মী মুখের গঠনটির কিছু ক্ষেত্রে ছাঁচ ব্যবহার করে থাকেন শিল্পীরা। আবার এই পাড়াতেই দয়াময় খাঁ-র মতো এমন শিল্পী রয়েছেন, যাঁরা ছাঁচ ব্যবহার না-করে বাস্তবধর্মী মুখের গঠন নির্মাণ করতে পারেন।
আগুনে পোড়ানোর পর পুতুলগুলির ওপর লাল রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়। এই রং ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভরসা করা হয় বাজার-চলতি ব্র্যান্ডগুলোর ওপর। পুতুলগুলির শরীরগাত্রে যে-সব অলংকার রয়েছে, সেগুলোর ওপর সোনালি রং দেওয়া হয়। এতে করে নারীর রাজকীয় রাজেশ্বরী বিভা বিকশিত হয়ে ওঠে। কিছু ক্ষেত্রে বর-বউ পুতুলের মাথায় মাটির মুকুট পরানো হয়।
নারীজীবনের সংগ্রাম ও মাতৃত্ব পূর্ণরূপে স্থান পেয়েছে এখানকার তৈরি পুতুলের মধ্যে। মাথায় কলসি নিয়ে হেঁটে চলা নারী-পুতুলের পাশাপাশি কাঁখে সন্তান নিয়ে ও মাথায় ঝুড়ি নিয়ে সংগ্রামরত মা-পুতুলের দেখা মেলে এখানে। মৃৎশিল্পী সুকুমার খাঁ এক্ষেত্রে অনবদ্য ভাবনার পরিচয় বহন করেছেন। এর পাশাপাশি মৃৎশিল্পী জয়ন্ত খাঁ শিশুর সঙ্গে মায়ের সম্পর্কের যে বিভিন্ন বৈচিত্র রয়েছে, তা তুলে ধরেছেন। একজন শিশুকে মানুষ হিসেবে বড় করে তুলতে সবথেকে বড় ভূমিকা যে মায়ের, তা ফুটে উঠেছে তাঁর শিল্পকলায়। আরও একটি পুতুলের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেটি হল– ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা সেপাই পুতুল বা সেপাই-ঘোড়া পুতুল।

ঘোড়ার পিঠে বসে রয়েছে একজন যোদ্ধা। রঙিন এই পুতুল বাঙালির ফেলে আসা বীরত্ব-গাথার সাক্ষ্য বহন করে। বাঁকুড়ার পাঁচমুড়ায় ‘ঘোড়সওয়ার’-এর দেখা পাওয়া যায়। যদিও সেই পুতুলটির গড়ন বিমূর্ত। আর সোনামুখীর এই পুতুলটির গঠন বাস্তবধর্মী। ঘোড়াটার মুখের গঠন সোনামুখীর নিজস্ব শৈলীর ঘোড়ার মতো। অর্থাৎ, চওড়া গঠন। ঠোঁটের আকৃতি মোটা। পুতুলের গায়ের ওপর রঙের অলংকরণ, বিভিন্ন শিল্পী বিভিন্নভাবে করে থাকেন। কোনও শিল্পী শুধু রং করে ছেড়ে দেন, আবার কেউ কেউ অলংকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। মৃৎশিল্পী সুকুমার খাঁ জানিয়েছেন, একবার রথের মেলার সময় তিনি গৌর-নিতাইও বানিয়ে ছিলেন। এ-বছর তিনি একাধিক হরিণ পুতুল তৈরি করেছেন।
সোনামুখী বলতেই যে পুতুলটির কথা সবার আগে মনে আসে, সেটি হল ভাগ্যমণি পুতুল। স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা এই পুতুলকে ‘ভাগ্যি মানি’ বলে অভিহিত করে থাকেন। পুতুলটির যে-বৈশিষ্ট্য সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে, তা হল, পুতুলটির মাথার পিছনে চালির মতো নান্দনিক কেশরাজি। ঠিক মাথার পিছনে চালি দিলে যেমন দেখতে হয়, ঠিক তেমন। বাঁশ-কাঠি দিয়ে শরীর-জুড়ে নকশা করা। সাধারণ পোড়ামাটির পুতুলটিতে আগে বনক বা বর্ণক রং ছাড়া আর কিছু দেওয়া হত না। এখন লাল রং দেওয়া হয়। পুতুলটির শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গের গঠন বৃহদাকার হলেও শরীরের নিম্নাঙ্গের গঠন ছোট। মুখের গঠনে বাস্তবধর্মী ছাপ স্পষ্ট। পুতুলটি হাতের মধ্যে ধরে রেখেছে একাধিক শিশুসন্তান। পুতুলটি কখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে আবার কখনও পা ছড়িয়ে বসে রয়েছে। তার ছড়ানো কোলে খেলা করে বেড়াচ্ছে একাধিক বিমূর্ত টেপা শৈলীতে অঙ্কিত শিশুসন্তান। স্থানীয় শিল্পীদের কথায়, এই পুতুলটির মধ্যে দিয়ে নারীর মাতৃত্বের উদযাপন করা হয়েছে। বংশপরম্পরা মেনে এই পুতুল নির্মাণ হয়ে চলেছে।

সোনামুখীতে চড়ক হয় না। ফলে রথযাত্রার মেলাতেই বসে সবচেয়ে বড় পুতুলের আসর। সোজা এবং উল্টোরথের দিন মৃৎশিল্পীরা তাঁদের শিল্পশৈলী নিয়ে সোনামুখীর রথের মেলায় বসেন। একাধিক স্থানীয় মৃৎশিল্পী আক্ষেপের সুরে জানালেন যে, পরম্পরাগত চাক বা চাকা ঘুরিয়ে মৃৎসামগ্রী ও পুতুল তৈরি করতে শারীরিক অসুবিধে হয়। বিশেষ করে বয়স্ক মৃৎশিল্পীদের এই অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় আরও বেশি করে। সেখানে যদি বৈদ্যুতিক চাক সরকারি সাহায্যে দেওয়া হয়, তাহলে তাঁরা অনেক বেশি উপকৃত হবেন। জেলা প্রশাসনের কাছে একাধিকবার এই দাবি করা হয়েছে। কিন্তু কোনও প্রকারের সুরাহা হয়নি! মৃৎশিল্পীরা আক্ষেপের সুরে জানালেন, কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী শহরতলির থেকে বহু শিল্পরসিক সোনামুখীর কুম্ভকারপাড়া বা কুমোরপাড়া ঘুরে গেলেও, তাদের অর্থাৎ মৃৎশিল্পীদের সার্বিক উন্নতি যে তিমিরে ছিল, সেখানেই রয়েছে।
প্রচারের আলো বাঁকুড়ার পাঁচমুড়ার কুমোরপাড়ায় বেশি পড়ে। কিন্তু ঐতিহ্যের দিক থেকে, সোনামুখীও কোনও অংশে কম নয়। কিন্তু বর্তমানে তা প্রচারের আলো থেকে অনেক দূরে। এই তীব্র গরমের মধ্যে বঞ্চনা থাকা সত্ত্বেও শিল্পীরা নিয়োজিত নিজেদের শিল্পসত্তায়। জয়ন্ত খাঁ, সুজিত খাঁ, গায়ত্রী দাস-সহ একাধিক মৃৎশিল্পীদের দাবি, তাদের এখানে বৈদ্যুতিক চাকের ব্যবস্থা করা হোক। এতে করে তাদের অনেকটাই সুবিধে হবে। আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়, এখানকার বেশিরভাগ মৃৎশিল্পীরা কুম্ভকার হলেও পদবিতে তাঁরা ‘খাঁ’ লেখেন। এই প্রসঙ্গে মৃৎশিল্পী সুকুমার খাঁ জানিয়েছেন, কোনও এক কালে নবাবের কাছ থেকে তাঁরা এই উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। বংশপরম্পরা মেনে সেই ধারা তাঁরা আজও বজায় রেখেছেন। সোনামুখীর এই কুম্ভকারপাড়াটি একাধিক অঞ্চলে বিভক্ত। যেমন বড় কার্তিকতলা, সত্যপীরতলা, গোদা শিবতলা।

বেলা গড়িয়ে আসছিল। ঈশান কোণে মেঘ জমাট বেঁধেছিল। এবার ফিরে যেতে হবে। বাস সোনামুখী বাজার ছেড়ে যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, শহরের শেষ সীমানায় শাল-পিয়াল-অশ্বত্থ গাছের বীথি উপরিভাগে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে প্রাকৃতিক খিলান বা তোরণ সৃষ্টি করেছে। এই জড়িয়ে থাকার মধ্যে যেন অনন্ত প্রজন্মের অসীম জন্মের নাড়ির টান লুকিয়ে রয়েছে। ঠিক যেভাবে মাটির পুতুলের সঙ্গে বাংলার আদি অকৃত্রিম সংস্কৃতি জড়িয়ে রয়েছে। বহু জন্মের অকৃত্রিম লোকজ ভালোবাসার মতো, যা আজও আষাঢ়ের মেঘলা সকালে জলছবির মতো স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে জীবিত রথের মেলায়।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved